সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

ইবনে আল-নাফিস: মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও বহুবিদ প্রতিভা

 


চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী রয়েছেন, যাঁদের আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন ইবনে আল-নাফিস (১২১০–১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)। একজন প্রখ্যাত আরব চিকিৎসক, দার্শনিক এবং বহুশাস্ত্রজ্ঞ (পলিম্যাথ) হিসেবে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বিশেষ করে মানবদেহের রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

ইবনে আল-নাফিস ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কের নিকটবর্তী একটি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ে দামেস্ক ছিল ইসলামিক স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নিজের জন্মভূমি দামেস্কে তিনি শৈশব ও কৈশোরে ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইনশাস্ত্র (ফিকহ), দর্শন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর ও ব্যাপক শিক্ষা লাভ করেন। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসকদের অধীনে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার হাতেখড়ি হয়েছিল।

কায়রোতে কর্মজীবন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা

দামেস্কে পড়াশোনা শেষ করার পর ইবনে আল-নাফিস মিসরের কায়রোতে চলে আসেন এবং জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সেখানে অতিবাহিত করেন। কায়রোতে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছিলেন।

  • তিনি মিসরের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

  • কায়রোর বিখ্যাত আল-নাসেরিআল-মানসুরি হাসপাতালের মতো বড় বড় চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দেন।

  • মামলুক সুলতান বায়বার্স-এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও তিনি রাজদরবারে দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান

১. ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালন আবিষ্কার

ইবনে আল-নাফিসের সবচেয়ে বড় অবদান হলো মানবদেহের ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালন (Pulmonary Circulation) আবিষ্কার। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (অ্যাভিসেনা) বিশ্বাস করতেন যে, হৃদপিণ্ডের দুই প্রকোষ্ঠের মাঝের পর্দা বা সেপ্টামের ছিদ্রের মাধ্যমে রক্ত ডান দিক থেকে বাম দিকে প্রবাহিত হয়।

কিন্তু ইবনে আল-নাফিস মানবদেহের শারীরস্থান (Anatomy) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এই প্রাচীন ধারণাকে স্পষ্টভাবে ভুল প্রমাণ করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে রক্ত ডান প্রকোষ্ঠ থেকে ফুসফুসে যায়, সেখানে বাতাসের সাথে মিশে শুদ্ধ হয় এবং তারপর হৃদপিণ্ডের বাম প্রকোষ্ঠে ফিরে আসে। ইউরোপে উইলিয়াম হার্ভির রক্তসঞ্চালন আবিষ্কারের প্রায় তিন শতাব্দী আগেই ইবনে আল-নাফিস এই সত্য উদঘাটন করেছিলেন।

২. করোনারি রক্তসঞ্চালন ও হৃদপিণ্ডের গঠন

ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালনের পাশাপাশি তিনি হৃদপিণ্ডকে পুষ্টি প্রদানকারী করোনারি রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াও চিহ্নিত করেছিলেন। একই সাথে গ্যালেনের অনেক ভ্রান্ত শারীরতাত্ত্বিক তত্ত্বকে তিনি যুক্তিসঙ্গতভাবে খণ্ডন করেন।

৩. অমর সব চিকিৎসা গ্রন্থ

ইবনে আল-নাফিস চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর বেশ কিছু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন:

  • শারহ আল-তাশরিহ আল-কানুন: এটি ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-কানুন ফি আল-তিব্ব'-এর শারীরস্থান অংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমালোচনামূলক ভাষ্য।

  • আল-শামিল ফি আল-তিব্ব: এটি একটি বিশাল চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ হওয়ার কথা ছিল। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় এটি সম্পূর্ণ হয়নি, তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান

ইবনে আল-নাফিস কেবল একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, বরং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল:

  • দর্শন ও সাহিত্য: তিনি 'থেলোগাস অটোডিডাকটাস' (Theologus Autodidactus) নামক একটি দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিমূলক গ্রন্থ রচনা করেন, যা আধুনিক সাইন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির প্রাচীনতম পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • জ্যোতির্বিদ্যা ও আইনশাস্ত্র: ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয়েও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।

উপসংহার

১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি কায়রোর মানসুরি হাসপাতালকে দান করে যান। যুগের পর যুগ ধরে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানগুলো আড়ালে পড়ে থাকলেও, আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবনে আল-নাফিস চিরকাল মানবসভ্যতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...