সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রি.): বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিজয়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল দুটি সাম্রাজ্যের ভাগ্যই পরিবর্তন করে দেয় না, বরং পুরো পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ এমনই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জমিনে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আধিপত্য চিরতরে ধসে পড়েছিল। ১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের সাসনানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের পর উদীয়মান ইসলামী শক্তির সামনে প্রধান পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেই সময় সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াস (Heraclius)। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা সাময়িকভাবে দামেস্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তারা ইয়ারমুকের মাঠে মূল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যদিও এই যুদ্ধকে সাধারণভাবে ইসলাম ও খ্রিস্টান শক্তির সংঘাত হিসেবে দেখা হয়, তবে সেসময়ের বাস্তবতায় অনেক যোদ্ধা ছিলেন যারা সরাসরি এই দুই ধর্মের কোনোটির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। ২. সংখ্যায় কম, ঈমানে বলীয়ান: কৌশলগত লড়াই ইয়ারমুকের প্রান্তরে বাইজেন্টাইন...

ক্ষমতা, রক্তক্ষয় ও পতনের সূচনা: ঔরঙ্গজেবের সিংহাসন আরোহণ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পরিণতি


মুঘল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং বিতর্কিত অধ্যায় হলো সম্রাট শাহজাহানের সন্তানদের মধ্যকার উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব। ১৬৫৭ সালে শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চার পুত্রদারা শিকোহ, শাহ শুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদ বখশসিংহাসনের দখল নিতে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ইতিহাস যাকে চেনে, তিনি হলেন মহিউদ্দিন মুহাম্মদ ঔরঙ্গজেব (আলমগীর I)

আজকে আমরা জানবো কীভাবে ঔরঙ্গজেব নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর কীভাবে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য ধসে পড়েছিল।

১. প্রথম অভিষেক ও প্রতিদ্বন্দ্বী দূরীকরণ (১৬৫৮)

১৬৫৮ সালের জুলাই মাসে সামুগড়ের যুদ্ধে জ্যেষ্ঠ ভাই দারা শিকোহকে পরাজিত করে এবং পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দী করে ঔরঙ্গজেব দিল্লির শালিমার বাগানে এক সাধারণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সিংহাসনে বসেন। তবে তখনও তাঁর ক্ষমতা পুরোপুরি নিষ্কণ্টক ছিল না।

সিংহাসন পাকাপোক্ত করতে তিনি একে একে তাঁর বাকি ভাইদের পথ থেকে সরিয়ে দেন:

  • শাহ শুজা: ১৬৫৯ সালের খাজওয়ার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আরাকানের জঙ্গলে আত্মগোপন করেন এবং সেখানেই প্রাণ হারান।
  • দারা শিকোহ: দেওরাইয়ের যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ১৬৫৯ সালের আগস্টে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
  • মুরাদ বখশ: শুরুতে ঔরঙ্গজেবের মিত্র থাকলেও পরে তাঁকে গুয়ালিওর দুর্গে বন্দী করা হয় এবং ১৬৬১ সালে হত্যা করা হয়।

২. দ্বিতীয় অভিষেক: ক্ষমতার চূড়ান্ত একত্রীকরণ (১৬৫৯)

সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করার পর, ১৬৫৯ সালের ১৩ জুন ঔরঙ্গজেব দিল্লির লাল কেল্লায় এক জমকালো ও আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো সিংহাসনে আরোহণ করেন।

এই দ্বিতীয় অভিষেক ছিল তাঁর ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর মাধ্যমেই শুরু হয় তাঁর প্রায় পাঁচ দশকের (১৬৫৮১৭০৭) দীর্ঘ শাসনকাল, যার অধীনে মুঘল সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ভৌগোলিক সীমানায় পৌঁছায়।

৩. ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু এবং পতনের শুরু (১৭০৭)

১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথেই মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য এক গভীর সংকটে পড়ে:

  • দুর্বল উত্তরসূরি (Rois Fainéants): ইতিহাসবিদ এস. এম. এডওয়ার্ডসের মতে, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথে কার্যকর শক্তি হিসেবে মুঘল শাসনের বিলুপ্তি ঘটে। দিল্লির দরবার হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক মারামারির আখড়া। পরবর্তীতে যারা সিংহাসনে বসেছিলেন, তারা ছিলেন অযোগ্য ও পুতুল শাসক।
  • সাম্রাজ্যের বিভাজন: দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় বাংলা, হায়দ্রাবাদ ও অযোধ্যার মতো বড় বড় প্রদেশগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অন্যদিকে মারাঠারা দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে ভারতবর্ষজুড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

শেষ কথা

ঔরঙ্গজেবের শাসনকাল যেমন মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির চূড়ান্ত শিখর ছিল, তেমনই তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক নীতির ফলাফল হিসেবে তাঁর মৃত্যুর পরেই এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়। একের পর এক অযোগ্য শাসকের হাত ধরে অবশেষে ভারতীয় উপমহাদেশে এক নতুন শক্তির উত্থানের পথ সুগম হয়।

আপনার মতামত জানান: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কি কেবল ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী দুর্বল শাসকরা দায়ী, নাকি এর বীজ ঔরঙ্গজেবের শাসনকালেই বোনা হয়েছিল? নিচে কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান!


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...