মুঘল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং বিতর্কিত অধ্যায় হলো
সম্রাট শাহজাহানের সন্তানদের মধ্যকার উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব। ১৬৫৭ সালে শাহজাহান
অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চার পুত্র—দারা শিকোহ, শাহ শুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদ বখশ—সিংহাসনের দখল নিতে এক রক্তক্ষয়ী
যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ইতিহাস যাকে চেনে, তিনি হলেন মহিউদ্দিন মুহাম্মদ ঔরঙ্গজেব (আলমগীর I)।
আজকে
আমরা জানবো কীভাবে ঔরঙ্গজেব নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর
কীভাবে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য ধসে পড়েছিল।
১. প্রথম অভিষেক ও প্রতিদ্বন্দ্বী দূরীকরণ
(১৬৫৮)
১৬৫৮
সালের জুলাই মাসে সামুগড়ের যুদ্ধে জ্যেষ্ঠ ভাই দারা শিকোহকে পরাজিত করে এবং পিতা
শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দী করে ঔরঙ্গজেব দিল্লির শালিমার বাগানে এক সাধারণ
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সিংহাসনে বসেন। তবে তখনও তাঁর ক্ষমতা পুরোপুরি
নিষ্কণ্টক ছিল না।
সিংহাসন
পাকাপোক্ত করতে তিনি একে একে তাঁর বাকি ভাইদের পথ থেকে সরিয়ে দেন:
- শাহ শুজা: ১৬৫৯ সালের খাজওয়ার যুদ্ধে
পরাজিত হয়ে আরাকানের জঙ্গলে আত্মগোপন করেন এবং সেখানেই প্রাণ হারান।
- দারা
শিকোহ: দেওরাইয়ের
যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ১৬৫৯ সালের আগস্টে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া
হয়।
- মুরাদ
বখশ: শুরুতে
ঔরঙ্গজেবের মিত্র থাকলেও পরে তাঁকে গুয়ালিওর দুর্গে বন্দী করা হয় এবং ১৬৬১
সালে হত্যা করা হয়।
২. দ্বিতীয় অভিষেক: ক্ষমতার চূড়ান্ত
একত্রীকরণ (১৬৫৯)
সকল
প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করার পর, ১৬৫৯ সালের ১৩ জুন
ঔরঙ্গজেব দিল্লির লাল কেল্লায় এক জমকালো ও আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে
দ্বিতীয়বারের মতো সিংহাসনে আরোহণ করেন।
এই
দ্বিতীয় অভিষেক ছিল তাঁর ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর মাধ্যমেই শুরু হয় তাঁর প্রায়
পাঁচ দশকের (১৬৫৮–১৭০৭)
দীর্ঘ শাসনকাল,
যার
অধীনে মুঘল সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ভৌগোলিক সীমানায় পৌঁছায়।
৩. ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু এবং পতনের শুরু (১৭০৭)
১৭০৭
সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথেই মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যায়। তাঁর
মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য এক গভীর সংকটে পড়ে:
- দুর্বল
উত্তরসূরি (Rois
Fainéants): ইতিহাসবিদ
এস. এম. এডওয়ার্ডসের মতে, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথে কার্যকর শক্তি হিসেবে
মুঘল শাসনের বিলুপ্তি ঘটে। দিল্লির দরবার হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক
মারামারির আখড়া। পরবর্তীতে যারা সিংহাসনে বসেছিলেন, তারা ছিলেন অযোগ্য ও পুতুল শাসক।
- সাম্রাজ্যের
বিভাজন: দিল্লির
কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় বাংলা, হায়দ্রাবাদ ও অযোধ্যার মতো বড় বড় প্রদেশগুলো
স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অন্যদিকে মারাঠারা দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে ভারতবর্ষজুড়ে
নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
শেষ কথা
ঔরঙ্গজেবের
শাসনকাল যেমন মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির চূড়ান্ত শিখর ছিল, তেমনই
তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক নীতির ফলাফল হিসেবে তাঁর মৃত্যুর পরেই এই বিশাল
সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়। একের পর এক অযোগ্য শাসকের হাত ধরে অবশেষে ভারতীয়
উপমহাদেশে এক নতুন শক্তির উত্থানের পথ সুগম হয়।
আপনার
মতামত জানান: মুঘল
সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কি কেবল ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী দুর্বল শাসকরা দায়ী, নাকি
এর বীজ ঔরঙ্গজেবের শাসনকালেই বোনা হয়েছিল? নিচে কমেন্ট করে আপনার
মতামত জানান!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন