সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

ওমান

 


 

আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দেশ ওমান।।দেশটির সরকারি নাম ওমান সুলতানাত এবং ওমানের রাজা সুলতান উপাধি ব্যবহার করেন।পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত দেশটি ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থলভাগে উত্তর-পশ্চিমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়েমেন। ইরান ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমুদ্রসীমা রয়েছে দেশটির।ওমানের সবচেয়ে উত্তরের অংশ মুসান্দাম উপদ্বীপ হর্মুজ প্রণালীর দক্ষিণ তীর গঠন করেছে। পারস্য উপসাগরে ওমানের কয়েক কিলোমিটার তটরেখা আছে। এটি একটি মরুময় দেশ, যেখানে সুউচ্চ পর্বতমালার ঠিক পাশেই রয়েছে উজ্জ্বল শুভ্র বালুর সমুদ্র সৈকত।

রাজধানীঃ মাসকাত ওমানের রাজধানী এবং বৃহত্তম নগর।

আয়তনঃ ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার । আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ৭০ তম বৃহত্তম দেশ।

জনসংখ্যাঃ ৪৬ লাখ, যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিদেশী নাগরিক। এরা মূলত ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইরান থেকে আগত বিদেশী।

ধর্মঃ দেশটির প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। বিশেষ করে এখানে সংখ্যালঘু মুসলমান গোত্র ইবাদি জাতির লোকেরা বাস করে।

ভাষাঃ আদর্শ আরবি ভাষা ওমানের সরকারি ভাষা। আনুষ্ঠানিক ও সরকারি কর্মকাণ্ডে কথ্য ও লিখিত ভাষা হিসেবে আদর্শ আরবি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় স্থানীয় আরবি উপভাষাগুলিই বেশি ব্যবহৃত হয়।

মুদ্র : রিয়াল।

জাতিসংঘে যোগদান : ৭ অক্টোবর ১৯৭১।

ইতিহাসঃ সপ্তদশ শতাব্দীতে ওমান শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল। পর্তুগাল ও ব্রিটেনের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলত তারা। উনবিংশ শতাব্দীতে তাদের প্রভাব পাকিস্তান ও ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রভাব কমতে শুরু করে। সালতানাতের ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছায়া দেখা দেয়।ঐতিহাসিকভাবেই মাসকাট পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য বন্দর। দেশটির রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং রাজতন্ত্র প্রচলিত সেখানে। ওমানের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্রের কাঠামোতে সংঘটিত হয়। ওমানের সুলতান হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারের প্রধান। ওমানের সুলতানেরা বংশানুক্রমে ক্ষমতায় আসেন।

ইসলামের আগমন-

ওমানে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক ইরাকের বসরা থেকে পালিয়ে আসার পরে ইবাদ সম্প্রদায় এই অঞ্চলে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কার্যত অধিকাংশ ওমানিরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী; যাদের তিন-চতুর্থাংশ আবদ-আল্লাহ ইবন ইবাদের ইবাদি নিয়ম অনুসরণ করে। ইবাদি মতবাদ বা ইবাদি আন্দোলন হল ইসলামের একটি ক্ষুদ্র মাযহাব। তারা কোন একসময় খারেজীদের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে অনেক ঊদার এবং ক্রমান্বয়ে অন্য মুসলিমদের নিকটবর্তী হচ্ছে। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এর উৎপত্তি সন্ধান করতে গিয়ে একে খারিজি আন্দোলনের একটি মধ্যপন্থী ধারা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমসাময়িক ইবাদিরা তাদের খারিজি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার তীব্র বিরোধিতা করেন, যদিও তারা স্বীকার করেন যে তাদের আন্দোলন ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের খারিজি বিদ্রোহ থেকে উৎপত্তিলাভ করেছে। তাদের মধ্যে নিরপরাধ ব্যক্তি যাদের মুসলিম পরিচয়েই মুখ্য, এবং যে কোন অবস্থায় মুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে আসে, এবং দলাদলি না করে আহলে সুন্নাতুয়াল জামাতের ইমামের পিছনে নামাজ পড়া দোষনীয় মনে করে না; তারাও ভিন্ন দলভুক্ত নয়। ইবাদিরা সুন্নি বা শিয়া পন্থার অন্তর্ভুক্ত নয়। এর আবির্ভাব ইবাদি আন্দোলন থেকে। এই আন্দোলন মহানবীর ইন্তেকালের ২০ বছর পর শুরু হয় যা সুন্নি ও শিয়া মতবাদের চেয়েও প্রাচীন। আব্দুল্লাহ ইবন ইবাদ আল-তামিমিকে এই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। কিন্তু এই মাযহাবের অনুসারীরা দাবি করেন যে এর প্রতিষ্ঠাতা জাবির ইবন জাইদ আল-আজদি। এই মতবাদের ওপর খারিজিদের প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়।ইবাদিরা নিজেদের মুসলমান বা সরলতার লোক বলে উল্লেখ করেন। ইবাদিরা ওমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী। এছাড়া আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে এর অস্থিত্ব রয়েছে। ওমানের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অফিসিয়াল সংস্করণ হলো ইবাদিজম।

সরকার ব্যবস্থা –

দেশটিতে কোনো সংবিধান নেই। চরম রাজতন্ত্র বিদ্যমান। সুলতানই দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কোনো রাজনৈতিক দলও নেই ।নেই জনগণের ভোটাধিকার। বর্তমানে হাইসাম ইবন তারিক আস-সাইদ দেশটির সুলতান এবং তাকে সহায়তা করার জন্য একটি মন্ত্রিসভা আছে।২০০৩ সালের অক্টোবরে প্রায় ২ লক্ষ ওমানি প্রথমবারের মত আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করে। মোট ৮৩জন সদস্য নির্বাচিত হন এবং এদের মধ্যে ২জন মহিলা সদস্যও ছিলেন।

প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ-

মাছকাট,নিঝুয়া ,সোহার ,দুখুম ,সালালাহ ,ইব্রি ,রুস্তাক ,হাইমা

সুলতান কাবুস

ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাঈদ আল সাঈদ প্রায় ৫০ বছর ওমানের সুলতান হিসাবে দেশটি শাসন করেনসুলতান কাবুস ১০ জানুয়ারি ২০২০ ৭৯ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। ১৯৩২ হতে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ওমানের শাসক ছিলেন সুলতান কাবুসের পিতা সাঈদ বিন তাইমুর। প্রজারা বিদ্রোহ করতে পারে এ ভয়ে সুলতান তাদের শিক্ষা, বিদেশ গমন, ও বিলাসিতার ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং যাবতীয় অর্থ নিজের ভান্ডারে জমা রাখতেন। এমনকি তার আপন পুত্র কাবুসকে তিন বছর বন্দী করে রেখেছিলেন সাঈদ বিন তাইমুর। সুলতান কাবুস ১৯৪০ সালের ১৮ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রাদেশিক রাজধানী সালালাহে কয়েক বছরের পুরনো আল-সাঈদ রাজপরিবারে তাঁর জন্মতিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সালালাহ ও ভারতের পুনেতে লাভ করেছেন। পুনেতে তিনি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মার ছাত্র ছিলেন। ১৬ বছর বয়সে কাবুস ইংল্যান্ডে পড়াশোনার জন্য যান।স্যান্ডহাস্ট রয়েল সামরিক অ্যাকাডেমি থেকে ১৯৬২ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন ।পরে ব্রিটিশ পদাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে জার্মানিতে চলে যানতিনি জার্মানিতে এক বছর দায়িত্ব পালন করেন।

সালালাহতে ফিরে আসার পর তিনি ইসলাম এবং দেশের ইতিহাসের উপর পড়াশোনা করেছেন।তাঁর বাবা সুলতান সাঈদ বিন তাইমুরের কড়া নজরদারি থেকে বাঁচতে অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন কাবুস। ১৯৭০ সালে ২৩ জুলাই ২৯ বছর বয়সে কাবুস ব্রিটিশ সৈন্যদের সহায়তায় এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে তাঁর বাবা সাঈদ বিন তাইমুরকে সরিয়ে ওমানের সুলতান হন।

এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা শাসক হন ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাঈদ আল সাঈদ।১৯৭৬ সালে সুলতান কাবুস বিয়ে করেন। কিন্তু সেই বিয়ে বেশিদিনটিকেনি। তিনি পুনরায় বিয়েও করেননি, যার কারণে তার কোনো সন্তান নেই। এমনকি তিনি পিতার একমাত্র সন্তান হওয়ায় তার কোনো উত্তরসূরিও নেই।ক্ষমতায় আসার পর সুলতান কাবুস একাধারে সুলতান, প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিজের হাতে নেন। ১৯৯৬ সাল থেকে মৌলিক আইনসহ সকল আইন ১৯৭০ সালের রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে প্রচলিত হয়ে আসছে। সুলতান বিচারকদের নিয়োগ করেন এবং সাজা রদ বা হ্রাস করতে পারেন।সুলতান কাবুস ক্ষমতা গ্রহণের পর ওমানে মাত্র ১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং তিনটি স্কুল ছিল। সুলতান কাবুস তখন ঘোষণা করেন, দেশটির তেল সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের আধুনিকায়ন করবেন।তিনি এরপর ওমানকে প্রায় অবকাঠামোহীন দেশ থেকে একটি আধুনিক দেশে রূপান্তর করেছেন।

১৯৮৬ সালে কাবুস বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।ওমানের সদ্য প্রয়াত সুলতান কাবুস সাবেক আরব উপদ্বীপটিকে একটি পশ্চাৎপদ অবস্থা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছিলেন। নিজের সালতানাতকে তিনি যেমন আঞ্চলিক উত্তেজনা থেকে দূরে রাখছিলেন, তেমনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল।সুলতান কাবুস কূটনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় বিভিন্ন সময় দেখিয়েছেন।২০১৩ সালে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনার সূত্রপাত করাতে ভূমিকা রাখেন সুলতান কাবুস।তাঁর প্রচেষ্টাতেই ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরমাণু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।ইয়েমেনের যুদ্ধ বন্ধ করতেও তিনিই আলোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন।হরমুজ প্রণালীর তীরে ও দুই চির বৈরী ইরান-সৌদি আরবের মাঝে কৌশলগত অবস্থান নেয় ওমান। কিন্তু দুই দেশের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল কাবুসের।সুলতানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল ইরানে। বিচ্ছিন্ন দোফার অঞ্চলে উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে পাওয়া মার্ক্সবাদী বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হন তিনি।সুলতান কাবুস ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী, জর্ডানের বাদশাহ হুসাইন বিন তালাল, ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্সেস ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর সহায়তা বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন।১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হবার পরেও পূর্বের সম্পর্ক টিকে আছে।এছাড়া সৌদি আরব ছাড়াও আরব উপসাগরীয় বাকি ছয় দেশের সঙ্গে কাবুসের ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না, এই নীতিতে তিনি অটল ছিলেন।২০১১ সালের আরব বসন্তেও তাঁকে খুবই কম বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ মন্ত্রীদের বরখাস্ত করেই সেই বিক্ষোভ প্রশমিত করতে সক্ষম হন তিনি।২০১৫ সালে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নেয়নি ওমান। এতে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীদের মধ্যে বন্দিবিনিময়ে সহায়তা করতে পেরেছেন কাবুস।ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সামরিক প্রধানসহ পশ্চিমা ও আরব কূটনীতিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন কাবুস।ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে দেশটি।২০১৮ সালের অক্টোবরে মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন কাবুস। এতে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। আগেই বলেছি ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ওমানেও কিছু অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেশটিতে বড় ধরণের কোন বিক্ষোভ হয়নি।ওমানের বিভিন্ন জায়গায় হাজার-হাজার মানুষ ভালো মজুরির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।নিরাপত্তা বাহিনী প্রথম দিকে সে বিক্ষোভের প্রতি কিছুটা নমনীয় ভাব দেখিয়েছিল।কিন্তু পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এবং তাজা গুলি ছুঁড়েছে। তখন দুজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়। বেআইনি সমাবেশ এবং সুলতানকে অপমান' করার অভিযোগে শতশত মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।তখন থেকে কর্তৃপক্ষ সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে দেয়। বিরোধীদের জন্য কোন জায়গা রাখেনি তার সরকার। স্বাধীন আজ্জাম পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে তার সম্পাদককে কারাগারে পাঠান।মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তখন বিভিন্ন বই বাজেয়াপ্ত এবং মানবাধিকার কর্মীদের হয়রানিও করা হয়।আধুনিক ওমান রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে সুলতান কাবুস তাঁর নেতিবাচক কাজগুলো ছাপিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ওমানের জনগণ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি প্রিয় মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ভূগোল

ওমান আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব চতুর্থাংশে অবস্থিত। ওমানের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা মরুভূমি, ১৫% পর্বত এবং মাত্র ৩% উপকূলীয় সমভূমি। বেশির ভাগ লোকালয় সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত।

ওমান উপসাগর, আরব সাগর, এবং আর রাব আল খালি মরুভূমি ওমানকে বাকি সব দেশ থেকে পৃথক করে রেখেছে।

অর্থনীতি

ওমানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ দেশটির উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত আল হাজর পর্বতমালা। ৩০১০ মিটার উঁচু জেবেল শামস এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সোহার ও মাস্কটের মধ্যবর্তী স্থানে ওমান উপসাগরের উপকূল ধরে রয়েছে বিস্তৃত সৈকত, যেগুলিতে ডাইভিং, পানির নিচে ডুব দেওয়া, এবং ডলফিন ও কচ্ছপদের সাথে খেলার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও পক্ষীপ্রিয় মানুষদের জন্যও ওমান জনপ্রিয়। এখানে স্থানীয় প্রায় ৮০ প্রজাতির এবং অতিথি প্রায় আরও ৪০০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অতিথি পাখিরা নির্দিষ্ট ঋতুতে ওমানে ফিরে ফিরে আসে। ওমানের মরুভূমি এর বিশালাকার বালিয়াড়িগুলি ঘুরে দেখতেও অনেকে পছন্দ করেনওমানের চুনাপাথরের পাহাড়ী গুহাগুলিও বিখ্যাত। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গুহা মাজলিস আল জিন এখানে অবস্থিত।

সংস্কৃত

ওমানের পুরুষেরা সাধারনত নিজেদের কাধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত দীর্ঘ হাতা দিয়ে এক প্রকার জামা পরিধান করে যাকে ডিশডশা বা বাংলায় আমরা জুব্বা বলে থাকি।নারীরা সকালেই মাথা থেকে পা এর গোড়ালি পর্যন্ত সকল অঙ্গ ঢাকা কালো কাপড়ের আবাইয়া বা জাকে আমারা বোরকা বলে থাকি সেটি পরিধান করে।

সমুদ্রগামী দেশ হওয়ায় ওমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হ'ল ধাও (যেটাকে পাল তোলা নৌকা বলা হয়ে থাকে) । এই নৌবহর গুলো শত শত বছর ধরে আরব উপদ্বীপ, ভারত এবং পূর্ব আফ্রিকা বরাবর ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে, ওমানি ধাও প্রাচীনতম ব্যবহারের বিষয়টি অষ্টম শতাব্দীতে চীন পৌঁছেছিল। আধুনিক দিনের ব্যবহারে এই ধাও গুলো বাণিজ্য, পর্যটন এবং মাছ ধরার লক্ষ্যে কাজ করে এবং ওমানের উপকূলরেখার পাশেই এগুলি দেখা যায়।

শিক্ষা-

প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাক্ষরতার হার ২০১০ সালে ছিল ৮৬.৯%।১৯৭০ সালের আগে দেশে ৩টি মাত্র স্কুল এবং তাতে ১০০০জন মত ছাত্র ছিল। সুলতান কাবুস এর সময় থেকে শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে। বর্তমানে ১০০০টি স্কুল এবং সেগুলোতে প্রায় ৬৫০,০০০জন ছাত্র ছাত্রী আছে। ওমানের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৬সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

যোগাযোগব্যবস্থা-

ওমান এয়ার হচ্ছে ওমানের জাতীয় বিমানসংস্থা, যা মাস্কাট এর সীব এ মাস্কাট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে অবস্থিত৷ বিমানসংস্থাটি অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিমান পরিচালনা করে থাকে এবং একই সাথে আঞ্চলিক এয়ার ট্যাক্সি এবং চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে৷ এয়ারলাইনটি দ্বারা পরিচালিত বিমানসমূহের প্রধান কেন্দ্রস্থল হচ্ছে মাস্কাট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট৷ ওমান এয়ার আরব এয়ার ক্যারিয়ার্স অর্গানাইজেশন এর একজন সদস্য৷

তেল

ওমান তেলসম্পদে সমৃদ্ধ। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান বিশ্বে ২৫তম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। এ ছাড়া দেশটি মাছ, খেজুর ও কিছু কৃষি পণ্যও রপ্তানি করে। যদিও তাদের প্রতিবেশী দেশগুলো এখনো প্রধানত তেলের ওপর নির্ভর করে চলে।

পর্যটন

দেশটির রাজধানী মাস্কাটের কাসর আল আলম স্ট্রিটে রয়েছে পর্তুগিজদের তৈরি দু’টি দুর্গ-আল জালালি দুর্গ এবং আল মিরানি দুর্গ। এই দুর্গ দু’টির মাঝখানে অবস্থিত “কাসর আল আলম” রাজপ্রাসাদ। নীল আর সোনালি স্তম্ভের অনিন্দ্যসুন্দর এই প্রাসাদটি ওমান সালাতানাতের বর্তমান সুলতান কাবুসের অফিস।তবে মাসকাট শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক সম্ভবত সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ। মাসকাটের পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতান কাবুসের শাসনামলের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত হয়। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এর মেঝেতে বিছানো পার্সিয়ান কার্পেটটি। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্পেট। ওমানে বহু বিদেশীর বাসকর্মী।

কৃষিঃ

দেশটির শতকরা ১ ভাগেরও কম জায়গা কৃষিকাজের উপযোগী। এর বেশিরভাগই খেজুরবাগান। খেজুর ছাড়াও টমেটো, তরমুজ এবং কলার চাষ হয় এদেশে। দেশের ভেতরে কোনও নদী বা খাল নেই।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...