সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

ফিলিস্তিন

 


 

ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন সরকারিভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র।১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ দ্বারা প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন বিভাগ যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিন ভূখন্ড (গাজা ভূখন্ড ও ওয়েস্ট ব্যাংক) ছাড়াও ইসরায়েল শাসনাধীন অঞ্চলও ছিল এবং জেরুজালেমকে ঘোষিত রাষ্টের রাজধানী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।আলজিয়ার্স শহরে নির্বাসনে থাকা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপাক্ষিক ভাবে ১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ১৯৮৮ ঘোষণার সময়ে কোনো অঞ্চলেই পিএলওর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যদিও তারা যে অঞ্চলগুলি দাবি করেছিল সেইগুলি ইসরায়েলের দখলে ছিল । এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৩৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশের স্বীকৃতিই এখনো পায়নি ফিলিস্তিন। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় মূল ভূখণ্ড দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। তবে ইসরাইল স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি ফিলিস্তিন। ১৯৭৪ আরব লীগ শীর্ষ বৈঠকে স্থির হয়েছিল, পিএলও ফিলিস্তিনের জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি এবং ও তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠিত আহবান জানিয়েছিল ।২২ নভেম্বর ১৯৭৪, থেকে জাতিসংঘ পিএলওকে " রাষ্ট্রহীন-সত্তা " রুপে পর্যবেক্ষক অবস্থা রেখেছিল। যারা কেবলমাত্র জাতিসংঘে তাদের বক্তব্য রাখতে পারতেন, কিন্তু ভোট দেবারর কোনো ক্ষমতা ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় ফিলিস্তিন।

মুসলমানদের আগমন

ফিলিস্তিনের জেরুজালেম শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহস্র বছরেরও প্রাচীন ইতিহাস। জেরুজালেম শহরটি বর্তমানে ইসরাইলেই অবস্থিত। বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর একটি বলে গণ্য করা হয় এই শহরকে। জেরুজালেমের নাম ইহুদী, ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের সাথে ওতোপ্রতোভাবে ও গভীরভাবে জড়িত। খ্রিস্টপূর্ব ১১শ শতকে দাউদ আ. জেরুজালেম জয়ের পূর্বে শহরটি জেুবুসিয়াসদের বাসস্থান ছিল। পরবর্তীকালে তার পুত্র সুলাইমান আ. শহরের দেয়াল সম্প্রসারিত করেন।এখানে মুসলিমদের প্রথম কেবলা মসজিদুল আকসা অবস্থিত ।রাসুল (সা.) মিরাজ রজনীতে মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ থেকে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাস প্রথম সফর করেন, যা ইসরা নামে পরিচিত। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র মেরাজ বেহেশতি বাহন বোরাকে চড়ে শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। পবিত্র আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’(সূরা আল ইসরা- ১) প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মিরাজ গমনের সময় বায়তুল মুকাদ্দাসে সব নবী রাসুলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এতে তিনি ইমামুল আম্বিয়া সব নবীর ইমাম ও সাইয়েদুল মুরসালিন সব রাসুলের সরদার হিসেবে স্বীকৃত হন। প্রথমে কাবা কিবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস স্থাপনের পর এটি কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ওহি লাভ ও নবুওয়ত প্রকাশের সময় বায়তুল মুকাদ্দাসই কিবলা ছিল। মদিনায় হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এই কিবলা পরিবর্তন হয়ে পুনরায় কাবা কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়।৭ম শতকে অর্থাৎ ৬৩৭ সালে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর শাসনামলে মুসলমানগণ জেরুজালেম জয় করে একে মুসলিম সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করে নেনতিনি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিপ্রদান করে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তির ফলে শহর মুসলিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং জিজিয়ার বিনিময়ে অমুসলিমদের নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। মুসলিমদের পক্ষে খলিফা উমর এতে স্বাক্ষর করেন এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস, আবদুর রহমান বিন আউফ ও মুয়াবিয়া মুসলিম পক্ষে চুক্তির স্বাক্ষী হন। আলেকজান্দ্রিয়ার পেট্রিয়ার্ক ইউটিকিয়াস বলেন, উমর চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার পরিদর্শন করেন ও উঠোনে বসেন। নামাযের সময় হলে তিনি চার্চের বাইরে গিয়ে নামায আদায় করেন যাতে পরবর্তীতে কেউ তার নামাযের কারণকে ব্যবহার করে এই চার্চকে মসজিদে রূপান্তর না করে। জেরুজালেমে দশদিন অবস্থান করার পর খলিফা উমর মদীনা ফিরে আসেন। ৫০০ বছরের নিপীড়নমূলক রোমান শাসনের পর এই প্রথম ইহুদিরা জেরুজালেম বসবাস ও উপাসনা করার জন্য পুনরায় অনুমতি পায়।পরবর্তীকালে ওই পবিত্র স্থান আবাদ করে সেখানে মসজিদুল আকসা ও কুব্বাতুস সাখরাহসহ (মসজিদ) বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়।১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের ক্রুসেডার খ্রিস্টানরা সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার পর বায়তুল মুকাদ্দাসের বিভিন্ন ইসলামী স্থাপনায় পরিবর্তন করে, বিশেষ করে মসজিদুল আকসাকে গির্জায় পরিণত করে।ইউরোপীয়রা বায়তুল মুকাদ্দাস দখলের জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড শুরু করে। প্রায় ২০০ বছর পর্যন্ত ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাত-আটটি ক্রুসেড পরিচালনা করে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে আবারও মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন।১২১৯ সালে দামেস্কের সুলতান মুয়াজ্জিম নগরের দেয়াল ধ্বংস করেন। ১২৪৩ সালে মিশরের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম জার্মানির দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের হস্তগত হয়। ১২৩৯ সালে তিনি দেয়াল পুনর্নির্মাণ করেন কিন্তু কেরাকের আমীর সেগুলোকে ধ্বংস করে দেন। ১২৪৩ সালে জেরুজালেম পুনরায় খ্রিস্টানদের দখলে আসে এবং দেয়ালসমূহ সংস্কার করা হয়। কিন্তু ১২৪৪ সালে তাতাররা শহরটি দখল করে এবং সুলতান মালিক নগরপ্রাচীর ভেঙ্গে ফেলেন। ১৫১৭ সালে উসমানী খলিফা ইয়াভুজ সুলতান সেলিম কুদসকে উসমানী খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোরের ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিন উসমানী খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। পুরনো শহরটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু স্থানের অবস্থানস্থল, যেমন মুসলিমদের কাছে ডোম অব দ্য রক ও আল-আকসা মসজিদ, ইহুদিদের কাছে টেম্পল মাউন্ট ও পশ্চিম দেয়াল এবং খ্রিষ্টানদের কাছে চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়।১৫৩৮ সালে সুলতান সুলেমান জেরুজালেম ঘিরে বিখ্যাত দেয়াল তুলে দেন। যেটা এখন ওয়াল অফ জেরুজালেম নামে পরিচিত।১৯৮১ সালে এই অঞ্চলটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

ফিলিস্তিন সমস্যার পটভূমি

ভূমধ্যসাগরের পূর্বে ১০,৪২৯ বর্গমাইলব্যাপী ফিলিস্তিন দেশটি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। আরব মুসলমানেরা ছিল সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী।বিশ শতকের শুরুর দিকে অটোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের প্রভাব বাড়ায়। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধ জয়ে আশায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহে নামায় ব্রিটিশ সরকারকিন্তু এর মাঝে যে মহাধোকাটি লুকিয়ে ছিল তা তারা বুঝতে পারেনি৷ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইহুদিদেরও গোপনে আশ্বাস দেওয়া হয়।১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর যুদ্ধে জয়ী হলে এই ভূমিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে বলে আশ্বাস দেন৷ যা ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা হিসেবে পরিচিত৷ অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে ফিলিস্তিনির ম্যানডেট পায় ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান৷ ফলে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন কি ধরনের পুরস্কার তিনি চান৷ উত্তর ছিল অর্থ নয় আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি আর তা হবে ফিলিস্তিন৷ ফলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় বৃটেন৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ের পর বৃটেন স্বাধীনতা দেয়ার অঙ্গীকারে ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সাল ৩০ বছর দেশটিকে নিজেদের অধীন রাখে৷ মূলত এই সময়টিই ফিলিস্তিনকে আরব শূন্য করার জন্য ভালোভাবে কাজে লাগায় ইহুদি বলয় দ্বারা প্রভাবিত ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি৷ ১৯২৩ সালে স্বাধীন তুরস্কের জন্ম হলে এই অঞ্চলে ইহুদীরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদগ্রীব হয়ে যানইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে, পোল্যান্ড, গ্রীস এবং সুইজাল্যান্ডে বসবাসকারী ইহুদীদেরকে নেতারা আহ্বান জানান ইসরায়েলে বসতি গড়তে। তাছাড়া ব্রিটিশ সরকার ইহুদীদেরকে তাদের নিজস্ব ভূমি ছেড়ে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে ফিলিস্তিনে দলে দলে অভিবাসী ইহুদি আসতে থাকে। ১৯১৯ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদির সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫ হাজারে উন্নীত হয় ।ধীরে ধীরে ইসরাইল ইহুদীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাধীন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠার ফলে সেখানে ইহুদীর সংখ্যা দ্রুতই বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৩১ সালে ইহুদীদের সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায় । ১৯৪৮ সালে সেখানে ইহুদিদের সংখ্যা ছয় লাখে উন্নীত হয়।বিরোধিতা সত্ত্বেও সেখানে তাঁরা বসতি গড়ে তোলে। এরপর ১৯২০, ’২১, ’২৮, ’২৯ ও ’৩৬ সালে আরবদের সঙ্গে ইহুদিদের সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় এলে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়। সেখানকার ইহুদিরা পালিয়ে ফিলিস্তিনে আসে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের তত্পরতা আরও বেড়ে যায়। ব্রিটিশ শাসন ও ইহুদি দখলদারির বিরুদ্ধে ১৯৩৬-১৯৩৯ সালে সংঘটিত হয় আরব বিদ্রোহ। ওই বিদ্রোহ দমন করা হয়। নিহত হয় পাঁচ হাজার আরব। আরবদের উচ্ছেদ ব্রিটিশরা একদিকে ইহুদিদের জন্য খুলে দেয় ফিলিস্তিনের দরজা, অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য গড়ে তোলে অনেক প্রশিক্ষিত গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন৷ ১৯২১ সালে ইহুদীরা 'হাগানাহ নামের বাহিনী তৈরি করে। এ বাহিনী ইহুদীবাদীদের রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং স্বাধীনতার পরে এই বাহিনী ইসরায়েলের মূল সামরিক বাহিনী গঠন করে। হাগানাহ ছাড়াও ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে৷ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হচ্ছিল তখন পরিস্থিতকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য গুপ্ত সংগঠন হাগানাহ বেছে নেয় আত্মহনন পন্থা৷ ১৯৪০ সালে এসএস প্যাটৃয়া নামক একটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে তারা উড়িয়ে দিয়ে ২৭৬ জন ইহুদিকে হত্যা করে৷ ১৯৪২ সালে আরেকটি জাহাজকে উড়িয়ে দিয়ে ৭৬৯ জন ইহুদিকে হত্যা করে৷ উভয় জাহাজে করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসছিল আর ব্রিটিশরা সামরিক কৌশলগত কারণে জাহাজ দুটিকে ফিলিস্তিনের বন্দরে ভিড়তে দিচ্ছিল না৷ হাগানাহ এভাবে ইহুদিদের হত্যা করে বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করলো৷ পাশাপাশি ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আরবদের উচ্ছেদকরণ চলতে থাকে খুব দ্রুত৷ এর ফলে ২০ লাখ বসতির মধ্যে বহিরাগত ইহুদির সংখ্যা দাড়ালো ৫ লাখ ৪০ হাজার৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন নিয়ে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে বৈরিতা বেড়ে যায়। ফিলিস্তিনের ওপর ম্যানডেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। একই সঙ্গে এই ভূ-ভাগ্য নির্ধারণে সদ্যগঠিত জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয়।১৯৪৭ সালের ১৫ মে গঠিত হয় United Nations Special Committee on Palestine (UNSCOP) যা পরে প্রস্তাব দেয় “স্বাধীন এক আরব রাষ্ট্র, স্বাধীন এক ইহুদী রাষ্ট্র এবং জেরুজালেম শহর”- এই তিন ভাগ।১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইঙ্গ-মার্কিন চাপে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে দ্বিখন্ডিত (ইহুদি ও আরব রাষ্ট্র) করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয় । তাতে ৩৩টি রাষ্ট্র পক্ষে, ১৩টি বিরুদ্ধে এবং ১০টি রাষ্ট্র ভোট দানে বিরত থাকে৷আরবদের বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিকল্পনাটি এগিয়ে যায়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নীলনকশায় ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭% আর ফিলিস্তিনীরা পেল ৪৩%তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত ফলে ভবিষ্যতে ইহুদিরা সীমানা বাড়াতে পারে৷ ফলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের মাধ্যমে পাস হয়ে যায় একটি অবৈধ ও অযৌক্তিক প্রস্তাব৷ প্রহসনের নাটকে জিতে গিয়ে ইহুদিরা হয়ে ওঠে আরো হিংস্র৷ তারা হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্যুৎ লাইন কাটা, বাড়িঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, জোর করে জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন করে মৃত্যু বিভীষিকা সৃষ্টি করতে লাগলো৷ ফলে লাখ লাখ আরব ত্যাগ করতে দেশ বাধ্য হলো ৷

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

মার্কিনদের প্রবল চাপ ও মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৪৮সালের ১৪ মে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনির ম্যানডেট ছেড়ে দেয়।সেদিন তেলআবিব মিউজিয়ামে জ্যুইশ পিপলস কাউন্সিল জড়ো হয় এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ঘোষণা করে।এভাবে ১৯৪৮ সালের ১৪মে রাতের অন্ধকারে ইহুদিবাদি ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম।সাথে সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এবং সোভিয়েতের স্টালিন স্বীকৃতি দেয় ইজরায়েলকে।১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হলে প্রতিবেশী চারটি আরব দেশ মিসর, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাক একযোগে ইসরায়েলকে আক্রমণ করে। সেই যুদ্ধে আরবেরা পরাজিত হয় এবং ইসরায়েল জাতিসংঘ পরিকল্পনায় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৫৬ শতাংশের জায়গায় মোট ৭৭ শতাংশ দখল করে নেয়। এরপর যে এক চিলতে জমি পড়ে রইল, সেখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা করা যেত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে মিসর ও জর্ডান তা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম গেল জর্ডানের বাদশাহর কবলে, গাজার দখল নিল মিসর।

বর্তমান পরিস্থিতি

মিত্রদের সহযোগিতা ও আশকারায় দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে ইসরায়েল। ষাটের দশকে পারমাণবিক বোমার মালিক বনে যায় তারা। দখলদারি ও বর্বরতার ব্যারোমিটার বাড়তে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরায়েলের একগুঁয়েমি ও নৃশংসতায় ফিলিস্তিনে রক্তগঙ্গা বইতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের অবৈধ দখল চালিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ফিলিস্তিন ২ হাজার ৪০০ বর্গমাইলের কয়েক টুকরো ভূমি মাত্রদীর্ঘ দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সীমানাও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদী পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের সীমানা ধরা হয়। এখন বড় প্রশ্ন হল, কে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তবতা হল, অধিকাংশ ফিলিস্তিনিই এখন পশ্চীমতীরের ছোট কিছু বসতিতে থাকেন। আর গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। সম্প্রতি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমতীরের আরো কিছু অংশ ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। দ্রুতই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবে ইসরাইল। ১৯৪৮ সালের পর আরব-ইসরায়েলের মধ্যে ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরও তিনটি যুদ্ধ হয়। এতে ফিলিস্তিনের ভাগ্যে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই জোটেনি।১৯৬৭ সালে ৬দিনের যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের কাছে পরাস্ত হয়। ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, মিশরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এ প্রথমবারের মতো ইহুদিদের জন্য পবিত্র জেরুজালেম ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। সেখান থেকে বহু ফিলিস্তিনীকে বিতাড়িত করা হয়। ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়এর ফলে মিশরকে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং প্রথমবারের মত কোনো আরব রাষ্ট্র কর্তৃক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ৯৯৪ সালে ২৬ অক্টোবর জর্ডান এবং ইসরাইল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। তখন পর্যন্ত জর্ডান ছিল দ্বিতীয় আরবদেশ মিশরের পর ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তাদের শর্ত ছিল, আগে ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের বিরোধের অবসান ঘটতে হবে। মুক্তির সংগ্রামের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও)। ১৯৬৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইয়াসির আরাফাত ছিলেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান। তিনি ফিলিস্তিনের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল ফাতাহরও নেতা ছিলেন।ইসরায়েলি দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করতে ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় হামাস। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক শাখা রয়েছে। কট্টরপন্থী সংগঠনটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না। ১৯৯৩ সালে সম্পাদিত অসলো প্রক্রিয়ারভিত্তিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার মধ্যে যে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম তীর ও গাজায় নামকাওয়াস্তে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন কায়েম হয়। তত দিনে অবশ্য সেই অঞ্চলের একটা বড় অংশ ইসরায়েলের অবৈধ বসতির কবলে, অথবা সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণে। নামেই স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে চৌপ্রহর ইসরায়েলি প্রহরা, উঁচু দেয়াল, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হলে ইসরায়েলি অনুমতি, ফলে এমন দেশকে স্বাধীন না বলে ছাদহীন কারাগার বলাই সংগত। । কিন্তু সেই প্রশাসনও দুই টুকরা হয়ে গেল ২০০৬ সালের নির্বাচনের পর। পশ্চিম তীর গেল ফাতাহর নিয়ন্ত্রণে, গাজা গেল ইসলামিক ব্রাদারহুডের মিত্র হিসেবে পরিচিত হামাসের। ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ফিলিস্তিনের দুই অংশ পশ্চিম তীর ও গাজা ২০০৭ সালের আগস্টে চলে যায় দুটি দলের নিয়ন্ত্রণে। সেই থেকে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ পশ্চিম তীরে ও খালেদ মেশালের নেতৃত্বে হামাস গাজা শাসন করছিল। দুজনের সঙ্গে কথা বন্ধ, যখন-তখন বন্দুকযুদ্ধ। হামাস সন্ত্রাসবাদী দল ও ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না, এই অভিযোগে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দলটির সঙ্গে সব সম্পর্ক বর্জন করে। 'সন্ত্রাসবাদী' তকমা থাকায় হামাসের ওপর বারবার আক্রমণ করেও ইসরায়েল পার পেয়ে যায়। এমনকি ওই সব সামরিক আক্রমণে হাজার নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নিহত হলেও নিজেকে নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ দাবি করে ইসরায়েল। ফলে হামাস-ফাতাহ বিভেদে লাভবান হচ্ছে ইসরায়েল। অন্যদিকে নিজেরা যে আলাপ-আলোচনা করে মতৈক্যে পৌঁছবে, ফাতাহ বা হামাস কেউই তাতে আগ্রহী নয়। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আরব শাসকরা সবাই শান্তির পক্ষে হলেও যুদ্ধের বিপক্ষে নয়। আরব রাজা-বাদশাহরা চাইলে ইসরায়েলকে চাপ দিতে পারত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ব্যাপারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেনদরবার করতে পারতইসরায়েলের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারে সক্ষম একমাত্র দেশটির নাম যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই দেশ কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশে সরকার বদল হয়, নতুন নেতৃত্ব আসে; কিন্তু তাদের আঁতাতের কোনো হেরফের হয় না। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নিরপেক্ষ 'মধ্যস্থতাকারী' হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার সরল অর্থ আগে ইসরায়েলের স্বার্থ, এরপর অন্য কথা। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই একচোখা নীতি তাদের জাতীয় স্বার্থবিরোধীও। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বব গেটস সরাসরিই কবুল করেছেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে যে মার্কিনবিরোধী মনোভাব, তার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি। তা সত্ত্বেও ইসরায়েল প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে বলেছিলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র হয় নিরপেক্ষ থাকুক অথবা আরবদের সমর্থন দিক। ট্রুম্যান নাকি জবাবে বলেছিলেন, দেশের অভ্যন্তরে কোনো আরব লবি নেই, যাদের জোরে নির্বাচনে জেতা যাবে। এই বাস্তবতার আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। বরং দশকের পর দশক ধরে সেখানে নতুন মাত্রায় সংঘাত জন্ম নিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় ফিলিস্তিন। স্বভাবতই তখন এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট। এর আগে তারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘পর্যবেক্ষক ভূখণ্ড’ হিসেবে যোগ দিত। কিন্তু এখন ‘সদস্য নয় এমন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই রায়কে সার্বভৌম ফিলিস্তিনের ‘জন্মসনদ’ বলে অভিহিত করেন। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত আছে।তারা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সদস্যপদও লাভ করেছে। সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামকে চিরতরে নিঃশেষ করার লক্ষ্যে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তি (ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি/শতাব্দীর সেরা চুক্তি) স্বাক্ষর করেছে। যে মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ বিশ্বের প্রায় সব পক্ষ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে মেনে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছার জন্য তৎপর, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতিপয় আরব রাষ্ট্রের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে সমূলে বিনাশ করার লক্ষ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে শতাব্দীর সেরা চুক্তি (!) স্বাক্ষর করে তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এ চুক্তি মোতাবেক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেইগাজা উপত্যকা, জিহুদিয়া পার্বত্য অঞ্চল ও পশ্চিম তীরের সামারিয়া অঞ্চল নিউ প্যালেস্টাইন নামে পরিচিত হবে। আর বাকি সব অঞ্চল, এমনকি এসব এলাকার ইহুদি বসতিগুলো সব স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জেরুসালেম ইসরাইল ও নিউ প্যালেন্টাইনের যৌথ রাজধানী হবে। আরবরা নিউ প্যালেস্টাইন এবং ইহুদিরা ইসরাইলের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। নিউ প্যালেস্টাইনের কোনো সেনাবাহিনী থাকবে না। হালকা অস্ত্রধারী পুলিশ থাকবে। বহিঃশত্রু থেকে তাদের রক্ষার দায়িত্বে থাকবে ইসরাইল। অর্থাৎ সেনাবাহিনী অস্ত্রভাণ্ডার সবই থাকবে ইহুদিদের ও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলি পৌরসভার হাতে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। আর কত রক্ত ঝরলে, লাশের মিছিল কতটা দীর্ঘ হলে, তাদের ভূখণ্ড স্বপ্নের স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ধরা দেবে—তা এখনো অজানা। মিসর, জর্দান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর আরববিশ্বের চতুর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দিয়েছে বাহরাইন। ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে ‘পেছন থেকে ছুরি চালানো’ হিসেবে দেখছে ফিলিস্তিন। তাদের জনগণ এ উদ্যোগে ব্যথিত ও মর্মাহত

ফাতাহ ও হামাস

ফিলিস্তিনে দুটি দল বেশ সক্রিয়একটি হামাস, অন্যটি ফাতাহ। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের মূল শক্তি হলো ফাতাহ। দলটি ইসরাইলি দখলদার সরকারের সমর্থনপুষ্ট। ফাতাহ ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে গঠিত দল। ফাতাহ নিজ অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে ১৯৬৫ সনে। মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের অনুরোধে ওই ঘোষণা দেয় ফাতাহ। নাসের ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মিশর শাসন করেন। একমাত্র ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে নাসের বিশ্বাস করতেন। তাই নাসেরের নেতৃত্বাধীন মিশর ফাতাহকে অস্ত্র ও সামরিক উপকরণের যোগান দেয়। রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি ফাতাহ জনপ্রিয় গণপ্রতিরোধ আন্দোলনও গড়ে তোলে এবং ফাতাহর সামরিক শাখার নাম দেয়া হয়েছিল আস সায়িক্বা বা বজ্র। ফাতাহ'র বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও সামরিক সদস্যরা থাকতেন মিশর, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, আলজেরিয়া ও তিউনিশিয়ায়। অন্যদিকে হামাস ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন সশস্ত্র সংগ্রাম করে আসছে। হামাস হল ফিলিস্তিনি সুন্নি ইসলামী বা ইসলামী রাজনৈতিক দল। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলি দখলদারির অবসানের দাবিতে ইন্তিফাদা বা ফিলিস্তিনি গণজাগরণ শুরুর পর ১৯৮৭ সালে হামাস গঠিত হয়। হামাস যার অর্থ উদ্দীপনা যার পুরো নাম হারাকাত আল মুকাওয়ামা আল ইসলামিয়া যার বাংলা অর্থ ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন।ইসরায়েলবিরোধী আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমাদ ইয়াসিনের নেতৃত্বে আবদেল আজিজ আল-রান্তিসি ও মাহমুদ জহর হামাস প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির বর্তমান প্রধান খালেদ মিশাল। সংগঠনটির সনদ অনুযায়ী তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর তাদের চাওয়া হলো, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে বর্তমান ইসরায়েল, গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে গঠিত একক ইসলামি রাষ্ট্র।হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শাইখ আহমেদ ইয়াসীন বলেন "ইসরাইলের জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে, তাদের বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে হবে।" ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইসরাইল ও জাপান হামাসকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে। সৌদি আরব, মিসর, আরব আমিরাতসহ আরও কিছু আরব দেশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেই বিবেচনা করে। অন্য দিকে ইরান, সিরিয়া, কাতার, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন নয় বরং একটি স্বাধীনতাকামী ও প্রতিরোধকামী সংগঠন হিসেবেই দেখে। হামাসের রাজনৈতিক শাখার পাশাপাশি আল কাসসাম ব্রিগেড নামে একটি সামরিক শাখা আছেএই শাখাটিই মূলত ইসরাইলের সাথে গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধরত।হামাসের দখলে রয়েছে গাজা এলাকা।

ইয়াসির আরাফাত

ইয়াসির আরাফাত, ছিলেন একজন ফিলিস্তিনী নেতা। পুরোনামমুহাম্মদ আবদেল রহমান আবদেল রউফ আরাফাত আল-কুদওয়া আল-হুসাইনি। ১৯৬৯-২০০৪ পর্যন্ত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগেনাইজেশন (পিএলও)এর চেয়ারম্যান ও ১৯৯৪-২০০৪ পর্যন্ত প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথরিটির (পিএনএ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্ট মিশরের কায়রোতে এক ফিলিস্তিনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াসির আরাফাত। তার বাবা আবদেল রউফ আল-কুদওয়া আল-হুসাইনি গাজার এবং মা জোয়া আবুল সাউদ জেরুজালেমের অধিবাসী ছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে মাকে হারান আরাফাত।শৈশবের অধিকাংশ সময়ই তিনি মিশরের কায়রোতে ছিলেন। লেখাপড়া করেছেন মিশরের কিং ফুয়াদ ইউনিভার্সিটিতে। এখান থেকেই তিনি আরব জাতীয়তাবাদে আকৃষ্ট হন এবং ইহুদিবাদ বিরোধী আদর্শে প্রভাবিত হন।১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভাগ করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৫২-৫৬ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি ছাত্রদের জেনারেল ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসরাইলকে উৎখাত করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে তিনি আধাসামরিক সংগঠন ‘ফাতাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে আরাফাতের ফাতাহ দল জর্ডানের সাথে মতপার্থক্যজনিত কারণে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে আরাফাত বিতর্কিত হয়ে পড়েন। জর্ডান থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি লেবাননে অবস্থান নেন, যেখানে তিনি ও তার ফাতাহ দল ইসরাইলের ১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালের আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হন।১৯৫৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত তিনি ফাতাহ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।ফাতাহরচেয়ারম্যান হিসাবে আরাফাত ইসরায়েলী দখলদারির বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেন। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় আরাফাত ধর্মনিরপেক্ষ ফাতাহ দলের নেতৃত্ব দেন।১৯৮৩-৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি তিউনিসিয়ায় ছিলেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে ইসরাইলের সঙ্গে সমঝোতা ও শান্তি আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯৮৮ সালে তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেন এবং ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকট নিরসনে ‘দ্বি-রাষ্ট্র’ ভিত্তিক সমাধান নীতির প্রতি সম্মতি দেন।তার নেতৃত্বেই ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয়। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয় আলজেরিয়া।দল-মত-নির্বিশেষে ফিলিস্তিনী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ আরাফাতকে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে সম্মান করে থাকে। তবে অনেক ইসরাইলী তাকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে অভিহিত করে থাকে। জীবনের শেষভাগে আরাফাত ইসরাইলী সরকারের সাথে কয়েক দফায় শান্তি আলোচনা শুরু করেন। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন, ১৯৯৩ সালে ইসরাইল ও পিএলও এর মধ্যে ঐতিহাসিক ‘অসলো চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।১৯৯৪ সালে তিনি গাজায় বসতি স্থাপন করেন। ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকট নিরসনের লক্ষ্যে তিনি ইসরাইলের সঙ্গে বেশ কিছু শান্তি আলোচনা ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৪ সালে আরাফাত ইজহাক রাবিন ও শিমন পেরেজ এর সাথে অসলো শান্তি চুক্তির জন্য একত্রে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২০ জানুয়ারি ফিলিস্তিনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জয়ী হয়ে আরাফাত ফিলিস্তিনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলন এর মাধ্যমে আরাফাত ইসরাইলীদের সাথে কয়েক দশকের সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রয়াস নেন। ইসরাইলীদের সাথে এই সমঝোতা স্থাপনের জন্য আরাফাতের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার নতজানু নীতির তীব্র নিন্দা করে। ২০০২ হতে ২০০৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত আরাফাত ইসরাইলী সেনাবাহিনীর হাতে তার রামাল্লার দপ্তরে কার্যত গৃহবন্দী হয়ে থাকেন। ২০০৪ এর শেষদিকে আরাফাত অসুস্থ হয়ে পড়েন, এবং কোমায় চলে যান। আরাফাতের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ পায়নি; কিন্তু চিকিৎসকদের মতে ,তিনি ইডিওপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপুরা এবং সিরোসিসে ভুগছিলেন। ২৫ অক্টোবর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ক'দিন পর তাকে বিমানে করে প্যারিসের কাছে একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ।সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ইয়াসির আরাফাত১১ নভেম্বর ২০০৪ সালেভোরবেলায় ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে ৮ দিন সংজ্ঞাহীন ছিলেন তিনি।মিশরের কায়রোতে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা উপস্থিত হয়ে এই মহান নেতার প্রতি সম্মান জানান।জেরুজালেমে পবিত্র আল-আক্বসা মসজিদের পাশে সমাহিত করার পরিকল্পনা থাকলেও ইসরাইলের আপত্তির কারণে তাকে রামাল্লায় সমাহিত করা হয়।তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রয়োগে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু হতে পারে, বলছে সুইস গবেষকরা। সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা বলছেন তারা ইয়াসের আরাফাতের দেহাবশেষ গবেষণার পর তার হাড়ে বিষাক্ত পোলোনিয়ামের সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু তারমৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে এমন বিতর্ক বেশ কিছুদিন যাবত চলে আসছিল। নয় বছর পর, ২০১৩ সালে - কবর থেকে তার দেহাবশেষ তোলা হয়, এবং সুইস বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় সেই দেহাবশেষে উচ্চমাত্রার তেজষ্ক্রিয় পদার্থ পলোনিয়াম পাওয়া যায়। বিষপ্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এমন সন্দেহ ওঠায় মৃত্যুর প্রায় আট বছর পর ইয়াসের আরাফাতের দেহাবশেষ কবর ২০১২ তোলা হয়। এক বছর গবেষণার পর সুইস বিজ্ঞানী বলছেন তার হাড়ে যে পরিমাণ পলিনিয়াম নামে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া গেছে তা মানবদেহের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ১৮ গুন বেশি।তবে বিজ্ঞানীরা এটাও বলেছিলেন যে তাদের পরীক্ষার এই ফল পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।সর্বশেষ ২০১৫ সালে ফ্রান্সের এক চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর কারণ ছিল স্বাভাবিক। তার দেহে পলোনিয়াম নামে যে বিষাক্ত পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তা প্রাকৃতিক কারণেই হয়েছে বলে এ প্রতিবেদনে বলা হয়। তিনি বলেছিলেন, “আমার এক হাতে জলপাই গাছের শাখা (শান্তির প্রতীক), আর এক হাতে যুদ্ধাস্ত্র। আমার হাত থেকে জলপাই গাছের শাখা পড়তে দিও না।”

ইন্তিফাদা

ইন্তিফাদাএকটি আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ প্রকম্পিত করা, জেগে ওঠা বা উত্থান ইত্যাদি। প্রচলিত অর্থে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের গণঅভ্যুত্থান।ফিলিস্তিনিদের প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ৮ ডিসেম্বর। ওই দিন গাজার শরণার্থী শিবিরের বাইরে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি লরি চাপা দিয়ে চারজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলে মানুষের চাপা ক্ষোভ জ্বলে ওঠে। জানা যায়, ১০ হাজারের মতো শোকার্ত মানুষ উপস্থিত হন। সেই নামাজে জানাজার জামাতে আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জ্বলন্ত লাভা ছড়িয়ে পড়ে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ক্যাম্প থেকে গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমের সব অঞ্চলে। তারা ইসরাইলি সেনা এবং ট্যাংকগুলোর দিকে পাথর ছুড়ে নিজেদের প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। প্রথম ইন্তিফাদা চলে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। ততদিনে ১৫০০ ফিলিস্তিনি এবং ২৭১ইসরাইলি নিহত হয়েছে; ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি করেছে কারাবরণ। প্রথম ইন্তিফাদায় ইসরাইলি বাহিনীর আধুনিক সব সমরাস্ত্রের মোকাবেলায় পাথর ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিরা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, ইসরাইল যে একটি হিংস্র রাষ্ট্রশক্তি এই সত্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত হয়।ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে। এটি ‘আল আকসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। দখলদার ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন বেশ কিছু সৈন্যসামন্ত সঙ্গে নিয়ে আল আকসা মসজিদে প্রবেশ করলে ফিলিস্তিনিরা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু করে এবং তা ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলে।যাতে মারা যায় ৩৩৯২জন ফিলিস্তিনি আর ৯৯৬জন ইসরায়েলি।বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যুতে ২০১৮ সালে শুরু হয় তৃতীয় ইন্তিফাদা। আল আকসা মসজিদসহ অন্যান্য মুসলিম ঐতিহ্য ধ্বংস করে বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদীদের শহর হিসেবে চিহ্নিত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে জোরালো প্রতিবাদ শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ট্রাম্পের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে এবং ফিলিস্তিনিরা তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু করতে বাধ্য হয়।

অসলো চুক্তি – ১৯৯৩

নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ১৯৯৩ সালে অত্যন্ত গোপনে দফায় দফায় আলোচনা, চুক্তি সইয়ে বিলম্ব, মধ্যস্থতা, পুনরায় আলাপ আলোচনার পর শেষপর্যন্তফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল, যা অসলো চুক্তি নামে পরিচিতি পায়। বোঝাপড়া হয়েছিলো - ফিলিস্তিনিরা স্বশাসনের আংশিক অধিকার পাবে এবং ইসরায়েল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো এবং তারপর গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।অসলো চুক্তি অনুসারে প্যালেস্টাইন অথোরিটি নামে একটি অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠিত হয়; যারাপশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকায় স্বায়ত্তশাসন কায়েম করতে পারবেন।ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি হিসেবে পিএলও ইসরায়েল রাষ্ট্র মেনে নেয়। ইসরায়েলিরা মেনে নেয় যে, ফিলিস্তিনি লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে।১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল কিনটনের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ও তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন। চুক্তির রূপকার ইয়াসির আরাফাত, আইজ্যাক রবিন ও ইসরাইলের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেজ মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে পরবর্তীকালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ওই ঐতিহাসিক চুক্তির পর চুক্তিবিরোধী কট্টরপন্থী একটি ইহুদি সংগঠন পরবর্তীকালেআইজ্যাক রবিনকে হত্যা করে।১৯৯৪ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনে অন্তর্বর্তী শাসন শুরু হয়। দুই মাস পর ২৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে নিজ ভূখণ্ডে ফিরে আসেন ইয়াসির আরাফাত।ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নামে অন্তর্বর্তীকালীন ফিলিস্তিন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকায় ফিলিস্তিনি অর্থনীতি, বেসামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল ইসরায়েল। ওই চুক্তির মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিতর্কিত নিরাপত্তা সহযোগিতার দুয়ার খুলেছিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানায়, ৭০ বছরেরও বেশি পুরনো সংঘাতের একটাই সমাধান, তাহলো পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। তবে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কেবল ইসরায়েলি দখলদারিত্বই জোরদার হয়েছে। ওই ধরনের কোনও সমাধানে পৌঁছানোটা ফিলিস্তিনিদের জন্য জটিল হয়ে পড়ে। ইসরায়েলি সেনাদের কড়া পাহারায় বর্তমানে ৬ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ ইসরায়েলি নাগরিক অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকাগুলোতে বসবাস করছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশই এখানে আছে। অধিকৃত এলাকাগুলোতে থাকতে ইসরায়েল সরকার তাদের নাগরিকদেরকে উৎসাহ ও প্রণোদনা দিয়ে থাকে।অসলো শান্তি চুক্তি অনুযায়ী, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন পরস্পরকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা। তবে ফিলিস্তিন এ চুক্তি মেনে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও দখলদার রাষ্ট্রটি তা আজও দেয়নি।যাইহোক, অসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন নিয়ে কিছু বলা হয় নি।২০১৮ সালেইসরায়েলকে দেওয়া জাতিরাষ্ট্রের স্বীকৃতি স্থগিত করেছে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন পিএলও। তারা অসলো চুক্তি থেকেও সরে আসতে পারে। পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন পিএলওর কেন্দ্রীয় পরিষদের এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা করে।১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী রেখে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের জাতিরাষ্ট্রের স্বীকৃতি স্থগিতের এ ঘোষণা বহাল থাকবে বলেও জানানো হয়।

স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের তালিকায় রয়েছে ১৩৭টি দেশ । ১৯৮৮ সালের ১৬ নভেম্বর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ। সে বছর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ঘোষণা দেওয়ার পর বছর ভারত, ভুটান, পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তান, ইরাক, সৌদি আরব, সুদানসহ বেশ কিছু দেশও তাঁদের স্বীকৃতি দেয়।সর্বশেষ স্বীকৃতিদাতা দেশটির নাম ভ্যাটিকান।

জেরুজালেম রাজধানী

প্রাচীন শহর জেরুজালেম। এই শহরে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থানতাই এই শহরকে নিজেদের করতে চায় তারা। এ নিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে চলছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সহিংসতা। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল। এ শহরেই মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল আকসা মসজিদ অবস্থিত। মক্কা ও মদিনার পর এটি মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান। ১৯৮০ সালে পুরো জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল। শহরটিকে তারা ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের ‘শাশ্বত এবং অবিভক্ত রাজধানী’ দাবি করতে থাকে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তাদের দাবীকৃত জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে কোনো রাষ্ট্রই স্বীকৃতি দেয়নি।১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম রাষ্ট্র যারা ২০১৭ সালেজেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ।সবাইকে অগ্রাহ্য করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। অনেক আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তার বিতর্কিত এই মন্তব্যের পর তিনি তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের কাজ শুরু করতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে কোনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে না পারলেও সাধারণ পরিষদ এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি ট্রাম্প। জেরুজালেম প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া ১২৮টি দেশকে শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন। পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনে প্রথম ইন্তিফাদার (এর অর্থ গণ-অভ্যুত্থান) সূচনা হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। ওই শান্তি চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনও চায় পূর্ব জেরুজালেম তাদের রাজধানী হবে।

ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি

২৮ জানুয়ারি ২০২০ সালে ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা চুক্তি নামের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক জেরুজালেম শহরকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবু দিস নামের একটি ছোট গ্রামকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়।ওই পরিকল্পনায় জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরের অংশবিশেষ ও গাজা উপত্যকা নিয়ে নামমাত্র একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে, যে রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনও সেনাবাহিনী থাকবে না। তবে ট্রাম্পের কট্টর ইসরায়েল ঘেঁষা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...