সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও আধুনিক তুরস্কের সূচনা (১৯১৮-১৯২৩)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি বিশ্ব মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। তবে শত শত বছর ধরে শাসন করা অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং তার ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক তুরস্কের উত্থান ইতিহাসবিদদের কাছে এক অনন্য রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় ও সেভ্র চুক্তি (Treaty of Sèvres) ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর মুদ্রোসের যুদ্ধবিরতি (Armistice of Mudros)-র মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয় চূড়ান্ত হয় । এর ঠিক পরপরই, ১৯১৮ সালের ১২ নভেম্বর থেকে বিজয়ী মিত্রবাহিনী অটোমান ভূখণ্ড দখল করতে শুরু করে । মিত্রবাহিনী চেয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে । সেই উদ্দেশ্যে ১৯২০ সালের ১০ আগস্ট স্বাক্ষরিত হয় আলোচিত সেভ্র চুক্তি । এই চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করে এর ভূখণ্ড মিত্রশক্তিদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল । তবে চুক্তির অপমানজনক শর্তগুলোর কারণে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় । ২. মুস্তফা কামাল পাশার নতুন সরকার ও স্বাধীনতা যুদ্ধ সেভ্র চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীনই মুস্তফা কামাল পাশা -র নেতৃত্বে নতুন এক রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে ।...

অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও আধুনিক তুরস্কের সূচনা (১৯১৮-১৯২৩)


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি বিশ্ব মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। তবে শত শত বছর ধরে শাসন করা অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং তার ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক তুরস্কের উত্থান ইতিহাসবিদদের কাছে এক অনন্য রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় ও সেভ্র চুক্তি (Treaty of Sèvres)

১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর মুদ্রোসের যুদ্ধবিরতি (Armistice of Mudros)-র মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয় চূড়ান্ত হয়। এর ঠিক পরপরই, ১৯১৮ সালের ১২ নভেম্বর থেকে বিজয়ী মিত্রবাহিনী অটোমান ভূখণ্ড দখল করতে শুরু করে

মিত্রবাহিনী চেয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে। সেই উদ্দেশ্যে ১৯২০ সালের ১০ আগস্ট স্বাক্ষরিত হয় আলোচিত সেভ্র চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত করে এর ভূখণ্ড মিত্রশক্তিদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে চুক্তির অপমানজনক শর্তগুলোর কারণে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়

২. মুস্তফা কামাল পাশার নতুন সরকার ও স্বাধীনতা যুদ্ধ

সেভ্র চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীনই মুস্তফা কামাল পাশা-র নেতৃত্বে নতুন এক রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে। ১৯২০ সালের এপ্রিলে আঙ্কারায় গঠিত হয় 'গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি' (Turkish Grand National Assembly), যা ইস্তাম্বুলের তৎকালীন অটোমান সরকার থেকে নিজেদের আলাদা ঘোষণা করে

একই সময়ে সেভ্র চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে গ্রিক বাহিনী আনাতোলিয়া অঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু মুস্তফা কামালের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তুর্কিরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অভাবনীয় জয় লাভ করে। যুদ্ধের ফলে গ্রিস বাধ্য হয়ে ১৯২২ সালের ১১ অক্টোবর মুদানিয়ার যুদ্ধবিরতি (Armistice of Mudanya) স্বাক্ষর করে

৩. সুলতানতন্ত্রের অবসান ও লোজান শান্তি চুক্তি

মুদানিয়া চুক্তির পর মিত্রশক্তি ইস্তাম্বুলের অটোমান সরকার এবং আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী সরকার—উভয়কেই নতুন শান্তি সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়। তবে একই দেশে দুই সরকারের প্রতিনিধিত্ব সংকট এড়াতে আঙ্কারার গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর অটোমান সুলতানতন্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করে

এর ফলে আঙ্কারা সরকারই সমগ্র তুরস্কের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে ১৯২২ সালের ২০ নভেম্বর শুরু হওয়া লোজান শান্তি সম্মেলনে (Lausanne Peace Conference) অংশ নেয়

দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই বিখ্যাত লোজান চুক্তি (Treaty of Lausanne) স্বাক্ষরিত হয়:

  • মিত্রশক্তির সৈন্যরা ইস্তাম্বুল ছেড়ে চলে যায় (১৯২৩ সালের ৪ অক্টোবর)

  • তুরস্ক তার সাবেক আরব প্রদেশগুলোর ওপর থেকে দাবি ছেড়ে দেয় এবং সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ও ডোডেকানিজ দ্বীপাঞ্চলে ইতালির অধিকার মেনে নেয়

  • সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্কের স্বীকৃতি লাভ

৪. নতুন সূর্য: তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা

লোজান চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত এই বিজয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতন্ত্রী তুরস্ক (Republic of Turkey) ঘোষণার মাধ্যমে আধুনিক স্বাধীন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। আর এই নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...