সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

উজবেকিস্তান

 


উজবেকিস্তান মধ্য এশিয়ার একটি স্থলবেষ্টিত দেশ।উজবেকিস্তান সীমান্তে পাঁচটি স্থলবেষ্টিত দেশ রয়েছে উত্তরে কাজাখস্তান; উত্তরপূর্ব কিরগিজস্তান; দক্ষিণপূর্ব তাজিকিস্তান, দক্ষিণ আফগানিস্তান; এবং দক্ষিণ পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতা সংযুক্তকারী বিখ্যাত রেশমপথের ওপর এর অবস্থান দেশটিকে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য দিয়েছে। এর উত্তর ও দক্ষিণের কিছুটা জায়গা জুড়ে রয়েছে আরাল সি। উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত আর রুক্ষ-শুষ্ক দিগন্ত-বিস্তৃত মরুভূমিই এ দেশের বৈশিষ্ট্য। গরমের সময় প্রবল উত্তাপ আর শীতকালে পারদ নেমে যায় শূন্যের অনেক নিচে। বৃষ্টিপাতও খুব কম।

রাজধানী- উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল বেরুনি এবং মকসুদ কাসগরির মতে, সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে তাসখন্দ হয়ে উঠেছিলপৃথিবীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর তাসখন্দ।

 আয়তনঃ ৪ লক্ষ ৪৮ হাজার ৯৮৭ বর্গকিলোমিটার। উজবেকিস্তানের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় তিন গুণ।

জনসংখ্যাপ্রায় সাড়ে তিন কোটি।

জাতিগোষ্ঠীঃ উজবেক ৭১ শতাংশ , রুশ ৮ শতাংশ , তাতার ও কাজাখ ৫ শতাংশ , বাকিরা তাজিক ,কারা কালপাক

ধর্ম- সিআইএর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী উজবেকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্ম ইসলাম। সুফি ঘরানায় বিশ্বাসী ও সুন্নি মতাবলম্বী।মুসলিম ৮৮শতাংশ, ইস্টার্ন অর্থডক্স ৯ শতাংশ ও অন্যান্য ৩ শতাংশ।

জনসংখ্যা- ৩০,৫৬৫,৪১১ (জুলাই, ২০২০ পর্যন্ত)

ভাষা-

উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উজবেক।এতে উজবেকিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোক কথা বলেন। প্রায় ১৪% লোক রুশ ভাষায় এবং প্রায় ৪% লোক তাজিকি ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে থেকে আগত অনেকগুলি ভাষা, যেমন তুর্কমেন, কাজাক ও কিরঘিজ ভাষা এখানে প্রচলিত।মুসলমানদের মধ্যে আরবি ও ফারসি ভাষার ব্যবহার আছে। একসময় উজবেকিস্তানে আরবি ভাষায় উজবেক ভাষা লেখা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে যাওয়ার পরও ১০ বছর পর্যন্ত আরবি বর্ণমালা অব্যাহত ছিল উজবেক ভাষায়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত সরকার এক ঘোষণায় আরবির পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়।কিন্তু স্তালিন ক্ষমতা দখলের পর ১৯৪০-এর দশক থেকে এটি সিরিলীয় লিপিতে লেখা হতে থাকে। ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলির থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উজবেক সরকার ১৯৯৩ সালে উজবেক ভাষা সরকারিভাবে আবার লাতিন লিপিতে লেখার আদেশ জারি করে। উজবেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধাপে ধাপে এই লিপি সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয়। রাষ্ট্রীয় ভাষা উজবেক হলেও মুসলমানরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরবি ও ফার্সি ভাষা ব্যবহার করে। আরবি বর্ণে একসময় উজবেক ভাষা লেখা হতো। পর ইতিহাসের চড়াই-উৎরাইয়ে তাতে পরিবর্তন আসে।

মুদ্রা – সোম

জাতিসংঘে যোগদান – ২ মার্চ ,১৯৯২ ।

ইসলামের আগমন

ইসলামের বার্তা নিয়ে সাহাবি এবং অন্য ধর্ম প্রচারকগণ দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েন। আরব উপদ্বীপথেকে স্থলপথে ধর্ম প্রচারকগণ ইরাক, ইরান ও আফগানিস্তান হয়ে বর্তমান উজবেকিস্তানের বুর্কিস্তান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।তখন এ অঞ্চলে যাযাবর তুর্কি উপজাতির বাস ছিল ।রাসুলের চাচাতো ভাই হযরত কুসম ইবনে আব্বাস (রা.) ইসলামের বাণী নিয়ে সপ্তম শতকে উজবেকিস্তানে পৌঁছেন এবং তৎকালীন শাসকসহ সবার মাঝে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেন। জন্মের পর অল্প কিছুদিন হজরত কুসম ইবনে আব্বাস (রা.) সচক্ষে মহানবীকে (সা.) দেখার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে তিনি পরবর্তীতে ইসলামের বাণী নিয়ে উজবেকিস্তানে আসেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলাম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে উজবেকিস্তানে অবস্থান করেন বলে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়। বর্তমানে উজবেকিস্তানের সমরখন্দে তার সমাধি থাকার কথা বিশ্বাস করে অনেক মুসলমান স্থানীয় স্মৃতিসৌধে ভিড় জমান।৩০ হিজরিতে হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে আহনাফ বিন কায়েস (রা.) এ অঞ্চলে প্রথম অভিযানে বের হন।পরে তা ক্রমে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ সমগ্র উজবেকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে।অষ্টম শতাব্দীর ৮৮ হিজরিতে উজবেকিস্তানের পুরো এলাকা মুসলমানদের অধীনে আসে উমাইয়া যুগে, মুসলিম আলেকজান্ডার খ্যাত কুতাইবা ইবনে মুসলিম  (রা.) এর হাতে।আব্বাসীয় যুগের খলিফা মুতাসিমবিল্লাহর শাসনামলে উজবেকিস্তানের বহুগোত্র ইসলামের পতাকা তলে শামিলহয়। একাদশ থেকে ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দপর্যন্ত সুফি ও দরবেশরা উজবেকিস্তানে ইসলাম প্রচারে শক্তিশালী ভূমিকা রাখেন।

৮১৯ থেকে ৮৯৯ সাল পর্যন্ত ইরানে সামানি বংশের শাসন চলে। মুসলমানদের পারস্য বিজয়ের পর উজবেকিস্তানে ইসলাম প্রবেশ করতে শুরু করে।মুসলিম বিশ্বের আলেকজান্ডার খ্যাত কুতাইবা ইবনে মুসলিম (র.) ছিলেন সে সাফল্যের অগ্রনায়ক। একাদশ থেকে ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুফি ও দরবেশরা উজবেকিস্তানে ইসলাম প্রচারে শক্তিশালী ভূমিকা রাখেন।খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে মধ্য এশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তিমুরিদ’ বংশের শাসন। এই মুসলমান বংশের প্রতিষ্ঠাতা আমির তিমুর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, উজবেকিস্তানসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে মধ্য এশিয়া বিশেষত উজবেকিস্তানের স্থানীয় পর্যায়ের বহু নেতা ইসলাম গ্রহণ করেন। তিমুর নিজে তার আমলের মুসলমান বিদ্যান ব্যক্তিদের অত্যন্ত সমাদর করতেন। তিনি সুন্নি মতবাদ ও সুফি সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন।তার আমলে মুসলমানদের জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, চিকিৎসা, দর্শন আবিষ্কার প্রভৃতি এক স্বর্ণযুগ অতিক্রম করে, যার নীরব সাক্ষী উজবেকিস্তানের সমরখন্দ। ভারতবর্ষ জয়ের পর আমির তিমুর তার নতুন রাজধানী সমরখন্দে আসেন এবং তৎকালীন মুসলমান বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এবং বৃহত্তম ‘বিবি খানম মসজিদ’ নির্মাণ করেন।

ইতিহাস

রুশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বর্তমান উজবেকিস্তান বুখারা আমিরাত, খিভা খানাত এবং কোকান্দ খানাতের মধ্যে বিভক্ত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উজবেকিস্তান রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। এসময় প্রচুরসংখ্যক রুশ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ১৯১২ সালের হিসাব অণুযায়ী, জার শাসিত উজবেকিস্তানে বসবাসকারী রুশদের সংখ্যা ছিল ২,১০,৩০৬ জন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রুশ কর্তৃপক্ষ উজবেকিস্তানসহ কেন্দ্রীয় এশিয়া থেকে সৈন্য সংগ্রহ করার প্রচেষ্টা চালালে এ অঞ্চলব্যাপী বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এমতাবস্থায় রুশ সরকার উজবেকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।১৯২০ সালের মধ্যে মধ্য এশিয়ায় রুশ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং কিছু প্রতিরোধ সত্ত্বেও উজবেকিস্তানসহ সমগ্র মধ্য এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯২৪ সালের ২৭ অক্টোবর উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র।ইসলামী আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা ধ্বংস করার জন্য কমিউনিস্ট সরকার যারপরনাই কোশেশ করে। তারা বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামী সেন্টার বন্ধ করে দেয়। সে সময় ধর্মকর্ম পালন সীমিত হয়ে পড়ে। মসজিদ যেহেতু মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টিতে মৌলিক অবদান রাখে, সে জন্য তারা মসজিদ বন্ধ করতে বেশি তত্পর ছিল।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে ১৪,৩৩,২৩০ জন উজবেক সৈন্য সোভিয়েত রেড আর্মির পক্ষে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২,৬৩,০০৫ জন উজবেক সৈন্য যুদ্ধ চলাকালে নিহত হন এবং ৩২,৬৭০ জন নিখোঁজ হন।দীর্ঘপথ পরিক্রমা শেষে ১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট মস্কোতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দিনই উজবেকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পরদিন সেপ্টেম্বর দেশটিতে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়

 

ইসলাম করিমভ

দেশটি স্বাধীন হলেও সোভিয়েত আমলের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সেক্রেটারি ইসলাম করিমভ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে উজবেকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ধরে রাখেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি স্ট্যালিনবাদী মানসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৯৯ সালে এক আদেশে তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। ইসলামপন্থীদের ওপর চলতে থাকে বেপরোয়া নির্যাতন, ধরপাকড় ও নিগ্রহ। তাঁর আমলে দেশটি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক’ হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি পায়। নিপীড়নের ভয়াবহতায় নিজেই নিজের রেকর্ড ভাঙতেন করিমভ। তিনি দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফুটন্ত পানিতে ফেলে সিদ্ধ করে মেরেছেন বলে জানান দেশটিতে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রেইগ মারি। এমনকি করিমভের নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাননি তাঁর সম্ভাব্য উত্তসূরি বড় মেয়ে গুলনারা। টুইটারে সরকারের সমালোচনা করায় তাঁকে ২০১৪ সাল থেকে গৃহবন্দি করে রেখেছে করিমভ সরকার। মা ও ছোট বোনের কড়া সমালোচক গুলনারা তাঁর বাবা করিমভকে স্ট্যালিনের সঙ্গে তুলনা করেন। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ করিমভ মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে বিবিসি বাংলা লিখেছে : ক্ষমতায় আসার পর তিনি সমালোচক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের জেলে ভরতে শুরু করেন, অনেককে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কট্টরপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে সন্দেহে হাজার হাজার মুসলমানকে তিনি কারাবন্দি করেন। তিনি দাবি করেন যে উজবেকিস্তান তাঁদের মতো করে গণতন্ত্রের চর্চা করছে। তবে এই গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কোনো বালাই ছিল না। উজবেকিস্তানের মুসলমানরা তাদের হারানো ঐতিহ্য ও অধিকার ফিরে পেতে প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি

উজবেকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারপ্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। উজবেকিস্তানে সরকারী পদপ্রাপ্তি রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ নয়, বরং কে কোন গোত্রের, তার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।উজবেকিস্তানে রয়েছে ১২টি প্রদেশ, একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং পৃথক সত্তায় গড়েওঠা রাজধানী তাসখন্দ 

খনিজ সম্পদ

দেশটির অর্থনীতি মূলত খনিজ সম্পদনির্ভর। বছরে দেশটি ৮০ টন স্বর্ণ উৎপাদন করে, যা বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থান। তামা মজুদের ক্ষেত্রে দশম এবং ইউরেনিয়াম মজুদের ক্ষেত্রে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে উজবেকিস্তান। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান বিশ্বের ১১ নম্বরে। এ ছাড়াও এখনো মাটির নিচে রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, অপরিশোধিত তেল (কনডেনসেট) এবং মূল্যবান হাইড্রোকার্বন। কয়লা রুপার খনিও রয়েছে।

কৃষি ও শিল্প

কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই উজবেকিস্তান। তুলা উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম ও তুলা রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের পঞ্চম স্থানে রয়েছে উজবেকিস্তান।

 ভূগোল

উজবেকিস্তানের ৮০% এলাকা সমতল মরুভূমি। দেশের পূর্বভাগে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতমালা যেগুলি ৪,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে। উজবেকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত তিয়ান শান পর্বতমালার পশ্চিম পাদদেশ নিয়ে গঠিত। উজবেকিস্তানের উত্তরের নিম্নভূমি কিজিল কুম নামের এক বিশাল মরুভূমি, যা দক্ষিণ কাজাকিস্তানেও প্রসারিত হয়েছে। ফের্গানা উপত্যকা উজবেকিস্তানের সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল; এটি কিজিল কুম মরুভূমির ঠিক পূর্বে অবস্থিত এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। সির দরিয়া নদী এই অঞ্চলটিকে কিজিল কুম মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। আমু দরিয়া অপর গুরুত্বপূর্ণ নদী।

উজবেকিস্তানে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। ১৯৬৬ সালে এমনই এক ভূমিকম্পে রাজধানী তাশখন্দের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

অর্থনীতি

উজবেকিস্তান ইউরেনিয়াম উৎপাদনে বৈষয়িকভাবে সপ্তম।উজবেকিস্তানের ৮০% এলাকা সমতল মরুভূমি। দেশের পূর্বভাগে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতমালা যেগুলি ৪,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে। উজবেকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত তিয়ান শান পর্বতমালার পশ্চিম পাদদেশ নিয়ে গঠিত। উজবেকিস্তানের উত্তরের নিম্নভূমি কিজিল কুম নামের এক বিশাল মরুভূমি, যা দক্ষিণ কাজাকিস্তানেও প্রসারিত হয়েছে। ফের্গানা উপত্যকা উজবেকিস্তানের সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল; এটি কিজিল কুম মরুভূমির ঠিক পূর্বে অবস্থিত এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। সির দরিয়া নদী এই অঞ্চলটিকে কিজিল কুম মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। আমু দরিয়া অপর গুরুত্বপূর্ণ নদী। উজবেকিস্তান প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। ১৯৬৬ সালে এমনই এক ভূমিকম্পে রাজধানী তাশখন্দের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

খাদ্য

উজবেকিস্তানে প্রচুর পরিমাণে শস্যের চাষ হয়। তাই রুটি এবং নুডলস গুরুত্বপূর্ণ এবং উজবেক রন্ধনশৈলীকে "নুডলসে সমৃদ্ধ" হিসাবে উল্লেখ করা হয। দেশে প্রচুর পরিমাণে ভেড়া থাকায় মাটন খুব জনপ্রিয় মাংস এবং এটি বিভিন্ন উজবেক খাবারের একটি অংশ।

উজবেকিস্তান এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পদ হল পালোভ (প্লোভ বা ওশ বা "পিলাফ"), একটি প্রধান খাবার যা চাল, টুকরা মাংস, কোঁচানো গাজর এবং পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত একটি কাজান (বা দেঘি) তে খোলা আগুনে তৈরি করা হয়। বৈচিত্র্যের জন্য বিভিন্ন ফল যোগ করা হয়। অতিথি ও পরিবারের জন্য ঘরে এটা প্রায়ই প্রস্তুত করা হয়। তবে পালভ বিশেষ অনুষ্ঠানগুলিতে ওশফাজ বা ওশ মাস্টার শেফ দ্বারা তৈরি করা হয়। ওশ পাচক খোলা আগুনে এই জাতীয় খাবারটি রান্না করেন। ছুটির দিনে কিংবা অনুষ্ঠান যেমন বিবাহ অনুষ্ঠানে এক পাত্র বা হাঁড়িতে প্রায় ১০০০ জনের জন্য একত্রে রান্না করা হয়। ওশি নাহর বা সকালের প্লভ খুব সকালে (৬ টা থেকে ৯ টার মধ্যে) পরিবেশন করা হয় যা একটি চলমান বিবাহের অংশ।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে: শরপা (শুরভা বা শোরভা), চর্বিযুক্ত মাংস (সাধারণত মাটন দিয়ে তৈরী) এবং তাজা শাকসব্জি দিয়ে তৈরী স্যুপ, নরেন এবং ল্যাগম্যান, নুডল-ভিত্তিক খাবার যা একটি স্যুপ বা একটি প্রধান কোর্স হিসাবে পরিবেশিত হয়; ম্যান্টি (কাস্কোনি নামেও পরিচিত), চুচভাড়া এবং সোমসা, হজমীকারক হিসেবে মূল খাবারের সঙ্গে পরিবেশিত; ডিমলামা (একটি মাংস এবং উদ্ভিজ্জ স্ট্যু) এবং বিভিন্ন কাবাব, সাধারণত যা প্রধান কোর্স হিসেবে পরিবেশিত হয়।

পর্যটনও তীর্থস্থান –

হাজার বছরের ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ উজবেকিস্তান পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় দেশ। উজবেকিস্তান বহু মুসলিম মনীষীর স্মৃতিধন্য দেশ। ইমাম বুখারি, ইমাম নাসাঈ ও ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ দেশে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আলবেরুনি উজবেকিস্তানের মানুষ ছিলেন। মঙ্গোলিয়া থেকে এসে চেঙ্গিস খানও এখানে কিছুকাল রাজত্ব করেছিলেন।উজবেকিস্তানে প্রচুর ইসলামি ঐতিহাসিক মসজিদ, স্থাপনাও প্রাচীন সমাধি রয়েছে।সামরকান্দ এবং বুখারা শহরে এসব মসজিদ এবং মাজারের বেশিরভাগ অবস্থিত।উজবেকিস্তানে কতগুলো মাজার আছে সেটির সংখ্যা কেউ জানে না। তবে কিছু কর্মকর্তা ধারণা করছেন মাজারের সংখ্যা দুই হাজারের কম হবে নাইতিহাসখ্যাত যোদ্ধা ও শাসক তৈমুর লং, হযরত ইমাম বুখারি, হযরত বাহাউদ্দিন নকশাবন্দীসহ অনেক জ্ঞানী ও গুণিজনের মাজার রয়েছে দেশটিতে। অসংখ্য প্রচীন মসজিদ, মাদ্রাসা, দুর্গ ও বৌদ্ধ ধর্মের নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে দেশজুড়ে। পুরো দেশ ঘুরে বেড়ানোর পর মনে হবে এ যেন এক ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের দেশ। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে লাভজনক করা যাবে বলে মনে দেশটির সরকার।"বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং পণ্ডিত ইমাম বুখারি এবং বাহাউদ্দিন নকসবন্দকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং ভারত থেকে অনেক পর্যটক এখানে আসতে পারে, " ১৪ শতকের সুফি নেতা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ-এর বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি অনুসারী আছে।কিছুদিন আগে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার তথ্য মতে, পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে উজবেকিস্তান দ্বিতীয় মক্কা হতে চায়। দেশটির সরকার মনে করে, দেশটির শতশত ধর্মীয় স্থাপনার মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা সম্ভব।ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ইচান কালা কমপ্লেক্স , বিখ্যাত বিবি খানম মসজিদ, কালটা মিনার, বোরগাজি খান মাদ্রাসা, ইসলাম খোজা মাদ্রাসা, মহম্মদ আমিন খান মাদ্রাসা, জুমা মসজিদ, ও মিনার, তাসখাউনি, হারেম ও পাহাড়ের গায়ে অনেক প্রাচীন সমাধি। প্রাচীনকালে খিভার শাসকদের বাসস্থান ছিল কুনয়া অর্ক ইত্যাদি।

 

তাসখন্দে প্রাচীন সভ্যতার নির্দশন হিসেবে এখানে রয়েছে অসংখ্য মাজার, মসজিদ আর সমাধি। এখানে রয়েছে পৃথিবীর প্রথম দিকের চারটি হাতে লেখা কোরান শরিফের একটি। যা দেখে অবশ্যই আপনি অভিভূত হনে। নগরীজুড়ে রয়েছে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট, যেখানে মিলবে এতিহ্যবাহী উজবেক রুটি আর জিভে পানি আনা বিভিন্ন স্বাদের কাবাব। দিনের ভ্রমণ শেষে বসে পড়ুন যে কোনো একটি সরাইখানায়, উপভোগ করুন উজবেক খাবার আর সেইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ব্যালে নৃত্য।বিশ্ব চলচ্চিত্রেও পিছিয়ে ছিল না উজবেকিস্তান। নব্বই দশক পর্যন্ত তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসব ছিল মর্যাদাপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান। তাসখন্দ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ৪০ হাজার দুষ্প্রাপ্য ইসলামী বইয়ের পাণ্ডুলিপি আছে।

সমরখন্দ -এটি উজবেকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। ১৩৪৯ হিজরি থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমরখন্দ ছিল উজবেকিস্তানের রাজধানী। এরপর সোভিয়েত সরকার তাসখন্দকে রাজধানী ঘোষণা করে। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, মঙ্গোলীয় ও ইরানি সংস্কৃতির স্রোতধারা মিলিত হয়েছে সদরখন্দের মোহনায়। কবি ও ইতিহাসবিদদের কাছে সমরখন্দ ‘প্রাচ্যের রোম’ হিসেবে পরিচিত।ঐতিহাসিকদের মতে সমরখন্দ রোম, এথেন্স আর ব্যাবিলনের মতোই দুই থেকে আড়াই হাজার বছরের পুরনো সমৃদ্ধ জনপদ। এ নগরীর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত আছে দার্শনিক, কবি, বিজ্ঞানী আর যোদ্ধার নাম। নগরীর সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক নিদর্শন পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। আলেকজেন্ডার দ্য গ্রেট সমরখন্দে এসে বলেছিলেন, ‘এ নগরী সম্পর্কে আগে যা শুনেছিলাম বাস্তবে এ নগরী তার চেয়েও সুন্দর ও রাজকীয়’।ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য সমরখন্দের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। বিখ্যাত বিবি খানম মসজিদ এখনো প্রাচীন স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। ২০০১ সালে ইউনেসকো ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকায় ২৭৫০ বছরের প্রাচীন সমরখন্দকে ‘বহু সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র’হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রাচীন আরবি নথিপত্রে সমরখন্দকে ‘প্রাচ্যের রত্ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইউরোপীয়দের কাছে সমরখন্দ বিজ্ঞানীদের বিচরণক্ষেত্র নামে পরিচিত।ইবনে সিনা, আবু রায়হান, ওমর খৈয়াম, আল বেরুনি, আলজামিদের মতো জ্ঞানীগুণি ব্যক্তি এক সময় সমরখন্দকে সমৃদ্ধ করেছে। দুই হাজার বছর আগে বিজ্ঞান, প্রকৌশলী আর নির্মাণশৈলীর যে উন্নতি সমরখন্দে হয়েছিল একুশ শতকের পর্যটকরা এখনও তা অনুধাবনে বিস্মিত হন। এ নগরীর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মোহাম্মদ (সা)র চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস-এর সমাধি।সপ্তম শতকে তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছেন। শাহী জিন্দা মাজার, সম্রাট তৈমুর লং নির্মিত সমাধি , জ্যোতির্বিদ উলুংবেক এবং ইমাম বোখারির মাজার।

বুখারা- উজবেকিস্তানের অন্যতম প্রাচীন শহর। মরক্কো যেমন মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন অথচ জীবন্ত শহর, বুখারাও মধ্য এশিয়ার সে রকমই একটি পুরনো অথচ প্রাণবন্ত শহর। শোনা যায়, সংস্কৃত ‘বিহারা’ শব্দটি থেকে ‘বুখারা’ শব্দের উত্পত্তি। যার অর্থ মন্দির। খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকে বুখারা শহরের গোড়াপত্তন ঘটে। সমরখন্দের পশ্চিমে অবস্থিত এ বুখারা নগরী একসময় ইসলামচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। এখানেই ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর জগদ্বিখ্যাত বুখারি শরিফ সংকলন সম্পন্ন করেন। এ শহরেই শায়েখ বাহাউদ্দীন নকশ্বন্দি (রহ.) আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। বুখারা নগরীতে ৩৫০টি মসজিদ ও ১০০টি মাদ্রাসা আছে। ওল্ড বুখারায় ঢোকার মুখে রাস্তার দুদিকের প্রাকার মুসলিম স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। ৯৪ হিজরি সালে বুখারা নগরীতে নির্মিত একটি মসজিদ এখনো বিদ্যমান। ১৫১৪ সালে নির্মিত হয়েছিল কালান মসজিদ। মির-ই-আরাব মাদ্রাসাটি ইয়েমেনের অধিবাসী শেখ আবদুল্লাহ ইয়ামানির তৈরি। এখানকার সুস্বাদু রুটি ও ফল পর্যটকদের রসনা মেটায়।

মুসলিম ব্যক্তিত্ব

আল বেরুনি

ইসলামের স্বর্ণযুগে ৯৭৩ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানের সীমান্তবর্তী শহর ‘বিরুনি’তে জন্মগ্রহণ করনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহাম্মদ আল বিরুনি (সংক্ষেপে আল বিরুনি)। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি স্থানীয়ভাবে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা, ধর্মতত্ত্ব, ব্যাকরণ, অঙ্ক, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা শাস্ত্র, দর্শন, পদার্থবিদ্যা ও অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক শাস্ত্র নিয়ে লেখাপড়া করেন। এরপর শুরু হয় বিভিন্ন বিষয়ে তার বই লেখার অবিরাম সংগ্রাম। স্থানীয় একাধিক রাজা-বাদশার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি শতাব্দীর ইতিহাস ও ঘটনাপঞ্জি নিয়ে বেশ কিছু বই লিখে সবার নজর কাড়েন। এর মধ্যে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনির প্রখ্যাত শাসক ও গজনি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ (গজনি মাহমুদ) তাকে সম্মানের সঙ্গে নিজের রাজধানী গজনিতে নিয়ে যান এবং রাজকীয় জ্যোতিষী নিযুক্ত করেন। ৪৪ বছর বয়সে আল বিরুনি গজনির শাসক মাহমুদের সঙ্গে ভারত অভিযানে অংশ নেন এবং ভারতের ওপর ব্যাপক গবেষণা ও লেখালেখি করেন। এ সময় তিনি ছায়াঘড়ির মতো সূর্যের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যা যে কোনো অপরিবর্তিত স্থানের সঠিক অবস্থান, দিনের সময় প্রভৃতি নির্ণয়ে সহায়তা করত। এ আবিষ্কারের পেছনে ছিল ইসলাম ধর্মের নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক সময়ে নামাজ আদায়, সাহরি ও ইফতারের সময় অনুধাবন এবং কাবার অবস্থান বা দিক নির্ণয় করে সঠিকভাবে কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায়, মসজিদ ও ঈদগার দিক নির্বাচন, সঠিক দিক বিবেচনা করে মৃত ব্যক্তির সমাহিত করা ইত্যাদি।

অংক ও জ্যোতির্বিদ্যায় আল বিরুনির বিশেষ আগ্রহ ছিল। এর মধ্যে জ্যামিতি নিয়ে তিনিচিরস্মরণীয় বহু কাজ করে গেছেন।তার সুপরিচিত ১৪৮টি বইয়ের মধ্যে ৯৫টি বই অঙ্ক ও জ্যোতির্বিদ্যাকে ঘিরে আবর্তিত। তার রচিত অঙ্ক শাস্ত্র, পদার্থবিদ্যার নানা সমীকরণ সমাধানে বিশেষত তরল পদার্থের ঘনত্ব নির্ণয়ে সহায়ক ছিল। পাহাড়ে উচ্চতা মাপার বিশেষ কৌশল আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাপার ক্ষেত্রে সফল হন। আজ বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা বিশেষত নভোযান ও স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবীর সঠিক ব্যাসার্ধ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮৪৭.৮ মাইল। অথচ পাহাড়ে উচ্চতাকে কেন্দ্র করে হাজার বছর আগে আল বিরুনি এই ব্যাসার্ধ ৩৯২৮.৭৭ মাইল বলে রায় দেন, যা মাত্র ২ শতাংশ বেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের আবিষ্কারের নেপথ্যে আল বিরুনি রচিত ফার্মেসি বিষয়ক বইয়ের অবদান রয়েছে। পদার্থের ঘনত্ব ও বিশুদ্ধতা নির্বাচনে তার আবিষ্কার চিকিৎসা শাস্ত্রেও ওষুধ আবিষ্কারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মূল্যবান পাথর নির্বাচনে আগে কেবল পাথরের রং বিবেচনা করা হতো। অথচ ইবনে সিনা ঘনত্ব ও শক্তি (হার্ডনেস) নির্ধারণ করে পাথরের যথাযথ মান ও গুণাগুণ বোঝার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে জ্ঞান অর্জনের অগ্রপথিক ছিলেন আল বিরুনি। বর্তমান যুগের ড. জাকির নায়েকের মতো সেই আমলে আল বিরুনি ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইহুদিসহ নানা ধর্মের ওপর অগাধ জ্ঞান রাখতেন এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে সঠিক বাণী উল্লেখ করে সবাইকে চমকে দিতেন। প্রতœতত্ত্ব বিশেষত ভারতে প্রতœতত্ত্ব নিয়ে আল বিরুনির লেখা পৃথিবীর মূল্যবান সম্পদ। সমগ্র ভারতবর্ষ ঘুরে ঘুরে তিনি ভারতীয় সাধারণ জনগণের জীবনাচার, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে অসংখ্য লেখা রচনা করেন। দীর্ঘ ৬৩ বছর ধরে তিনি অবিরাম লিখে গেছেন। তার রচনা বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ১২টি শাখায় চর্চা করা হয়। দীর্ঘ ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন এই জ্ঞান তাপস। ১০৫০ সালে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে মৃত্যুবরণ করেন আল বিরুনি এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।

ইমাম তিরমিজি (রহ.)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান মক্কা থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে বর্তমান উজবেকিস্তানের সমরখন্দ এলাকার তিরমিজ নামক স্থানে জন্ম নেন মহান ইসলামী চিন্তাবিদ ও হাদিস সংগ্রহকারী মুহাম্মদ ইবনে ইসাআত তিরমিজি, সংক্ষেপে ইমাম তিরমিজি (রহ.)। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে আরব জাহানের পথেপ্রান্তরে ঘুরে শুদ্ধ হাদিস সংগ্রহ করে অমর হয়ে আছেন তিনি। একদল গবেষক তাঁর জন্ম মক্কায় দাবি করলেও অধিকাংশের মতে তাঁর জন্ম বর্তমান উজবেকিস্তানে আনুমানিক ৮২৪-২৫ সালে। তাঁর পূর্বপুরুষ অন্য দেশে বসতি স্থাপন করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষত ইরান এবং ইরাকে সপরিবারে বসবাস এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে ইমাম তিরমিজি (রহ.) এর শৈশব কাটে বলে জানা যায়। ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা, ব্যাকরণ ও বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন তিনি। তাই তার রচনা ভাষাগত ও ব্যাকরণগত শুদ্ধতার বিচারে অনন্য স্থান লাভ করেছে। তবে বিশুদ্ধ হাদিসের সন্ধানে তাঁর পথচলা শুরু হয় আনুমানিক ২০ বছর বয়সে। এই পথযাত্রায় তিনি বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০০ ইসলামী চিন্তাবিদ এবং হাদিস সংগ্রহকারীর সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের কাছ থেকে বিশুদ্ধ হাদিস এবং হাদিসের সূত্র বা পরম্পরার সন্ধান করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় তৎকালে ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ বসরা ও কুফা নগরে। শুধু কুফা নগরেই তিনি ৪২ জন ইসলামী আলেম ওলামা থেকে হাদিস সংগ্রহ করেন। এ ছাড়াও তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন আরেক হাদিস সংগ্রহকারী ইমাম বুখারি (রহ.)। ইতিহাস মতে, ইমাম তিরমিজি (রহ.) দীর্ঘ পাঁচ বছর ইমাম বুখারির (রহ.) সান্নিধ্যে ইরানের নিশাপুর অঞ্চলে অবস্থান করেন এবং সংগৃহীত হাদিসের বিশুদ্ধতার বিষয়ে নিশ্চিত হন। তাই ইমাম বুখারির (রহ.) প্রতি তিনি সর্বদা কৃতজ্ঞ ছিলেন। একটি হাদিস গ্রন্থে ইমাম তিরমিজি (রহ.) ১১৪ বার ইমাম বুখারির (রহ.) নাম উল্লেখ করেন। এ ছাড়াও ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় তার দীর্ঘদিন হাদিসের সন্ধানের বিচরণের তথ্য রয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ.) ছাড়াও তার শিক্ষা এবং কর্মজীবনে ইমাম আদ দারিমি (রহ.), ইমাম মুসলিম (রহ.) এবং ইমাম দাউদের (রহ.) প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাঁর সংকলিত বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে ৮টি গ্রন্থ বিশেষভাবে সমাদৃত। তবে তার সংকলিত বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ ‘সামাইম মোহাম্মদিয়া’ অথবা ‘সামাইল আততিরমিজি’ অথবা জামি আততিরমিজি’ ইসলামী বিশ্বে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার সংকলিত ৩ হাজার ৯৬২টি হাদিস শুদ্ধতার নিরিখে বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ৮৭০ সালে ইমাম বুখারি (রহ.) মৃত্যুবরণ করলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ইমাম তিরমিজি (রহ.)। দীর্ঘদিনের সঙ্গী, পরামর্শক ও শিক্ষক ইমাম বুখারির (রহ.) শোকে প্রায়ই কান্নœাকাটি করতেন ইমাম তিরমিজি (রহ.)। এ ছাড়াও পরকালের চিন্তা ও আল্লাহর ভয়েও কেঁদে বুক ভাসাতেন তিনি। শেষ জীবনে তিনি কিছুই চোখে দেখতেন না। তাই তাঁকে অনেক গবেষক ‘লাকাব’ বা ‘আজ জারির’ উপাধি দেন, যার অর্থ দৃষ্টিহীন। অনেকেই আবার তাঁকে জন্মান্ধ বললেও ইতিহাস তা সমর্থন করে না। নিজ জীবনে তিনি যেমন কেঁদেছেন, তেমনি অসংখ্য ভক্ত ও শিষ্যদের কাঁদিয়ে ৮৯২ সালের ৯ অক্টোবর পরকালে পাড়ি জমান ইমাম তিরমিজি (রহ.)। জীবনের শেষভাগে তিনি নিজ জন্মস্থান উজবেকিস্তানের তিরমিজে ফেরত আসেন এবং ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত হন। এখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর তিরমিজ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে শিরাবদ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। ১৯৯০ সালে তাঁর জন্মের ১২০০তম বার্ষিকী উদযাপন করা হয় এই স্মৃতিসৌধে।

ইবনে সিনা

চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্যতম দিকপাল আবু আলী হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ আল ইবনে আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা (সংক্ষেপে ইবনে সিনা)। ৯৮০ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলের আফসান গ্রামে বাবা আবদুল্লাহ ও মা সিমারার কোলজুড়ে জন্ম নেন ইবনে সিনা। মাত্র ১০ বছর বয়সে কোরআন শরিফ মুখস্থ করে তিনি তার প্রখর স্মৃতিশক্তি ও প্রতিভার জানান দেন। এক ভারতীয় প-িতের হাতে তার অঙ্গে হাতেখড়ি ঘটে এবং তৎকালে যারা চিকিৎসা বা রোগীর সেবা করতেন, তাদের সান্নিধ্যেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। মুসলমান হিসেবে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় বিশেষত ইসলামী বিচার ব্যবস্থা বা শরিয়া আইন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। দর্শন শাস্ত্রেও তার আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন প্রখর জ্ঞান পিপাসু। কথিত আছে অ্যারিস্টটলের একটি বই তিনি বোঝার জন্য ৪০ বার পড়েছিলেন এবং কোনো কোনো বই পড়তে পড়তে বইয়ের অক্ষরগুলো মুছে গিয়েছিল। ১৬ বছর বয়সে চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চায় তিনি বিশেষভাবে মনোযোগ দেন এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি একজন সুচিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি পান। দিনভর তিনি বিনাপয়সায় রোগী দেখতেন এবং অজু করা অবস্থায় রাতভর লেখাপড়া করতেন। সুনামের কারণে তৎকালে ইরান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত তৎকালীন সামাদিন সাম্রাজ্যের প্রধান চিকিৎসক নিযুক্ত হন এবং সাম্রাজ্যের আমির ৯২ বছর বয়সী নুহুকে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পেতে সহায়তা করেন। ১০০৪ সালে সামাদিন সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে তিনি এক বিরূপ পরিবেশে যাযাবরের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটে বেড়ান। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর এই প্রতিকূল অবস্থার অবসান ঘটে এবং তিনি তৎকালীন বৃহত্তর পারস্য (ইরান) অঞ্চলের শাসক মোহাম্মদ ইবনে রুস্তম দুশমানজিয়ার চিকিৎসক এবং সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। শেষ জীবনে পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে তিনি ধর্ম চর্চায় মন দেন। সব সম্পদ গরিবদের দান করেন ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করে দেন। এ সময় প্রতিদিন তিনি একবার কোরআন খতম করতেন বলে জানা যায়। ১০৩৭ সালের জুন মাসে পবিত্র রমজান মাস চলাকালে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ইবনে সিনার মৃত্যু ঘটে। ইরানের হামদানে তাকে সমাহিত করা হয়।

ইবনে সিনা মৃত্তিকা বিজ্ঞান, ভূগোল, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা ও কাব্যসাহিত্য বিষয়ে বহু বই লিখেছেন। তবে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনার নাম ‘আল কানুন ফিত্বিব’, ‘দি ক্যানন অব মেডিসিন’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। এই বই চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিকোষ বা ইনসাইক্লোপিয়া হিসেবে সমাদৃত। তার একটি বিখ্যাত উক্তি হলো ‘এই দুনিয়ার লোকেরা দুই দলে বিভক্ত। এক দলের ধর্ম নেই কিন্তু বুদ্ধি আছে। আরেক দলের ধর্ম আছে, কিন্তু বুদ্ধি নেই।’

বুখারি

সুফি মতবাদে বিশ্বাসী মুসলমানদের কাছে হাদিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ‘সহি আল বুুখারি’ নামক হাদিস গ্রন্থ। এই গ্রন্থের হাদিস সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ইমাম আল জুফি আল বুখারি। ৮১০ সালের ২১ জুলাই বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলের রাজধানী বুখারা শহরে জন্ম নেন ইমাম বুখারি। তার বাবা ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিমও ছিলেন একজন হাদিস সংগ্রহকারী। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি অসংখ্য হাদিস মুখস্থ করে ফেলেন। এরপর তিনি বাবাকে হারান এবং ১৬ বছর বয়সে সপরিবারে মক্কায় চলে আসেন। এরপর মক্কায় বসেই শুরু হয় তার হাদিস নিয়ে সাধনা। কথিত আছে বিশুদ্ধ হাদিসের সন্ধানে তিনি সে আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ বহু অঞ্চলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রায় ১০০০ ইমাম ও ইসলামী চিন্তাবিদের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ ইসলামী রীতিনীতি, ফতোয়া, মতবাদ ও হাদিস সংগ্রহ করেন। প্রখর স্মৃতিশক্তির কল্যাণে তিনি প্রথম জীবনে প্রায় ৭০ হাজার এবং শেষ দিকে প্রায় ৩ লাখ হাদিস মুখস্থ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। হাদিস শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি ইমাম আহাম্মদ বিন হানবাল (র.)-এর কাছে বিশেভাবে ঋণী ছিলেন। তার কাছ থেকে হাদিস শিক্ষা নেওয়া ছাত্রের সংখ্যা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন। তবে ধারণা করা হয় যে, কমপক্ষে ৯০ হাজার ছাত্র ও অনুসারী তার কাছে হাদিস শিখতে এসেছিলেন। বিশুদ্ধতার কথা বিবেচনা করে তিনি প্রথমে হাদিস বর্ণনাকারীর জীবন, আচরণ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গবেষণা করতেন এবং পরবর্তীতে তার কাছে যাবেন কি না সে সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি প্রতিটি হাদিস মক্কা বা মদিনা শরিফে বসে লিখতেন এবং হাদিস লেখার আগে নফল নামাজ পড়ে বিশুদ্ধ হাদিস

লেখার শক্তি কামনা করতেন। অসংখ্য হাদিস মুখস্থ করলেও ১৬ বছরে তিনি ৬টি খ-ে প্রায় ৭২৫২টি হাদিস লিখেছেন বলে জানা যায়। শেষ জীবনে তিনি আবারও উজবেকিস্তান নিজ জন্মভূমি বুখারায় ফেরত আসেন এবং একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তৎকালীন শাসক এই মাদ্রাসায় নিজ পুত্রকে পৃথকভাবে পড়াতে বললে তিনি তা অস্বীকার করেন। ফলে বুখারা ছেড়ে তাকে ৩০ মাইল দূরের এক দুর্গম গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়। শেষ জীবনে তিনি তার সব পৈতৃক সম্পত্তি দান করে দেন। এ সময় দিনে ২-১টি পেস্তা বাদাম খেয়েও তার দিন অতিবাহিত হয়। ৬২ বছর বয়সে ৮৭০ সালে খারতাঙ্ক নামক সেই দুর্গম গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯৯৮ সালে এখানে স্মৃতিসৌধ, মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়।

তৈমুর লং

দিগ্বিজয়ী আমির তৈমুর লং(১৩৩৬ -১৪০৫)ছিলেন এক বিচিত্র চরিত্রের অধিকারী, দুঃসাহসী শাসক, বিশ্ব বিখ্যাত চেঙ্গীজ খানের দৌহিত্র। তৈমুর সমরকন্দের নিকটবর্তী কুশ নামক স্থানে ১৩৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তৈমুর যার অর্থ ‘লৌহ। তিনি তৈমুর লং নামেও পরিচিত, যার অর্থ খোঁড়া তৈমুর। তাঁর আসল নাম তৈমুর বেগ। যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি আহত হন, যার ফলে তাঁর একটি পা অকেজো হয়ে যায় এবং তিনি খোঁড়া বা খোঁড়া হয়ে যান।ইউরোপে তিনি ‘তিমুর’ (Timur) বা ‘তিমুরলেন’ (Timurlane) নামে পরিচিত। যুবক তৈমুরের ডান পা এক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক কীভাবে তিনি খোঁড়া হয়েছিলেন, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি।একদল ইতিহাসবিদের মতে, একবার তৈমুর তার দলবল নিয়ে এক বণিকের ভেড়ার পাল লুট করতে যান। কিন্তু ফেরার পথে তৈমুর রাখালদের তীরের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন। তার ডান হাত এবং ডান পা চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি ‘খোঁড়া তৈমুর’ বা ‘তৈমুর-ই-লং’ নামে পরিচিত হন।তিনি পূর্বপুরুষ মহান সেলযুক সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান তুঘরিল বেগকে অনুপ্রেরণা হিসেবে অনুসরণ করতেন। তিনি তুঘরিল বেগের সরাসরি বংশধর না হলেও তুঘরিল বেগ যে অর্ঘুজ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই অর্গুজ গোত্রেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এবং তিনিও আলেকজান্ডার ও চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্বজয়ে সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হয়েছিলেন।তিনি পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজ দখলে এনে তৈমুরীয় সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত নেতৃত্বে আসীন ছিল। তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান, পাকিস্তান, ভারতবর্ষ এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত।এই অপরাজেয় সমরবিদ ইতিহাসের অন্যতম সফল সেনানায়ক হিসেবে পরিগণিত হন। তাঁর কারণেই তৈমুরীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই বংশ কোনো না কোনোভাবে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নেতৃত্বে আসীন ছিল। এ নিয়ে বিশ্ব বিজেতা তৈমুর লং, দিগ্বিজয়ী তৈমুর, দুনিয়া কাঁপানো তৈমুর লং নামের অনেকগুলো বইও রচিত হয়েছে। তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী। তৈমুরের কফিনের ঢালায় বড় করে লেখা ছিল, “যে আমার কবর খনন করবে, সে আমার চেয়েও ভয়াবহ এক শাসককে জাগিয়ে তুলবে” এবং “আমি যেদিন ফের জেগে উঠবো, সেদিন সমগ্র পৃথিবী আমার ভয়ে কাঁপবে!” তৈমুর নিজেকে ‘ইসলামের তরবারি’ হিসেবে জাহির করেন। কিন্তু ইতিহাসবিদগণ তার ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাননি। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি ইসলামকে স্রেফ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তৈমুর বাহিনী প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করে, যা তৎকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৫%।

সম্রাট বাবর

মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ( ১৪৮৩ -১৫৩০)সাধারণত বাবর, বাবুর নামেই বেশি পরিচিত। বাবর জন্মেছিলেন ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফারগানা প্রদেশের আনদিজান শহরে। ফারগানা বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত। তিনি ফারগানা প্রদেশের শাসনকর্তা ওমর মির্জার বড় পুত্র ছিলেন। তার স্ত্রী কুতলুক নিগার আনাম ইউনূস খান এর কন্যা ছিলেন। মঙ্গলদের থেকে উদ্ধুত বারলাস উপজাতিতে বেড়ে উঠলেও বাবরের জাতিতে তুর্কিও পারস্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ছিল।সম্রাট বাবরভারত উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট। তিনি তৈমুর লঙ্গ-এর সরাসরি বংশধর এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তিনি মির্জা ওমর সাঈখ বেগ এর পুত্র, এবংতৈমুরী শাসক উলুগ বেগ এর প্রপৌত্র ছিলেন। সম্রাট বাবর১৫২৬ সালেপানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লীর লোদি রাজবংশের সুলতান ইবরাহিম লোদিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মির্জা হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। পানি পথের যুদ্ধে তিনিই প্রথম কামানের ব্যবহার করেন। তার প্রখর রণকৌশলের কাছে হার মানে ইবরাহিম লোদি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...