বাহরাইন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দ্বীপ
রাষ্ট্র। বাহরাইন পারস্য উপসাগরের পশ্চিম অংশের ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর পূর্বে
কাতার ও পশ্চিমে সৌদী আরব। সবচেয়ে বড় দ্বীপটিও বাহরাইন নামে পরিচিত এবং এতে
দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী অবস্থিত। বাহার শব্দের অর্থ সাগর আর বাহরাইন হচ্ছে
দু'টি সাগর। এটি একটি দ্বীপ রাষ্ট্র এর
চারদিকে সাগর। উপসাগরের দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনে প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া যায়।
শোধনাগারও তারাই প্রথম তৈরি করে।
রাজধানী মানামা
আয়তন : মোট ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার।আয়তনের দিক
দিয়ে এটি বিশ্বের ১৭৪ তম দেশ। মালদ্বীপ ও সিঙ্গাপুরের পরে এটি এশিয়ার তৃতীয়
ক্ষুদ্রতম দেশ।
জনসংখ্যাঃ ১৪ লাখ ৫০ হাজার ।
ধর্মঃ ৭০% মুসলমান। একইসাথে খ্রিস্টান
ধর্মের ১৫ শতাংশ এবং হিন্দু ধর্মের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের বাস এদেশে। মুসলমানদের
মধ্যে প্রায় ৭০% শিয়া মতাবলম্বী।বাকীরা সুন্নী।আরব বিশ্বের যে ৩ টি দেশে শিয়া
জনপ্রাধান্য আছে তার একটি এটি অপর দুটি ইরান ও ইরাক । তবে সুন্নীরা বাহরাইনের
সরকার নিয়ন্ত্রণ করেন।অমুসলিম বিদেশীদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন মতাবলম্বী
ছাড়াও হিন্দু, বাহাই,
বৌদ্ধ, শিখ, ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী আছে।
ভাষা আরবি ভাষা বাহরাইনের সরকারি ভাষা।
এছাড়াও এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলিতে ফার্সি ভাষা, উর্দু ভাষা, এবং হিন্দি ভাষা বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য এবং পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি
পাচ্ছে।
বাহরাইনের সরকারী মুদ্রা বাহরাইনি দিনার।
ইতিহাস
বর্তমান বাহরাইন অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগে
দিলমুন নামক সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। ৫ হাজার বছর আগেও বাহরাইন সিন্ধু অববাহিকা ও
মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ অব্দের দিকে ভারত থেকে বাণিজ্য আসা
বন্ধ হয়ে গেলে দিলমুন সভ্যতার পতন ঘটা শুরু করে। ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে
আসিরীয় রাজার বাহরাইনকে ক্রমাগত নিজেদের বলে দাবী করতে শুরু করে। ৬০০
খ্রিস্টপূর্বাব্দের কিছু পরে দিলমুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের
অধীনে চলে যায়। এরপর অনেক দিন যাবৎ বাহরাইনের কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না।
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে পারস্য উপসাগরে মহাবীর আলেকজান্ডারের পদার্পণ ঘটলে আবার এর
হদিস পাওয়া যায়। যদিও আরব গোত্র বনি ওয়াএল এবং পারসিক
গভর্নরেরা অঞ্চলটি শাসন করতেন, খ্রিস্টীয়
৭ম শতক পর্যন্তও এটি গ্রিক নাম তিলোস নামে পরিচিত ছিল। ঐ শতকে এখানকার অধিবাসীরা
ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। ৭ম শতক থেকে বিভিন্ন পর্বে এলাকাটি সিরিয়ার উমাইয়া
বংশীয় খলিফাগণ, বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাগণ শাসন করেন।
পর্তুগিজরা ১৫২১ সালে এটি দখল করে এবং পরে পারসিকরা এটি ১৬০২ সালে জয় করে। শেষ
পর্যন্ত বনি উতবাহ গোত্রের আল খালিফা পরিবার ১৭৮৩ সালে ইরানীদের কাছ থেকে অঞ্চলটি
দখল করে এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত তারা বাহরাইনের শাসক।১৮৬১ খ্রিস্টাব্দেবাহরাইন কেব্রিটিশ
আশ্রিতরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাহরাইনে বড় আকারে খনিজ তেলের উৎপাদন শুরু
হবার কিছু পরেই ১৯৩৫ সালে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটিটি
বাহরাইনে নিয়ে আসা হয়।১৯৬৮সালে বাহরাইন কাতার ওবর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৬টিআমিরাতের
সাথে ব্রিটিশ আশ্রয় আরব আমিরাতের ফেডারেশন গঠন করে। কিন্তু বাহরাইন ও কাতার এই
ব্যবস্থা পছন্দ করেনি। তাই১৯৭১সালের ১৫আগস্ট বাহরাইন ফেডারেশন হতে বের হয়ে
স্বাধীনতা ঘোষণা করে।স্বাধীনতার পরে শেখ আমির উপাধি গ্রহণ করে এবং শেখ খলিফা
প্রধানমন্ত্রী হন।নতুন রাষ্ট্র বাহরাইনের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয় এবং ১৯৭৩
সালে প্রথম সংসদ নির্বাচিত হয়, কিন্তু
মাত্র দুই বছর পরে ১৯৭৫ সালে বাহরাইনের আমির সংসদ ভেঙে দেন, কেননা নির্বাচিত সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আল-খলিফা শাসনের অবসান এবং
মার্কিন নৌবাহিনীকে সেখান থেকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা করছিল।১৯৯০-এর দশকে বাহরাইনের
সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায়ের অসন্তুষ্টি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের আকারে
প্রকাশ পায়। এর প্রেক্ষিতে বাহরাইনের আমির প্রায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত, ১৯৯৫ সালে, বাহরাইনের মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন, এবং আইন পর্যালোচনাকারী কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ৪০-এ বৃদ্ধি করেন।
এর ফলে সংঘাতের পরিমাণ প্রথমে কিছু কমলেও ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে বেশ কিছু হোটেল ও
রেস্তোরাঁ-তে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে এবং এতে অনেকে নিহত হয়। পুলিশ প্রায় ১ হাজার
লোককে এর জের ধরে গ্রেফতার করে এবং কোন বিচার ছাড়াই এদের শাস্তি দেয়া হয়।
সম্প্রতি বাহরাইন সরকার এদের অনেককে ছেড়ে দিয়েছে।সাংবিধানিকভাবে রাজতান্ত্রিক এই
দেশে নির্বাচিত পরিষদ রয়েছে। তবে ইদানিং সুন্নিপ্রধান সরকারের কাছ থেকে আরো ক্ষমতা
দাবি করতে শুরু করেছে সংখ্যাগুরু শিয়ারা। অর্থাৎ শিয়া-সুন্নি বিরোধও রয়েছে
দেশটিতে। ২০১১ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সরকার তা শক্ত হাতে দমন
করে। দেশটিতে বাদশাহই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতেও বাদশাহর
কাছের লোকজনকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাহরাইনের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি সেখানেই
জন্ম-নেওয়া। এছাড়া বাহরাইনে শিয়া মুসলিমদের সংখ্যা সুন্নী মুসলিমদের প্রায়
দ্বিগুণ।
ইসরায়েলকে স্বীকৃতি
১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে ইসরায়েলকে চতুর্থ
আরব দেশ হিসেবে বাহরাইন স্বীকৃতি দেয়।মিসর,
জর্ডান ও
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর ইসরায়েলের সাথে চতুর্থ আরব দেশ হিসেবে বাহরাইনের পূর্ণ
কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত করল।বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এ-সংক্রান্ত চুক্তি
স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকেই
বেশিরভাগ আরব রাষ্ট্র এটিকে একটি দখলদার শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ফলে
স্বভাবতই এতোদিন ধরে ইসরায়েলকে বয়কট করে আসছিল তারা। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
প্রতিষ্ঠায় আরব দেশগুলো এতদিন ধরে প্রধান তিনটি শর্ত দিয়েছিল। সেগুলো হলো যুদ্ধের
সময় আরব দেশগুলোর দখল করা জমি ছেড়ে দেওয়া,
ফিলিস্তিন
রাষ্ট্র গঠন ও স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনের দখল করা জমি হস্তান্তর। সেই শর্তের কোনোটা
পূরণ না হওয়ার পরও আরব দেশগুলো ইহুদি রাষ্ট্রটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
রাজনীতি
বাহরাইনের রাজনীতি একটি সাংবিধানিক
রাজতন্ত্র কাঠামোতে সংঘটিত হয়। রাজা শাইখ হামাদ বিন ইসা আল খালিফা সরকার চালানোর
জন্য একজন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। বাহরাইনের আইনসভা দুই-কক্ষবিশিষ্ট। নিম্ন কক্ষের
সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। ঊর্ধ্বকক্ষ তথা শুরা কাউন্সিলের
সদস্যদের রাজা নিয়োগ দেন। বর্তমানে খালিফা ইবন সুলমান আল-খালিফা দেশের
প্রধানমন্ত্রী। রাজপুত্র শাইখ সালমান বাহরাইনের সেনাবাহিনীর কমান্ডার।
প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ
অর্থনীতি ১৯৩০-এর দশকে বাহরাইন পারস্য
উপসাগরের প্রথম দেশ হিসেবে তেল-ভিত্তিক অর্থনীতি গঠন করে, কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকেই এর সমস্ত তেল ফুরিয়ে যায়। তবে দেশটি এই
পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করেরেখেছিল এবং
দেশটির অর্থনীতি এখনও উন্নতি করে যাচ্ছে।
বাহরাইনের অর্থনীতি প্রধানত পেট্টোলিয়াম
উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রিফাইনিং এর উপর
নির্ভরশীল। এই খাত ৬০% রপ্তানিতে ও ৩০% জিডিপিতে অবদান রাখে। এদেশের শ্রমবাজারের ৫
ভাগের ৩ ভাগ দখল করে আছে বিদেশি শ্রমিকেরা। যোগাযোগব্যবস্থা ভাল হওয়ায় পারস্য
উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে সদরদপ্তর স্থাপন করেছে। পর্যটন
খাত অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এই খাত জিডিপিতে ৯% অবদান রাখছে। শুধুমাত্র ১% ভূমি
চাষযোগ্য হওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরা উৎপাদনে অক্ষম। তারা এক্ষেত্রে
আমদানির উপর নির্ভর করে। তাদের মাথাপিছু আয়ও অনেক বেশি। প্রায় ৫১,৯৫৬ মা.ডলার(২০১৭ অনুযায়ী)
সংস্কৃতি সঙ্গীত
বাহরাইনের সঙ্গীত অনেকটা এর প্রতিবেশী
রাষ্ট্রসমূহের মতই। খালিজি (Khaliji) , এক প্রকার
লোক সঙ্গীত সমগ্র বাহরাইন জুড়ে জনপ্রিয়। এছাড়া শহুরে ঘরানার সাওত (sawt) সঙ্গীতও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
আলি বাহার বাহরাইনের বিখ্যাত গায়কদের
মধ্যে একজন। Al Ekhwa (আরবি অনুবাদ- দ্যা ব্রাদার্স) তার সঙ্গীত
দলের নাম।
অ্যারাবস গট ট্যালেন্ট কর্তৃক ২০১১ সালে
নির্বাচিত ক্ষুদে সংগীত শিল্পী হালা আল তুরক বাহরাইনে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাহরাইন ছাড়াও
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়াও তার ইউটিউব মিউজিক ভিডিও
সমূহ খুবই জনপ্রিয়।
উল্লেখ্য,
পারসিয়ান
গালফ স্টেটস সমূহের মধ্যে বাহরাইনেই সর্বপ্রথম recording
studio স্থাপন করা
হয়।
পরিবহন
বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের তথা
দেশের প্রধান ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। এটি অন্যতম হাব বিমানবন্দর।
বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শহরের তথা
দেশের প্রধান ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য, বাহরাইন এবং সৌদি আরবের মধ্যে ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কিং ফাহাদ কজওয়ে
নির্মাণ শুরু করার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৪ সালে বাহরাইন সবচেয়ে
দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম তুলেছিল। পতাকাটির
দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৯.৫ মিটার এবং প্রস্থ ৯৭.১ মিটার।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন