সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

যুক্তির ইমাম: পারসিক দার্শনিক ও মুফাসসির ফখরুদ্দিন আল-রাজির বর্ণাঢ্য জীবন

 

ইসলামের ইতিহাস ও দর্শনে এমন কিছু মনীষী জন্ম নিয়েছেন, যারা নিজেদের মেধা ও মনন দিয়ে পুরো যুগকে প্রভাবিত করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পঞ্চম-ষষ্ঠ হিজরির বিশিষ্ট পারসিক পলিমেথ এবং প্রখ্যাত কুরআান ব্যাখ্যাকার ইমাম ফখরুদ্দিন আল-রাজি (১১৪৯–১২০৯ খ্রিষ্টাব্দ)। ইসলামী বিশ্বে যিনি "যুক্তির ইমাম" (Imam of Rationality) হিসেবে সমাদৃত।

যুক্তিবিদ্যা, দর্শন এবং আল-আশআরি theology (ধর্মতত্ত্ব)-কে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই মনীষীর জীবন ও কর্ম আজও গবেষকদের জন্য এক বিস্ময়।

১. প্রারম্ভিক জীবন ও জ্ঞান অন্বেষণ

বর্তমান ইরানের রাই (Rayy) শহরে জন্মগ্রহণ করা ফখরুদ্দিন আল-রাজি ছোটবেলা থেকেই ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। প্রথমে তিনি তাঁর পিতা (যিনি নিজেও একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন) এবং পরবর্তীতে স্থানীয় প্রাজ্ঞ পন্ডিতদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।

জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে বসিয়ে রাখেনি। জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এক দীর্ঘ ও বিস্তৃত যাত্রায় বের হন। প্রাক-মঙ্গোল রাজবংশগুলোর কাছ থেকে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং জীবনের শেষ বছরগুলোতে হেরাটের মাদ্রাসায় শিক্ষাদানে কাটিয়ে দেন। হেরাটে থাকাকালীনই ১২০৯ খ্রিষ্টাব্দে এক রহস্যময় ও বিতর্কিত পরিস্থিতিতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

২. অমর সৃষ্টি: তাফসিরুল কাবির

আল-রাজির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক সাহিত্যকর্ম হলো 'তাফসিরুল কাবির' (Tafsir al-Kabir)। এটি পবিত্র কুরআনের ওপর রচিত একটি বিশাল ও যুগান্তকারী ৩২ খণ্ডের তাফসির বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

এই বিশাল গ্রন্থে তিনি কেবল গতানুগতিক ধারায় আয়াতের অর্থ করেননি, বরং কুরআনের আয়াতের সাথে আধুনিক যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

৩. জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুমুখী শাখায় অবদান

ফখরুদ্দিন আল-রাজি কেবল একজন মুফাসসির বা তাফসিরকারকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং বহুশাস্ত্রজ্ঞ পলিমেথ। জীবনের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে তিনি ১০০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তাঁর রচনায় আশআরি ধর্মতত্ত্বের সাথে গভীর যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির এমন এক সংমিশ্রণ দেখা যায়, যা তৎকালীন ইসলামি চিন্তাজগতে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে ইসলামি দর্শনের গতিপথ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

৪. ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

জীবনের শেষ সময় হেরাটে কাটলেও মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি ও কর্মের অমরত্ব ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সমাধিসৌধ এবং তুর্কমেনিস্তানের কুনিয়া-উরগেঞ্চে (Kunya-Urgench) অবস্থিত তাঁর মাজারটি আজও তাঁর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইমাম ফখরুদ্দিন আল-রাজি আমাদের শিখিয়েছেন যে, ধর্মবিশ্বাস এবং যুক্তিবাদী চিন্তার বিরোধ নয়, বরং তাদের সঠিক সমন্বয়ই মানবজাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...