১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু
তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়।
২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান
আবদুল মজিদ জীবনের শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, তাঁকে যেন হয় তাঁর জন্মভূমি তুরস্কে অথবা ভারতের হায়দ্রাবাদে দাফন করা হয়। তাঁর সুযোগ্য কন্যা রাজকুমারী দুররু শেহভার (Princess Durru Shehvar) বারবার তুরস্ক সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁর পিতাকে ইস্তাম্বুলে দাফন করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তুর্কি সরকার সেই অনুমতি দেয়নি।
পরিবারের ইচ্ছা এবং পিতার শেষ ইচ্ছে পূরণ না হওয়ায় অনিশ্চয়তা যখন চরমে, তখন এগিয়ে আসেন রাজকুমারী নিলুফার। তাঁর সহযোগিতায় সৌদি আরবে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত উসমানীয় খেলাফতের এই শেষ প্রতিনিধিকে মদিনার পবিত্র জান্নাতুল বাকি (Jannat-ul-Baqi) কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তবে তৎকালীন সৌদি রাজা আবদুল আজিজ আল সৌদের শর্ত অনুযায়ী, সেখানে কোনো জনসমাবেশ বা সরকারি অনুষ্ঠান হয়নি এবং তাঁর কবরের ওপর কোনো নামফলকও রাখা হয়নি।
৩. নির্বাসিত জীবনের আর্থিক লড়াই ও খেলাফত আন্দোলন
নির্বাসনের দিনগুলোতে আর্থিক সংকটেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। বিশিষ্ট গবেষক অরবিন্দ আচার্যের মতে, খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা শওকত আলী হায়দ্রাবাদের নিজামের কাছে সুপারিশ করেছিলেন, যেন তিনি নির্বাসিত খলিফাকে প্রতি মাসে ৩০০ পাউন্ড পেনশন প্রদান করেন। এই সহায়তা তাঁর নির্বাসিত জীবনের কিছুটা ভার লাঘব করেছিল।
ইস্তাম্বুলের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ থেকে শুরু করে প্যারিসের নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাট হয়ে মদিনার নিরব মাটি—উসমানীয় খেলাফতের এই অন্তিম অধ্যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম করুণ এক রূপকথা হয়ে বেঁচে রয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন