সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

মালয়েশিয়া

 


মালয়েশিয়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। বহু জাতির ও বহু ভাষার মানুষের বসবাস মালয়েশিয়ায়।পুরো মালয় দ্বীপপুঞ্জ এক সময় মালয়েশিয়া নামে পরিচিত ছিল
; তবে পরবর্তীকালে, এর সীমানা ভৌগোলিকভাবে খর্বিত হয়। এবং উনিশ শতকের শেষের দিকে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ব্রিটেন উপনিবেশের অধীনস্থ অংশই মালয়েশিয়া নামে পরিচিত হয়।যুক্তরাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে ১৩ টি রাজ্য এবং তিনটি ফেডারেল অঞ্চল নিয়ে গঠিত।দক্ষিণ চীন সাগর দ্বারা দেশটি দুই ভাগে বিভক্ত, মালয়েশিয়া উপদ্বীপ এবং পূর্ব মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার স্থল সীমান্তে রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, এবং ব্রুনাই; এর সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন এর সাথে।

রাজধানীঃ দেশটির রাজধানী শহর কুয়ালালামপুর এবং পুত্রজায়া হল ফেডারেল সরকারের রাজধানী।

আয়তন ৩ লক্ষ২৯ হাজার ৮৪৭ বর্গ কিলোমিটার। (৬৭ তম)

জনসংখ্যা জনসংখ্যা প্রায় ৩২ মিলিয়ন। বিশ্বের ৪৪ তম জনবহুল দেশ। মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মালয়েশিয়ার অবস্থান মুসলিম বিশ্বে ১৩তম।

জাতি-গোষ্ঠী : মালয় ৫০.১ শতাংশ, চীনা ২২.৬ শতাংশ, আদিবাসী ১১.৮ শতাংশ, ভারতীয় ৬.৭ শতাংশ, অন্যান্য ৮.৮ শতাংশ ।

ধর্মঃ দাপ্তরিকভাবে মালয়েশিয়া একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হলেও ইসলাম এর আনুষ্ঠানিক ধর্ম। মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩% ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এছাড়া ১৯.৮% জন বৌদ্ধ, ৯.২% জন খ্রিষ্টান, ৬.৩% জন হিন্দু এবং বাকিরা অন্যান্য ধর্ম পালন করে থাকে।

ভাষা -মালয় ভাষা মালয়েশিয়ার সরকারি ভাষা। এখানে ইংরেজি ভাষা সার্বজনীন ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মালয়েশিয়াতে আরও প্রায় ১৩০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা, বুগিনীয় ভাষা, দায়াক ভাষা, জাভানীয় ভাষা এবং তামিল ভাষা উল্লেখযোগ্য।

মুদ্রা : রিঙ্গিত

জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভ : ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭

ওআইসির সদস্য

নামকরণ

মালয়েশিয়া নামটি এসেছে সমগ্র মলয়দ্বীপপুঞ্জেরপূর্ববর্তীনাম থেকে । এ নামটি গ্রহণ করা হয় ১৯৬৩ সালে যখন মালয় ফেডারেশন, সিঙ্গাপু্র , উত্তর বোর্নিও এবং সারাওয়াকসহ প্রত্যেকটি রাজ্য নিয়ে একটি যুক্তরাজ্য গঠন করা হয় । তবে এ নামটি পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চল কে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো।

ইতিহাস

ইসলামের আগমন

ইসলাম আগমনেরআগে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মাবলম্বী ছিল। ৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে আরব মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছার আগে বিভিন্ন জাতিভেদ প্রথা ছিল। বিভিন্ন শ্রেণিভেদ ছিল। আজকের ভারতের মতো হিন্দুদের উঁচু-নীচু প্রথা অত্যন্ত প্রকট ছিল। আরবের মুসলিম বণিকেরা যখন ব্যবসার জন্য মালয়েশিয়ায় গেলেন, তখন চিরাচরিত নিয়মে জীবিকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন। মুসলিমদের সাম্য, ন্যায়নীতি, ভ্রাতৃত্ব ভাব ও চারিত্রিক মাধুর্য দেখে লোকেরা মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম কবুল করতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে মালয়েশিয়ার শাসকদের কাছেও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। তখনকার শাসক ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এ ভূখণ্ডের প্রায় সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন।সিঙ্গাপুরের রাজা পরমেশ্বর ( ১৩৯৬-১৪১৪) প্রথমে মাজাপাহিত পরে থাই সেনাবাহিনী দ্বারা বিতাড়িতহয়ে মালাক্কায়পালিয়ে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।ইসলাম গ্রহণের পর তার নাম হয় ইস্কান্দার শাহ। তিনি নতুন এক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশ১৫১১১ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজকর্তৃকউৎখাত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এখানে ক্ষমতায় ছিল। মালয়েশিয়ায় সুন্নী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ । মালয়েশিয়া শরিয়াহ ভিত্তিক সকল কাজে ‘শাফেয়ী’ মাযহাবের অনুসরন করে থাকে।ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় আলোচনা কিংবা যেকোন ধরনের সমস্যা নিষ্পত্তিতে ‘শরীয়াহ আদালত’র সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। তবে শরিয়াহ আদালতের কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্ত বিয়ে,সম্পত্তির উত্তরাধিকার,বিয়ে বিচ্ছেদ, ধর্মীয় আলোচনা প্রভৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ।

ইতিহাস

মালয়েশিয়ার ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ছয় হাজার বছরের পুরনো।৪০ হাজার বছর আগেও মালয় অঞ্চলে মানুষ বসবাসের নিদর্শন পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ারইতিহাস খুবইপ্রাচীন। সারাওয়াকের নিয়াহ গুহার বহু প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আছে । ইসলামের আগমনের পূর্বে এখানে বৌদ্ধরাজত্ব লাঙ্কাসুকা ও বৌদ্ধ রাজত্ব শ্রীবিজয়াছিল।ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শ্রীবিজয়ারাজ্য খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।চতুর্দশ শতাব্দীতে জাভার হিন্দু রাজত্ব মাজাপাহিত ও মালয়েশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।

১৫১১ সালে পর্তুগিজ নাবিক অ্যাফোনসো দ্য আলবুকার্ক এই অঞ্চলে নৌ অভিযান পরিচালনা করেন। এটাই ছিল মালয় উপদ্বীপে ইউরোপীয়দের প্রথম অভিযান। ১৬৪১খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজরা পর্তুগিজদেরনিকট হতে মালাক্কার দখল ছিনিয়ে নেয়।পরবর্তীকালে ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় । প্রকৃতপক্ষে১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে কেদাহর সুলতানের কাছ থেকে পেনাং দখলের মাধ্যমে মালয়ে ব্রিটিশশাসনের সূত্রপাত হয় ।অতঃপর সিংগাপুর ১৮১৯, ও মালাক্কা ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে দখলের পর ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় । দীর্ঘকাল নীরব থাকার পরে ১৮৭৪খ্রিস্টাব্দে হতে ব্রিটিশরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালয়ী রাজ্য গুলোর প্রতি হস্তক্ষেপ শুরু করে। এভাবে পেরাক সেলেংগোর সেম্বিলান, নেগরী ,পাহাং ,জোহোর, ত্রেঙ্গান ,পেব্লিস ,কেলেনতান ও কেদাহব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেখানে প্রতিষ্ঠা হয় ব্রিটিশ কলোনি।১৮৬৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া এখানে সরাসরি শাসন করে। ১৮৭৪ সালে স্বাক্ষরিত পাংকর চুক্তি অনুসারে বিভিন্ন রাজ্যের সুলতানরা ব্রিটিশ এলাকার শাসনের সুযোগ পায়। এসব এলাকায় ব্রিটিশরা টিন ও স্বর্ণের খনি প্রতিষ্ঠা করে। এছাড়াও নানা ধরনের মসলা ও ফসলের বাগান প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় রাবার চাষও শুরু হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মালয় উপত্যকা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। জাপানি আক্রমণে বিক্ষত হয়ে ওঠে এই অঞ্চল। ব্রিটিশরা চীন, ফরাসীদের সহায়তায় মালয় অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যুদ্ধের পরে ১৯৪৬ সালের ১ এপ্রিল মালয়ান ইউনিয়ন গঠিত হয়। এ সময় মালয় অঞ্চলে স্বাধিকার চেতনা জন্ম নেয়।ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ফেডারেশন অব মালয় গঠিত হয়। স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য মালয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট টেংকু আব্দুর রহমান তখনকার মালয়ের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৬৩ সালে ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া গঠিত হয়।স্বাধীনতা লাভ করলেও নবগঠিত মালয়েশিয়ার নেতাদের বেশ কিছু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৬১ সালে এই নতুন রাষ্ট্রের জন্য মালয়েশিয়া নামটি নির্ধারিত হয়। ১৯৬৩ সালেসিঙ্গাপুর, সাবাহ এবং সারাওয়াক মালয় যুক্ত হয়ে মালয়েশিয়া গঠিত হয়অবশ্য সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে শান্তিপূর্ণ ভাবে মালয়েশিয়া থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।এছাড়া নতুন রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার উত্থানে ভীত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ মালয়েশিয়ায় বেশ কয়েকবার সেনা প্রেরণ করে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয় ইন্দোনেশীয় আগ্রাসন। মালয়েশিয়ার আরেকটি আশু সংকট ছিল জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করা। মালয়েশিয়া একটি বহু জাতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত রাষ্ট্র এবং তাদের সকলকে একই পতাকার নিচে আনা সহজ কাজ ছিল না। নতুন সংবিধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়ী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার পরিচালনায় স্থায়ী ক্ষমতা বরাদ্দ করা হয়। পাশাপাশি ইসলামকে জাতীয় ধর্মের সম্মান দেওয়া হয় এবং মালয় ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়।তবে সংখ্যালঘু চীনারা আগে থেকেই মালয়েশিয়ার ব্যবসা বাণিজ্যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছিলো। ফলে স্বাধীন মালয়েশিয়ায় নতুন করে অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দা মালয়ীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্য বিভিন্ন কোটা ব্যবস্থা চালু করে।চীনারা এর বিরোধিতা করে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করে। ১৯৬৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধীদল জয়লাভ করলে কুয়ালালামপুরে জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দুই বছর সেখানে জারি থাকে জরুরি আইন।আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয় দেশটির সাবেক (দীর্ঘ মেয়াদি: ১৯৮১-২০০৩) প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদকে। তার নেতৃত্বে মালয়েশিয়া বর্তমান বিশ্বের একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।২২ বছরের শাসনামলে ড. মাহাথির গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করেছিলেন। এখানে কোনো জাতি গোষ্ঠীর লোকই এক বাক্যে মাহাথিরকে সালাম জানাতে কার্পণ্য করে না। ৬৯ সালের পর থেকে এ দেশে ঘটেনি কোনো জাতিগত দাঙ্গা। সমৃদ্ধ ও আধুনিক মালয়েশিয়া গড়তে সাতু মালয়েশিয়া’ বা ‘ওয়ান মালয়েশিয়া’ স্লোগানের প্রতীক। মালয়ী ‘সাতু’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘এক’ কনসেপ্ট জনগণের মধ্যে জাতিবোধের চেয়ে বড় করে তোলে দেশাত্মবোধকে।

টুংকু আব্দুল রহমান

টুংকু আব্দুল রহমান পুত্রা আল-হাজ ইবনি আলমারহুম সুলতান আব্দুল হামিদ হালিম শাহ ( ১৯০৩ - ১৯৯০) ছিলেন একজন মালয়েশিয়ান রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৩ সালে কেদাহের আলুর ছেতারে অবস্থিত ইস্তানা প্যামিন প্যালেসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কেদে সুলতানাতের ২৫ তম শাসক সুলতান আব্দুল হামিদ হালিম শাহ এর ৪৫ সন্তান-সন্তানাদির মধ্যে সপ্তম সন্তান ছিলেন।টুংকু আব্দুল রহমান ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার সরকার প্রধান ছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার পরে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত মালয়েশিয়া ফেডারেশনের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৩ সালে সাবাহ, সারাওয়াক এবং সিঙ্গাপুর মালয়ার সাথে একত্রিত হয়ে মালয়েশিয়া গঠনের পর ১৯৭০ সালে পদত্যাগ করা পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।সহজভাবে তাকে "টুংকু" (মালয়া অভিজাত পদবী) নামে ডাকা হলেও টুংকু আব্দুল রহমান যিনি এমনকি তার সমালোচকদের দৃষ্টিতেও মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা এবং মালয়েশিয়া গঠন এর স্থপতি হিসেবে ব্যাপকভাবে "প্রতিষ্ঠাতা জনক" হিসেবে বিবেচিত হন। যেমন, প্রায়ই তাকে "স্বাধীনতার জনক" অথবা "মালয়েশিয়ার জনক" হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।তিনি ওআইসির প্রথম মহাসচিব ছিলেন।

ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ

ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি।মাহাথির মোহাম্মদ ১৯২৫ সালে মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর এ্যালোর সেটর-এ এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা-মাতার নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। ১৯৭৪ সালে দল নির্বাচনে জয়ী হবার পর তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। মাত্র দুই বছর পর মাহাথির ১৯৭৬ এ উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতে তিনি সফল হন। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের জন্য অনেক কিছু করার পরিকল্পনা থাকলেও মাহাথির স্বাধীনভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম ছিলেন না। ১৬ই জুলাই, ১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি তার সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত হন। সেই থেকে টানা ২২ বছর মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এর মধ্যে প্রতিবার তিনি ও তার দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন।

মাহাথির  বিশ্বময় আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সকল বিষয় পুনঃপরীক্ষা করেন। সকল নীতি, পদ্ধতি, সরকার চালাতে প্রাত্যহিক সকল কাজ, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়। তার সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ওয়ার্ক-ফ্লো চার্ট আর অফিস ম্যানুয়েল প্রবর্তন করেন। মাহাথির ও তার সরকার দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি তৈরি করেন যার মাধ্যমে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হয়। ব্যবসা এবং রাজনীতিতে ফুটপাতের লোক থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যন্ত দেশের জন্য নিজের জন্য কাজ করবে। ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে বিদেশ থেকেও শ্রমিক আনা শুরু করেন। সে সময় প্রায় ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেন মাহাথির।দেশ থেকে প্রচুর পণ্য রপ্তানি শুরু করেন। ওই একই বছর ১৯৯২ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে মালয়েশিয়া।এরপর পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, প্রধান সড়ক নির্মাণসহ মাহাথিরের অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়।১৯৯০ সালেই মালয়েশিয়ার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। মাহাথির ১৯৭১ সালে প্রনিত নিউ ইকোনমিক পলিসি (এনইপি) সফল ভাবে বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। এনইপির উদ্দেশ্য ছিল জাতি নির্বিশেষে দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে জাতি পরিচয় মুছে ফেলা। নতুন সম্পদ সৃষ্টি করা এবং এর বৃহত্তর অংশ দরিদ্রদের জন্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম্পদের পুনঃবণ্টনের চেষ্টা করা হয়। ১৯৯১ সালে বিশ বছর মেয়াদি এনইপি শেষ হয়। দারিদ্র্য বিমোচন বহুলাংশে অর্জিত হয়। সমৃদ্ধির একটি পর্যায়ে পৌছে মালয়েশিয়া বিভিন্ন জাতির সুসম্পর্কসহ একটি জাতিতে পরিনত হয় যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঈর্ষনীয়। বিশ বছর মেয়াদি এনইপি শেষ হবার পর দশ বছর মেয়াদি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি (এনডিপি) প্রনয়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মাহাথির মোহাম্মদ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালের ওআইসি সম্মেলনের সফল সমাপ্তির পর ৩০শে অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।অবসর গ্রহণের দীর্ঘ পনের বছর পর ৯২ বছর বয়েসে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ব্যাপক দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ আবারও আসেন রাজনীতিতে। । ২০১৬ সালে বারসাতু নামে একটি নতুনদল গঠন করেন মাহাথির। ২০১৮ সালের নির্বাচনে পাকাতান হারাপান জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১০ মে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ২০২০ সালেরফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। বারসাতুর সভাপতি ও মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিন ইয়াসিনের সঙ্গে বিরোধের জেরে নিজ দল থেকেও বহিষ্কৃত হন মাহাথির।মাহাথির মোহাম্মদ আবার নতুন রাজনৈতিক দল গড়লেন। দলটির নাম পাত্রী পেজুয়াং তানাহ এয়ার। এর অর্থ জাতির জন্য যুদ্ধ করার দল। নতুন দলকে ডাকা হবে ‘পেজুয়াং’ নামে। মালয় ভাষায় পেজুয়াংয়ের অর্থ হচ্ছে যোদ্ধা।

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার মালয়েশিয়ার, কুয়ালালামপুরে অবস্থিত একটি বহুতল ভবন। এটি আসলে একজোড়া দালান।মালয়েশিয়ার প্রধান তেলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের অফিস এখানে। এই পেট্রোনাস কোম্পানির নামেই টাওয়ারটির নামকরণ করা হয়েছে। এখানে আলজাজিরা, বোয়িং, আইবিএম, ক্রওলার নেটওয়ার্ক, মাইক্রোসফট, রয়টার্সসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দফতরের রয়েছে। ৮৮ ফ্লোর ও গ্রাউন্ডে আরো পাঁচ ফ্লোর সর্বমোট ৯৩ ফ্লোর বিশিষ্ট বিশ্বের তৃতীয় এই সুউচ্চ দালানটিরউচ্চতা ১৪৮৩ ফুট ।যা ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে উচু ভবন বলে সমাদৃত হত। ২০০৪ সালে এসে তাইওয়ানের ১০১ তলা বিশিষ্ট ‘তাইপে-১০১’ ভবনের কাছে শ্রেষ্ঠত্ব ছেড়ে দিতে হয় ‘পেট্রোনাস টাওয়ার’কে। তবে টুইন ভবন বিবেচনায় এটির উচ্চতা এখনো পৃথিবীতে নাম্বার ওয়ান। অপরূপ সুন্দর এই টাওয়ারটির নকশা করেছিলেন আর্জেন্টাইন স্থপতি চেসার পেলী। এই দালান জোড়ার নিচে প্রায় ১২০ মিটারের ফাউন্ডেশন গাঁথুনি আছে। আরএই ফাউন্ডেশন গাঁথুনি করে দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ব্যাচি সোল্টাঞ্চ। টাওয়ারটি বাস্তবায়নে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠা নগুলো ছিল জাপানভিত্তিক হাজামা করপোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন এবং কোরিয়াভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠান কুকডোং ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন। বিল্ডিং দুটির মধ্যখানে একটি সংযোগ সেতু আছে, যা ৪১ এবং ৪২তম তলায় অবস্থিত। এই সেতুটি ৫৮ দশমিক ৪ মিটার লম্বা এবং এর ওজন প্রায় ৭৫০ টন। পেট্রোনাস টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১ মার্চ ১৯৯৩ সালে। দুই দফায় নির্মাণ কাজ শেষে ১ আগস্ট১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বিন মুহাম্মাদ এটি উদ্বোধন করেন। পেট্রোনাস টাওয়ার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।মালয়েশিয়ার মোবাইল কোম্পানি ম্যাক্সিস ও তেল কোম্পানি পেট্রোনাসের যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত। প্রথম ফ্লোরে এবং ওপরে প্রায় সব রকমের জিনিস ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আছে। রাতে লাইট, পানির ফোয়ারা ও সঙ্গীতের মূর্ছনায় সেই এক অদ্ভুত অনুভূতি পাবেন। দুইন টাওয়ার সংযুক্তকারী স্কাই ব্রিজে ওঠার সুযোগ আছে, যেখানে ওঠার পর কুয়ালালামপুর শহর এক নজরে দেখা যায়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এবং এই অঞ্চলের মধ্যে মালয়েশিয়াই সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের যাত্রা তখন থেকেই। এরপর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মালয়েশিয়া সফরে গেলে দু’দেশের সম্পর্ক আরো মজবুত ভিত্তিতে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ১৯৭৬ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মী আসতে শুরু করে।অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে শ্রম, শিক্ষা, সামরিক, সাংস্কৃতিক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে।মালয়েশিয়া এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য-অংশীদার।বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছে এদেশে।যারা কিনা শ্রম দিয়ে আধুনিক মালয়েশিয়া গড়ায় অবদান রেখে যাচ্ছেন।

সরকার ও রাজনীতি

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কাঠামোতে পরিচালিত হয়। রাজা হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকার প্রধান। প্রাদেশিক সরকার আছে এবং রাজা নির্বাচিত হয় প্রাদেশিক সুলতানদের মধ্য থেকে যা মালয়েশিয়ার ঐক্যকে করেছে সমৃদ্ধ। রাজা মালয়েশিয়ার জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।উল্লেখ্য মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজা পঞ্চম মোহাম্মদ।মালয়েশিয়ার সরকার ও ১১টি অঙ্গরাজ্য সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত।সরকার এবং আইনসভার দুই কক্ষের (দেওয়ান নেগারা ও দেওয়ান রাকিয়াত) উপর যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন বিভাগ অপেক্ষা স্বাধীন, তবে নির্বাহী বিভাগ বিচারক নিয়োগদানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

মালয়েশিয়ার ১৩টি রাজ্য (নেগেরি) হল জোহর, কেদাহ, কেলান্তান, মেলাকা, নেগেরি সেমবিলান, পাহাং, পেরাক, পারলিস , পুলাউ, পেনাং , সাবাহ, সারাওয়াক, সেলাঙ্গর এবং তেরেঙ্গানু। আর ৩টি এলাকা- কুয়ালামলামপুর, লাবুয়ান ও পুত্রাজায়া শহরসহ একটি ফেডারেল টেরিটরি (ওয়িলাইয়াহ পেরসেকুতুয়ান)।

অর্থনীতি মালয়েশিয়ার অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত মুক্ত কিন্তু রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। বর্তমানে মালয়েশিয়া একটি উঠতি শিল্পউন্নত বাজার অর্থনীতি বলে বিবেচিত। সরকার বিভিন্ন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও এই প্রভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। মালয়েশিয়ার অর্থনীতি মূলত মুক্তবাজার অর্থনীতি।

মালয়েশিয়ার পাম তেল রপ্তানির হার কমছে। বেড়ে গিয়েছে পাম তেল পরিশোধন ও উৎপাদনের খরচ। যেহেতু মহাথির মহম্মদ গত কয়েক মাস ধরে কট্টর ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন ও কাশ্মীর-সহ নানা ইস্যুতে খোলাখুলিভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করছেন। তাই বদলা নিতে ভারত মালয়েশিয়া থেকে পাম তেল কেনা বন্ধ করে ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে। মালয়েশিয়া বিশ্বে যত লক্ষ টন পাম তেল বিক্রি করে তার এক- তৃতীয়াংশ কিনত ভারত। শ্রম, সেকেন্ড হোম বা বাণিজ্যিক কারণে মালয়েশিয়ায় অনেক অভিবাসী রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

মালয়েশিয়া আসিয়ান এবং ওআইসি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য।এছাড়াও জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) এবং কমনওয়েলথ এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে মালয়েশিয়ার সরব উপস্থিতি রয়েছে। মালয়েশিয়ার বৈদেশিক নীতি নিরপেক্ষতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে দেশটি বদ্ধ পরিকর। এছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সম্পদ বা জাতীয় যে কোন ইস্যুতে মালয়েশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত দৃঢ়।

মালয়েশিয়ার সাথে ইসরায়েলের কোন প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং ইসরায়েলকে কখনও স্বীকৃতি দেয় নি।

ফিলিস্তিনের সাথে মালয়েশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনকে মালয়েশিয়া নৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে । দখলদার ইসরায়েলী সৈন্যদের সকল প্রকার নির্যাতন,আক্রমন এবং ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরায়েলের দমন-পীড়নমূলক নীতিকে মালয়েশিয়া সুস্পষ্টভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

খাবার এবং সংস্কৃতি

এশিয়ার খাদ্য স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশটি। নানা বর্ণ, ধর্ম আর সংস্কৃতির মানুষের অবস্থানের ফলে এখানকার খাবারও বেশ বৈচিত্রময়। মালয়, চাইনীজ এবং ভারতীয় নানা ধরনের খাবার বিভিন্ন রোস্তোরাঁ এবং পথের পাশের স্টলে খুব কম দামে পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং থাইল্যান্ডের খাবার। নানা সংস্কৃতির মানুষের নানা উৎসবের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যটি ফুটে ওঠে।

মালয়েশিয়ায় রয়েছে বহুভাষী,বহুজাতিক নৃগোষ্ঠী। ফলে অসংখ্য জাতির সহস্র ধরনের রীতি-নীতি ও আচরনের মিশেলে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি হয়ে ওঠেছে বৈচিত্র্যময়। তবে মালয়েশিয় সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সমাজের আবহমান কাল ধরে পালন করে আসা বৈচিত্রময় দৃষ্টিভঙ্গী ও আচার-আচরন। পাশাপাশি এটি ইসলামি সংস্কৃতির সাথে রক্ষা করেছে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। মালয়েশিয়ার সংস্কৃতিতে মালয় ভাষাকে সবার উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতির এবং ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রতিবেশী দেশ বলে পারষ্পরিক সাংস্কৃতিক উপাদানের বিনিময় এবং বিষয়বস্তুর ধারনে ইন্দোনেশীয়া এবং মালয়েশিয়া পরষ্পর পরষ্পরকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করেছ। তবে তা , সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও আত্নপরিচয়ের মৌলিক বিশ্বাস পালন,সংরক্ষনে মালয়েশিয়া বদ্ধ পরিকর।

খেলাধুলা

ফুটবল মালয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ফুটবলের পরেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে ব্যাডমিন্টন। এছাড়াও হকি, টেনিস,ঘোড়দৌড়,মার্শাল আর্ট এখানে জনপ্রিয়। ২০৩৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম আয়োজক হতে পারে দেশটি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় মালয়েশিয়ার সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। মালয়েশিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়। মালয়েশিয়া এ পর্যন্ত অলিম্পিকে ৬টি মেডেল জিতেছে যার ৫টিই এসেছে ব্যাডমিন্টন থেকে।

নাগরিকত্ব

মালয়েশিয়াতে তিন ধরনের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা রয়েছে প্রথম হল যারা আদি নাগরিক তারা। তাদেরকে মালয় ভাষায় আস্লি বলে , তারা হচ্ছে মালয়েশিয়ার প্রথম পর্যায়ের নাগরিক । দ্বিতীয়ত রয়েছে যারা নগর সভ্যতার যুগ থেকে মালয়েশিয়ার শহর বা নগরে বাস করে, তারা মূলত আস্লি দের থেকেই এসেছে তবে বহু আগে তাদের আদি বাসস্থান ত্যাগ করেছে। ৃতীয়ত রয়েছে যারা বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে ঐখানে স্থায়ী ভাবে জীবন যাপন করছে তারা । এই শ্রেণীর মধ্যে আছে চীনা, থাই, ভিয়েতনামি, তামিল, ইন্দোনেশিয়ান বাংলাদেশি, পাকিস্তানি। তাদের মধ্যে এখন সবচেয়ে ভাল অবস্থানে আছে চীনা মালয়েশিয়ানরা, মালয়েশিয়ার বেশীর ভাগ বড় বড় ব্যবসা প্রতষ্ঠান এখন তাদের মালিকানাধীন। আর তামিলদের বেশীর ভাগ ট্যাক্সি চালক আর কিছু আছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

মালায়েশিয়ায় এখন সাধারণত বহিরাগতদের নাগরিকত্ব দেয়া হয় না। তবে ঐখানে জন্ম হলে বা কোন মালয় নাগরিক কে বিয়ে করলে মালায়সিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া যায় । সেক্ষেত্রে মালায়েশিয়ার পাসপোর্ট দেয়া হয়। এবং অন্য সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় ভাবে সকলেই সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।

গণমাধ্যম

মালয়েশিয়ার প্রধান সংবাদপত্রগুলি হল উতুসান মালয়েশিয়া, দ্য স্টার এবং দ্য মালয় মেইল। এগুলির সবগুলিরই ইন্টারনেট সংস্করণ আছে। এগুলিতে স্থানীয় ইস্যু, রাজনীতি, ব্যবসা, বিনোদন এবং সংস্কৃতির উপর সংবাদ ও নিবন্ধ থাকে।

উতুসান মালয়েশিয়া ইংরেজি ও মালয় উভয় ভাষাতেই প্রকাশিত হয়। এটি ১৯৩৯ সালে সিঙ্গাপুরে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে মালয়েশিয়া ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে তারা কুয়ালালামপুরে স্থানান্তরিত হয়। এটি মালয়েশিয়ার প্রথম অনলাইন পত্রিকা হিসেবেও ইন্টারনেটে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এটি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদপত্র।

পেট্রোনাস টাওয়ার, পেনাং, লংকাওয়ে , গেনটিং হাইল্যান্ড, বাতু কেভ, মালাকা।যেহেতু একটি বহুজাতিক দেশ, তাই তাদের খাওয়া-দাওয়া, চাল-চলন ও পোশাক-আশাকে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের মধ্যে অসম্ভব সহনশীলতা দেখা যায়। কারণ, চাইনিজ কমিউনিটি যে পোশাক পরে রাস্তাঘাটে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, তা পশ্চিমা দেশগুলোতেও আজকাল সাধারণত দেখা যায় না। অথচ মুসলিম ছেলেমেয়েরা তাদের ধর্মীয় ও শালীন পোশাক পরেই সব খানে চলছে। অনেক মুসলিম মেয়ে শালীন পোশাক ও মাথায় স্কার্ফ পরেই হোটেল-রেস্টুরেন্ট, দোকান ও অফিস-আদালতে কাজকর্ম করছেন। অন্য দিকে চাইনিজ মেয়েরা মিনি প্যান্ট পরে রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছেন।

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...