সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

ইবনে সিনা: হৃদরোগ ও নাড়ির চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী মুসলিম মনীষী

মুসলিম বিশ্বের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা (Ibn Sina) । ইউরোপে তিনি Avicenna নামে পরিচিত। একাদশ শতাব্দীর এই বহুমুখী প্রতিভা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন, যা মধ্যযুগীয় চিকিৎসাশাস্ত্রকে নতুন মাত্রা দেয়। তাঁর বিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘আল-কানুন ফিৎ-তিব’ (The Canon of Medicine) বহু শতাব্দী ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নাড়ি পরীক্ষায় ইবনে সিনার অবদান ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল নাড়ি বা Pulse সম্পর্কে তাঁর বিশদ বিশ্লেষণ। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস ও গ্যালেন নাড়ি এবং শারীরিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ইবনে সিনা তাঁদের জ্ঞানকে আরও বিশ্লেষণ ও সুসংগঠিত করেন। তিনি মনে করতেন, রোগীর নাড়ির গতি ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব। নাড়ি পরীক্ষার দশটি বৈশিষ্ট্য ইবনে সিনা নাড়ি পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে একাধিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনার একটি কাঠামো তৈরি করেন। এর মধ্যে নাড়ি...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

আয়ুবা সুলায়মান ডিয়ালো: দাসত্ব থেকে লন্ডনের অভিজাত সমাজে

  ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; বরং একটি যুগের নির্মম বাস্তবতার দলিল। আয়ুবা সুলায়মান ডিয়ালো (Ayuba Suleiman Diallo) , যিনি Job ben Solomon নামেও পরিচিত, ছিলেন এমনই একজন পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম পণ্ডিত। দাস হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দিতে বাধ্য হওয়ার পরও তিনি তাঁর জ্ঞান, বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা ধরে রেখেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ফিরে পান। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম আয়ুবা সুলায়মান ডিয়ালো আনুমানিক ১৭০১ সালে পশ্চিম আফ্রিকার বুন্দুতে (বর্তমান সেনেগাল) এক সম্ভ্রান্ত ফুলানি বা ফুলবে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল সমাজে প্রভাবশালী এবং ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। তিনি সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন এবং একজন হাফিজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি আরবি ভাষায় পড়তে ও লিখতে দক্ষ ছিলেন। দাসত্বের নির্মম শিকার ১৭৩১ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ব্রিটিশ তামাক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্কিত দাস ব্যবসায়ীরা তাঁকে বন্দি করে আমেরিকার মেরিল্যান্ডে নিয়ে যায়। ...

জাবির ইবনে হাইয়ান: রসায়ন বিজ্ঞানের জনক

ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম মনীষীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে জাবির ইবনে হাইয়ান অন্যতম। ইউরোপীয় লেখায় তিনি Geber নামে পরিচিত। তাঁকে “রসায়ন বিজ্ঞানের জনক” হিসেবে অভিহিত করা হয়। শৈশব ও শিক্ষাজীবন জাবির ইবনে হাইয়ানের জন্ম আনুমানিক ৭২১ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে। তিনি তৎকালীন বিখ্যাত আলেম ও ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এর কাছে শিক্ষা লাভ করেন বলে ঐতিহ্যগতভাবে উল্লেখ করা হয়। জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ধাতুবিদ্যা ও রসায়ন নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করেন। রসায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন জাবিরের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল আলকেমিকে কেবল তাত্ত্বিক ও দার্শনিক চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষাভিত্তিক একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্ঞানচর্চায় রূপ দেওয়া। তিনি রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করতেন এবং পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের ওপর গুরুত্ব দিতেন। তাঁর গবেষণায় পাতন, বাষ্পীভবন, স্ফটিকীকরণ, পরিস্রবণ ও ক্যালসিনেশনের মতো বিভিন্ন পরীক্ষাগার পদ্ধতির উন্নতি ঘটে। এসব পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে রসায়নবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খনিজ অ্যাসিড ও অ্যা...

জাপানে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়: বদলে যাচ্ছে দেশটির ধর্মীয় চিত্র

জাপানকে সাধারণত বৌদ্ধ ও শিন্তো ঐতিহ্যের দেশ হিসেবে দেখা হয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে—জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা ও উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। জাপানে মুসলিমের সংখ্যা কত? বিভিন্ন গবেষণা ও অনুমানভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে বা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে জাপানে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার-এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল। এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছেন বিদেশি মুসলিম নাগরিক ও বাসিন্দা এবং জাপানি মুসলিমরা। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, জাপানে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি গণনা নেই। ফলে মুসলিম জনসংখ্যার বিভিন্ন হিসাব গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্যের উৎসভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। কেন বাড়ছে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা? জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলো থেকে মানুষের অভিবাসন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে কর্মী, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অভিবাসী জাপানে আসছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, আন্তঃদেশীয় বিবাহ এবং জাপানিদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারে...

পর্দা প্রথা ভেঙে সিংহাসনে বসা এক সাহসী নারীর গল্প: রাজিয়া সুলতানা

১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে যখন রাজিয়া সুলতানা দিল্লির শাসক হন, তখন তিনি এমন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন যা এর আগে অন্য কোনো সুলতানকে মোকাবিলা করতে হয়নি। এটি কোনো বিদেশি আক্রমণ বা গৃহযুদ্ধ ছিল না; বরং বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ সাধারণ যে তিনি একজন নারী ছিলেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লির রাজপরিবারের নারীদের পর্দা প্রথার আড়ালে অন্তরালে থাকার প্রত্যাশা করা হতো এবং তারা খুব কমই জনসমক্ষে আসতেন। একজন রানীর কাজ ছিল কেবল প্রাসাদের দেয়ালের আড়ালে থেকে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা, প্রকাশ্যে শাসন করা নয়। কিন্তু রাজিয়া কোনো পুতুল শাসক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন না। সিংহাসনে বসার পরপরই তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নেন যা তুর্কি অভিজাত এবং রক্ষণশীল সমাজের একটি বড় অংশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। ঐতিহ্য ভাঙার সাহসী পদক্ষেপ রাজিয়া সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় পর্দা পরিহার করেন এবং জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি একজন সুলতানের পুরুষসুলভ পোশাক পরিধান করা শুরু করেন, যার মধ্যে ছিল পাগড়ি (কুলাহ) এবং পুরুষ শাসকদের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় আলখাল্লা। তিনি উন্মুক্ত দরবারে বসতেন, ব্যক্তিগতভাবে জনগণের আবেদন শুনতেন, বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, সৈন্য...

আল-জাজিরা আল-ফুরাতিয়ার আরব-ইসলামিক বিজয়: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

  ইরাক এবং লেভান্তে ইসলামী বিজয়গুলোকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে আল-জাজিরা আল-ফুরাতিয়া (উচ্চ মেসোপটেমিয়া)-র বিজয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল । এটি মুসলিমদের ভৌগোলিক অর্জনগুলোকে সুরক্ষিত করে, খ্রিস্টান আরব উপজাতি ও বাইজেন্টাইনদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং বাইজেন্টাইন আর্মিতে আরবদের নিয়োগ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় । এছাড়া এটি সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে আর্মেনিয়ার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা থেকেও বাধাগ্রস্ত করেছিল । বিজয়ের কৌশলগত গুরুত্ব ও পটভূমি আমওয়াসের প্লেগের সময় আবু উবায়দার দুঃখজনক ইন্তেকালের পর, খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হিমস, কিনস린 এবং আল-জাজিরার গভর্নর হিসেবে ইয়াদ বিন গানমকে নিয়োগ দেন । ১৮ হিজরির মধ্য শাবানে (৬৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২১ আগস্ট) তিনি রাক্কা দিয়ে এই অভিযান শুরু করেন এবং রক্তপাতহীনভাবে তা জয় করেন । মূল পয়েন্ট: এডেসা (আল-রুহা)-র দিকে অগ্রসর হয়ে দুর্গ অবরোধ করার পর টানা ছয় দিন প্রতিরোধের মুখে বাইজেন্টাইন কমান্ডার শান্তির আবেদন জানান। ইয়াদ লোকজনকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং জিযিয়া ও খারাজ (কর) বিনিময়ে সন্ধি গ্রহণ করেন । হারান থেকে মেসোপটেমিয়ার ...

১৬ শতকের উসমানীয়-মিশরীয় বহুবিদ্যাবিদ তাকি আল-দ্বীন এবং তাঁর আবিষ্কারসমূহ

  ১. মূল আবিষ্কার ও প্রকৌশলগত উদ্ভাবন ছয় সিলিন্ডারের জল পাম্প (১৫৫৯): তিনি একটি উন্নত জলবাহী যন্ত্র তৈরি করেন, যা জল উত্তোলনের জন্য একটি জলের সাহায্যে চালিত স্কুপ-হুইল, অ্যাক্সেলের ওপর ক্যাম সিস্টেম এবং ভালভ ব্যবহার করত। প্রাথমিক বাষ্পীয় টারবাইন (১৫৫১): তিনি এমন একটি বাষ্পচালিত যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা চাকার ডানার দিকে চালিত বাষ্পের জেট দ্বারা চালিত হতো এবং এটি ভবিষ্যতের বাষ্প প্রযুক্তির অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছিল। নির্ভুল ঘড়ি ও অ্যালার্ম সিস্টেম: তিনি এমন উন্নত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক ঘড়ি তৈরি করেছিলেন যা মিনিট ও সেকেন্ডের মাপে সময় পরিমাপ করতে পারত, পাশাপাশি প্রাথমিক মেকানিক্যাল অ্যালার্ম সিস্টেমও আবিষ্কার করেছিলেন। ২. জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদান কনস্টান্টিনোপল মানমন্দির (১৫৭৭): নক্ষত্রপুঞ্জ নিখুঁতভাবে ম্যাপ করা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব আপডেট করার উদ্দেশ্যে তিনি সুলতান তৃতীয় মুরাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অত্যাধুনিক মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ৩. ইসমাইল আল-জাজারির সাথে তুলনা ইসমাইল আল-জাজারি (দ্বাদশ শতাব্দী): তিনি মূলত রোবটিক ডিভাইস (অটোমাটা) এবং ক্র্যাঙ্কশাফটের মতো মৌলিক যান্ত্...

আল-আন্দালুস: ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু সভ্যতা রয়েছে, যা মানবজাতিকে পথ দেখিয়েছে নতুন আলোর দিকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো 'আল-আন্দালুস'   —আইবেরীয় উপদ্বীপে গড়ে ওঠা এক অনন্য মুসলিম রাজ্য, যা আজও জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সুদিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। আল-আন্দালুস ও মুসলিম শাসনের সূচনা (৭১১ খ্রিস্টাব্দ) ৭১১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) পদার্পণ করেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে সেখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় 'আল-আন্দালুস' । দ্রুতই উন্নতির পথে এগিয়ে চলা এই অঞ্চলটি ৭৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এমনকি তারা ফ্রান্সের দক্ষিণাংশেও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছিল, যা সেসময়ের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিত। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র আল-আন্দালুস কেবল রাজনৈতিক বিজয়ের গল্প ছিল না, এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের এক সূতিকাগার। মুসলিম শাসনামলে এই অঞ্চলটি হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নত কৃষি...

ওমর খৈয়াম: বিজ্ঞান ও কবিতার এক অনন্য মেলবন্ধন

  সেলজুক সাম্রাজ্যের সময়কালে পারস্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকাশে যে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন ওমর খৈয়াম (১০৪৮–১১৩১ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং কবি—সব পরিচয়ই যেন তাঁর কাছে ম্লান। তিনি একইসাথে বিজ্ঞানের কঠোর যুক্তি আর কবিতার সূক্ষ্ম অনুভূতির এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। বিজ্ঞান ও গণিতে বিস্ময়কর অবদান ওমর খৈয়াম গণিতের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। বীজগণিত: তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ (cubic equations) নিয়ে একটি অসাধারণ অভিসন্দর্ভ রচনা করেছিলেন। জ্যামিতি: বৃত্ত ও পরাবৃত্তের (parabola) ছেদবিন্দু ব্যবহার করে জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান আবিষ্কার ছিল তাঁর সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে। এছাড়া তিনি ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্য নিয়েও গভীর গবেষণা করেছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যা: ফার্সি পঞ্জিকা বা 'জালালী ক্যালেন্ডার' সংস্কারে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর হিসেব করা সৌর বছর এতটাই নির্ভুল ছিল যে, হাজার বছরেও এতে মাত্র এক দিনের পার্থক্য হতো। সাহিত্যের অমর স্রষ্টা বিজ্ঞানের বাইরে তিনি সারা বিশ্বে মূলত পরিচিত তাঁর 'রুবাইয়াত' (Rubaiyat) বা চতুর...

ইবনে আল-নাফিস: মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও বহুবিদ প্রতিভা

  চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী রয়েছেন, যাঁদের আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন ইবনে আল-নাফিস (১২১০–১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন প্রখ্যাত আরব চিকিৎসক, দার্শনিক এবং বহুশাস্ত্রজ্ঞ (পলিম্যাথ) হিসেবে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বিশেষ করে মানবদেহের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। জন্ম ও প্রাথমিক জীবন ইবনে আল-নাফিস ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কের নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ে দামেস্ক ছিল ইসলামিক স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নিজের জন্মভূমি দামেস্কে তিনি শৈশব ও কৈশোরে ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইনশাস্ত্র (ফিকহ), দর্শন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর ও ব্যাপক শিক্ষা লাভ করেন। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসকদের অধীনে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার হাতেখড়ি হয়েছিল। কায়রোতে কর্মজীবন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দামেস্কে পড়াশোনা শেষ করার পর ইবনে আল-নাফিস মিসরের কায়রোতে চলে আসেন এবং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সেখানে অতিবাহিত করেন। কায়রোতে তিনি অত্যন্ত সম্মা...

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...