মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...
আজ ঐতিহাসিক ১১ মার্চ। ইতিহাসে দিনটি একটি স্মরণীয় দিন। জেনে নেই ১১ মার্চ ইতিহাসে কেন এতো বিখ্যাত। ভাষা আন্দোলন তথা এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১১ মার্চ একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে পূর্ব বাংলায়
সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। ১১ মার্চ প্রতিবাদের যে ভিত রচনা হয়েছিল তারই সূত্র ধরে তৎকালীন সরকার ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় এবং এই সংগ্রামের পরিপূর্ণতা লাভ করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের সিঁড়ি বেয়েই ৫২ 'র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলন বিকাশ লাভ করে।যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন করাচিতে অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান গণপরিষদের এ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই পূর্ব বাংলায় ( বাংলাদেশ) বাংলাকে অফিস-আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনেরই প্রতিফলন ঘটে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালি সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাবের মধ্যে। প্রস্তাবটিতে তিনি বলেন, ‘উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার থাকতে হবে’।তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন, পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের ছয় কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে চার কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। সুতরাং বিষয়টিকে প্রাদেশিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে দেখা উচিত। তাই তিনি গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির দাবি করেন।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি পাকিস্তান গণপরিষদে আলোচিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বাঙালি পার্লামেন্ট সদস্যদের একাংশ এর পক্ষে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ সমর্থিত এমপিরা এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, মোহাজের ও পুনর্বাসনমন্ত্রী গজনফর আলী খান, পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন এবং গণপরিষদের সহ-সভাপতি তমিজউদ্দিন খান।প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তার বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা ও একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’ খাজা নাজিমুদ্দীন বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব, ‘একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতাদের এসব বক্তব্যের জবাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব সমর্থন করে গণপরিষদে কংগ্রেস দলের সেক্রেটারি রাজকুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই কথ্য ভাষা নয়। তা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের উপরতলার কিছুসংখ্যক মানুষের ভাষা। আসলে এ হলো অন্যদের উপর উচ্চশ্রেণির আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা। বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্য চাপ দিচ্ছি না। আমরা শুধু চাই পরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি। ইংরেজিকে যদি সে মর্যাদা দেয়া হয়, তাহলে বাংলা ভাষাও সে মর্যাদার অধিকারী।’
কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে প্রস্তাবটি মুসলিম লীগ নেতাদের অদূরদর্শিতা ও চাটুকারিতার কারণে বাতিল হয়ে যায়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে না গিয়ে তিনবার বিভিন্ন সংশোধনীসহ বিলটি পুনরায় উত্থাপন করেন কিন্তু প্রতিবারই তা একই ভাগ্যবরণ করে।
গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের এক সভায় মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষার তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেয়া, পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ভাষা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে ১১ মার্চ সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। সভায় আরো দাবি করা হয় যে, বাংলাকে অবিলম্বে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা বলে ঘোষণা করা হোক। এই সভা ও সভার সিদ্ধান্ত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১১ মার্চের ধর্মঘটের প্রতি চতুর্দিক থেকে জন সমর্থন আসতে থাকে।
১১ মার্চের হরতাল সফল করতে ১ মার্চ, ১৯৪৮ তারিখে প্রচার মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম (তমদ্দুন মজলিস সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য), নঈমুদ্দীন আহমদ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক) এবং আবদুর রহমান চৌধুরী (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতা)। জাতীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এ বিবৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। ওই বিবৃতিতে ১১ মার্চের হরতালকে সফল করার আহ্বান জানানো হয়।১১ মার্চের হরতালকে সামনে রেখে তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে ২ মার্চ ফজলুল হক হলে বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কামরুদ্দীন আহমদ। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন রণেশ দাসগুপ্ত, অধ্যাপক আবুল কাশেম, অজিত কুমার গুহ, আজিজ আহমদ, সরদার ফজলুল করিম, নঈমুদ্দীন আহমদ, তফাজ্জল আলী, শামসুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আলী আহমদ, শহীদুল্লাহ কায়সার, অলি আহাদ, শওকত আলী, তাজউদ্দীন আহমদ,শামসুল হক, লিলি খান, আনোয়ারা খাতুন, মহিউদ্দিন, শামসুল আলম, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুল আউয়াল, প্রমুখ। সভায় ২৮ জন সদস্য নিয়ে প্রথম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন শামসুল আলম। ওই সভায় ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১১ মার্চের কর্মসূচি সফল করার জন্য ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে একটি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় পরের দিনের ধর্মঘটের বিস্তারিত কর্মসূচি সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এভাবেই ১১ মার্চের হরতাল সফল করার কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছিল।
১১ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ) সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট, ঢাকা শহরে বিক্ষোভ এবং পিকেটিং করা হয়। এ দিন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা আন্দোলন, মিছিল ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১১ মার্চের ভোরে ছাত্ররা পিকেটিংয়ের জন্য বিভিন্ন হল থেকে বেরিয়ে পড়েন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ( বুয়েট) এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। পিকেটিং চলাকালে ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয় এবং বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। 'হরতালের সময় ২০০ জন আহত, ১৮ জন গুরুতর আহত এবং ৯০০ জন গ্রেপ্তার হন।’ (অমৃত বাজার পত্রিকা, ১৩ মার্চ, ১৯৪৮)।মুসলিম লীগ সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালিয়ে মিছিল থেকে শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, অলি আহাদ সহ বেশ কয়েকজন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা করে।
১১ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই গ্রেপ্তার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই বঙ্গবন্ধুর প্রথম গ্রেপ্তার।১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১১ মার্চের ধর্মঘট শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পূর্ব বাংলার সর্বত্রই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ওই দিন ছাত্রসমাজ সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করে।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঐতিহাসিক ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্ব পর্যন্ত ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। অতএব ঘটনাবহুল এ দিবসটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক মর্যাদায় আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যধিক গুরুত্ববহ ও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন