সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পতন: ক্ষমতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়

মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...

ব্রুনাই

 


ব্রুনাই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার তেল সম্পদে সমৃদ্ধ একটি ধনী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় নাম নেগারা ব্রুনেই দারুস সালাম।এটি একটি রাজতান্ত্রিক ইসলামী দেশ।বোর্নিও দ্বীপ পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। দ্বীপের একটি অংশ ব্রুনাই। আর বাকি অংশে আছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। বোর্নিওর উত্তর-পশ্চিম উপকূলেঅবস্থিত ব্রুনাই। দেশটি দক্ষিণ ও পূর্বে সারাওয়াক রাজ্য দ্বারা বেষ্টিত। পশ্চিম ও উত্তরে দক্ষিণ চীন সাগর। ব্রুনাই দুইটি আলাদা এলাকা নিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে পশ্চিমেরটি বৃহত্তর। দুই এলাকাতেই সমুদ্র বন্দর আছে। তবে দুইটিকেই মালয়শিয়ার সারাওয়াক প্রদেশ ঘিরে রেখেছে। ব্রুনাই জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ এবং আসিয়ানের সদস্য।

রাজধানী : বন্দর সেরি বেগাওয়ান

আয়তন : ৫ হাজার ৭৬৫ বর্গ কিমি।(১৭২ তম)

জনসংখ্যা : ৪১ লাখ পাঁচ হাজার ৭১৭ জন।

ধর্ম : সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক তথ্যমতে ৭৯% মুসলিম, ৯% খ্রিস্টান , ৮% বৌদ্ধ এবংবাকী ৪.৭% আদিবাসী সহ বিভিন্ন ধর্মের ।

রাষ্ট্রধর্ম : ব্রুনাইয়ের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম।

ভাষা: মালয় ভাষা ও ইংরেজি ভাষা ব্রুনাইয়ের সরকারি ভাষা। ব্রুনাইয়ের অর্ধেকেরও বেশি লোকের মাতৃভাষা মালয় ভাষা। অন্যদিকে ইংরেজি মাতৃভাষী লোকের সংখ্যা হাজার দশেক। এখানকার প্রায় ১২% লোক চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষাতে কথা বলেন। এছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যালঘু ভাষা প্রচলিত। মালয় ভাষা দেশটির সার্বজনীন ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা, তবে ইদানীং পর্যটন ও বাণিজ্যে ইংরেজি ভাষার প্রসার বেড়েছে।

মুদ্রা : ব্রুনাই ডলার। ১মার্কিন ডলার = ১.৯৩ ব্রুনাই ডলার।

ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা : ১ জানুয়ারি ১৯৮৪

জাতিসংঘে যোগদান : ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪

নামকরণ

ইসলামের আগমন ও মুসলমানদের অবস্থা

ব্রুনাইতেও খ্রিষ্টিয় চৌদ্দ শতকে কিংবা পণেরো শতকের শুরুর দিকে জনগণ ইসলামে দীক্ষা লাভ করেছিল। ১৪০৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজতান্ত্রিক ব্রুনাই ইসলামে প্রবেশ করার পর তৎকালীন বাদশা নিজের নাম ‘মুহাম্মাদ’ রেখেছিলেন। এই নাম নিয়েই তিনি তাঁর শাসনকার্য বা হুকুমাত শুরু করেছিলেন। এই দেশে ইসলাম বিস্তারের পর ব্রুনাইয়ের সম্মান এবং মর্যাদা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে বলা হয়ে থাকে ইতিহাসের স্বর্ণযুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম আসার পর ব্রুনাইতে জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বোরনিও দ্বীপ, মালয়েশিয়ার পূর্ব দ্বীপ, বর্তমান ফিলিপাইনের মূল ভূখণ্ড এবং সিঙ্গাপুর এই কটি ভূখন্ড নিয়ে একটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ঐ সাম্রাজ্য ব্রুনাই সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে।

বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বহু মুসলিমের কবরের এপিটাফ থেকে অনুমান করা হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে ব্রুনাইয়ে ইসলামের আগমন ঘটেছে। ঐতিহাসিকদের মতে ১৩৭৬ সালে সুলতান মুহাম্মাদ শাহ (ওয়াং লেক বেতাতা) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ১৪০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ব্রুনাই রাজ্য শাসন করেন। ১২৬৪ খ্রিস্টাব্দের রাঞ্জেস কবরস্থানের ‘বু কেন সু মিনাহ’-এর কবরও তার মুসলিম হওযার প্রমাণ বহন করে। চীনা ঐতিহাসিকদের মতে, ‘বু’ চৈনিক মুসলিম পরিবারের নাম। চীনের কঞ্জো শহর থেকে এসেছিলেন। চীনে অনেক আরব ও ফরাসিদেরও বসবাস ছিল। তাছাড়া ওই কবরের পাশে আরও অনেক মুসলমানের কবর আছে, যাতে প্রমাণিত হয় ইসলাম ধর্মের মানুষ অন্তত দ্বাদশ শতাব্দীর আগে এখানে এসেছে।

চীনের ইতিহাস অনুযায়ী, ‘বো লাশি’ (মুসলিম নাম আবু লাইস) নামে একজন চৈনিক মুসলিম দশম শতাব্দীতে ব্রুনাইয়ে আসেন, যিনি পেশায় কূটনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তখনকার রাজা ‘হিয়াংতা’ তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবর্ধনা জানান। আরো জানা যায়, ব্রুনাই থেকেও একটি দল চীনে গিয়েছিল। সঙ্গে দলনেতা হিসেবে ছিল ‘বু আলি’ (আবু আলি) নামের একজন মুসলিম। ব্রুনাইয়ের রাষ্ট্রপ্রধান তখনও মুসলিম না হলেও রাষ্ট্রের উচ্চপদে বহু মুসলিম ছিল।

আরব, পারস্য, ভারত ও চীন থেকে আগত ব্যবসায়ী ছাড়াও সুলতান মাহমুদ শাহের ইসলাম গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্রুনাইয়ে ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রসার হয়। তাছাড়া এ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর শরিফ আলী নামের একজন ইসলামপ্রচারকের আগমন ঘটে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সুলতান আহমদের কন্যাকে বিয়ে করেন। স্থানীয় বহু ইসলামপ্রচারকের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। ফলে আশপাশের বহু অঞ্চলে দ্রুততর সময়ে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। শ্বশুর আহমাদের পর রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। অত্যধিক খোদাভীতি ও ন্যায়পরায়ণতার দরুন ‘সুলতানুল বারাকাহ’ বা পুণ্যবান শাসক উপাধি পান। তিনি শুধু শাসকই ছিলেন নন; বরং জুমার নামাজের ইমাম ও জাতির ধর্মীয় দিকনির্দেশকও ছিলেন। সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেন ইসলামের শিক্ষা ও আর্দশ। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম কর্মকর্তা স্যার টমাস স্টেমফোর্ড রাফেল্স তার বিখ্যাত

The History of Java বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘আলীর ইসলামি কার্যক্রমগুলো কেবল ব্রুনাইতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তার কার্যক্রমের প্রভাব ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি এ কার্যক্রম ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলেও পৌঁছে যায়।১৫শ শতাব্দীতে যখন একজন মালয় মুসলিম সুলতান হিসেবে অভিষিক্ত হন, তখন থেকেই ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতান ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামী ঐতিহ্যকে সমর্থন করছিলেন, যদিও দায়িত্ব সাধারণত নিযুক্ত কর্মকর্তাদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৩০-এর দশক থেকে সুলতানরা মসজিদ নির্মাণ এবং ধর্ম বিষয়ক বিভাগের বিস্তৃতির সাথে সাথে ইসলামের ব্যাপক সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা, যার মধ্যে হজ্জও অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং ইসলামকে উন্নীত করার জন্য ক্রমবর্ধমান তেলের রাজস্ব ব্যবহার করেছেন।

১৯৫২ সালে সুলতান তৃতীয় ওমর আলী সাইফুদ্দিন ব্রুনাইয়ের বন্দরের অত্যাধুনিকায়ন শুরু করেন। তাকেই আধুনিক ব্রুনাইয়ের স্থপতি বলা হয়। আজ অবধি ব্রুনাই নগর সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উন্নয়নের কেন্দ্রভূমি হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া ‘সুলতান ওমর সাইফুদ্দিন জামে মসজিদ’ এবং ‘ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র’ স্থাপনের মাধ্যমে ইসলামের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত হয় ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার। ইসলামী ভাবাদর্শ বাস্তবায়নে সেরিবাগাওয়ানে ১৯৭২ সালে টিচার্স কলেজ, ১৯৯১ সালে ইসলামী ব্যাংক, ১৯৯২ সালে ‘দারুস সালাম ব্রুনাই (পবিত্র কোরআনের) মাসহাফ প্রকল্প’ সরকারিভাবে স্থাপিত হয়। ১৯৯৩ সালে ‘তাহফিজুল কোরআন ইনস্টিটিউট’, ১৯৯৯ সালে ‘সুলতান ওমর আলী সাইফ ইসলামিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউট’সহ অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৯ সালে বিশ্বে সর্বপ্রথম ব্রুনাই হালাল নামে হালাল পণ্যে বাণিজ্যিক ব্রান্ড চালু করা হয়।ওমানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অরগানাইজেশন্স’ ২০১৯ সালের জন্য ব্রুনাই দারুসসালামকে এশিয়ার ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করে। শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক থেকে আধুনিক ব্রুনাই প্রত্নতত্ত্ব ও স্থাপত্যের উজ্জ্বল নির্দশন হিসেবে মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত।

ইতিহাস

চতুর্দশ শতাব্দী হতে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রুনাইয়ের সুলতান ব্রুনাইকে শাসন করছে। এই অঞ্চলটি বোর্নিও এর উত্তরাঞ্চল এবং ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রুনাই সালতানাত ছিল শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে জলদস্যুদের আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে এর শক্তি কমে আসতে থাকে।ব্রুনাই সাম্রাজ্যের শক্তিও উপনিবেশবাদী হল্যান্ড এবং উপনিবেশবাদী বৃটেনের শক্তির মতোই ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পেতে ক্ষয়ের অতলে হারিয়ে গিয়েছিল। ১৮৮৮ সালে এক চুক্তি বলে ব্রুনাই ব্রিটেনের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ব্রুনাই ১৮৮৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের আশ্রিত রাজ্য হিসেবে ছিল। ১৯৪১ সালের ১৬ ডিসেম্বর (পার্ল হারবারে বোমা হামলার ৮দিন পর) জাপানি সৈন্যরা ব্রুনেইতে হানা দেয়। ১০ হাজার জাপানি সেনার দল ৬ দিন যুদ্ধের পর দখল করে নেয় পুরো ব্রেুনেই। ১৯৪৫ সালে মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় অস্ট্রেলীয় ৯ম ডিভিশন অবতরণ করে ব্রুনেইতে। তিন দিনের ভয়াবহ যুদ্ধের পর ১০ হাজার জাপানি সৈন্যের কমান্ডার জেনারেল মাসাও বাবার অধীন সেনারা আত্সমর্পণ করে। ব্রিটিশ সেনারা জাপানিদের কাছ থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয় এবং পরের বছরের জুলাই পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। ব্রিটেনের সঙ্গেও ব্রুনাইকে করতে হয়েছে অনেকগুলো শান্তি-সমঝোতা চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও চুক্তি রয়েছে তাদের। মালয় অঞ্চলে একমাত্র ব্রুনাই ১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে ব্রিটেনের অধিভুক্ত হয়ে থেকে যায়। ১৯৭৯ সালের ৭ জানুয়ারি ব্রুনাই সুলতান ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রুনাই পুরোপুরি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৫৯ সালের সংবিধান অনুযায়ী পাদুকা সেরি বাগিন্দা সুলতান হাসসান আল বলকিয়াহ হলেন দেশের প্রধান।ব্রুনাই ২০১৪ সালে ইসলামি শরিয়া আইনে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেয়ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান আল বলকিয়া এ আইন চালুর ঘোষণা দেন। ১৯৮৭ সালে হজ করে আসার র থেকেই গত তিন দশকে সুলতান ধর্মের দিকে বেশি করে এগিয়েছেন। তিনি শরিয়া আইন চালু করার ক্ষেত্রে বারবারই আল্লাহর দিক থেকে আসা বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দিয়েছেন। ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল ইসলামি শরিয়া আইন চালু হয়েছে। ইসলামী শরিয়া মোতাবেক দেশ চালানোর কথা পুণর্ব্যক্ত করে ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান আল বলকিয়া বলেন, ব্রুনাই সর্বদা আল্লাহর কাছে অনুগত থাকবেএবং দেশের আইন কানুন শরীয়া অনুযায়ী চলবে।নাগরিকদের বেশি বেশি ধর্মীয় চর্চার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু মসজিদেই নামাজ আদায়কে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। মানুষের মধ্যে ধর্মীয় প্রেরণা বাড়াতে উন্মুক্ত স্থানে নামাজ আদায় করতে হবে।শরিয়াহ আইনের কারণে দেশের শান্তি শৃঙ্খলা উন্নত হবে জানিয়ে সুলতান হাসান আল বলকিয়া বলেন, ব্রুনাই ভ্রমণকারীরা দেশটির নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হবে। এটিই শরীয়া আইনের দেশ ব্রুনাইয়ের সফলতা।যে কেউ এই দেশে আসার পর একটি সূখকর অভিজ্ঞতা পাবে, এবং নিরাপদ ও সুসংগত পরিবেশ উপভোগ করবে।

হাসসান আল-বলকিয়া

হাসসান আল-বলকিয়া হলেন ব্রুনাইয়ের ২৯তম এবং বর্তমান সুলতান ও ইয়াং ডি পেটরুয়ান।সুলতান ১৯৪৬ সালের ১৫ জুলাই ব্রুনাই টাউনে (বর্তমান নাম বন্দর সেরি বেগাওয়ান) পেনগিরান মুদা (যুবরাজ) হাসসান আল-বলকিয়াহ হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন। সুলতান কুয়ালালামপুরের ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট, যুক্তরাজ্য থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন।তিনি তার পিতার সিংহাসন ত্যাগের পর ৫ অক্টোবর ১৯৬৭ সালে ব্রুনাই দারুস সালামের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৯৬৮ সালের এক আগস্টে তার অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, এবং তিনি ব্রুনাইয়ের ইয়াং ডি-পেরটুয়ান (রাষ্ট্রপ্রধান) হন। পিতার মতো তিনিও যুক্তরাজ্যের রাণি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নিকট থেকে নাইট উপধি পান।

ব্রুনাইর ১৯৫৯ সালের সংবিধান অনুসারে সুলতান পূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতাসহ রাষ্ট্রের প্রধান, ১৯৬২ সাল থেকে সুলতান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করারও অধিকারী। ২০০৬ সালের মার্চে সুলতান ব্রুনাইর আইনে নিজেকে ভুলের উর্ধ্বে রেখে সংবিধান সংশোধন করেন। বলকিয়াহ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সরকারেরও প্রধান। সম্প্রতি তিনি ব্রুনাই সরকারকে গণতন্ত্রীকরণ করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং নিচেকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি আইনসভা পুনরায় চালু করেন, যেটি ১৯৬২ সাল থেকে অকার্যকর ছিল।

সুলতান বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিত, ফোর্বস ২০০৮ সালে সুলতানের মোট সম্পদের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার বলে উল্লেখ করে।

ব্রুনাইয়ের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোতে সংঘটিত হয়। ব্রুনাইয়ের সুলতান হলেন একাধারে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। ব্রুনাইয়ে ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন কাউন্সিল আছে, তবে এর সদস্যেরা আইন প্রণয়নে কেবল পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। ২০০৪ সাল থেকে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

সংস্কৃতি

ব্রুনাইয়ের সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে মালে সংস্কৃতির এবং ইসলামী ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়। সংস্কৃতি দেশের ডেমোগ্রাফিক মেকআপ দ্বারা প্রভাবিত হয়. জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মালে হয়, এবং বাকি চীনা, ভারতীয় ও যেমন ডায়াকস, দুসুন্স এবং কেদাযান্স যেমন আদিবাসী মালয় নিয়ে গঠিত যদিও স্টান্ডার্ট, মালাই ব্রুনাইয়ের সরকারী ভাষা, যেমন ব্রুনেই মালয় ও ইংরেজি ভাষায় আরো সাধারণভাবে বলা হয়।

অর্থনীতি

তেল উৎপাদনে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ারতৃতীয় এবং গ্যাস রপ্তানিতে বিশ্বে নবম স্থানে আছে। তেল ও গ্যাস সম্পদসমৃদ্ধ এ ভূখণ্ড বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র। দেশটির প্রধান সুলতান হাসান আল বলকিয়া বিপুল ধনসম্পদের মালিক। দেশটির জনগণ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপুল ভর্তুকি পান। জনগণকে কোনো কর দিতে হয় না। দেশটি প্রায় পুরোপুরি আমদানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে প্রচুর সম্পদ থাকার পরও রাজধানীর বাইরে উন্নয়নের খুব একটা ছোঁয়া লাগেনি। সম্প্রতি তেল-গ্যাসের বাইরেও অর্থনীতির অন্য ক্ষেত্রগুলোতে সফল হওয়ার চেষ্টা করছে ব্রুনাই। মনোযোগী হচ্ছে পর্যটনের দিকেও।এছাড়া বস্ত্র, আসবাবপত্র ও পশমসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ দ্রব্যে সমৃদ্ধ দেশটি। উন্নয়ন ও উন্নত জীবনমানের দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরেই এর অবস্থান।

কৃষি সম্পদ : ব্রুনাইয়ের কৃষিদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ধান, কলা ও অন্যান্য ফলমূল। গবাদিপশু সম্পদের মধ্যে রয়েছে গরু, মহিষ, শূকর এবং হাঁস-মুরগি।

বনজ সম্পদ : দেশের অধিকাংশ এলাকা জুড়েই রয়েছে বনাঞ্চল। এসব বনাঞ্চলে মূল্যবান কাঠ পাওয়া যায়। কাঠের বার্ষিক গড় উৎপাদন ৩লক্ষ কিউবিক মিটার।

শিল্প ও বাণিজ্য : ব্রুনাই প্রাথমিক পর্যায়ে তেল শিল্পের উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট কর্মজীবীদের ১০% ভাগ এ শিল্পে কর্মরত। অন্যান্য শিল্পের মধ্যে রয়েছে রাবার, কাগজ এবং কাঠ শিল্প। এছাড়া কুটির শিল্পের মধ্যে রয়েছে নৌকা তৈরি, বস্ত্র বুনন, তামা ও ইস্পাতের বাসনপত্র ইত্যাদি।

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...