সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গুয়াদালেতের যুদ্ধ (৭১১ খ্রিষ্টাব্দ): ভিসিগথ সাম্রাজ্যের পতন ও স্পেনে মুসলমানদের আগমন

  ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাস। ইউরোপের ইতিহাসে এটি কেবল একটি সাধারণ বছর নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনা। জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে উমাইয়া সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ পা রেখেছিলেন ইউরোপের মাটিতে। তাঁর এই অভিযান এবং পরবর্তী গুয়াদালেতের যুদ্ধ (Battle of Guadalete) স্পেন ও পর্তুগাল নিয়ে গঠিত আইবেরীয় উপদ্বীপের রাজনীতি ও ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। যুদ্ধপূর্ব প্রেক্ষাপট: খণ্ডিত এক সাম্রাজ্য অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে স্পেনের শাসন ক্ষমতায় ছিল ভিসিগথ সাম্রাজ্য। কিন্তু ভিতর থেকে সেই সাম্রাজ্য ছিল জীর্ণ এবং গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ভিসিগথ অভিজাতদের মধ্যে চরম বিরোধ চলছিল। ঠিক এই অস্থিরতার সময়ে ক্ষমতায় আসেন ডন রদ্রিগো (Don Rodrigo) , যিনি ছিলেন ভিসিগথদের শেষ রাজা। কিন্তু রাজ্যজুড়ে আনুগত্যের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ শত্রুতার কারণে তাঁর সিংহাসন ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। তারিক বিন জিয়াদের ঐতিহাসিক অভিযান উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইরের আদেশে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ৭,০০০ (পরবর্তীতে আরও যোগ হওয়াসহ প্রায় ১২,০০০) আরব ও বার্বার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে আইবেরীয়...

বাফেউসের যুদ্ধ: উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের উত্থান ও এক মহাকাব্যের সূচনা



১২৯৯ সাল। আনাতোলিয়ার বুকে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম হতে যাচ্ছিল। বিলেজিক, ইয়ারহিসার, ইনেগোল এবং ইয়েনিশেহির বিজয়ের পর তরুণ তুর্কি নেতা উসমান বে (Osman Bey) সেলজুকদের অধীনতা পাশ কাটিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করলেন। প্রতিষ্ঠিত হলো উসমানীয় (অটোমান) রাজ্য

কিন্তু রাজ্যের ভিত্তি শক্ত করতে এবং নিজের অবস্থান পোক্ত করতে তার প্রয়োজন ছিল একটি বড় বিজয়ের। আর সেই সুযোগ তৈরি হলো বাইজেন্টাইনদের সাবেক রাজধানী নিকিয়া (Nicaea/আজকের ইজনিক) অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে।

বাইজেন্টাইনদের প্রথম প্রতিরোধ চূর্ণ

নিকিয়া হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় অ্যান্ড্রো নিকোস (Andronikos II) ১২০২ সালের বসন্তে তার ছেলে ও সহ-সম্রাট নবম মাইকেলকে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে পাঠান। কিন্তু উসমান বে এবং তার দুঃসাহসী যোদ্ধারা বাইজেন্টাইন বাহিনীকে মাঝপথেই আটকে দেন। লড়াইয়ের তীব্রতা দেখে মাইকেল তার সৈন্যদল নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।

বাফেউসের মহাযুদ্ধ (১৩০২): বাঁক বদলে দেওয়া মুহূর্ত

প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, একই বছরের জুলাই মাসে সম্রাট অ্যান্ড্রো নিকোস তার সেনাপতি জর্জ মুজালনের নেতৃত্বে আরেকটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী পাঠান। অবশেষে নিকোমিডিয়ার (আজকের ইজমিতে) কাছে বাফেউস’ (Bapheus) নামক স্থানে দুই মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উসমান বে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। পরাজয়ের ধাক্কায় বাইজেন্টাইন সেনারা প্রাণ বাঁচাতে নিকোমিডিয়া শহরের প্রাচীরের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধের ফলাফল: ১. বিথিনিয়া (Bithynia) অঞ্চলের গ্রাম ও মুক্তাঞ্চলের ওপর বাইজেন্টাইনদের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারিয়ে যায়। ২. পুরো অঞ্চলজুড়ে অটোমানদের অবাধ বিস্তারের পথ খুলে যায়।

আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে উসমান বে

বাফেউসের যুদ্ধের খবর চারদিকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ জর্জ প্যাকাইমেরেসের (George Pachymeres) মতে, এই বিজয়ের মহাকাব্যিক খবর শুনে পশ্চিম আনাতোলিয়া থেকে হাজার হাজার তুর্কি যোদ্ধা উসমান বে-র অধীনে যোগ দিতে ছুটে আসেন। রাতারাতি উসমান বে হয়ে ওঠেন এক অপরাজেয় ও জনপ্রিয় নেতা।

কেন বাফেউসের যুদ্ধ এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিখ্যাত তুর্কি ইতিহাসবিদ খালিল ইনালচিক (Halil İnalcık) মনে করেন, উসমানীয় রাজবংশের বৈধতা ও সার্বভৌম ক্ষমতার মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই বাফেউসের যুদ্ধের মাধ্যমেই। এই জয় প্রমাণ করেছিল যে অটোমানরা কেবল সাধারণ কোনো উপজাতি নয়, বরং একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের সূচনা

এই পরাজয় বাইজেন্টাইন সম্রাট সহজেই মেনে নিতে পারেননি। ফলে শুরু হয় শতাব্দীপ্রাচীন অটোমান-বাইজেন্টাইন যুদ্ধএর পর থেকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একে একে আনাতোলিয়ায় তাদের সমস্ত ভূখণ্ড হারাতে থাকে, যা পরবর্তীতে উসমানীয়দের এক বিশ্বজয়ী পরাশক্তিতে রূপান্তরের পথ সুগম করে দেয়।


ইতিহাসের যে যুদ্ধগুলো একটি নতুন সাম্রাজ্যের জন্ম দিয়েছিল, বাফেউসের যুদ্ধ নিঃসন্দেহে তার মধ্যে অন্যতম। উসমান বে-র এই দূরদর্শী নেতৃত্বের গল্প আপনাকে কেমন লাগলো? আপনার অনুভূতি জানান কমেন্টে!

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...