সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

১৬ শতকের উসমানীয়-মিশরীয় বহুবিদ্যাবিদ তাকি আল-দ্বীন এবং তাঁর আবিষ্কারসমূহ

  ১. মূল আবিষ্কার ও প্রকৌশলগত উদ্ভাবন ছয় সিলিন্ডারের জল পাম্প (১৫৫৯): তিনি একটি উন্নত জলবাহী যন্ত্র তৈরি করেন, যা জল উত্তোলনের জন্য একটি জলের সাহায্যে চালিত স্কুপ-হুইল, অ্যাক্সেলের ওপর ক্যাম সিস্টেম এবং ভালভ ব্যবহার করত। প্রাথমিক বাষ্পীয় টারবাইন (১৫৫১): তিনি এমন একটি বাষ্পচালিত যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা চাকার ডানার দিকে চালিত বাষ্পের জেট দ্বারা চালিত হতো এবং এটি ভবিষ্যতের বাষ্প প্রযুক্তির অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছিল। নির্ভুল ঘড়ি ও অ্যালার্ম সিস্টেম: তিনি এমন উন্নত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক ঘড়ি তৈরি করেছিলেন যা মিনিট ও সেকেন্ডের মাপে সময় পরিমাপ করতে পারত, পাশাপাশি প্রাথমিক মেকানিক্যাল অ্যালার্ম সিস্টেমও আবিষ্কার করেছিলেন। ২. জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদান কনস্টান্টিনোপল মানমন্দির (১৫৭৭): নক্ষত্রপুঞ্জ নিখুঁতভাবে ম্যাপ করা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব আপডেট করার উদ্দেশ্যে তিনি সুলতান তৃতীয় মুরাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অত্যাধুনিক মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ৩. ইসমাইল আল-জাজারির সাথে তুলনা ইসমাইল আল-জাজারি (দ্বাদশ শতাব্দী): তিনি মূলত রোবটিক ডিভাইস (অটোমাটা) এবং ক্র্যাঙ্কশাফটের মতো মৌলিক যান্ত্...
সাম্প্রতিক পোস্টগুলি

আল-আন্দালুস: ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু সভ্যতা রয়েছে, যা মানবজাতিকে পথ দেখিয়েছে নতুন আলোর দিকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো 'আল-আন্দালুস'   —আইবেরীয় উপদ্বীপে গড়ে ওঠা এক অনন্য মুসলিম রাজ্য, যা আজও জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সুদিন হিসেবে স্মরণ করা হয়। আল-আন্দালুস ও মুসলিম শাসনের সূচনা (৭১১ খ্রিস্টাব্দ) ৭১১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) পদার্পণ করেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে সেখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় 'আল-আন্দালুস' । দ্রুতই উন্নতির পথে এগিয়ে চলা এই অঞ্চলটি ৭৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরোটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এমনকি তারা ফ্রান্সের দক্ষিণাংশেও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছিল, যা সেসময়ের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিত। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র আল-আন্দালুস কেবল রাজনৈতিক বিজয়ের গল্প ছিল না, এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের এক সূতিকাগার। মুসলিম শাসনামলে এই অঞ্চলটি হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নত কৃষি...

ওমর খৈয়াম: বিজ্ঞান ও কবিতার এক অনন্য মেলবন্ধন

  সেলজুক সাম্রাজ্যের সময়কালে পারস্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকাশে যে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন ওমর খৈয়াম (১০৪৮–১১৩১ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং কবি—সব পরিচয়ই যেন তাঁর কাছে ম্লান। তিনি একইসাথে বিজ্ঞানের কঠোর যুক্তি আর কবিতার সূক্ষ্ম অনুভূতির এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। বিজ্ঞান ও গণিতে বিস্ময়কর অবদান ওমর খৈয়াম গণিতের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। বীজগণিত: তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ (cubic equations) নিয়ে একটি অসাধারণ অভিসন্দর্ভ রচনা করেছিলেন। জ্যামিতি: বৃত্ত ও পরাবৃত্তের (parabola) ছেদবিন্দু ব্যবহার করে জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান আবিষ্কার ছিল তাঁর সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে। এছাড়া তিনি ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্য নিয়েও গভীর গবেষণা করেছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যা: ফার্সি পঞ্জিকা বা 'জালালী ক্যালেন্ডার' সংস্কারে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর হিসেব করা সৌর বছর এতটাই নির্ভুল ছিল যে, হাজার বছরেও এতে মাত্র এক দিনের পার্থক্য হতো। সাহিত্যের অমর স্রষ্টা বিজ্ঞানের বাইরে তিনি সারা বিশ্বে মূলত পরিচিত তাঁর 'রুবাইয়াত' (Rubaiyat) বা চতুর...

ইবনে আল-নাফিস: মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও বহুবিদ প্রতিভা

  চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী রয়েছেন, যাঁদের আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন ইবনে আল-নাফিস (১২১০–১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন প্রখ্যাত আরব চিকিৎসক, দার্শনিক এবং বহুশাস্ত্রজ্ঞ (পলিম্যাথ) হিসেবে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বিশেষ করে মানবদেহের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। জন্ম ও প্রাথমিক জীবন ইবনে আল-নাফিস ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কের নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ে দামেস্ক ছিল ইসলামিক স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নিজের জন্মভূমি দামেস্কে তিনি শৈশব ও কৈশোরে ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইনশাস্ত্র (ফিকহ), দর্শন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর ও ব্যাপক শিক্ষা লাভ করেন। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসকদের অধীনে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার হাতেখড়ি হয়েছিল। কায়রোতে কর্মজীবন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দামেস্কে পড়াশোনা শেষ করার পর ইবনে আল-নাফিস মিসরের কায়রোতে চলে আসেন এবং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সেখানে অতিবাহিত করেন। কায়রোতে তিনি অত্যন্ত সম্মা...

কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ: আন্দালুসিয়ার ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে মেসকিটা (Mezquita) নামে পরিচিত, মানবসভ্যতা ও ইসলামী স্থাপত্যের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন। স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের কর্ডোবা শহরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি, শিল্প এবং ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ১. ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বিপ্লবের ফলে উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটে। আব্বাসীয়রা উমাইয়া রাজপরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে হত্যা করলেও, রাজকুমার আব্দুর রহমান প্রথম  অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং পালিয়ে উত্তর আফ্রিকা পেরিয়ে স্পেনে (আইবেরিয়ান উপদ্বীপ) আশ্রয় নেন। উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা: স্পেনে পৌঁছে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবেলা করে কর্ডোবাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেন এবং সেখানে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। কৌশলগত দূরদর্শিতা:  আব্দুর রহমান প্রথম  কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, তিনি উত্তর আফ্রিকার উপজাতি, ইউরোপের খ্রিস্টান রাজ্য এবং বাগদাদের আব্বাসীয়দের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ম...

আহমদ ইবনে মজিদ: সমুদ্রের সিংহ এবং মুসলিম জাহাজ চালনার ইতিহাস

  আহমদ ইবনে মজিদ (মৃত্যু: ১৫০২) ছিলেন মধ্যযুগের একজন অত্যন্ত প্রখ্যাত আরব নাবিক, গণিতবিদ ও কার্টোগ্রাফার। ১৪৯০ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কিতাব আল-ফাওয়ায়েদ ফি উসুল ইলম আল-বাহর ওয়া আল-কওয়ায়েদ' (Kitab al-Fawa'id fi Usul 'Ilm al-Bahr wa 'l-Qawa'id) সামুদ্রিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি প্রায় ১৪৩২ সালে বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমার জুলফার অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি নেভিগেশন বা জাহাজ চালনা বিদ্যায় চরম দক্ষতা অর্জন করেন এবং তাঁর অসাধারণ দক্ষতার জন্য তাঁকে "সমুদ্রের সিংহ" (The Lion of the Sea) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।ইবনে মজিদ সামুদ্রিক বিজ্ঞানের ওপর প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব বইয়ে তিনি চন্দ্র কক্ষপথ (lunar mansions), রম্ব লাইন (rhumb lines) এবং নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল নেভিগেশন টেকনিকগুলো বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর এই বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক রুটগুলোতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ...

শরীফ হুসাইন বিন আলী এবং আরব বিদ্রোহ (১৮৫৩–১৯২১)

 হেজাজের প্রথম রাজা এবং মক্কার আমীর শরীফ হুসাইন বিন আলী (১৮৫৩–১৯২১) ছিলেন হাশেমী রাজবংশের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর। ১৯০৮ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত হন। হুসাইন আঞ্চলিক সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং মুসলিম হাজীদের নিরাপত্তা ও লজিস্টিকস নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে, ১৯০৮ সালের তরুণ তুর্কি বিপ্লব এবং তাদের জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে, কারণ তিনি মনে করতেন এই নীতিগুলো ইসলামী ঐতিহ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অবশেষে, ব্রিটিশদের সহায়তায় তিনি ১৯১৬ সালের ১০ জুন 'মহান আরব বিদ্রোহ' শুরু করেন এবং তাঁর বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করে ওই অঞ্চলে অটোমান শাসনের অবসান ঘটান।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের বিস্তার: একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ

  মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতকাল ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম একটি স্থানীয় ধর্মীয় আন্দোলন থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে রূপ নেয়। মদিনা থেকে শুরু করে এই আন্দোলন কূটনীতি, চুক্তি এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সমগ্র আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। মূল দিকসমূহ: রাজনৈতিক ঐক্য: আরবের বিভিন্ন গোত্র ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব মেনে নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের আন্তঃগোত্রীয় দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র: মদিনাকে কেন্দ্র করে একটি সুসংহত ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান: এই নবগঠিত রাষ্ট্রটি এমন এক সময়ে গঠিত হয়েছিল যখন এর পশ্চিমে বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্য এবং পূর্বে সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্য অবস্থান করছিল—উভয় সাম্রাজ্যই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মানচিত্র (Map Overview) ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের বিস্তৃতি বোঝাতে সাধারণত যে ঐতিহাসিক মানচিত্রগুলো (যেমন: আল মুকাদ্দামা বা অন্যান্য ঐতিহাসিক ম্যাপ) ব্যবহার করা হয়, তাতে নিম্নলিখিত ভৌগোলিক সীমানা দেখা যায়: সবুজ বা নির্দিষ্ট রঙে চিহ্নিত এলাকা: সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ (মক্কা, মদিনা,...

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

মিশর জয় ও হেলিওপলিসের যুদ্ধ (৬৩৯–৬৪১ খ্রিষ্টাব্দ)

  ইয়ারমুক (আগস্ট ৬৩৬) এবং আল-কাদিসিয়ার (নভেম্বর ৬৩৬) ঐতিহাসিক বিজয়ের পর রাশেদুন খিলাফতের নজর পড়ে মিশরের দিকে। খলিফা উমর (রা.)-এর অনুমতিক্রমে সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.) প্রায় ৪,০০০ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে ৬৩৯ সালের ডিসেম্বরে মিশরের অভিমুখে যাত্রা করেন। ১. প্রাথমিক অভিযান ও প্রতিরোধ (৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ) পেলুসিয়াম (Pelusium) জয়: নীল নদ বদ্বীপের পূর্ব সীমানার এই গুরুত্বপূর্ণ দুর্গটি ৬৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। বেলবেইসের (Belbeis) পতন: তীব্র অবরোধের পর মার্চ মাসের শেষের দিকে বেলবেইস শহর বিজিত হয়। পেলুসিয়াম ও বেলবেইসে বাইজেন্টাইন বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে আমর ইবনুল আস (রা.) খলিফার কাছে অতিরিক্ত সৈন্যের আবেদন জানান। ২. বাবিলন অবরোধ ও হেলিওপলিসের যুদ্ধ মে ৬৪০-এর মধ্যে মুসলিম বাহিনী বাবিলন দুর্গ অবরোধ শুরু করে। তবে হেলিওপলিসে অবস্থানরত বাইজেন্টাইন বাহিনী পিছন থেকে আক্রমণ করতে পারে—এই আশঙ্কায় আমর ইবনুল আস (রা.) বাবিলনে কিছু সৈন্য রেখে মূল বাহিনী নিয়ে হেলিওপলিসের দিকে অগ্রসর হন। ঐতিহাসিক জয়: জুলাইয়ের শুরুতে অতিরিক্ত সৈন্য এসে পৌঁছায় এবং ৬ জুলাই ৬৪০ তারিখে ...

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান:  কিয়ামত সংঘটিত হবার  পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে  ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।  আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn। Boxএর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।  ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে  দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে, হে মুসলিম! আসো, আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে, হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদিদেরকে ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...