সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গুয়াদালেতের যুদ্ধ (৭১১ খ্রিষ্টাব্দ): ভিসিগথ সাম্রাজ্যের পতন ও স্পেনে মুসলমানদের আগমন

  ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাস। ইউরোপের ইতিহাসে এটি কেবল একটি সাধারণ বছর নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনা। জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে উমাইয়া সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ পা রেখেছিলেন ইউরোপের মাটিতে। তাঁর এই অভিযান এবং পরবর্তী গুয়াদালেতের যুদ্ধ (Battle of Guadalete) স্পেন ও পর্তুগাল নিয়ে গঠিত আইবেরীয় উপদ্বীপের রাজনীতি ও ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। যুদ্ধপূর্ব প্রেক্ষাপট: খণ্ডিত এক সাম্রাজ্য অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে স্পেনের শাসন ক্ষমতায় ছিল ভিসিগথ সাম্রাজ্য। কিন্তু ভিতর থেকে সেই সাম্রাজ্য ছিল জীর্ণ এবং গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ভিসিগথ অভিজাতদের মধ্যে চরম বিরোধ চলছিল। ঠিক এই অস্থিরতার সময়ে ক্ষমতায় আসেন ডন রদ্রিগো (Don Rodrigo) , যিনি ছিলেন ভিসিগথদের শেষ রাজা। কিন্তু রাজ্যজুড়ে আনুগত্যের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ শত্রুতার কারণে তাঁর সিংহাসন ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। তারিক বিন জিয়াদের ঐতিহাসিক অভিযান উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইরের আদেশে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ (পরবর্তীতে আরও যোগ হওয়াসহ প্রায় ১২,০০০) আরব ও বার্বার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে আইবেরীয়...

হুমায়ূনের উত্থান, পতন ও পুনরাগমন: পুনরুদ্ধার করেছিলেন তাঁর সাম্রাজ্য

 

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নাসির-উদ-দীন মুহাম্মদ হুমায়ূনের মতো নাটকীয় জীবনকাহিনী খুব কমই দেখা যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের এই দ্বিতীয় সম্রাটের গল্প কেবল নিরবচ্ছিন্ন জয়ের নয়, বরং এটি নির্বাসন, সহনশীলতা এবং এক রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের গল্প।

১. বাইশ বছরে সিংহাসনারোহণ

১৫৩০ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও বাবা বাবরের মৃত্যুর পর, মাত্র ২২ বছর বয়সে আগ্রার সিংহাসনে বসেন হুমায়ূন। উত্তরাধিকার সূত্রে একটি তরুণ, অস্থির এবং শত্রুপুরি বেষ্টিত সাম্রাজ্য পাওয়ায়, এই তরুণ শাসককে শুরুতেই চতুর্দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখোমুখি হতে হয়।

২. আফগান বাঘের কাছে পরাজয়

হুমায়ূনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শের শাহ সুরি—একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ আফগান সেনাপতি। তাঁদের এই ক্ষমতার লড়াইয়ে মুঘলরা দুটি ভয়াবহ পরাজয়ের মুখোমুখি হয়:

  • চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯): শের শাহের অতর্কিত আক্রমণে হুমায়ূনের বাহিনী বিধ্বস্ত হয় এবং সম্রাট প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

  • কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০): শের শাহের এক নির্ণায়ক জয়, যা উত্তর ভারতে মুঘলদের প্রভাব পুরোপুরি চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।

সাম্রাজ্য হারিয়ে হুমায়ূন ভারত ছাড়তে বাধ্য হন এবং শুরু হয় তাঁর ১৫ বছরের দীর্ঘ ও কষ্টকর নির্বাসিত জীবন।

৩. পারস্যে আশ্রয়: জীবনের মোড় ঘোরা অধ্যায়

১৫৪৪ সালে নিঃস্ব ও শত্রু দ্বারা অনুসৃত হয়ে হুমায়ূন পারস্যে (বর্তমান ইরান) সাফাবি শাসক শাহ তাহমাস্পের দরবারে আশ্রয় নেন।

এই নির্বাসনকাল হুমায়ূনের জীবনে এক বড় পরিবর্তন আনে। শাহ তাহমাস্প তাঁকে রাজনৈতিক শর্তের বিনিময়ে সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। এর চেয়েও বড় কথা, পারস্যে অবস্থানের সময় হুমায়ূন পারস্যের সংস্কৃতি, শিল্প ও স্থাপত্যের সংস্পর্শে আসেন—যে উপাদানগুলো পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বতন্ত্র পরিচয় গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

৪. দিল্লিতে বিজয়ী প্রত্যাবর্তন

সাফাবিদের দেওয়া পুনর্গঠিত সেনাবাহিনী এবং শের শাহের মৃত্যুর পর সুরি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভাঙনকে কাজে লাগিয়ে হুমায়ূন তাঁর সুযোগ গ্রহণ করেন।

  • ২২ জুন ১৫৫৫: পাঞ্জাবের সরহিন্দের যুদ্ধে হুমায়ূন সিকান্দর শাহ সুরিকে মুখোমুখি হন এবং এক বিশাল জয় লাভ করেন।

  • ২৩ জুলাই ১৫৫৫: পরাজিত করার ঠিক এক মাস পর হুমায়ূন বিজয়ীর বেশে দিল্লিতে প্রবেশ করেন এবং রাজ্য হারানোর ১৫ বছর পর পুনরায় মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন।

৫. নিয়তির করুণ পরিণতি

হুমায়ূনের এই পুনরুদ্ধার করা গৌরব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দিল্লি পুনরুদ্ধারের মাত্র ছয় মাস পর, ১৫৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি, সম্রাট তাঁর লাইব্রেরি (শের মণ্ডল)-এর খাড়া পাথরের সিঁড়ি দিয়ে বই নিয়ে নামার সময় পা পিছলে পড়ে যান। গুরুতর আহত হয়ে তিনি কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন।

ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেন-পুল তাঁর সম্পর্কে বিখ্যাত এক উক্তি করেছিলেন: "হুমায়ূন জীবনভর হোঁচট খেয়েছেন, আর হোঁচট খেয়েই জীবন থেকে বিদায় নিয়েছেন।"

ইতিহাস ও উত্তরাধিকার

স্বল্পস্থায়ী ও রাজনৈতিকভাবে অস্থির হলেও, হুমায়ূনের এই প্রত্যাবর্তন মুঘল সাম্রাজ্যকে চিরতরে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের কারণেই তাঁর ১৩ বছর বয়সী পুত্র ও উত্তরসূরি আকবর পরবর্তীতে ক্ষমতা সুসংহত করতে পেরেছিলেন এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আজ দিল্লিতে অবস্থিত তাঁর চমৎকার লাল বেলেপাথরের সমাধিটি (হুমায়ূনের সমাধিসৌধ) ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে—যা এক নাছোড়বান্দা সম্রাটের স্মৃতির প্রতীক।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...