সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আইন জালুতের যুদ্ধ: যে যুদ্ধে থেমে গিয়েছিল মঙ্গোলদের দুর্বার অগ্রযাত্রা

  ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তখন আতঙ্কের কালো মেঘ। মঙ্গোল বাহিনীর নাম শুনলেই নগরীর দরজা বন্ধ হয়ে যেত, মানুষ পালানোর পথ খুঁজত। একের পর এক নগরী ধ্বংস করে এগিয়ে আসছিল চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের বাহিনী। এরই মধ্যে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী সেনাপতি হুলাগু খান মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ংকর অভিযান শুরু করেন। বাগদাদ থেকে সিরিয়া—ধ্বংসের পথে মঙ্গোল বাহিনী ১২৫৮ সালে হুলাগুর বাহিনী আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ দখল করে। শেষ আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহ নিহত হন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাগদাদ ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। এরপর হুলাগুর বাহিনী সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। ১২৬০ সালের জানুয়ারিতে আলেপ্পো অবরোধ করা হয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শহরটি মঙ্গোলদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর মঙ্গোল বাহিনী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হয় এবং মার্চ মাসে দামেস্কও তাদের দখলে আসে। মনে হচ্ছিল—মঙ্গোলদের থামানোর মতো কোনো শক্তিই আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইতিহাস তখন অন্য একটি অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মিশরে উঠে এল মামলুক শক্তি মঙ্গোলদের এই অপ্রতিরোধ...

তুমি কি সুন্দরী নও? তাহলে ঘোমটা খোলো!”—আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রচারণা, নারী ও প্রতিরোধের রাজনীতি

 


“Are you not pretty? Unveil yourself!”—একটি প্রচারপোস্টারের এই বাক্য আজ আলজেরিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত প্রতীক। প্রথম দর্শনে এটি যেন নারীমুক্তি, সৌন্দর্য ও আধুনিকতার আহ্বান। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই ধরনের প্রচারণা ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতির অংশ।

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৯৫৪–১৯৬২) সময় ফরাসি কর্তৃপক্ষ আলজেরীয় সমাজের সাংস্কৃতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল নারীদের পোশাক—বিশেষত ঐতিহ্যবাহী হাইক (haïk) ও পর্দা।

ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রচারণায় পর্দাকে অনেক সময় আলজেরীয় নারীর “অবদমন” ও “পশ্চাৎপদতার” প্রতীক হিসেবে দেখানো হতো। বিপরীতে, পর্দা সরানোকে উপস্থাপন করা হতো “মুক্তি”, “আধুনিকতা” ও “সভ্যতার” প্রতীক হিসেবে।

কিন্তু এই প্রচারণার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল আরও গভীর। প্রশ্নটি ছিল শুধু—একজন নারী কী পোশাক পরবেন? বরং প্রশ্নটি হয়ে উঠেছিল—আলজেরীয় সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় কে নির্ধারণ করবে?

ঔপনিবেশিক শাসনের চোখে “আলজেরীয় নারী”

ফ্রান্স ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া দখল করে এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত দেশটি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে ফরাসি শাসকগোষ্ঠী আলজেরীয় সমাজকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে আনার নানা চেষ্টা চালায়।

নারীদের প্রশ্নটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলজেরীয় নারীকে প্রায়ই এমন একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যিনি “পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বন্দি” এবং যাকে ফরাসি শাসন “মুক্ত” করতে পারে। এই ধারণার মাধ্যমে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন নিজেকে কেবল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে নয়, বরং “সভ্যতা” ও “নারীমুক্তির” বাহক হিসেবেও তুলে ধরতে চেয়েছিল।

ফরাসি ঔপনিবেশিক ফটোগ্রাফি ও প্রচারণার ইতিহাস নিয়ে আলজেরীয় সাহিত্যিক ও সমালোচক মালেক আল্লুলা (Malek Alloula)-র বিখ্যাত গ্রন্থ The Colonial Harem বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আল্লুলা দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক যুগের বহু পোস্টকার্ড ও ছবিতে আলজেরীয় নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা বাস্তব আলজেরীয় জীবনের চেয়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কল্পনা ও “ওরিয়েন্টালিস্ট” দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি প্রতিফলিত করত।

অর্থাৎ, আলজেরীয় নারীর দেহ, পোশাক ও পর্দা শুধু সামাজিক বাস্তবতার বিষয় ছিল না; এগুলো ঔপনিবেশিক ক্ষমতার দৃষ্টিতেও একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।

“ঘোমটা খোলো”—নারীমুক্তি নাকি সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ?

১৯৫০-এর দশকে ফরাসি প্রচারণায় “unveiling” বা পর্দা সরানোর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। “Are you not pretty? Unveil yourself!” ধরনের পোস্টার সেই প্রচারণার প্রতীকী উদাহরণ।

এই পোস্টারের ভাষা লক্ষণীয়। এখানে নারীকে বলা হচ্ছে—তোমার সৌন্দর্য প্রকাশ করো, নিজেকে উন্মুক্ত করো, আধুনিক হও।

কিন্তু এই “মুক্তি”র ধারণাটি কার?

ঔপনিবেশিক প্রশাসনই যদি নির্ধারণ করে দেয় যে একজন নারীকে কী পোশাক পরতে হবে, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে এবং কোন পোশাক “মুক্ত” আর কোনটি “পশ্চাৎপদ”—তাহলে সেটি কি সত্যিই নারীর স্বাধীন পছন্দ?

এই প্রশ্নটি পরবর্তীকালে উপনিবেশবাদ, নারীমুক্তি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে “আলজেরীয় নারীকে মুক্ত করা”র ভাষা অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নারীদের পর্দা সরানোকে আলজেরীয় সমাজের ওপর ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রতীকী বিজয় হিসেবেও দেখা হতো।

ফ্রান্তজ ফানোঁ: “পর্দা” যখন রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র

এই বিষয়টি বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের একজন হলেন ফ্রান্তজ ফানোঁ (Frantz Fanon)—মার্টিনিকান বংশোদ্ভূত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, লেখক ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চিন্তাবিদ, যিনি আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর A Dying Colonialism গ্রন্থে “Algeria Unveiled” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি কীভাবে আলজেরীয় নারীর পর্দাকে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

ফানোঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে পর্দা ছিল এমন একটি সাংস্কৃতিক চিহ্ন, যার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে আলজেরীয় সমাজের প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলা সম্ভব হতে পারে।

আধুনিক গবেষণায় ফানোঁর এই বিশ্লেষণকে আরও বিস্তৃত করে বলা হয়েছে—ঔপনিবেশিক ক্ষমতা সাংস্কৃতিক প্রতীককে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, আর প্রতিরোধ আন্দোলন সেই একই প্রতীককে নতুন রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়:

একই পোশাক একদিকে ঔপনিবেশিকতার চোখে “পশ্চাৎপদতার প্রতীক”, অন্যদিকে উপনিবেশিত জনগণের কাছে “পরিচয় ও প্রতিরোধের প্রতীক” হয়ে উঠতে পারে।

হাইক: পোশাক থেকে প্রতিরোধের প্রতীকে

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাকের রাজনৈতিক অর্থ বদলে যায়।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ যখন পর্দা সরানোর প্রচারণা চালাচ্ছিল, তখন অনেক আলজেরীয়ের কাছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা নিজেই হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার একটি অবস্থান।

কিন্তু এখানেও ইতিহাস সরল নয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আলজেরীয় নারীরা কখনো ঐতিহ্যবাহী হাইক ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় আড়াল করেছেন, আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী ইউরোপীয় পোশাকও গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, পোশাকটি ছিল একটি কৌশলগত হাতিয়ার—স্থির কোনো রাজনৈতিক প্রতীক নয়।

কিছু নারী স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে হাইক ব্যবহার করে অস্ত্র বা বার্তা বহনের মতো গোপন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। আবার ফরাসি বাহিনী যখন ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ওপর নজরদারি বাড়ায়, তখন কিছু নারী ইউরোপীয় পোশাক পরে নিজেদের কম সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশলও গ্রহণ করেন।

এখানেই ফানোঁর “historical dynamism of the veil”—অর্থাৎ পর্দার পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ভূমিকা—ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পর্দা কখনো পরিচয়ের প্রতীক, কখনো প্রতিরোধের হাতিয়ার, আবার কখনো কৌশলগতভাবে সরিয়ে ফেলা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

তবে ইতিহাসের আরেকটি দিকও আছে

এই ইতিহাসকে শুধু “ফরাসিরা পর্দা খুলতে চেয়েছিল, আর আলজেরীয় নারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন”—এভাবে দেখলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকৃত হয়ে যায়।

আলজেরীয় নারীরা একক কোনো রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন না।

কেউ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেছেন, কেউ তা পরিবর্তন করেছেন, কেউ স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ ফরাসি শাসনের পক্ষেও ছিলেন।

এমনকি ফানোঁর বিশ্লেষণও পরবর্তী নারীবাদী ও উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষকদের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, ফানোঁ কখনো কখনো পর্দাকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে দেখেছেন এবং নারীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। অন্যদিকে, তাঁর বিশ্লেষণের সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন কীভাবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা নারীর শরীর ও পোশাককে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অংশ বানিয়েছিল।

সুতরাং, এই ইতিহাসের সবচেয়ে সঠিক পাঠ হলো—আলজেরীয় নারীদের অভিজ্ঞতা ছিল বহুমাত্রিক এবং তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল সক্রিয় ও কৌশলগত।

“নারীমুক্তি”র নামে ঔপনিবেশিক রাজনীতি

এই ঘটনাটি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে:

কোনো জনগোষ্ঠীর নারীদের মুক্ত করার দাবি কি কখনো সেই জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হতে পারে?

আলজেরিয়ার ইতিহাসে এর উত্তর জটিল হলেও গুরুত্বপূর্ণ।

ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রচারণা আলজেরীয় নারীর পর্দাকে “অবদমন” হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু একই সময়ে আলজেরিয়ার ওপর ফরাসি সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় ছিল।

ফলে “মুক্তি”র ভাষা এবং ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি গভীর বৈপরীত্য তৈরি হয়।

এ কারণেই আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষণায় আলজেরিয়ার এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এখানে নারী, পোশাক, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

১৯৫৮ সালের পোস্টার: একটি ছবির চেয়ে অনেক বেশি

আজ ১৯৫৮ সালের বলে প্রচারিত এই পোস্টারের দিকে তাকালে আমরা শুধু একটি পুরোনো বিজ্ঞাপন বা প্রচারচিত্র দেখি না।

আমরা দেখি ঔপনিবেশিক ক্ষমতার একটি কৌশল—যেখানে একজন নারীর পোশাককে কেন্দ্র করে একটি পুরো সমাজের পরিচয়কে পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।

আমরা দেখি, “আধুনিকতা” ও “মুক্তি”র ধারণা কীভাবে রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

আবার আমরা এটাও দেখি—একটি সাংস্কৃতিক প্রতীককে ক্ষমতা যখন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সেই প্রতীকই কখনো কখনো প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত হতে পারে।

আলজেরীয় নারীরা কখনো হাইক পরেছেন, কখনো তা সরিয়েছেন; কখনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেছেন, কখনো কৌশলগতভাবে বদলেছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সিদ্ধান্তগুলো সবসময় ঔপনিবেশিক শক্তির নির্দেশে নেওয়া হয়নি।

এটাই হয়তো এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

উপসংহার

আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস আমাদের দেখায়, ঔপনিবেশিকতা শুধু বন্দুক, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে কাজ করে না। এটি মানুষের সংস্কৃতি, পোশাক, ভাষা, ধর্মীয় পরিচয় এবং আত্মপরিচয়ের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

“Are you not pretty? Unveil yourself!”—এই স্লোগান তাই কেবল একটি নারীর প্রতি আহ্বান ছিল না; এটি ছিল একটি বৃহত্তর ঔপনিবেশিক কল্পনার অংশ, যেখানে ফরাসি শাসন নিজেকে “মুক্তিদাতা” এবং আলজেরীয় সংস্কৃতিকে “পশ্চাৎপদ” হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, পরিচয়কে বাইরে থেকে পুনর্নির্ধারণ করা সহজ নয়।

কখনো হাইক হয়ে উঠেছে পরিচয়ের প্রতীক, কখনো প্রতিরোধের কৌশল; আবার কখনো সেটি সরিয়ে ফেলাও হয়েছে প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে।

অতএব, আলজেরিয়ার ইতিহাস আমাদের শেখায়—

পোশাকের রাজনৈতিক অর্থ স্থির নয়। ক্ষমতা তাকে একটি অর্থ দিতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধ সেই অর্থকে বদলে দিতে পারে।

আর নারীমুক্তির নামে পরিচালিত কোনো রাজনৈতিক প্রচারণাকে বোঝার জন্য শুধু প্রচারণার ভাষা নয়, বরং কে প্রচারণা চালাচ্ছে, কেন চালাচ্ছে এবং যাদের “মুক্ত” করার কথা বলা হচ্ছে—তারা নিজেরা কী বলছেন—সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।

নির্বাচিত গবেষণাগ্রন্থ ও সূত্র

1.     Frantz Fanon, A Dying Colonialism (1959; ইংরেজি অনুবাদ, 1967) — বিশেষত “Algeria Unveiled” অধ্যায়। ফানোঁর কাজ আলজেরীয় সমাজে পর্দা, ঔপনিবেশিক ক্ষমতা ও প্রতিরোধের সম্পর্ক বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস।

2.     Malek Alloula, The Colonial Harem (1981; ইংরেজি অনুবাদ 1986) — ঔপনিবেশিক ফটোগ্রাফি, আলজেরীয় নারীর উপস্থাপন এবং ইউরোপীয় “Orientalist” দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ।

3.     Neil MacMaster, Burning the Veil: The Algerian War and the “Emancipation” of Muslim Women, 1954–1962 — আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ফরাসি “নারীমুক্তি” প্রচারণার বিস্তারিত গবেষণা।

4.     Azzedine Haddour, “Torture Unveiled” — ফানোঁর Algeria Unveiled নিয়ে পরবর্তী নারীবাদী ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

5.     Algerian War of Independence (1954–1962) — ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজেরীয় জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

 

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...