রাজধানীঃ দোহা
আয়তনঃ ১১ হাজার ৫১৮
বর্গকিলোমিটার আয়তন।আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১৫৮ তম বৃহত্তম দেশ।বাংলাদেশের তুলনায়ও প্রায় ১৩ গুণ ছোট।
জনসংখ্যাঃ
প্রায় ২৬ লাখ ৪১ হাজার। কাতারে জনসংখ্যায় নারীর চেয়ে
পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি।
ধর্মঃ জনসংখ্যার প্রায়
৬৮ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে, ১৩.৮ শতাংশ খ্রিস্টধর্মে, ১৩.৮ শতাংশ হিন্দুধর্মে এবং ৩.১ শতাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী।
ভাষাঃ আরবি ভাষা
কাতারের সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় ৫৬% লোক আরবি ভাষাতে কথা বলেন। প্রায়
এক-চতুর্থাংশ লোক ফার্সি ভাষায় কথা বলেন। বাকীরা ভারতীয় উপমহাদেশের ও ফিলিপিন
দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য ভাষাতে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক কাজকর্মে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার
করা হয়।
মুদ্রার -রিয়াল।
প্রাগৌতিহাসিক কাল থেকে কাতারে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রত্নতত্তবিদ ডে কার্ডির মতে, কাতারে প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো। এখানের আবহাওয়া ছিলো বৃষ্টিবহুল, জলপ্রপাত, উচু ঘাস ও স্বচ্ছ পানির নালা ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আধুনিক ইতিহাসের জনক হেরাডোটাসের মতে, কাতারে 'কান্নানিয়ান' নামক জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস ছিলো। এরা মাছ ধরার মৌসুমে অস্থায়ী অভিযান করে মাছ শিকার করত। খ্রিঃপূঃ ৪৯৯-৪৪৯ অব্দে পারস্য ও প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যের যুদ্ধের রেকর্ড হতে এ তথ্য পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে কাতারের বিভিন্ন প্রত্নতত্ত যেমন, মাটির বাসন, চকমকি পাথর, পাথর কাটার যন্ত্র বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়, এ কাতারের পূর্ব উপকূল রাস আব্রুখের সাথে মেসোপটেমিয়ান আল উবায়েদ গোত্রের ব্যবসা ছিলো। পরবর্তিতে টলেমির মানচিত্রে কাতারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেখানে একে কাথারা ও এর একটি শহর কাদারা নামে দেখানো হয়।
ইসলাম পূর্ব যুগে কাতার
আরব উপ দ্বীপের অন্যান্য দেশের মতোই পারস্যের 'শাসানী' রাজবংশের অধিনস্থ ছিলো। পরবর্তিতে সপ্তম শতকে সমগ্র আরব উপ দ্বীপে
ইসলাম প্রসার লাভ করলে এ অঞ্চলও ইসলামের ছায়ায় চলে আসে। এ সময় বনু আমের বিন আবদ
উল কায়েস, বনু সা'দ বিন
যায়েদ মিনাহ বিন তামি্ম নামক বিভিন্ন গোত্রের বসবাস ছিলো। বর্তমান শাসক গোষ্ঠী
আল-থানি, আ্ল তামিমিরই একটি শাখা।হযরতমুহাম্মদ (সা)
দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে আলা আল হাদরামি কে প্রেরণ করেন ৬২৮ সালে। তখন
কাতার অঞ্চলে শাসন করছিল স্থানীয় বনু তামিম গোত্র। বনু তামিমের গোত্র প্রধান
মুনযির বি্ন সাওয়া আল তামিমি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য
গোত্রে ইসলাম প্রসারে ভূমিকা রাখেন। উমাইয়া (৬৬১-৭৫০ খ্রী) ও আব্বাসীয় (৭৫০-১২৫৮
খ্রী) আমলে দামেস্ক ও বাগদাদ কেন্দ্রিক ব্যবসা গড়ে ওঠে।
ষোড়শ শতকে কাতার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতার মুখে পড়ে। এ শতকের প্রথমার্ধ ছিলো মামলুকের অধিকারে। পরবর্তীতে মামলুকের প্রভাব কমে যাওয়ায় আরব অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয় উসমানীয় সালতানাত। এছাড়া, স্থানীয় শক্তি ছিলো হরমুজ। উসমানীয় সালতানাত মামলুককে সরিয়ে আরব অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ইরানের সাফাভি রাজবংশ উসমানীয় থেকে বাগদাদ দখল করে। একই সময় স্প্যানিশ- পর্তুগীজদের হাতে মুসলিম ইউরোপীয় শক্তি আল আন্দালুসের পতন হয়। পর্তুগীজ নৌ শক্তি বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তারে ছড়িয়ে পরে। এরা খুব অল্প সময়ে দূর্ধর্ষতার জন্য খ্যাতি অর্জন করে। ১৫০৯ সালে উসমানিয়া, মামলুক ও ভারতীয় মুসলিম রাজশক্তি মিলিত হয়ে পর্তুগীজদের দমনে শক্তি প্রয়োগ করেন। ইতিহাসে এটি তিন রাজার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে পর্তুগীজ দের নৌবহরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে।কাতার ও ব্রিটিশ চুক্তি ১৮৬৮ সালে ব্রিটিশ – আল থানি চুক্তির মাধ্যমে জন্ম লাভ করে আধুনিক কাতারের। ১৮৬৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে লুইস পেলি আল ওয়াকরায় মুহাম্মাদ আল থানি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হন। ১২ সেপ্টেম্বর ১৮৬৮ সালে মুহাম্মদ বিন থানি চুক্তিবদ্ধ হতে সম্মত হন। বিষয় গুলো ছিলোঃ ১। দোহায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান করা। ২। সমুদ্রে অশান্তি সৃষ্টি হতে বিরত থাকা। ৩। যে নিজেদের ও প্রতিবেশীর মাঝে সৃষ্ট যে কোন ধরনের সমস্যায় ব্রিটিশদের ফয়সালা গ্রহণ করা। ৪। বাহরাইনের তৎকালীন আমীর আলি বিন খলিফার সাথে সুসম্পর্ক রাখা। ৫। বাহরাইনের পূর্ববর্তী আমির মোহাম্মদ বিন খলিফাকে কাতারে পাওয়া গেলে তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়া।দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ আছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯শ শতকের শেষভাগ থেকে আল-থানি গোত্রের লোকেরা কাতার অঞ্চলটিকে একটি আমিরাত হিসেবে শাসন করে আসছে। ১৯৭১ সালে এটি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।কাতারের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। কাতারের আমীর হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান তামিম বিন হামাদ আল থানি ২০১৩ সালে তার পিতা হামাদ বিন খলিফা আল থানির হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সাল থেকে দেশটির আমীর ছিলেন হামাদ বিন খলিফা আল থানি। ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি দেশটির প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ বিন নাসের বিন খলিফা আল থানি এর পদত্যাগের পর ৬ষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খালিদ বিন খলিফা বিন আব্দুল আজিজ আল থানি। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্তও এটি একটি তুলনামূলকভাবে দরিদ্র দেশ ছিল। ঐ সময় দেশটিতে পেট্রোলিয়ামের মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং এগুলি উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির একটি। কাতারের নাগরিক সুযোগ সুবিধার মান খুবই উন্নত। আরব উপদ্বীপের মত কাতারও একটি উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরু এলাকা। এখানে ভূ-পৃষ্ঠস্থ কোন জলাশয় নেই এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের সংখ্যাও যৎসামান্য।
প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ
-দোহা (রাজধানী দোহা'র সাথে যুক্ত আল রাইয়ান ও দায়্যান মিউনিসিপ্যালিটি) আল ওয়াকর্যা ,আল খোর ,দায়্যান , আল রাইয়ান , মিসাইড ,দোক্ষান ,আল সামাল ।
২০১৭ সালের জুনে উপসাগরীয় দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, মিসর, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কাতারের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে।দোহার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনে কাতারের ওপর স্থল, নৌ ও আকাশ পথে অবরোধ আরোপ করে দেশ গুলি। অবরোধ আরোপ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পর তা প্রত্যাহারে কাতারকে ১৩টি শর্ত দেয় তারা । এসব শর্তের মধ্যে ছিল আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক বন্ধ, তুর্কি বাহিনীকে কাতার থেকে বহিষ্কার, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ। শর্ত মানতে অস্বীকার করে কাতার জানিয়ে দেয়, এসব পদক্ষেপ দোহার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তিন বছর আগে সৌদি ও আরব আমিরাতের নেতৃত্বেকাতারের ওপর আরোপ করাঅবরোধ দোহাকে কাবু করতে পারছে না। যে উদ্দেশ্যে এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল, সেটিও থাকছে নাগালের বাইরে। কাতারকে আঞ্চলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার বদলে এই অবরোধ উল্টো তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছে।সৌদি হুমকি উপেক্ষা করে ইরান, তুরস্ক ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করে কাতার। দেশটিতে বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নামে তৈরি তুর্কি ঘাঁটিতে থানি সরকারের সমর্থনে কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান। দেশটিতে তুরস্ক ও ইরান জরুরি খাদ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী পাঠিয়ে পাশে দাঁড়ানোয় সৌদি জোটের অবরোধ ভেস্তে যায়। ওমান ও কুয়েতও অবরোধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়নি। কাতারের বন্দর ও বিমানবন্দরে খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের সরবরাহে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতির সৃষ্টি হয়নি। ২০১৭ সালের জুন থেকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের (বাহরাইন ও মিসরসহ) আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজের জন্য। কেবল আকাশসীমা নয়, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিকসহ সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয় এই জোট। তাই তখন বাধ্য হয়ে কাতার এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজগুলো ব্যবহার করছে ইরানের আকাশসীমা। আর এ কারণে ইরান কাতারের কাছ থেকে পাচ্ছে বার্ষিক ১৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আল জাজিরা আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল।আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক মালিকানাধীন এবং কাতারের দোহা সদর দফতর থেকে সম্প্রচারিত একটি সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল। আল জাজিরা চ্যানেল কাতার সরকার মালিকানাধীন। স্যাটেলাইট চ্যানেলটি আরবি ভাষার টেলিভিশন স্টেশন এর সাথে অরবিট কমিউনিকেশন কোম্পানির একটি যৌথ উদ্যোগে ১লা নভেম্বর ১৯৯৬ সালে উদ্বোধনকরা হয়ে।প্রাথমিকভাবে এটি আরবি ভাষায় চালু হলেও বর্তমানে স্যাটেলাইট চ্যানেলটি টিভি চ্যানেল হিসেবে আল জাজিরা থেকে একাধিক ভাষায় ইন্টারনেট এবংটিভি চ্যানেল সহ বিশ্বের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রসারিত হচ্ছে। আল জাজিরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের চার দেশ আল-জাজিরা টিভির সম্প্রচার বন্ধের শর্ত দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণমাধ্যমে আল জাজিরা। আল-জাজিরা সৌদি আর মিশরের মতো কট্টর রক্ষণশীল শাসকদের শত্রু হয়ে গেছে। ওইশাসকরা চায় না রাজতন্ত্রের শাসিত জনগণ রাজতন্ত্রের সমালোচনা করা সংবাদ দেখুক। প্রথম দিকে চ্যানেলটি নির্ভীক প্রতিবেদন, উত্তপ্ত বিতর্ক ও আরব অঞ্চলের স্বৈরাচারী শাসকদের বিষয়ে ঢালাও আলোচনা করে অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করেছিল। ২০১১ সালে ‘আরব-বসন্ত’ নামে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে যুগান্তকারী বৈপ্লবিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহের অসাধারণ কাভারেজ দেওয়ায় এরই মধ্যে চ্যানেলটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।এছাড়া, কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে সংঘটিত আরব বসন্তের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ঘটনাপ্রবাহের ওপর চ্যানেলটির কাভারেজ বিশ্বের কোটি কোটি উৎসুক সংবাদশ্রোতা এবং দর্শকের মনোযোগ কাড়ে। মিসরে ‘বিপ্লবের’ সময় আল জাজিরার ওয়েবসাইটে ঢোকার পরিমাণ বা ট্রাফিক বেড়ে গিয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ শতাংশ! ওই সময় কায়রোতে থাকা চ্যানেলটির অফিসে লুটতরাজ চালিয়েছিল সরকারি বাহিনী। আর তাহরির স্কয়ারে শোনা যাচ্ছিল ‘লং লিভ আল জাজিরা’ স্লোগান।চ্যানেলটি লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের ওপরও সবার আগে সবচেয়ে বেশি সংবাদ সরবরাহের কৃতিত্ব দেখিয়েছে। লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি ধরা পড়া ও নিহত হওয়ার খবর ও ছবি সবার আগে বিশ্ববাসীকে আল জাজিরাই দিয়েছিলো। আরব বসন্ত ঘিরে চ্যানেলটির সংবাদ পরিবেশনের ধরন একটি সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি করে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে চ্যানেলটি। ওই সময় এটি ছিল এসব তথ্যের একটি প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তারা সাদ্দাম হোসেনকে ‘স্বৈরাচারী’ হিসেবে অভিহিত করেছিল, আবার ইসরায়েলের বিভিন্ন খবরও সম্প্রচার করত। এটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইসলামপন্থী ও আরব জাতীয়তাবাদীদের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। অর্থনৈতিক সঙ্কটে নিপতিত ইউরোপের রাজপথে জনতার বিক্ষোভের পাশাপাশি জাপানের সুনামির বিপর্যয়কর ঘটনাবলীও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। এসব ঘটনার প্রতি মুহূর্তের খবর পরিবেশন করার জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলো আল জাজিরা।
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ কাতার। ছোট এ দেশটিতে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুতের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। ২০১২ সালে, কাতার বিশ্বের তৃতীয়বারের জন্য (মাথাপিছু আয় অনুসারে) শীর্ষে থাকা দেশটির খেতাব অর্জন করে। ২০১০ সালে প্রথম লুক্সেমবার্গকে পেছনে ফেলেছে। ২০১২ সালে কাতারের জিডিপি ১৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে এবং জানা যায় যে গ্যাস রফতানি ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে এটি সর্বকালের উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে কাতারের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুসম্পর্ক।মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের বন্ধুপ্রতিম দেশ কাতারে ১৯৭৩ সাল থেকে জনশক্তি রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে ৪ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত আছেন সেখানে। যাদের অধিকাংশই নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত। কাতারে বিপুল পরিমাণ জনশক্তি রপ্তানী করে বাংলাদেশ। সরকারি হিসাব বলছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট জনশক্তি রপ্তানির ২২ শতাংশের গন্তব্যস্থল ছিল কাতার। দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিন্সের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। কাতার চ্যারিটির বাংলাদেশে স্কুল, এতিমখানা এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে।২০১৪ সালে দোহায় বাংলাদেশ-কাতার মহিলা সমিতি গঠন করা হয়েছিল।দেশটির বিভিন্ন মসজিদের মুয়াজ্জিন ও ইমামদের বড় অংশ বাংলাদেশি। দেশটির ২ হাজার ৪শ’র মতো মসজিদে প্রায় ১ হাজার ৩শ’ বাংলাদেশি ইমাম ও মুয়াজ্জিন কর্মরত। কাতারিদের কাছে মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি ইমাম-মুয়াজ্জিন বেশ সম্মানিত।
দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ সত্তরের দশকে শেল কোম্পানি দেশটির সবচেয়ে বড় সম্পদ আবিষ্কার করে: ‘দ্য নর্থ ফিল্ড’, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র!এই প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্তও এটি একটি তুলনামূলকভাবে দরিদ্র দেশ ছিল। ঐ সময় দেশটিতে পেট্রোলিয়ামের মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং এগুলি উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির একটি।গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে প্রচুর সম্পদ কিনেছে কাতার। কয়েকমাস আগে কাতারের অর্থমন্ত্রী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাজ্যে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫ থেকে ৫১ বিলিয়ন ডলারের মতো। শুধু তাই নয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরও ৫ বিলিয়ন পাউন্ডের মতো সম্পদ ক্রয়ের ইচ্ছা রয়েছে দেশটির।বিশ্বে ইসলামপন্থীদের প্রথম মানসম্পন্ন টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরা কিন্তু কাতারের। প্রতিষ্ঠানটির করা সর্বশেষ ‘ক্রুসেড সিরিজটা’ বিশ্বে আলোড়ন ফেলেছে। এ ছাড়া খেলাধুলার জনপ্রিয় চ্যানেল ‘বিএন’ও তাদের। ফুটবল ক্লাব পিএসজির নাম তো আপনারা অবশ্যয় শুনেছেন। এই ক্লাবটির মালিকও কিন্তু কাতার।এই দেশেই ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে।বর্তমানে বিশ্বে কাতার এয়ারওয়েজ বিমান ভ্রমণের জন্য শ্রেষ্ঠ এয়ারলাইন্স। হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি ২০১৪ সালে তৈরি হয়েছিল। প্রতিবছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন যাত্রীকে পরিচালনা করার ক্ষমতা রয়েছে এই বিমানবন্দরটির। হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বের নবম বৃহত্তম। কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত দা এস্পায়ার টাওয়ার এই দেশের সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং। কাতারে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন হয়। যার অন্যতম প্রধান কারন এই দেশে কোন বনভূমি নেই। বিশ্বে কোন বনভূমি নেই এইরকম দেশের সংখ্যা মোট ৪ টি। যার বাকি ৩ টি দেশ হলও সান মারিনো, গ্রীনল্যান্ড এবং ওমান।দেশটি পেট্রোলিয়াম রফতানিকারী সংস্থাগুলির (ওপেক) সদস্য রাষ্ট্র ছিল, ১৯৬১ সালে যোগদান করে এবং ২০১৯ এর জানুয়ারী মাসে বের হয়ে যায়।
কাতারের রাজধানী দোহা পরিণত হয়েছে ইসলামী শিল্পের অনন্য জাদুঘরে। জাদুঘরটির নকশা করেছেন স্থপতি আই. এম. পাই। ইসলামি শিল্পের যাদুঘরের মূল ভবনের পেছনে একটি ২৮০,০০০ বর্গমিটার বিশিষ্ট পার্ক রয়েছে। পাঁচতলা বিশিষ্ট এই জাদুঘরে রয়েছে একটা উপহারের দোকান, পাঠাগার, শ্রেণীকক্ষ এবং একটি ২০০-আসন বিশিষ্ট থিয়েটার। নামাজ পরা ও ওজু করার জন্য জাদুঘরে রয়েছে বিশেষ স্থান। এছাড়া জাদুঘরে আছে রেস্টুরেন্ট, যেখানে আরবি খাবারের পাশাপাশি ফরাসি, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাবার পাওয়া যায়।জাদুঘরটির স্থাপত্য প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য দ্বারা প্রভাবিত। তথাপি এর রয়েছে অনন্য স্থাপনাশৈলী। এই স্থাপনা শৈলীর ভবন এই অঞ্চলে এটাই প্রথম। জাদুঘরে ইসলামি শিল্পকলার বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এছাড়া গবেষণা ও পড়ার জন্য আছে পাঠাগার। মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট ৪৫,০০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত। স্থানটি আসলে একটা কৃত্রিক উপদ্বীপ, এখান থেকে দোহা উপসাগরের দক্ষিণ প্রান্ত দেখা যায়। জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ ২০০৬ সালে শেষ হয়, কিন্ত পরবর্তীকালে কয়েকবার জাদুঘরের অভ্যন্তরীন নকশায় পরিবর্তন করা হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৮ সালের ২২ নভেম্বরে জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বরে। জাদুঘরটির স্থপতি ছিলেন আম. এম. পাই। এসময় তার বয়স ছিল ৯১ বছর। নকশা করার পূর্বে আই. এম. পাই প্রায় ছয় মাস ধরে মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেন মুসলিম স্থাপত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য।
২০২২ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার ২২তম আসর বসছে কাতার ।এক হিসেবে কাতারকে সৌভাগ্যবান রাষ্ট্র বললেই চলে। কেননা, ফিফা বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম আরব-মুসলিম দেশ হিসেবে দেশটি বিশ্বকাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়; এটি সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও শীতকালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ।২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পর এশিয়াতে অনুষ্ঠিত এটি হবে ফিফার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।এটিই হবে ৩২ দল বিশিষ্ট ফিফার সর্বশেষ আসর, এর পরবর্তীতে ৪৮টি দল নিয়ে উত্তর আমেরিকাতে অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এটিই হবে প্রথম বিশ্বকাপ যা মে, জুন বা জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হবে না; এর পরিবর্তে প্রতিযোগিতাটি নভেম্বরের শেষ দিকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নির্ধারিত। সূচি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা উন্মোচন হবে ২০ নভেম্বর কাতারের রাজধানী দোহা সিটির আল বাইত স্টেডিয়ামে। স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় প্রথম ম্যাচ শুরু হবে।এটি প্রায় ২৮ দিনের সময়সীমাতে শেষ করা হবে, ফাইনাল খেলাটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, যা কাতার জাতীয় দিবসও। জানা গেছে, আল বাইত স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৬০ হাজার। আর ফাইনালের ভেন্যু লুসাইল স্টেডিয়ামে দর্শক ধারণ ক্ষমতার ৮০ হাজার।বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কাতার যেসব স্টেডিয়াম তৈরি করছে তারই মধ্যে আল খোর স্টেডিয়াম একটি। বারোটি স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে। কোনোটি সামুদ্রিক নৌকার, কোনোটি ঝিনুক, কোনটি মরুদ্যানের নকশার আদলে। শুধু বাইরের চাকচিক্যই নয়। এসব স্টেডিয়ামের ভিতরেও থাকছে অভিনবত্ব। খেলোয়াড় আর দর্শকদের জন্য আরামদায়ক আবহাওয়া নিশ্চিত করবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি। ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে গড়ে ওঠা নির্মাণ খাতে বাংলাদেশীরা জড়িত ।কাতার বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে গত ১০ বছরে (২০১১ সাল থেকে ২০২০সাল ) বাংলাদেশি ১০১৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।পাশাপাশি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৬হাজার ৫০০শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে ।এসব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা।মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জনের পর থেকে কাতারে প্রতি সপ্তাহে গড়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপালও শ্রীলঙ্কার ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গার্ডিয়ানের নির্ভরযোগ্যসূত্র ও দেশগুলোর সরকারি অনুযায়ী দশ বছরে ৫হাজার ৯২৭জন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।এর মধ্যে মৃত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ১হাজার ১৮।বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামবানানোর কাজ করছেন এমন অবস্থাতেই ৩৭জন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন।যদিও বিশ্বকাপ আয়োজন কমিটি এরমধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যুকে কাজের বাইরের ঘটনায় মৃত্যু বলে চালিয়েদিয়েছে।
ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম আরব-মুসলিম রাষ্ট্রে সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ শীতকালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শক ও ভক্তদের স্বাগত জানাতে বর্ণিল সাজে সেজেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত কাতার। দেশটির রাজধানী দোহাসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে মহানবী (সা.)-এর হাদিস সম্বলিত ম্যুরাল।বিশ্বকাপ ভক্তদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে অভিনব কায়দায় অভ্যর্থনা জানাতে এমন উদ্যোগ নেয় কাতার। তাই বিভিন্ন স্থানে দেয়ালজুড়ে সাঁটানো হয় বর্ণিল ম্যুরাল, ব্যানার ও ফেস্টুন। এতে লেখা হয় সামাজিক শিষ্টাচার বিষয়ক মহানবী (সা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী। আরবি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা অর্থপূর্ণ হাদিসগুলো চলার পথে দর্শক ও পাঠকদের মনে তৈরি করে অন্য রকম অনুভূতি।একটি দেয়ালে সাদা রঙের ওপর কালো বর্ণে দয়া-অনুকম্পা নিয়ে মহানবী (সা.)-এর একটি বাণী দেখা যায় যার অর্থ হলো, ‘অন্যের প্রতি দয়া করে না তার প্রতি দয়া করা হয় না’। অন্য স্থানে মহানবী (সা.)-এর আরেকটি বাণী দেখা যায় যার অর্থ হলো, ‘সব ভালো কাজই দান।কাতারে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে সেসব মুসলিম 'ফ্যান টিকিট' বা 'হায়া কার্ড' পাবেন তারা সেই কার্ড দেখিয়ে ওমরাহ করতে পারবেন। পাশাপাশি, মদিনায় যেতে পারবেন। । তবে, সৌদি আরবে আসতে ভিসা প্লাটফর্ম থেকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিমা নিতে হবে।কার্ডধারীরা বিশ্বকাপ শুরুর ১০ তিন আগে সৌদি আরবে ঢুকতে পারবেন এবং ২ মাস সেখানে অবস্থান করতে পারেন।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন