১. নাম, বংশ পরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ
আসল নাম: আমির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ।
তাঁর দাদার নাম 'জাররাহ'-এর নামানুসারে তিনি ইবনুল জাররাহ হিসেবে পরিচিত হন। বংশ: তিনি কুরাইশ গোত্রের বনু হারিস ইবনে ফিহর শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ইসলাম গ্রহণ: ইসলাম প্রচারের একেবারে শুরুর দিকে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দাওয়াতে তিনি ইমানের সুশীতল ছায়ায় আসেন।
তিনি ছিলেন নবম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ছায়াসঙ্গী হয়ে আমৃত্যু ইসলাম প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
২. ‘আমীনুল উম্মত’ উপাধির নেপথ্য ইতিহাস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন সাহাবীকে তাঁদের বিশেষ গুণের জন্য বিশেষ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। হযরত আবু উবাইদাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা।
একবার নাজরান থেকে একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এমন একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে তাঁদের সাথে পাঠানোর অনুরোধ জানাল, যিনি তাদের আর্থিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে ফয়সালা করতে পারেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছিলেন:
"প্রতিটি জাতিরই একজন আমীন বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে, আর আমাদের উম্মতের আমীন হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।" (সহিহ বুখারি)
৩. ঐতিহাসিক যুদ্ধসমূহে বীরত্ব ও আত্মত্যাগ
হযরত আবু উবাইদাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বদর, ওহুদ, খন্দকসহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নেতৃত্বাধীন প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বদর যুদ্ধ: বদরের প্রান্তরে কাফিরদের পক্ষে তাঁর নিজের পিতা আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ লড়াই করতে আসেন। আল্লাহর দ্বীনের সামনে রক্তের সম্পর্ককে পেছনে ফেলে তিনি সত্যের পক্ষে অবিচল ছিলেন।
ওহুদ যুদ্ধ: ওহুদের সংকটে যখন কাফিরদের হামলায় মুসলমানদের মাঝে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখন যাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হেলমেটের দুটি লোহার কড়া বা রিং তাঁর গালের ভেতরে ঢুকে যায়। হযরত আবু উবাইদাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিজের দাঁত দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সাথে সেই কড়া দুটি টান দিয়ে বের করতে গিয়ে তাঁর নিজের সামনের দুটি দাঁত হারিয়ে ফেলেন।
৪. সেনাপতি হিসেবে ভূমিকা ও শাম বিজয়
খলিফা হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতকালে তিনি সিরিয়া ও ফিলিস্তিন তথা শাম (Bilad al-Sham) বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ সামরিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফলেই সিরিয়ার বড় বড় শহরগুলো মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং তিনি সিরিয়ার গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দুনিয়ার এত বড় সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দেওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম মাত্রায় সরল ও সাদাসিধে।
৫. ইন্তেকাল এবং আমওয়াসের মহামারি
১৮ হিজরিতে ফিলিস্তিন ও জর্ডান উপত্যকায় 'আমওয়াস' নামক ভয়াবহ প্লেগ মহামারি দেখা দেয়। সেই সময় মুসলিম বাহিনীকে রক্ষা ও তদারকি করতে গিয়ে তিনি নিজেই এই মহামারিতে আক্রান্ত হন।
বয়স ও স্থান: প্রায় ৫৮ বছর বয়সে জর্ডান উপত্যকায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
জানাযা: তাঁর ইন্তেকালের পর অপর মহান সাহাবী হযরত মুআয ইবন জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর জানাযার নামায পড়ান।
মাজার শরিফ: জর্ডান উপত্যকায় 'মাসজিদ আবু উবাইদাহ'-এর সংলগ্ন একটি কক্ষে ঐতিহ্যগতভাবে তাঁর মাজার শরিফটি অবস্থিত। তাঁর আশপাশের কবরস্থানটিতে আমওয়াসের মহামারিতে শহীদ হওয়া বহু সাহাবীর চিরনিদ্রা রয়েছে।
উপসংহার
হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন বিনম্রতা, সাহসিকতা, সততা এবং ইমানের এক মূর্ত প্রতীক। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর এবং সকল সাহাবীর ওপর পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট হোন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন