১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান
মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের।
৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন।
এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন।
২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল:
মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন্দ্ব: ৭০২ সালে খুরসানের গভর্নর আল-মুহাল্লাবের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাব দায়িত্ব পান। কিন্তু দ্রুতই হাজ্জাজের সাথে ইয়াজিদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ৭০৪ সালে খলিফার অনুমতি নিয়ে হাজ্জাজ ইয়াজিদকে পদচ্যুত ও বন্দি করেন।
সুলাইমানের আশ্রয়: ৭০৯ সালে ইয়াজিদ কারাগার থেকে পালিয়ে রামলায় সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের (খলিফা আল-ওয়ালিদের ভাই) কাছে আশ্রয় নেন।
উত্তরাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন: খলিফা আল-ওয়ালিদ তাঁর ভাই সুলাইমানকে টপকে নিজের ছেলেকে পরবর্তী খলিফা করতে চেয়েছিলেন এবং হাজ্জাজ এই পরিকল্পনা সমর্থন করেছিলেন। ফলে সুলাইমান এবং হাজ্জাজের মধ্যকার শত্রুতা চরম আকার ধারণ করে।
৩. ক্ষমতার পটপরিবর্তন (৭১৪–৭১৫ খ্রিস্টাব্দ)
খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায়: ১. ৭১৪ খ্রিস্টাব্দ: হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মৃত্যুবরণ করেন।
২. ৭১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি: খলিফা আল-ওয়ালিদের মৃত্যু হয় এবং সুলাইমান নতুন খলিফা হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
ক্ষমতায় এসেই খলিফা সুলাইমান হাজ্জাজের অনুসারীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন। তিনি হাজ্জাজের বন্দিদের মুক্ত করেন এবং ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাবকে ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর নতুন গভর্নর নিযুক্ত করেন।
৪. তলব ও মৃত্যুদণ্ড
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সেনাপতি হওয়ায় মুহাম্মদ বিন কাসিম এই রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাব দায়িত্ব পেয়েই পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে হাজ্জাজের অনুসারীদের সরিয়ে নিজ সমর্থকদের বসাতে শুরু করেন। এই ধারায় মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু থেকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং খলিফা সুলাইমানের প্ররোচনায় ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাবের আদেশে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
উপসংহার
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের এই করুণ পরিণতি কোনো সামরিক ব্যর্থতার কারণে হয়নি; বরং এটি ছিল উমাইয়া খিলাফতের কেন্দ্রে থাকা দীর্ঘদিনের দলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার নির্মম রাজনীতির এক বলি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন