চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী রয়েছেন, যাঁদের আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন ইবনে আল-নাফিস (১২১০–১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন প্রখ্যাত আরব চিকিৎসক, দার্শনিক এবং বহুশাস্ত্রজ্ঞ (পলিম্যাথ) হিসেবে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বিশেষ করে মানবদেহের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ইবনে আল-নাফিস ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কের নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ে দামেস্ক ছিল ইসলামিক স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নিজের জন্মভূমি দামেস্কে তিনি শৈশব ও কৈশোরে ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইনশাস্ত্র (ফিকহ), দর্শন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর ও ব্যাপক শিক্ষা লাভ করেন। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসকদের অধীনে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার হাতেখড়ি হয়েছিল।
কায়রোতে কর্মজীবন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা
দামেস্কে পড়াশোনা শেষ করার পর ইবনে আল-নাফিস মিসরের কায়রোতে চলে আসেন এবং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সেখানে অতিবাহিত করেন। কায়রোতে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছিলেন।
তিনি মিসরের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কায়রোর বিখ্যাত আল-নাসেরি ও আল-মানসুরি হাসপাতালের মতো বড় বড় চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দেন।
মামলুক সুলতান বায়বার্স-এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও তিনি রাজদরবারে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান
১. ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালন আবিষ্কার
ইবনে আল-নাফিসের সবচেয়ে বড় অবদান হলো মানবদেহের ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালন (Pulmonary Circulation) আবিষ্কার। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (অ্যাভিসেনা) বিশ্বাস করতেন যে, হৃদপিণ্ডের দুই প্রকোষ্ঠের মাঝের পর্দা বা সেপ্টামের ছিদ্রের মাধ্যমে রক্ত ডান দিক থেকে বাম দিকে প্রবাহিত হয়।
কিন্তু ইবনে আল-নাফিস মানবদেহের শারীরস্থান (Anatomy) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এই প্রাচীন ধারণাকে স্পষ্টভাবে ভুল প্রমাণ করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে রক্ত ডান প্রকোষ্ঠ থেকে ফুসফুসে যায়, সেখানে বাতাসের সাথে মিশে শুদ্ধ হয় এবং তারপর হৃদপিণ্ডের বাম প্রকোষ্ঠে ফিরে আসে। ইউরোপে উইলিয়াম হার্ভির রক্তসঞ্চালন আবিষ্কারের প্রায় তিন শতাব্দী আগেই ইবনে আল-নাফিস এই সত্য উদঘাটন করেছিলেন।
২. করোনারি রক্তসঞ্চালন ও হৃদপিণ্ডের গঠন
ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালনের পাশাপাশি তিনি হৃদপিণ্ডকে পুষ্টি প্রদানকারী করোনারি রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াও চিহ্নিত করেছিলেন। একই সাথে গ্যালেনের অনেক ভ্রান্ত শারীরতাত্ত্বিক তত্ত্বকে তিনি যুক্তিসঙ্গতভাবে খণ্ডন করেন।
৩. অমর সব চিকিৎসা গ্রন্থ
ইবনে আল-নাফিস চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর বেশ কিছু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন:
শারহ আল-তাশরিহ আল-কানুন: এটি ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-কানুন ফি আল-তিব্ব'-এর শারীরস্থান অংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমালোচনামূলক ভাষ্য।
আল-শামিল ফি আল-তিব্ব: এটি একটি বিশাল চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ হওয়ার কথা ছিল। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় এটি সম্পূর্ণ হয়নি, তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান
ইবনে আল-নাফিস কেবল একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, বরং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল:
দর্শন ও সাহিত্য: তিনি 'থেলোগাস অটোডিডাকটাস' (Theologus Autodidactus) নামক একটি দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিমূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যা আধুনিক সাইন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির প্রাচীনতম পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জ্যোতির্বিদ্যা ও আইনশাস্ত্র: ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয়েও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
উপসংহার
১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি কায়রোর মানসুরি হাসপাতালকে দান করে যান। যুগের পর যুগ ধরে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানগুলো আড়ালে পড়ে থাকলেও, আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবনে আল-নাফিস চিরকাল মানবসভ্যতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন