সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

জ্যোতির্বিজ্ঞানী থেকে ট্র্যাজেডিক শাসক: তৈমুরী বংশের রাজা উলুগ বেগের করুণ ইতিহাস

 


১৫ শতকের ইতিহাস কেবল যুদ্ধবিগ্রহ বা সাম্রাজ্য বিস্তারের গল্প নয়, এটি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এক রোমহর্ষক অধ্যায়ও বটে। এই যুগের অন্যতম উজ্জ্বল এবং একই সাথে ট্র্যাজেডিতে ভরপুর এক চরিত্রের নাম উলুগ বেগ—যিনি ছিলেন একাধারে তৈমুরী রাজবংশের শাসক এবং বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রাখা সত্ত্বেও ক্ষমতার রাজনীতিতে তাঁর করুণ পরিণতি আজও ইতিহাসকে নাড়া দেয়। ১৪৪৯ সালের ২৭ অক্টোবর তাঁর জীবনাবসান ঘটে এক নির্মম চক্রান্তের মাধ্যমে।

১. বিজ্ঞানসাধক বনাম দুর্বল শাসক

উলুগ বেগ কেবল একজন রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও শিক্ষানুরাগী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মানমন্দির এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে ছিল এক ভিন্ন চিত্র। একজন সফল বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হলেও সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক কূটচাল সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর মারাত্মক দুর্বলতা ছিল। একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য পরিচালনা করার জন্য যে রাজনৈতিক চতুরতার প্রয়োজন হয়, তার বড়ই অভাব ছিল তাঁর মধ্যে।

২. ধর্মীয় অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

রাজবংশের ভেতরে চলা ক্ষমতার দ্বান্দ্বিক লড়াইয়ের সময় উলুগ বেগের ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন সংকটের জন্ম দেয়। রক্ষণশীল ধর্মীয় পুরোহিত ও উলেমাদের সাথে তাঁর মতপার্থক্য চরমে পৌঁছায়।

তাঁর এই ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সেসময়ের রক্ষণশীল মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে একদিকে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং অন্যদিকে ধর্মীয় মহলের তীব্র সমালোচনার জাঁতাকলে পড়ে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি চরমভাবে নড়বড়ে হয়ে যায়।

৩. ক্ষমতার লোভ ও রাজপথের ট্র্যাজেডি

পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁর নিজস্ব বিদ্রোহী পুত্র আব্দ আল-লতিফ পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। গৃহযুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে পড়া উলুগ বেগ একপর্যায়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে মক্কা শরিফে তীর্থযাত্রায় (হজ্জ) যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তিনি সমরকন্দ আত্মসমর্পণ করার পর ভেবেছিলেন নির্বিঘ্নে তীর্থযাত্রায় রওনা হবেন। কিন্তু বিধিবাম! তাঁর বিদ্রোহী পুত্রের গোপন নির্দেশে পথিমধ্যে স্থানীয় এক ঘাতক তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

যে পুত্র পিতার রক্তে হাত রঞ্জিত করেছিল, ইতিহাসে সে 'পাদারকুশ' বা পিতৃঘাতক হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। তবে ক্ষমতার লোভে করা এই পাপের ফল সে বেশি দিন ভোগ করতে পারেনি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাকেও ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।

৪. জ্ঞানের আলো নিভে যাওয়ার উপাখ্যান

উলুগ বেগের মৃত্যুর পর তাঁর তৈরি সেই বিখ্যাত ও অনন্য সাধারণ মানমন্দিরটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের অপমৃত্যু ঘটে।

উলুগ বেগের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান সাধনা আর ক্ষমতার রাজনীতি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত। ইতিহাস তাঁকে একজন সফল জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে মনে রাখলেও, তাঁর রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও করুণ পতন আজও মানব ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি হয়ে রয়েছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...