সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

আজারবাইজান

 


 

দক্ষিণ ককেশীয় অঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র ‘দ্য রিপাবলিক অব আজারবাইজান’ এশিয়া ও ইউরোপের মোহনায় অবস্থিত। ‘ইউরোশিয়া’ অঞ্চলের এশীয় দেশ আজারবাইজান।দেশটির পূর্বে কাস্পিয়ার সাগর, উত্তরে রাশিয়া, উত্তর-পশ্চিমে জর্জিয়া, পশ্চিমে আর্মেনিয়া এবং দক্ষিণে ইরান। এছাড়াও ছিটমহল নাখশিভানের মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আজারবাইজানের একচিলতে সীমান্ত আছে।আর্মেনিয়ার পর্বতের একটি সরু সারি নাখশিভান ও আজারবাইজানকে পৃথক করেছে। আজারবাইজানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে আর্মেনীয়-অধ্যুষিত এলাকা নাগোর্নো-কারাবাখের আনুগত্য বিতর্কিত। কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থিত অনেকগুলি দ্বীপও আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত।

রাজধানীঃ সাগরতীরে অবস্থিত বন্দর শহর বাকু আজারবাইজানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

আয়তন ৮৬ হাজার ৬০০বর্গকিলোমিটার। আয়তন ও জনসংখ্যার দিকে থেকে এটি ককেশীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বৃহত্তম। আজারবাইজান মোটামুটি পর্তুগাল বা মার্কিন অঙ্গরাজ্য মেইন-এর সম-আয়তনবিশিষ্ট।

জনসংখ্যাঃ আজারবাইজানে প্রায় ৯৮ লক্ষ ২৪ হাজার ৯০০ লোকের বাস।

জনগোষ্ঠীর ৯৫% লোক জাতিগতভাবে আজারবাইজানি। অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতির লোকের মধ্যে লেজগীয়, রুশ, আর্মেনীয় ও তালিশ জাতির লোক প্রধান।

ধর্মঃ আজারবাইজানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী। আজারবাইজানের ৯৭ ভাগ মানুষ মুসলমান। এর মধ্যে ৮৫% শিয়া এবং ১৫% সুন্নি। আজারবাইজান বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক শিয়াবহুল দেশ।যদিও আজারবাইজান মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।

আজারবাইজানের রাষ্ট্রভাষা আজারবাইজানি।

আজারবাইজানের মুদ্রার নাম মানাত।

ইসলামের আগমন

হিজরি প্রথম শতকেই আজারবাইজানে ইসলামের আগমন হয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সময়ে আজারবাইজানে ইসলামের জয়যাত্রা শুরু হয়। আজারবাইজানে প্রথম অভিযান পরিচালিত হয় উতবা ইবনে ফারকাদ (রা.)-এর নেতৃত্বে। তাঁর অভিযানের মুখে সাসানি সাম্রাজ্যের নিযুক্ত প্রশাসক ‘মিরজিয়ান’ সন্ধি করতে বাধ্য হন। তাঁর পর হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) ‘আরবিল’ জয় করেন। এরপর একে একে অভিযান পরিচালনা করেন মুগিরা ইবনে শুবা, আশআস ইবনে কায়েস ও সারাকা ইবনে আমর (রা.)। তাঁদের অভিযানে আজারবাইজানের বেশির ভাগ ভূমি ইসলামী খেলাফতের অধীনে চলে আসে। এ সময় ফারকাদ আস সুলামিকে এই অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে এই অঞ্চলে। এই সময় মিসর ও সিরিয়ার মুসলিম আরবরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করে। ক্রমান্বয়ে ইসলাম আজারবাইজানের খ্রিস্টান ও মূর্তিপূজারি জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। মাত্র এক শতকের ব্যবধানে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে পরিণত হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালেকের যুগে আজারবাইজানে ইসলামের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি হয়। তিনি অত্র অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি ইসলামী খেলাফতের সীমানা বিস্তারেও মনোযোগ দেন। তাঁর সময়ে ‘ওরসান’ ও ‘বুরঝান্দ’ নামে দুটি ইসলামী নগরের গোড়াপত্তন হয় এবং জাররাহ ইবনে আবদুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দক্ষিণ আজারবাইজানের ‘আল খুরঝ’ জয় করে। আব্বাসীয় আমলেও এই অঞ্চলের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে। এ সময় মুসলিমরা আজারবাইজানের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিজরি পঞ্চম শতকে আজারবাইজান সেলজুকদের শাসনাধীন হয়। সেলজুক শাসনামলে এই অঞ্চলে সুফিবাদের বিস্তৃতি ঘটে। তাদের শাসনামলেই আজারবাইজানে শিয়া মতবাদের বিস্তৃতি ঘটে। সেলজুকদের পর আজারবাইজান উসমানীয় সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

ইতিহাস

অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে ককেশীয় এই দেশটি পর্যায়ক্রমে রুশ ও পারস্যের শাসনাধীন ছিল।আঠারো শতকের শেষভাগে প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকদের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকলে রাশিয়া তাদের ওপর চড়াও হয়। সীমান্তবর্তী মুসলিম দেশগুলোর ওপর তার হামলা ও আগ্রাসন বৃদ্ধি পায়। ১৮০১ ও ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে দুই দফা তৎকালীন মুসলিম পারস্যের ওপর হামলা করে রাশিয়া এবং জর্জিয়া, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার বিস্তৃত ভূমি দখল করে নেয়। অবশ্য মুসলিম শাসকরা এই অঞ্চল থেকে হাত গুটিয়ে নিলেও স্থানীয় মুসলিম নেতাদের কেউ কেউ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। যা দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীকাল পর্যন্ত টিকে ছিল। ১৮৫৯ সালে ইমাম শামিলের পরাজয় বরণের মধ্য দিয়ে অত্র অঞ্চলে রুশ আগ্রাসন রোধের শেষ সম্ভাবনাটুকু শেষ হয়ে যায়। আজারবাইজানের পূর্ণ ভূমি রাশিয়া পুরোপুরি দখল না করলেও এই অঞ্চলের মুসলিম শাসকদের মধ্যে বিরোধ উসকে দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করত সে। অবশেষে ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর সমর্থনে রাশিয়া আজারবাইজানে প্রবেশ করে। রুশ গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯১৮ সালের ২৮শে মে তৎকালীন আজারবাইজানের উত্তর অংশটি একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯২০ সালে বলশেভিক লাল সেনারা এটি আক্রমণ করে আবার রুশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং ১৯২২ সালে দেশটি আন্তঃককেশীয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির পর রুশ সরকার আজারবাইজান থেকে ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি মিটিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সব ধরনের ধর্মচর্চার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে। আরব সংস্কৃতির পরিবর্তে রুশ সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারে লিপ্ত হয়। আগে আরবি বর্ণে আজারবাইজানি লেখা হলেও তার পরিবর্তে রুশ বর্ণে লেখার ফরমান জারি করা হয়। অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। রুশ শাসনামলে আজারবাইজানে মসজিদের সংখ্যা দুই হাজার থেকে মাত্র ১৬-তে নেমে আসে।১৯৩৬ সালে আন্তঃককেশীয় সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রটি ভেঙে তিনটি আলাদা প্রজাতন্ত্র আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়াতে ভেঙে দেওয়া হয়। তখন থেকেই আজারবাইজানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং নাগোর্নো-কারাবাখ এলাকার খ্রিস্টান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব্বের সূত্রপাত। নাগোর্নো-কারাবাখের জনগণ আর্মেনিয়ার সাথে একত্রিত হতে চায়। ১৯৯১ সালের ২০শে অক্টোবর আজারবাইজান স্বাধীনতা লাভ করলে[এই দ্বন্দ্ব্ব সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। ফলে নতুনভাবে স্বাধীন দেশটির প্রথম বছরগুলি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক অবনতি, এবং নাগোর্নো-কারাবাখের যুদ্ধে অতীবাহিত হয়। ১৯৯৪ সালের মে মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিচ্ছিন্নতাবাদী আর্মেনীয়রা যুদ্ধে ক্ষান্ত দেয়। এখনও নাগোর্নো-কারাবাখ ও আরও ৭টি আজারবাইজানি জেলা আর্মেনীয়দের সামরিক নিয়ন্ত্রণে আছে। ১৯৯৫ সালে আজারবাইজানে প্রথম আইনসভা নির্বাচন অণুষ্ঠিত হয় এবং ঐ বছরই সোভিয়েত-উত্তর নতুন সংবিধান পাস করা হয়। বর্তমানে আজারবাইজানে এক হাজার ৮০০ মসজিদ রয়েছে।রুশ শাসনামলে বিপুলসংখ্যক রুশ নাগরিক আজারবাইজানে বসতি স্থাপন করে। যাদের সংখ্যা একসময় ১০ শতাংশে উন্নীত হয়সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পরও আজারবাইজানের রাষ্ট্র ও সমাজে রুশ শাসনের কালো দাগ রয়ে গেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মুসলিম হলেও আজারবাইজান একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। দেশের বেশির ভাগ নাগরিক এখনো ধর্মবিমুখ। মুসলিম জনগণের খুব সামান্য অংশই ধর্মপরায়ণ। তবে আশার কথা হলো, তরুণ প্রজন্ম ইসলামপরায়ণ। তারা ক্রমেই ইসলামের প্রতি ঝুঁকছে। বাকু রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিআরআই)-এর এক প্রতিবেদনে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আজারবাইজানের মুসলমানের ধর্মীয় প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। যাতে দেখানো হয়েছে, এই তিন বছরে ধর্মবিমুখতার হার ৫৯ থেকে ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ধার্মিকদের সংখ্যা ১৬ থেকে ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে সে দেশে মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি নমনীয় হচ্ছে। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় আজারবাইজানে মাত্র একটি মাদরাসা (ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ছিল। ২০০০ সালে যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০-এ। যার মধ্যে সরকার অনুমোদিত ৩০টি মাদরাসাও রয়েছে। বাকুতে অবস্থিত মাদরাসাটিকে ১৯৯২ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়। সম্প্রতি সরকার সাতটি ইসলামিক কলেজের অনুমোদন দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে ২০২০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। সব মিলিয়ে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে আজারবাইজানের মুসলিমরা।

নাগোর্নো-কারাবাখ বিতর্ক

নাগোর্নো-কারাবাখ ককেশাস পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বিস্তৃত উচ্চভূমি।নাগর্নো-কারাবাখ ছিটমহলটির মোট আয়তন৪,৪০০ বর্গকিলোমিটার।ছিটমহলটির বাসিন্দাদের শতকরা ৯০ ভাগ জাতিগত আর্মেনীয়।নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের সমস্যা শুরু হয় উসমানীয় সম্রাজ্য পতনের পরে যখন এ অঞ্চলটি ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এ অঞ্চল চলে যায় বলশেভিকদের অধীনে।১৯২৩ সালে তত্কালীন সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্ট্যালিন একে আর্মেনিয়ার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে আজারবাইজানের সঙ্গে জুড়ে দেন। নাম দেওয়া হয় নাগোর্নো-কারাবাখ অটোনোমাস ওব্লাস্ট (এনকেএও)।আর্মেনিয়ান সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক ইস্যুটি এরপর দীর্ঘ সময় অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে থাকে।আজারবাইজানের ভূসীমার মধ্য থেকে নাগোর্নো -কারাবাখ অঞ্চলকে আর্মেনীয়দের নেতৃত্বে স্বায়ত্বশাসন দিয়ে দেয় রাশিয়া। তখন থেকেই আজারবাইজান বিরোধিতা করে আসছে।১৯৯১ সালের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার অনেক প্রজাতন্ত্রের মতো স্বাধীনতা ঘোষণা করে নাগোর্নো-কারাবাখ । শুরু হয়ে যায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পক্ষে থাকে কারাবাখ ও আর্মেনিয়া অন্যদিকে আজারবাইজান। যুদ্ধের পর কারাবাখ কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ করছে, যদিও এই স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়নি। কারাবাখ এখনো আজারবাইজানের আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে রয়েছে কিন্তু ছিটমহলটির ওপর আজারবাইজানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আর্মেনিয়া আজারবাইজান স্বাধীন হয়।আজারবাইজানের তুলনামূলক কম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রাশিয়ার ইন্ধনে আর্মেনীয়রা ধীরে ধীরে নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলের আশে পাশের বিশাল ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এ নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে বিরোধে জড়িয়ে আছে দুই প্রতিবেশী। আর্মেনিয়া ১৯৯২-৯৪ সালে যখন এই নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করে নেয় তখন সেখান থেকে প্রায় দশ লাখ আজেরি উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছিল। তিন বছরের যুদ্ধে ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।তখন থেকে প্রতি যুদ্ধে আর্মেনিয়া আজারবাইজানের একটু একটু করে ভূমি দখল করতে থাকে। এখনও নাগোর্নো-কারাবাখ ও আরও ৭টি আজারবাইজানি জেলা আর্মেনীয়দের সামরিক নিয়ন্ত্রণে আছে।এতে আর্মেনিয়া আজারবাইজানের প্রায় ২০ শতাংশ অঞ্চল দখল করে আছে। এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ৪-৫ টি রিসোলিউশন পাশ করেছে। আর্মেনিয়ার দখল অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং দখল করা সকল ভূখণ্ডকে আজারবাইজানের কাছে হস্তান্তর করতে বলেছেকিন্তু বিশ্বের আরো অনেক মুসলিম জনপদের মতো আজারবাইজানের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা করেনি আর্মেনিয়া।২৭ সেপ্টেম্বর সকালে হঠাৎ করে শুরু হয়ে যাওয়া এই যুদ্ধে বড় বড় কামান, ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। যে অঞ্চলের জন্য লড়াই চলছে সেই নাগোর্নো-কারাবাখের জন-অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ১৯৯০ এর দশকের পর সেখানে এই প্রথম এধরনের হামলার ঘটনা ঘটলো। ১০ নভেম্বর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান পরিপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুসারে, গত মাস দেড়েকের সংঘর্ষে আজারবাইজান বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটির যে অংশ দখল করে নিয়েছে, তা তারা রেখে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে শুশা শহর, যাকে আর্মেনীয়রা শুশি নামে ডাকে। এছাড়া চুক্তির অধীনে আর্মেনীয় বাহিনীকে আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে আরো কয়েকটি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে।

রাজনীতি

আজারবাইজানে রাজনীতি-র ভিত্তি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র, যেখানে আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রপ্রধান, এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারপ্রধান। নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের হাতে, আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সরকার ও সংসদ উভয়ের হাতে ন্যস্ত। বিচার বিভাগ স্বাধীন।

প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ

আজারবাইজান ১০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল;৬৬ টি রেয়ন এবং ৭৭ টি শহরে বিভক্ত।

অর্থনীতি

আজারবাইজানের অর্থনীতি বর্তমানে একটি সন্ধি পর্যায়ে বিদ্যমান, যেখানে সরকার এখনও একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে চলেছে। আজারবাইজানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেলের ভাণ্ডার। বৈচিত্র‌্যময় জলবায়ু অঞ্চলের উপস্থিতির কারণে দেশটির কৃষি খাতের উন্নতির সম্ভাবনাও প্রচুর। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সহযোগিতায় আজারবাইজান একটি সফল অর্থনৈতিক সুস্থিতিকরণ প্রকল্প হাতে নেয়, যার ফলশ্রুতিতে ২০০০ সাল থেকে দেশটির অর্থনীতি ১০% হারে প্রবৃদ্ধি লাভ করে চলেছে। ২০০৭ সালে আজারবাইজানের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পায়। মূলত তেল খাতই এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। ২০০৭ সালের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GDP) ৫২.৮% খনিজ তেল খাত থেকে আসে।

আজারবাইজানের বাকু তেলক্ষেত্রগুলি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। কিন্তু দুর্নীতি, সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ এবং দুর্বল সরকারের কারণে দেশটি খনিজ সম্পদ থেকে সম্ভাব্য মুনাফা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আজারবাইজান তেল সম্পদে সমৃদ্ধ। তেল সম্পদের কারণেই দেশটি বেশ সমৃদ্ধ এবং এর আঞ্চলিক প্রভাব ও বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্নীতি ও দারিদ্র, যা দেশটির ক্রমবর্ধমান উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।রয়েছে তেল, গ্যাস ও লোহার মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। তবে তেল ও তেল শিল্পের ওপরই টিকে আছে দেশটির অর্থনীতি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...