সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ: আন্দালুসিয়ার ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন


কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে মেসকিটা (Mezquita) নামে পরিচিত, মানবসভ্যতা ও ইসলামী স্থাপত্যের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন। স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের কর্ডোবা শহরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি, শিল্প এবং ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

১. ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বিপ্লবের ফলে উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটে। আব্বাসীয়রা উমাইয়া রাজপরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে হত্যা করলেও, রাজকুমার আব্দুর রহমান প্রথম  অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং পালিয়ে উত্তর আফ্রিকা পেরিয়ে স্পেনে (আইবেরিয়ান উপদ্বীপ) আশ্রয় নেন।

  • উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা: স্পেনে পৌঁছে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবেলা করে কর্ডোবাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেন এবং সেখানে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন।

  • কৌশলগত দূরদর্শিতা: আব্দুর রহমান প্রথম  কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, তিনি উত্তর আফ্রিকার উপজাতি, ইউরোপের খ্রিস্টান রাজ্য এবং বাগদাদের আব্বাসীয়দের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

  • মসজিদ নির্মাণের সূচনা: ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি কর্ডোবার তৎকালীন বিশপ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছ থেকে একটি ছোট গির্জার জমি কিনে নেন (ন্যায্য মূল্যের বিনিময়ে) এবং সেখানে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এটি ছিল আন্দালুসিয়ায় উমাইয়া শক্তির উত্থান এবং তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।

২. নির্মাণ ও ধারাবাহিক সম্প্রসারণ

কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ একদিনে নির্মিত হয়নি; বরং শত শত বছর ধরে বিভিন্ন উমাইয়া শাসক ও আমিরের আমলে এর কলেবর ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে:

  • আব্দুর রহমান প্রথম  (৭৮৫-৭৮৮): মূল প্রার্থনাকক্ষ এবং এর সামনের খোলা প্রাঙ্গণ বা সাহন (Sahn) তৈরি করেন।

  • আব্দুর রহমান দ্বিতীয় (নবম শতাব্দী): মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে তিনি মসজিদের প্রার্থনাকক্ষ বা সসংকীর্ণ অংশ দক্ষিণ দিকে প্রসারিত করেন।

  • আল-হাকাম দ্বিতীয় (৯৬১-৯৭৬): এই আমলের কাজগুলোকে কর্ডোবা খিলাফতের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তিনি মিহরাব এবং তার আশেপাশের অংশ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পুনর্নির্মাণ করেন, যেখানে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রেরিত কারিগরদের দিয়ে সোনালী মোজাইকের কাজ করানো হয়।

  • আল-মনসুর (শেষ সম্প্রসারণ): দশম শতাব্দীর শেষের দিকে আল-মনসুর মসজিদের পূর্ব দিকে বিশাল পরিসরে আরেকটি অংশ যুক্ত করেন, যার ফলে মসজিদটি তার বর্তমান আয়তনের কাছাকাছি পৌঁছায়।

৩. স্থাপত্যশৈলী ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

কর্ডোবার মেসকিটা তার অভিনব এবং যুগান্তকারী স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, যা তৎকালীন সময়ে ইসলামি ও ইউরোপীয় উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছিল।

ক. বিখ্যাত লাল-সাদা ডাবল-আর্চ (Double-Arched Columns)

মসজিদের ভেতরের প্রার্থনা হলে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে শত শত পাথরের স্তম্ভের সারি। গ্রানাইট, জ্যাসপার এবং মার্বেলের তৈরি প্রায় ৮৫০টি স্তম্ভের ওপর দুই স্তরের (ডাবল) খিলান তৈরি করা হয়েছে।

  • নিচের খিলানটি অর্ধবৃত্তাকার এবং ওপরের খিলানটি অশ্বক্ষুরাকৃতি (Horseshoe arch)।

  • লাল ইট ও সাদা পাথরের ডোরাকাটা এই নকশা ভেতরের স্থানটিকে এক অন্তহীন গোলকধাঁধা এবং জাদুকরি নান্দনিকতা দান করেছে।

খ. চমৎকার মিহরাব ও গম্বুজ

মসজিদের মিহরাবটি (যে দিক ফিরে নামাজ পড়া হয়) ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক নিদর্শন।

  • এর চারপাশে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি এবং সুক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশায় খচিত মার্বেলের কাজ রয়েছে।

  • মিহরাবের ছাদের গম্বুজটি একটিমাত্র বিশাল পাথর খোদাই করে অসাধারণ জ্যামিতিক বিন্যাসে তৈরি করা হয়েছে, যা সেকালের প্রকৌশল বিদ্যার উৎকর্ষের প্রমাণ দেয়।

গ. সাহন বা প্রাঙ্গণ (Court of Oranges)

মসজিদের প্রবেশদ্বারে একটি বিশাল উন্মুক্ত চত্বর রয়েছে, যা কমলা বাগান বা 'Patio de los Naranjos' নামে পরিচিত। এখানে সারি সারি কমলা ও লেবু গাছ এবং ঝরনা রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তি আনে।

৪. রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্যাথেড্রালে রূপান্তর

১৩ শতকে (১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে) ক্যাস্টিলের রাজা ফার্দিনান্দ তৃতীয় কর্ডোবা দখল করার পর এই ইসলামী স্থাপনাটিকে একটি ক্যাথেড্রালে (Catholic Cathedral) রূপান্তর করা হয়।

  • পরিবর্তন: মূল মসজিদের ভেতরেই ষোড়শ শতাব্দীতে রেনেসাঁ ও গথিক শৈলীতে একটি বিশাল প্রার্থনাকক্ষ বা ‘চ্যাপেল’ নির্মাণ করা হয়।

  • স্প্যানিশ রাজার প্রতিক্রিয়া: পরবর্তীতে যখন স্পেনের রাজা চার্লস পঞ্চম এই নতুন ক্যাথেড্রাল নির্মাণের ফলে মূল ইসলামিক স্থাপত্যের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানতে পারেন, তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন— "তোমরা এমন একটি জিনিস ভেঙে ফেললে যা সারা বিশ্বে অদ্বিতীয় এবং এর পরিবর্তে এমন কিছু বানালে যা যেকোনো জায়গায় দেখা যায়।"

৫. আধুনিক গুরুত্ব ও ইউনেস্কো স্বীকৃতি

  • সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: কর্ডোবার গ্রেট মসজিদ একই সাথে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের এক অনন্য প্রতীক। এটি স্পেনে মুসলমানদের দীর্ঘ আটশ বছরের সোনালী শাসনের সাক্ষ্য বহন করে।

  • ইউনেস্কো স্বীকৃতি: ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বর্তমানে এটি স্পেনের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...