বিশ্বের স্থাপত্যকলার ইতিহাসে ইট, কাঠ, কংক্রিট বা পাথরের তৈরি অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন মসজিদের কথা আমরা জানি। কিন্তু আপনি কি এমন কোনো মসজিদের কথা শুনেছেন, যা সম্পূর্ণ মাটির তৈরি এবং যার সংস্কার কাজে অংশ নেয় একটি পুরো শহর? বলছিলাম পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ঐতিহাসিক জেন্নে (Djenné) শহরে অবস্থিত ‘গ্রেট মস্ক অফ জেন্নে’ (Great Mosque of Djenné)-র কথা। এটি শুধু একটি উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি দালান এবং আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী ‘সুদানো-সাহেলিয়ান’ স্থাপত্যরীতির সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ।
ইতিহাস ও পুনর্নির্মাণ
ধারণা করা হয়, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে) জেন্নে
যখন বাণিজ্য ও ইসলামী শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল, তখন এখানে প্রথম মসজিদটি নির্মিত হয়।
সময়ের আবর্তে মূল মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ১৯০৭ সালে ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান মাটির
নির্মাণশৈলী বজায় রেখে বর্তমান মসজিদটি নতুন করে গড়ে তোলা হয়। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো
(UNESCO) এই মসজিদ এবং
জেন্নের প্রাচীন শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অদ্ভুত ও অনন্য স্থাপত্যকৌশল
- রোদে
শুকানো মাটির ইট: মসজিদটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে রোদে শুকানো
মাটির ইট এবং কাদার প্রলেপ।
- দেয়ালে
কাঠের মাচা (Toron): মসজিদের বাইরের দেয়ালে তালের কাঠ প্রসেস করে বের
করে রাখা হয়েছে। এগুলো দেখতে যেমন অদ্ভুত লাগে, তেমনই এগুলো কাঠামোর ওপর চাপ কমায়। সবচেয়ে মজার
বিষয় হলো, যখনই
মসজিদে কোনো মেরামতের প্রয়োজন হয়, কারিগররা এই কাঠগুলোতে পা দিয়ে মাচা হিসেবে দাঁড়িয়ে
দেয়াল প্লাস্টার করতে পারেন।
- মিনারের
শীর্ষে উটপাখির ডিম: মসজিদের মিনারের একদম উঁচুতে বসানো রয়েছে উটপাখির
ডিমের খোলস, যা
স্থানীয় সংস্কৃতিতে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীক।
‘ক্রিপিসাজ’ (Crépissage): এক অদ্ভুত উৎসব
যেহেতু মসজিদটি মাটির তৈরি, তাই বর্ষার বৃষ্টিতে দেয়ালের কাদার
প্রলেপ কিছুটা ক্ষয়ে যায়। কিন্তু স্থানীয়রা এটাকে কোনো সমস্যা মনে করেন না, বরং তারা এটিকে একটি উৎসবে রূপ
দিয়েছেন!
প্রতি বছর বর্ষার শেষে অনুষ্ঠিত হয় ‘ক্রিপিসাজ’ (Crépissage) নামের এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এই দিনে
জেন্নে শহরের ছোট-বড়, আবালবৃদ্ধবনিতা
সবাই একসাথে মিলিত হয়। আনন্দ-উৎসব, নাচ-গান আর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে পুরো শহরের মানুষ এক
হয়ে মাত্র একদিনেই পুরো মসজিদের মাটির প্রলেপ নতুন করে লেপে দেন। এটি যেন একতায় আর
সম্প্রদায়ের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা এক জীবন্ত স্থাপত্য।
শেষ কথা
যান্ত্রিক এই যুগে যেখানে বহুতল কংক্রিটের দালানই
আধুনিকতার প্রতীক, সেখানে
প্রাকৃতিক উপাদান আর মানুষের পরম ভালোবাসায় শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকা ‘গ্রেট মস্ক অফ জেন্নে’ আমাদের প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বাঁচার
শিক্ষা দেয়।
আপনি কি কখনো এরকম কোনো ঐতিহ্যবাহী স্থানে ভ্রমণের
স্বপ্ন দেখেন? আপনার অনুভূতি
জানান কমেন্টে!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন