সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

ইরান



ইরান দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। ইরানের সরকারী নাম ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান। ইরান ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত।ইরানের পূর্বে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান
, উত্তর-পূর্বে তুর্কমেনস্তিান, উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, উত্তর-পশ্চিমে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া এবং পশ্চিমে তুরস্ক ও ইরাক। উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের অপর পাড়ে রয়েছে কাজাখস্তান ও রাশিয়ার মতো বৃহৎ দেশ। আর দক্ষিণে রয়েছে পারস্য উপসাগর। সাগরের ওপারেই আছে কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।ইরান বিশ্বের সবচেয়ে পর্বতময় দেশগুলির একটি; এখানে হিমালয়ের পরেই এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ দামভান্দ অবস্থিত। প্রায় ২০০০ বছর ধরে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে ইরান নামে ডাকত। ইরান নামটি এই এলাকায় বসতি স্থাপনকারী আর্য গোত্রের নাম থেকে নেয়া। কিন্তু গ্রিকরা এই অঞ্চলকে পার্সিস (বর্তমান ইরানের ফার্স প্রদেশ) বলে ডাকত, এবং সেখান থেকে ইউরোপীয় ভাষায় এর নাম হয় পার্সিয়া , যা বাংলায় পারস্য।১৯৩৫ সালে ইরানের শাসক দেশটিকে ইরান নামেই সারা বিশ্বে পরিচিত গড়ে তোলে।দেশটির জনগণ জাতিগত ও ভাষাগতভাবে বিচিত্র হলেও এরা প্রায় সবাই মুসলিম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলটি ইসলামের শিয়া মতাবলম্বীদের কেন্দ্র। ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার আছে। পারস্য উপসাগরের অন্যান্য তেলসমৃদ্ধ দেশের মতো ইরানেও তেল রপ্তানি ২০শ শতকের শুরু থেকে দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

রাজধানী তেহরান ইরানের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী শহরটি ইরানের উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত।

আয়তন ১৬,৪৮,০০০ বর্গকিলোমিটার।সৌদি আরবের পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ইরান হচ্ছে বিশ্বের সবেচয়ে বড় আয়তনের দেশগুলোর তালিকায় ১৮তম যা ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের মোট আয়তনের সমান।

জনসংখ্যাঃ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ইরানের মোট জনসংখ্যা সাত কোটি ৮৫ লাখ। ইরান জাতিগতভাবে ও ভাষাগতভাবে বিচিত্র এক দেশ। কিছু কিছু শহরে, যেমন তেহরানে, বিভিন্ন জাতির লোকের সহাবস্থান পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও ইরানের বাইরে প্রবাসে আরও প্রায় ৪০ লক্ষ ইরানি নাগরিক বসবাস করেন। এরা মূলত উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, তুরস্ক, পারস্য উপসাগরীয় দেশসমূহ এবং অস্ট্রেলিয়াতে বাস করেন।

জাতিগোষ্ঠীঃ সিআইএ ফ্যাক্টবুক অনুসারে ইরানের জাতিগুলি এরকম: পারসিক জাতি ৫১%, আজেরি জাতি ২৪%, গিলাকি জাতি ও মাজান্দারানি জাতি ৮%, কুর্দি জাতি ৭%,আরব জাতি ৩%, লুর জাতি ২%, বেলুচি জাতি ২%, তুর্কমেন জাতি ২% এবং অন্যান্য ১%।

ধর্মঃইরানের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ জনগণ শিয়া মুসলমান। বর্তমানে ইরানের ৪ থেকে ৮% লোক সুন্নি মুসলমান, এদের অধিকাংশই কুর্দি ও বেলুচি। বাকি ২% অমুসলিম সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান, ইহুদি, বাহাই, মান্দীয়, ইয়েজিদি, ইয়ারসানি, জরথুস্ত্র প্রভৃতি সম্প্রদায়ের।

ভাষাঃ আধুনিক ফার্সি ইরানের সরকারি ভাষা। ফার্সি একটি প্রাচীন সাহিত্যিক ভাষা। ৭ম শতাব্দীতে আরবদের আক্রমণের আগে এটি পাহলভী লিপিতে লেখা হত। ৯ম ও ১০ম শতাব্দীতে ভাষাটি আরবি লিপি ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৯৫০ সাল পর্যন্তও কথ্য ফার্সির অনেকগুলি স্বতন্ত্র উপভাষা ছিল, তবে এর পর সরকারি শিক্ষা ও গণমাধ্যমের প্রসারের ফলে একটি মান্য কথ্য ফার্সির উদ্ভব ঘটেছে। এছাড়া কিছু সংখ্যালঘু ভাষাভাষী আছে যাদের নিজস্ব প্রচার মাধ্যম ও প্রকাশনা আছে। এদের মধ্যে তুর্কী ভাষা আজেরি, কুর্দী, আরবি ও আর্মেনীয় প্রধান।

মুদ্রা ইরানের সরকারী মুদ্রা রিয়াল।

ইতিহাস

পৃথিবীর বৃহৎ সভ্যতাগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায়পারস্যের ইতিহাসের সূচনা প্রায় এক লাখ বছর আগে থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বর্তমান ইরান ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য পারস্যের কেন্দ্র।ইরানের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের যার সূচনা হিসেবে বলা যায় ইরানী প্লেট-এ অবস্থিত আজারবাইজানের মানইয়ান সভ্যতা। এর পর আসে জাবোলের শহর-ই-সোখতা এবং প্রাচীন জিরফ্ট সম্রাজ্য যা এলাম সম্রাজ্য এবং আকামেনিদ সাম্রাজ্য দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।পরবর্তীতে আসে পার্সিয়ান এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য। পৃথিবীর উত্তরাংশ থেকে আর্যদের আগমনের পূর্বেই ইরানী প্লেটে অনেক প্রাচীন এবং প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অগ্রগামী সভ্যতার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় যদিও আর্য জাতির অনেক ইতিহাসই এখনও পর্যন্ত অনেক ঐতিহাসিকের কাছে অজানা রয়ে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল অনুসারে পারস্যের ইতিহাসের সূচনা ধরা হয়েছে প্যালিওলিথিক যুগের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১০০,০০০ বছর আগে।

ইসলামের আগমন

পারস্য সম্রাট কিসরা মহানবী (সা.)-এর প্রেরিত চিঠি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলেছিল। এ ঘটনা শুনে মহানবী (সা.) মুসলমানদের হাতে পারস্য বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁর ওফাতের অল্প দিনের মাথায় এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়। ওমর (রা.)-এর শাসনামলে

মুসলিমেরা ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য সাসানীয় সাম্রাজ্যে আক্রমণ শুরু করে। ইরানের তেহরান ও নিশাপুরে বিজিত হয়ে ইসলাম পারস্যে পৌঁছে।কিরমান, মাকরান, সিস্তান, খোরাসান, আজারবাইজান প্রভৃতি অঞ্চল একে একে মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। এভাবে মুসলমানদের পারস্য বিজয় সম্পর্কে মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। ৬৫১ সালে তারা সাসানিদ সাম্রাজ্যের পূর্ণ পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। এর পর প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ইরান আরব ইসলামিক সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে। এসময় মূল ইরানের বাইরে বর্তমান পশ্চিম আফগানিস্তানের হেরাতেও এই সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল। ইসলামের খলিফারা প্রথমে মদীনা, ও পরবর্তীকালে সিরিয়ার দামেস্ক ও শেষ পর্যন্ত ইরাকের বাগদাদ থেকে ইরান শাসন করতেন। ৯ম শতাব্দীর শেষে এসে পূর্ব ইরানে স্বাধীন রাজ্যের আবির্ভাব ঘটে এবং ১১শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাগদাদের আরব খলিফা ইরানের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

ইসলামের ইরান বিজয়ের পর ইরানীরা ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া শুরু করে। এর আগে বেশির ভাগ ইরানী সাসানিদ সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম জরথুষ্ট্রবাদে বিশ্বাসী ছিল ও কিছু সংখ্যালঘু ইরানী খ্রিস্ট ও ইহুদী ধর্মাবলম্বী ছিল। ১০ম শতকের মধ্যেই ইরানের অধিকাংশ জনগণ মুসলিমে রূপান্তরিত হয়, এবং এদের আধিকাংশই ছিল সুন্নী মুসলিম, তবে কেউ কেউ শিয়া ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন ধারা অনুসরণ করত। এদের মধ্যে ইসমাইলি নামের একটি শিয়া গোত্র এলবুরুজ পর্বত এলাকার রুদাবার অঞ্চলে ১১শ থেকে ১৩শ শতক পর্যন্ত একটি ছোট কিন্তু স্বাধীন রাজ্যে বসবাস করত। হযরত আলী (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.)-এর মৃত্যুর প্রায় এক হাজার বছর পর প্রাচীন সাফাভি(১৫০৪-১৭৩৬) সাম্রাজ্য (আজকে যা ইরান) ইরাকের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।সাফাভি সাম্রাজ্যই ইরানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে শিয়া ধর্মকে প্রবর্তন করেছিল। ১৫০১ সালে সাফাভি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে ইরানে সুন্নি ধর্মের প্রচলন ছিল।

১৫০১ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাজতন্ত্রী ইরান হয় শাহ কিংবা রাজারা শাসন করতেন। দেশটির জনগণ জাতিগত ও ভাষাগতভাবে বিচিত্র হলেও এরা প্রায় সবাই মুসলিম। শতাব্দীরপর শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলটি ইসলামের শিয়া মতাবলম্বীদের কেন্দ্র। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত সংবিধান এবং ১৯৮৯ সালের সংশোধনী ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। সংবিধানে ইসলাম ধর্মের শিয়া মতটিকে ইরানের রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।আলি খামেনেই বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। আর হাসান রুহানি দেশটির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। আরও আছে ২৯০ সদস্যবিশিষ্ট এককাক্ষিক আইনসভা।

ইশনা আশারিয়া বা দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী শিয়া

ইরাক, ইরান, আজারবাইজান, লেবানন ও বাহরাইনের অধিকাংশ মানুষ এর অনুসারি। এছাড়া পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কুয়েত ও আলবেনিয়ার অনেক মানুষ ইশনা আশারিয়া শিয়া। এদের ধারনা, মুহম্মদের মৃত্যুর পর হযরত আলী হচ্ছেন মুসলমানদের বৈধ নেতা বা ইমাম। সাহাবাগণ হযরত আলীকে ইমাম না বানিয়ে আবু বকর-ওমর-উসমানকে খলিফা বানিয়েছে, যা আল্লাহর আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন।এরা ইশনা আশারিয়া বা বার ইমামিয়া বা জাফরিয়া উপশাখা।

প্রথাগত সুন্নী ইসলামের সাথে শিয়া মতবাদের মৌলিক পার্থক্য ইসলামের নেতৃত্ব বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শিয়াদের বিশ্বাস যাঁরা হজরত আলী (রাঃ) এবং সায়্যিদা ফাতিমা (রাঃ) এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর বংশধর অর্থাৎ যাঁরা সায়্যিদ, শুধুমাত্র তাঁরাই ইসলামের খলিফা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাদের আরো বিশ্বাস এই খলিফাগণ ঐশ্বরিকভাবে নিয়োজিতহন, মনুষ্য যাচাই বাছাইয়ের ভিত্তিতে নয়। ১২ জন ইমাম হলেন –১। ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ),২। ইমাম হাসান ইবনে আলী (রাঃ),৩। ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ),৪। ইমাম জয়নাল আবেদিন (রাঃ),৫। ইমাম মুহাম্মাদ আল বাকের (রাঃ),৬। ইমাম জাফর সাদেক (রাঃ)

৭। ইমাম মুসা আল কাজিম (রাঃ),৮। ইমাম আলী রেজা (রাঃ),৯। ইমাম মুহাম্মাদ আল তাক্বি (রাঃ)

১০। ইমাম আলী আন নাক্বি (রাঃ),১১। ইমাম হাসান আল আসকারি (রাঃ),১২। ইমাম মুহাম্মাদ আল মাহদি (আঃ)।১২ ইমামের মতবাদটি ধারণ করে ইসনা আশারিয়্যাহ শিয়ারা। শিয়াদের মধ্যে এটাই সর্ববৃহৎ দল, মোট শিয়া জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮৫ ভাগই হল ইসনা আশারিয়্যাহ।

ইসলামি বিপ্লব -১৯৭৯

ইরানের ইসলামী বিপ্লব, বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের কষাঘাতে নিস্পেষিত ইরানি জনগণ ইমাম খোমেনী (রহ.)-র নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে এই বিপ্লব সফল করেন।এ বিপ্লবকে বলা হয় ফরাসি এবং বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব।ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী আর প্রভাবশালী শাহী রক্তের ধারক ছিলেন তিনি। তার বংশ গত আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। শুরুটা করেছিলেন তারই পূর্বপুরুষ মহান কুরুশ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। সেই বংশের শেষ সম্রাট ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বিপ্লবী দেশবাসীর কাছে পরাজিত হয়ে মিশর পলায়ন করে। কিছু দশক আগে রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান। সর্বময় ক্ষমতা ছিলো পার্লামেন্টের হাতে এবং নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সেই ক্ষমতা ভোগ করতেন।১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ বিপ্লবের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ইসলামী বিপ্লবের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ।ইরানের বিপ্লব বিশ্বের ন্যায়কামী ও নির্যাতিতদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।বিভিন্ন মুসলিম দেশে যুবকরা ইসলামী বিপ্লবের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হতে থাকে

রুহুল্লাহ খোমেনী

রুহুল্লাহ খোমেনী (১৯০২ –১৯৮৯), যিনি পশ্চিমা বিশ্বে আয়াতুল্লাহ খোমেনী হিসেবে পরিচিত ছিলেন একজন ইরানি রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী ও ধর্মীয় নেতা। তিনি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা কান্ডারী । রুহুল্লাহ খোমেনী ১৯০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইরানের খোমেন শহরের একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তার পুরো নাম সৈয়দ রুহুল্লাহ মুসাবি খোমেনি। বংশ পরম্পরায় এ মহান নেতার পরিবার সমাজকে ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দেয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

ইমামের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পবিত্র কুরআন হেফ্‌জ করার মধ্যদিয়ে। এরপর তিনি ইরানের আরাক শহরে ১৯২০-২১ সালেএবং পরবর্তীতে কোমে ১৯২৩ সালেধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৩০ এর দশকে ইমাম খোমেনী (রহ.) কোমের ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রের ছাত্রদের ইসলামি আইনশাস্ত্র শিক্ষা দেন।১৯৫০ এর দশকে তিনি ইসলামি ফিকাহশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করে মুজতাহিদ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ইমামের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।১৯৬৩ সালে তিনি তত্‌কালীন শাহ সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন ও আমেরিকার পদলেহী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সে সময় মোহাম্মাদ-রেজা শাহ ইরানে কথিত স্বেতবিপ্লব শুরু করেছিলেন।ইমামের নেতৃত্বে দেশে বসবাসরত ইরানি জনগণের পাশাপাশি সারাবিশ্বে অবস্থানরত ইরানিরা শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবি তৎপরতা শুরু করে। ১৯৭৮ সালে ইরানে যখন চরম অস্থিরতা এবং সহিংসতা শুরু হয়, আয়াতুল্লাহ খোমেনি তখন ইরাকে শিয়াদের পবিত্র নগরী নাজাফে কড়া পাহারায় নির্বাসিত জীবনে ছিলেন।ইরাকে তখন সাদ্দাম হোসেনের শাসন।ইরানের শাহ আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে ইরাক থেকে বহিষ্কারের জন্য সাদ্দাম হোসেনকে অনুরোধ করেন।চরম ভুল করেছিলেন শাহ। বহিষ্কৃত খোমেনীফ্রান্সে পাড়ি জমালেন এবং সেখান থেকে সহজে সারা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন।তার আপসহীন এবং জোরালো সব বক্তব্যের কারণে দ্রুত তিনি সারা বিশ্বের নজর কাড়েন।১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি এককালের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাহ এবং তার রানী দেশ ত্যাগ করেন। সারা দুনিয়া তখন সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল এই রাজ দম্পতির জন্য। প্লেনের উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। খোমেনি দেশে ফেরার সুযোগ পান এবং ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে । এর মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজীরবিহীন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন ইমাম খোমেনী (রহ.)। বিপ্লবের পর খোমেনী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান মোতাবেক জাতির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বহনকারী সর্বোচ্চ নেতার পদে অধিষ্ঠিত হন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালের ২৩ মে মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ইমামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং এর ১১ দিন পর ৪ জুন তিনি ৮৭ বছর বয়সে তেহরানের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাযার নামাজে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।

নোবেল জয়ী

ইরানের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শিরিন এবাদি। তিনি ইরানের হামাদানে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৪ সালের ২১ জুন। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন।২০০৩ সালে তিনি প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। শিরিন এবাদি প্রথম ও একমাত্র ইরানি নারী হিসেবে পুরস্কারটি পান। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, বিশেষত নারী, শিশু এবং শরণার্থী অধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য শিরিন এবাদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নারীর জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমতার উন্নয়নে তিনি কাজ করে চলেছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর থেকে এবাদি বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা ও শিক্ষা প্রদান করে অসংখ্য পুরস্কার জিতেছেন।

সামরিক বাহিনী

ইরানে দুই ধরনের সেনাবাহিনী রয়েছে। একটি প্রথাগত সেনাবাহিনী ও বৈপ্লবিক সুরক্ষা বাহিনী।

সেনাবাহিনী

এর ৪ টি ভাগ রয়েছে। ভূ সেনা , নৌ সেনা , বায়ু সেনা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সেনা। তবে তাদের বায়ু সেনার বিমানগুলো অধিকাংশ পুরোনো প্রযুক্তির।

প্রশাসনিক অঞ্চল

ইরান ৩০টি প্রদেশে বিভক্ত। ফার্সি ভাষায় এগুলির নাম ওস্তান । প্রতিটি প্রদেশ একটি স্থানীয় (সাধারণত বৃহত্তম) শহর থেকে শাসিত হয়, যাকে প্রদেশটির রাজধানী বলা হয়। প্রদেশের প্রশাসক হিসেবে থাকেন একজন গভর্নর এবং তাকে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় নিয়োগদান করে।প্রতিটি প্রদেশ আবার অনেকগুলি অংশে বিভক্ত, যাদেরকে ফার্সি ভাষায় বলে শাহ্‌রেস্তান প্রতিটি শাহ্‌রেস্তান আবার অনেকগুলি জেলায় বিভক্ত, যেগুলিকে বাখ্‌শ বলে। একেকটি শাহ্‌রেস্তান সাধারণত একাধিক শহর এবং অনেক গুচ্ছগ্রাম নিয়ে গঠিত। শাহ্‌রেস্তানের একটি শহরকে সাধারণত সেটির রাজধানী বা কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদা দেয়া হয়।

প্রদেশ

১৯৫০ সাল অবধি ইরান ১২টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল: আর্দালান, আজারবাইজান, বালুচিস্তান, ফারস, জিলান, আরাক-ই-আজম, খোরাসান, খুজেস্তান, কেরমান, লারেস্তান, লোরেস্তান এবং মাজান্দারান।১৯৫০ সালে ইরানকে ১০টি প্রদেশে এবং তার অধীনে অনেকগুলো গভর্নরেটে ভাগ করা হয়: গিলান; মাজান্দারান; পূর্ব আজারবাইজান; পশ্চিম আজারবাইজান; কের্মানশাহ; খুজেস্তান; ফার্স; কের্মান; খোরাসান; ইসফাহান। ১৯৬০ হতে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এক এক করে অনেকগুলো গভর্নরেটকে প্রদেশে উন্নীত করা হয়। সর্বশেষ ২০০৪ সালে তৎকালীন সর্ববৃহৎ খোরাসান প্রদেশকে তিন ভাগে ভাগ করে তিনটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়।

প্রাকৃতিক অঞ্চল

ইরানের অভ্যন্তরীণ মালভূমিগুলি প্রায় সম্পূর্ণরূপে পর্বতবেষ্টিত। জগ্রোস পর্বতমালা প্রধান পর্বতমালা এবং এটি দেশটির ভেতরে দিয়ে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে ১,৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্য জুড়ে বিস্তৃত। পারস্য উপসাগরের উত্তর উপকূলের খোঁজেস্তন ছাড়া পশ্চিম ইরানের প্রায় পুরোটাই জগ্রোস পর্বতমালায় গঠিতপর্বতমালাটির মধ্য অংশ প্রস্থে প্রায় ৩৪০ কিমি চওড়া। এর অধিকাংশ চূড়া ৪,০০০ মিটারেরও অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট। এদের মধ্যে ৪,৫৪৭ মিটার উঁচু জার্দ কুহ সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। ২,৩০০ মিটারের চেয়ে উঁচু শৃঙ্গগুলিতে অনেক পানি জমা হয় এবং এগুলি নিচের উপত্যকায় ভূ-গর্ভস্থ পানি আকারে নেমে আসে। এই উপত্যকাগুলি সমুদ্রতল থেকে ১২০০ থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হলেও যথেষ্ট উর্বর এবং এগুলিতে বিভিন্ন ধরনের শস্যের আবাদ করা হয়।

ইরানের উত্তর প্রান্তে একটি খাড়া, সরু পর্বতমালা কাস্পিয়ান সাগরের পুরো দক্ষিণ তীর জুড়ে অবস্থিত; এর নাম আলবোর্জ পর্বতমালা। এই পর্বতমালাটি প্রায় ৬০০ কিমি দীর্ঘ এবং এর গড় প্রস্থ প্রায় ১০০ কিমি। ইরানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ দামভান্দ (৫,৬৭০ মি) এই পর্বতমালার মধ্যভাগে অবস্থিত। আলবোর্জের আরও অনেকগুলি চূড়া ৩,৬০০ মিটার ছাড়িয়ে গেছে। এই পর্বতমালার উত্তর ঢালের অরণ্যে সারা বছর ধরে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এই পর্বতমালা ও কাস্পিয়ান সাগরের অন্তর্বর্তী স্থানে গড়ে ২৪ কিমি প্রস্থবিশিষ্ট একটি উর্বর সমভূমি আছে। আলবোর্জ পর্বতমালার পূর্বে সমান্তরাল কতগুলি পর্বতমালা রয়েছে, যেগুলি ২৪০০ থেকে ২৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এই পর্বতমালাগুলির মাঝে অনেক সরু, আবাদী উপত্যকা আছে। ইরানের পূর্ব সীমান্ত ধরে অনেকগুলি অপেক্ষাকৃত নিম্ন উচ্চতার শৈলশিরা চলে গেছে; এদেরকে একত্রে পূর্বের উঁচু অঞ্চল নামে ডাকা হয়।

এই পর্বতমালার বেষ্টনীর মাঝের নীচু এলাকাকে একত্রে কেন্দ্রীয় মালভূমি নামে ডাকা হয়। এদের মধ্যে আছে মধ্য-উত্তর ইরানের দাশ্‌তে কাভির নামের একটি বিরাট লবণাক্ত মরুভূমি, দক্ষিণ-পূর্বের দাশ্‌তে লুত নামের নুড়ি ও বালির মরুভূমি এবং একাধিক উর্বর মরূদ্যান।

ইরানের পর্বতগুলি একটি সক্রিয় ভূমিকম্প এলাকার উপর অবস্থিত, এবং প্রতি বছর এখানে বহু ছোট আকারের ভূমিকম্প হয়। বড় আকারের ভূমিকম্প কিছুদিন পর পরই ঘটে এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৮শ শতকে ভূমিকম্পের কারণে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ শহর দুইবার মাটিতে মিশে যায় এবং প্রতিবার প্রায় ৪০,০০০ করে লোক মারা যায়। ২০শ শতকের মধ্যভাগ থেকে দেশটিতে অনেকগুলি বড় আকারের ভূমিকম্প ঘটেছে যাতে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৯০ সালের জুনে আলবোর্জ ও জগ্রোসের মিলনস্থলে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৩৭,০০০ লোক মারা যান। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ ইরানে এক ভূমিকম্পে প্রাচীন নগরী বামের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রায় ৩০,০০০ লোক মারা যান। ইরানের অনেকগুলি পর্বত আগ্নেয়। এদের মধ্যে কেবল দামভান্দ পর্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের কুহে তাফতান সক্রিয় আগ্নেয়গিরি; এদের চূড়ার কাছে কিছু সময় পর পর গ্যাস নিঃসরিত হয়।

নদী ও জলাশয়

ইরানে অনেক নদী আছে, কিন্তু এগুলির প্রায় সবগুলিই স্বল্পদৈর্ঘ্য ও অগভীর এবং নৌপরিবহনের অযোগ্য। কারণ দেশটির একমাত্র নৌপরিবহনযোগ্য নদী এবং এটি দক্ষিণ-পশ্চিমের আহওয়াজ শহরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বেশির ভাগ নদীর উৎপত্তি পার্বত্য অঞ্চলে এবং সমাপ্তি অভ্যন্তরীণ উপত্যকায়। প্রাচীনকাল থেকে ইরানের অধিবাসীরা নদীগুলিকে সেচকাজে ব্যবহার করে আসছে। ২০শ শতকে আব-এ দেজ, কারখেহ, কারুন, সেফিদ রুদ ও অন্যান্য নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে সেচকাজের পরিধি বাড়ানো হয় এবং জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। তিনটি নদী ইরানের আন্তর্জাতিক সীমানায় প্রবাহিত হয়। আরাস নদী আর্মেনীয়া ও আজারবাইজানের সাথে সীমান্তে, শাত-আল আরাব নদী ইরাকের সাথে সীমান্তে প্রবাহিত। ইরান চারটি দেশের সাথে বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ কাস্পিয়ান সাগরের অংশীদার। অনেক ছোট ছোট নোনাপানির হ্রদ ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থিত, এদের মধ্যে উত্তর-পশ্চিমের ঊর্মিয়া হ্রদ সবচেয়ে বড়। উঁচু পর্বত উপত্যকা এলাকায় কিছু মিষ্টি পানির হ্রদের দেখা মেলে।

অর্থনীতি

পর্যটন

ইরানের সর্বত্র পর্যটকদের জন্য আকর্ষনীয় অনেক ঐতিহাসিক স্থান আছে। বাম শহরে বিখ্যাত রেশম পথের উপর ২০০৩ সাল পর্যন্তও আর্গ-এ বাম নামে বিশ্বের বৃহত্তম adobe জাতীয় দালানটি অবস্থিত ছিল, তবে দুর্ভাগ্যবশত ২০০৩ সালে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২০০০ বছরের পুরনো দালানটি প্রায় পুরো ধ্বংস হয়ে যায়। এই একই ভূমিকম্পে বাম শহরের আরও অনেক প্রাচীন দালানও ধ্বংস হয়। ইরান সরকার এগুলি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

কের্মানশাহ প্রদেশে রয়েছে বেহিস্তুনের শিলালিপি, যাতে পাহাড়ের গায়ে প্রাচীন পারসিক, ব্যাবিলনীয় এবং এলামীয় অক্ষরে অনেক খোদাইকৃত লেখা পাওয়া যায়। গ্রিকেরা ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এই শিলালিপিটির উল্লেখ করেছিল।

খুজেস্তান প্রদেশে চোগা জানবিল নামে এলামীয় সভ্যতার একটি প্রাচীন কম্পলেক্স রয়েছে। এটি খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ শতকে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

ইশফাহান শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বিখ্যাত নক্‌শ-ই জাহান ময়দান। এই ময়দান চারপাশ ঘিরে রয়েছে সাফাভিদ রাজত্বের অনেকগুলি প্রাচীন নিদর্শন, যাদের মধ্যে দক্ষিণের শাহ মসজিদটি অন্যতম। শাহ মসজিদের জুম্মা নামাজ এখানেই পড়া হয়।

পাসারগাদায়ে একটি প্রাচীন এলামীয় শহরের ধ্বংসাবশেষ। ফার্স প্রদেশে অবস্থিত শহরটি আর্কেমেনীয় পারসীয় সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল। এর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে পার্সেপোলিস শহর, যা প্রাচীন পারস্যের বিখ্যাত রাজা দ্বিতীয় কুরোশ খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই শহরের নানা স্থাপত্যকর্ম ও খোদাইকর্মে প্রাচীন পারসিকদের সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়।

এছাড়াও উত্তর-পশ্চিম ইরানের সোলতানিয়েহ শহরের ধ্বংসাবশেষ, বিশেষত ইল-খান ওলজেইতু-র সমাধিস্তম্ভ দর্শনীয় স্থান। পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশে আছে রাজা সুলায়মানের স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থান তাখ্‌ত-ই-সুলাইমান।

এছাড়াও ফার্স প্রদেশের তাঙ্গে বোলাগি নামের উপত্যকায় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫ সহস্রাব্দ প্রাচীন ১৩০টি মনুষ্য বসতির নিদর্শনবিশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান বিদ্যমান।

খাদ্য

সাধারণত ইরানের প্রধান খাবারের মধ্যে আছে চাল, মাংস (যেমন ভেড়ার, মুরগিবা মাছ), সবজির (যেমন পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন শাক) সাথে বাদামের মিশ্রণ এবং বাদাম। তাল, ডালিম, কুইন, প্রুনিস, খুরফু, এবং রেসিনসের মতো ফলের সাথে প্রায়শইসবুজ গুল্ম ব্যবহার করা হয়। ইরানীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মশলার মধ্যে আছে জাফরান, শুকনো লেবু, দারুচিনি এবং পেসলে যা বিশেষ খাবারের সাথে ব্যবহৃত হয়।

৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন ইরানিরা একটি বিশেষ মজার খাবার তৈরি করেছিল যা গোলাপের পানি ও সেমাই দিয়ে তৈরি করা হতো। যা গ্রীষ্মকালে রাজপ্রাসাদে পরিবেশন করা হতোবরফকে জাফরান এবং ফল ও অন্যান্য স্বাদের সঙ্গে মিশ্রিত করা হতো। আজকের দিনে সর্বাধিক জনপ্রিয় ইরানী মিষ্টি জাতীয় খাবার হচ্ছে আধা জমায়িত নুডলস দিয়ে তৈরী ফালুদা যার শিকড় সাবেক রাজধানী শিরাজ শহরে। বাস্তানি ই জামেরানী ফার্সি শব্দের অর্থ জাফরান আইসক্রিম একটি ঐতিহ্যবাহী ইরানী আইসক্রিম যা সাধারণত "ঐতিহ্যবাহী আইসক্রিম" নামে পরিচিত। অন্যান্য প্রকারের ইরানী ডেজার্টগুলি বিভিন্ন ধরনের চাল, গম ও দুগ্ধবৈচিত্র্যে তৈরি হয়।

তেল

ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার আছে। দেশটিতে পুরো বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক তেলের ১০ শতাংশ মজুদ আছে। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ।

ইরান বিশ্বের ২য় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ।

বিশ্বকাপ ফুটবল 

ফুটবলে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে তাদেরকে গণ্য করা হয়। এ পর্যন্ত তিনবার এশিয়ান কাপ এবং চারবার এশিয়ান গেমস ফুটবলে স্বর্ণপদক পেয়েছে। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা ইরান ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ খেলে। এরপর আরো পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনোবারই গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি আলি দাইয়ের ইরান।অন্যদিকে, এএফসি এশিয়ান কাপে ইরান অন্যতম সফল দল, যেখানে তারা ৩টি (১৯৬৮, ১৯৭২ এবং ১৯৭৬) শিরোপা জয়লাভ করেছে। এছাড়াও, ইরান এপর্যন্ত ৪ বার (২০০০, ২০০৪, ২০০৭ এবং ২০০৮) ডাব্লিউএএফএফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়লাভ করেছে।জাভাদ নেকুউনাম, আলী দাই, আলী করিমি, সর্দার আজমুন এবং করিম আনসারিফার্ডের মতো খেলোয়াড়গণ ইরানের জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন।মুহাম্মদ আল-দিয়ায়া , সামি আল-জাবির, মুহাম্মদ আল-খিলাইউই, মোহাম্মদ আল-সাহলাউই এবং তাইসির আল-জাসিমের মতো খেলোয়াড়গণ সৌদি আরবের জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন।


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...