লেবানন
এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে অবস্থিত দেশটিতে
রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। লেবানানকে বহু সভ্যতা-সংস্কৃতির
মিলনমোহনাও বলা হয়ে থাকে।এর উত্তর ও পূর্বে সিরিয়া, দক্ষিণে ইসরায়েলের
সীমানা দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ও সাইপ্রাস দ্বীপ।লেবানন পৃথিবীর
মানচিত্রে এমন অবস্থানে আছে যে, পশ্চিম এশিয়ার জন্য লেবাননকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার আর
ইউরোপের জন্য একে পশ্চিম এশিয়ার প্রবশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।এ দেশটির নাম
বিশ্বের সবচেয় প্রাচীনতম দেশের নাম হিসাবে পরিচিত এবং প্রায় ৪০০০ বছরেরও বেশি সময়
ধরে এই নামটি অপরিবর্তিত রয়েছে।
আয়তনঃ
১০ হাজার ৪৫২ বর্গকিলোমিটার।।আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১৬১ তম দেশ।
জনসংখ্যাঃ
জনসংখ্যা : ৬৮ লাখ ২৫ হাজার ৪৪৫ জন।এরমধ্যে ২০ লাখই সিরীয় আর ফিলিস্তিনের
শরণার্থী।
ধর্মঃ
পরিসংখ্যান মোতাবেক লেবাননে সুন্নি মুসলমান ২৮ শতাংশ। শিয়া মুসলমানও প্রায় ২৮
শতাংশ। ম্যারোনেইট খ্রিস্টান ২২ শতাংশ। গ্রিক অর্থোডক্স ৮ শতাংশ। দ্রুজ ৫ শতাংশ ও
গ্রিক ক্যাথলিক রয়েছে ৪ শতাংশ। লেবাননের আশপাশ থেকে আসা উদ্বাস্তুর সংখ্যা হচ্ছে ৩,৭৫,০০০। এর মধ্যে ফিলিস্তিন
থেকে আসা উদ্বাস্তুর সংখ্যা সর্বাধিক ২,৭০,০০০। এ ছাড়া ৫০,০০০ জন এসেছে ইরাক থেকে ও
৪,৫০০ জন সুদান থেকে আগত
উদ্বাস্তু।
ভাষাঃ
আরবি ভাষা লেবাননের সরকারি ভাষা। দেশটির ৯০%-এরও বেশি লোক আরবি ভাষাতে কথা বলে।
এছাড়াও লেবাননে আর্মেনীয় ভাষা, কুর্দি ভাষা ও আরামীয় ভাষা প্রচলিত। আন্তর্জাতিক
যোগাযোগের জন্য ফরাসি ভাষা ব্যবহার করা হয়।
মুদ্রা
: লেবানিজ পাউন্ড।বাংলাদেশী ১ টাকা সমান প্রায় ১৮ লেবানিজ পাউন্ড।
জাতিসংঘে
যোগদান : ১৯৪৫ সাল।
ইতিহাস
লেবাননে
সভ্যতার সূচনা সাত হাজার বছরেরও আগে। ফিনিসীয় আদি আবাসভূমি এই দেশ। খ্রিস্টপূর্ব
৬৪-তে এখানে রোমান সাম্রাজ্যের শাসন শুরু হয়। খ্রিস্টানরা নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় চলে
আসে। এরপর এই অঞ্চল মুসলমানদের দখলে আসে।তারপর আসে দ্রুজ নামে নতুন একটি ধর্মীয়
গোষ্ঠী। গোষ্ঠীটি লেবাননে তাদের শাসন কায়েম রাখে কয়েক শতাব্দী ধরে। এরপর আবারও
রোমান ক্যাথলিকদের নিয়ন্ত্রণে আসে এলাকাটি।শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ যায়
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। ১৫১৬ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ওসমানীয় শাসকরাই ছিলেন
লেবাননের অধিকর্তা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের পতন ঘটে। আরবদের আশা ছিল
ইঙ্গ-ফরাসি মিত্রপক্ষ ও তাদের স্বাধীনতা দেবে কিন্তু বিশ্বাসঘাতক মুসলমানদেরকে বার
বারই শত্রুদের কুপরামর্শে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয়েছে ।যুদ্ধের শেষে ব্রিটিশ ও ফ্রান্স
আরব জাহান ভাগ করে নেয় ফিলিস্তিন এবং ইরাক বৃটেনের আর সিরিয়া ফ্রান্সের দখলে চলে
যায়। ইংরেজরা ফিলিস্তিন দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র স্থাপন করে গিয়েছে লেবানন
কেসিরিয়াহতে পৃথক করে সেখানে একটিখ্রিষ্টানরাষ্ট্রস্থাপন ছিল ফরাসিদের আসল
উদ্দেশ্য। পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে আজকের লেবানন গঠিত তা ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে চলে
যায়।দ্বিতীয় মহাযুদ্ধদ্বারাব্যাহত না হলে হয়তো আজ লেবানন সম্পূর্ণই খ্রিস্টান
রাষ্ট্র থাকতো। কিন্তুযুদ্ধদ্বারাফরাসিদের পরিকল্পনা কিছুটাবাধাপ্রাপ্তহলেও তারা
লেবাননে প্রধানত একটি খ্রিস্টান শাসিত রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিল । লেবাননের
রাজনীতি, সংস্কৃতি
এবং অর্থনীতি সর্বত্র ফরাসিদের সেই ষড়যন্ত্রের ছাপ রয়েছে।তাই দেশটিতে এত
অস্থিরতা । স্বাধীনতা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ফরাসিদের ছিলনা।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু
হলে ফরাসিরা জার্মানির কাছে হেরে গেলে ১৯৪১ সালে ফ্রান্স জার্মানদখলেচলে যাওয়ার
পর ব্রিটেনের আবার স্বাধীনতারপুরাআশ্বাস দিয়ে জাতীয়তাবাদীদেরসহযোগিতায়
১৯৪১সালের শেষের দিকে লেবানন দখল করে । ২৬নভেম্বর তাদের সমর্থনে লেবাননের
স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় । ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে জার্মানির প্রতি
স্থানীয়ভাবে কোনো সহানুভূতি সৃষ্টি না হতে পারে। বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হাজার
১৯৪৩ সালে একটি প্রজাতন্ত্রওঘোষিত হয়। পরের বছর জানুয়ারি মাসে আবার স্বাধীন
দেশটিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়।অবশেষে যুদ্ধের পর ১৯৪৬সালের ডিসেম্বরে ভিতর সব
ব্রিটিশ ও মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে লেবানন স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৫ সালে
গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই লড়াইয়ে নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ। লেবাননের ভেতরেই
বাস্তুচ্যুত হয় ৭৫ হাজার। যুদ্ধে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মতো বিদেশি শক্তিও জড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে লেবাননে বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।এরই একপর্যায়ে ১৯৮২ সালে
ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে হামলা শুরু করে। এই হামলার কিছু আগে সত্তরের
দশকের একেবারে শেষভাগে শিয়ারা ইরানের সহায়তা নিয়ে গড়ে তোলে হিজবুল্লাহ সংগঠন। মূলত
নাজাফে পড়ালেখা করা ধর্মীয় নেতারা মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁদের একটি শক্তিশালী
সামরিক শাখাও তৈরি হয়। এদের অস্ত্র, অর্থ, গোলাবারুদ আসে ইরান থেকে।
ইসরায়েল আক্রমণ করার পর লেবাননের ভেতর সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয় এই গোষ্ঠী। পরে
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলি বাহিনী সরে যায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী
সেখানে মোতায়েন করা হয়।তায়েফ চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৮৯ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের
অবসান ঘটে। আরব লীগের মধ্যস্থতায় সব মিলিশিয়া গোষ্ঠী ভেঙে দেওয়া হয়। তবে থেকে যায়
হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা। দুই বছর পর নির্বাচিত পার্লামেন্ট যুদ্ধের জন্য
দায়মুক্তি আইন পাস করে। হিজবুল্লাহ এখনো একই অবস্থায় লেবাননে বিদ্যমান। এই গোষ্ঠী
১৮টি দেশের কালো তালিকাভুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব লীগের কালো তালিকাতেও তাদের
নাম আছে। যদিও লেবাননে আজও তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০০৫ সালে এক গাড়িবোমা হামলায়
নিহত হন তখনকার প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি। গত ১৫ বছরে তাঁর বিচার সম্পন্ন হয়নি।
লেবাননে হিজবুল্লাহ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ২০১৮ সালে ৯ বছর পর দেশটিতে
পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই গোষ্ঠী নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। এ
দফায় সরকারে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না থাকলেও প্রভাবিত করার শক্তি রয়েছে। এর
আগের দফায় মন্ত্রিসভাতেও তাদের ৯ সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিকভাবে
দুর্বল লেবানন বহু বছর ধরেই হিজবুল্লার মাধ্যমে ইরান এবং হারিরি পরিবারের মাধ্যমে
সৌদি আরবের ছায়া যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখা যায় ২০১৭
সালে। সেবার প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে সৌদিতে ডেকে নিয়ে রীতিমতো গৃহবন্দি করে
ফেলে তারা। অভিযোগ ছিল, তিনি
হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। পরে ফ্রান্সের মধ্যস্থতায়
দেশে ফেরেন নিহত রফিক হারিরির ছেলে সাদ। এর পরপরই পদত্যাগ করেন তিনি। ২০১৩ সালের
সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীর বন্দরে ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে যথাযথভাবে
গুদামজাত করে না রাখাকে এই বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। বিস্ফোরণে দেড়
শতাধিক নিহত ও ৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণের প্রচণ্ডতা আর শব্দতরঙ্গের
তীব্রতায় নগরজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু ভবন।
রাজনীতি
১৮টি
ধর্মীয় গোষ্ঠী লেবাননে বিরাজমান। প্রত্যেকে স্বকীয়তার সঙ্গে নিজ ধর্মের রীতিনীতি ও
উৎসব পালন করে। এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় না। সবার
মধ্যে রয়েছে বিস্ময়জাগানিয়া ধর্মীয় সমঝোতা। কারণ, সেখানে পারস্পরিক
সম্প্রীতি বেশ জোরদার। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন নজির নেই।লেবানন সরকারের
সর্বোচ্চ পদগুলো ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের জন্য আনুপাতিক হারে নির্ধারিত। ধর্ম ও
গোষ্ঠীগতভাবে বিভক্ত হয়েও ধর্মীয় সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া
হয়েছে।লেবাননে খ্রিস্টান, সুন্নি
ও শিয়া মুসলমানরা একত্রে বাস করে। লেবানন একটি সংসদীয় গণতন্ত্র যেখানে সরকারের
সর্বোচ্চ পদগুলি আনুপাতিক হারে কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকদের প্রতিনিধির
জন্য নির্ধারিত। সংবিধান অনুসারে প্রতি ৪ বছর অন্তর সংসদীয় নির্বাচন হয়। আইনসভা
আবার ৬ বছর মেয়াদের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। লেবানন ধর্ম ও গোষ্ঠীগতভাবে
বিভক্ত একটি রাষ্ট্র। এখানে খ্রিস্টান, সুন্নী মুসলমান ও শিয়া
মুসলমানেরা একত্রে বাস করেন। লেবাননে ধর্মীয় সংস্কৃতির চমত্কার সমঝোতা দেখা যায়। এমন
উদাহরণ পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। সরকারের সর্বোচ্চ পদগুলো আনুপাতিক হারে ধর্মীয়
গোষ্ঠীর নেতাদের জন্য নির্ধারিত।গোষ্ঠীগুলি লেবাননের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে
নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাপারে চুক্তি করেছেন।১৯৪৩ সালের লেবাননের জাতীয় চুক্তি অনুযায়ী, সংসদে খ্রিস্টানদের
সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়া হয়েছে৷ প্রেসিডেন্টকে হতে হবে ম্যারোনাইট খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন
সুন্নি মুসলমান এবং সংসদ স্পীকারকে হতে হবে শিয়া মুসলমান৷ । সংসদের আসনগুলোও
অর্ধেক করে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। দেশের সংসদ চার বছরের জন্য
নির্বাচিত হয়। দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংসদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। প্রেসিডেন্ট
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন। সবকিছু মিলিয়ে এখানে প্রতিটি গোষ্ঠী বা দল তাদের
কার্যক্রম পরিচালনা ও অধিকার সমানভাবে পেয়ে থাকে। লেবাননে
উৎসব হিসেবে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের উৎসবে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছুটির দিনগুলোও
নির্ধারিত হয় সেই অনুসারে।
দ্রুজ
সম্প্রদায়
দ্রুজদ্রুজ
ধর্ম মূলত শিয়া ইসলামের একটি শাখা। দ্রুজ নামটি এসেছে মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল
নাশতাকিন আদ-দারাজীর নাম থেকে। দারাজী শব্দটি ফারসি। আদ-দারাজী ছিলেন প্রাক দ্রুজ
যুগের একজন সাধু ও প্রচারক। দ্রুজগণ আদ-দারাজীকে ধর্মগুরু মানে এবং নিজেদেরকে
দ্রুজ বলে পরিচয় দেয়।দ্রুজদের আবাসভূমি সিরিয়া, লেবানন। ইসরাইল, এবং জর্দানে। দ্রুজ
ধর্মকে আলাদা ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কারণ এই ধর্মের ভিত্তিমূল ইসলাম।
দ্রুজগণ নিজেদেরকে “আহলে তাওহীদ” (একেশ্ববাদী মানুষ বা একতাবদ্ধ মানুষ) অথবা “আল
মুয়াহিদুন” বলে পরিচয় দেয়।বিশেষ করে লেবাননের ইতিহাস গঠনে দ্রুজদের ভূমিকা
গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুজদের সামাজিক রীতিনীতি মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের থেকে ভিন্ন।
দ্রুজ অনুসারীগণ প্রধানত সিরিয়া, লেবানন, জর্দান এবং ইসরাইলে বসবাস করে। ইনস্টিটিউট অফ দ্রুজ’’ এর
গবেষণা থেকে জানা যায় ৫০-৫৫% দ্রুজ সিরিয়ায়, ৪০% লেবাননে, ৬-৭% ইসরাইলে এবং ১-২%
জর্দানে বাস করে।মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ
আফ্রিকায় দ্রুজ অনুসারীগণ বাস করে। দ্রুজগণ আরবীতে কথা বলে এবং প্রাচ্যীয়
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ করেন। পৃথিবীতে দ্রুজ অনুসারীগণের
সংখ্যা দশ লাখেরও বেশি।
গৃহ
যুদ্ধ
গত
শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৭ সালের
মধ্যে লাখে লাখে ফিলিস্তিন মুসলমান শরণার্থী হিসেবে লেবাননে প্রবেশ করতে শুরু করে।
ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবর্তন আসতে শুরু করে দেশটির জনমিতিক হিসাবে।
স্নায়ুযুদ্ধও লেবাননের রাজনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলে। এই সংকটে খ্রিস্টানরা
পশ্চিমাদের দিকে এবং ফিলিস্তিনিসহ মুসলমানরা সোভিয়েতের দিকে হেলে পড়ে। দুই পক্ষের
মধ্যে শুরু থেকেই সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়। বিষয়টি চরমে উঠলে ১৯৭৫ সালে গৃহযুদ্ধ
শুরু হয়। এই লড়াইয়ে নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ। লেবাননের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত
হয় ৭৫ হাজার। যুদ্ধে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মতো বিদেশি শক্তিও জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে
লেবাননে বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এরই একপর্যায়ে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে হামলা শুরু করে। এই হামলার কিছু আগে সত্তরের দশকের
একেবারে শেষভাগে শিয়ারা ইরানের সহায়তা নিয়ে গড়ে তোলে হিজবুল্লাহ সংগঠন। ইসরায়েল
আক্রমণ করার পর লেবাননের ভেতর সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয় এই গোষ্ঠী। পরে জাতিসংঘের
মধ্যস্থতায় ইসরায়েলি বাহিনী সরে যায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সেখানে মোতায়েন
করা হয়। তায়েফ চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৮৯ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে।
হিজবুল্লাহ
হিজবুল্লাহ
লেবানন ভিত্তিক শিয়া ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র সংগঠন। যারা ইসরাইলের
সীমান্তবর্তী অবস্থানে থেকেও সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে জায়নবাদী দখলদার দেশটির উপর
সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করে আসতে সক্ষম হয়েছে। সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ’র
নেতৃত্বাধীন এই দলটি লেবাননের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়, এবং সমগ্র মুসলিম জাহানের
অগণিত মজলুম মানুষের প্রেরণার উৎস।১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর পর ইমাম আয়াতুল্লাহ
খোমেনির কিছু শিষ্যের হাতে যাত্রা শুরু করে লেবাননের হিজবুল্লাহ। মূলত নাজাফে
পড়ালেখা করা ধর্মীয় নেতারা মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। দলটির জিহাদ কাউন্সিল নামক
সামরিক শাখা এবং লয়ালটি টু দ্য রেসিস্ট্যান্স ব্লক নামক রাজনৈতিক শাখা রয়েছে।
ইরানের
রেভ্যুলুশনারী গার্ড বাহিনীর হাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৮৫ সালে আত্নপ্রকাশ করে দলটি।
এটি ইরান ও সিরিয়া থেকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণ করে, এবং তার সামরিকপক্ষকে আরব
এবং মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশ জুড়ে একটি প্রতিরোধের আন্দোলন হিসেবে গণ্য করা হয়।
ছোট একটি সামরিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও একে একে সামাজিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, নির্বাচনে জয়লাভ এবং
নিজস্ব স্যাটেলাইট টিভিচ্যানেলসহ সাংস্কৃতিক জগতে সদর্পে পদচারণার মাধ্যমে
হিজবুল্লাহ আজ এমন একটি অবস্থানে এসে উপনীত হয়েছে যে এটি এখন – “রাষ্ট্রের ভেতর আর
এক রাষ্ট্র” হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে
পরিচিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অনেককেই বিস্মিত করেছে
বলে বিশ্বেরসংবাদ মাধ্যমগুলো স্বীকার করে নিয়েছেন।লেবাননে সংসদে তাদের অংশ গ্রহণ
থাকে । হিজবুল্লাহ ব্যাপকহারে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে থাকে। শিক্ষা বিস্তার, চিকিৎসা ও সমাজসেবামূলক
কাজে এর পরিধি পুরো লেবানন জুড়েই বিস্তৃত। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ স্থাপন করেছে – “আল
শহীদ সোস্যাল এসোসিয়েশন”, যার
মাধ্যমে দ্বীনের পথে শহীদ হওয়া মুজাহিদদের পরিবারকে যথাযথভাবে পুনর্বাসিত করা হয়।
জাতিসংঘ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, একটি দেশের সরকারের যা যা
করা উচিত, হিজবুল্লাহ
সেগুলোই করে থাকে। ২০০৬ সালে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের সময় পুরো বৈরুত শহরে পানি
সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। হিজবুল্লাহ এককভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত
করে। সিএনএন এর ভাষ্যমতে, হিজবুল্লাহ
শহরের আবর্জনা পরিস্কার থেকে শুরু করে স্কুলঘর মেরামত পর্যন্ত সকল কাজই করে থাকে।
এমনকি, যুদ্ধাহত
মুজাহিদদের বিনোদনের জন্য হিজবুল্লাহ পরিচালিত অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলোও ব্যপকভাবে
ব্যবহৃত হয়। এভাবেই লেবানিজ জনমানুষের মধ্যে হিজবুল্লাহ্র একটি ব্যপক গ্রহণযোগ্যতা
সৃষ্টি হয়েছে। আমেরিকা নেদারল্যান্ডস, বাহরাইন, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইসরায়েলের কাছে
হিজবুল্লাহ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। এই গোষ্ঠী ১৮টি দেশের কালো তালিকাভুক্ত। ইউরোপীয়
ইউনিয়ন ও আরব লীগের কালো তালিকাতেও তাদের নাম আছে। যদিও লেবাননে আজও তারা অত্যন্ত
শক্তিশালী।
অর্থনীতি
লেবানন
অর্থনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল কিন্তু বর্তমানে তাদের দেশের অর্থনীতিতে অনেকটা
সাফল্য নিয়ে এসেছে তাদের পর্যটন খাত কে কাজে লাগিয়ে।লেবাননে প্রতি বছর
গ্রীষ্মকালে ইউরোপ থেকে বহু পর্যটক পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন।
সংস্কৃতি
লেবাননের
সরকারী নাম “লেবানিজ রিপাবলিক”। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে অবস্থিত পশ্চিম এশিয়ার স্বাধীন
একটি দেশ এটি। এর উত্তর ও পূর্বে সিরিয়া, দক্ষিণে ইসরায়েল ও
পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ঘেষে সাইপ্রাস অবস্থিত।
ভূমধ্যসাগরের
পাড়ে হাজারো বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি
নিয়ে স্বমহিমায় অবস্থান করছে পাহাড়ময় লেবানন। দেশটির নানা ঐতিহাসিক স্থাপত্য, চোখ জুড়ানো সব সমুদ্রসৈকত, পটে আঁকা ছবির মতো সুন্দর
সব পাহাড়-পর্বতের বদৌলতে মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, সারা পৃথিবীর মানুষের
কাছেই দেশটি একটি লোভনীয় গন্তব্য। নানা সময়ে বিভিন্ন সভ্যতার সংস্পর্শে এসে লেবানন
সমৃদ্ধ হয়েছে ইতিহাস, ভাষা ও
সংস্কৃতিতে। ক্যানানাইট, ফিনিশীয়, আরব ও ফরাসি সভ্যতার সেসব
নিদর্শন আজও দেখা যায় লেবাননের মাটিতে। এটি এমনই এক দেশ, যেখানে সব রুচির মানুষ
মুগ্ধ হওয়ার মতো কোনো না কোনো উপকরণ পাবেনই।
কৃষিকাজের
জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত।লেবানন বেসরকারী রেডিও এবং টিভি অনুমোদন দেওয়া দেশের
দিক থকে গোটা আরব মহাদেশের মধ্যে প্রথম দেশ। ১৯৫৯ সালে লেবাননের মানুষ প্রথম টিভির
দেখা পায়। বর্তমানে সেখানে নয়টি জাতীয় টিভি চ্যানেল আছে। যার একটি মাত্র সরকারি, আর বাকি সব বেসরকারি।
দেশটিতে
১৮-৩০ বৎসর বয়সের মধ্যে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করতে
হয়।মাউন্ট লেবানন, যা
লেবাননের একটি পর্বতমালা, এর গড়
উচ্চতা প্রায় ২৫০০ মিটার। দেশটির নাম মূলত এই পর্বতশ্রেণি থেকেই এসেছে।
লেবাননে
প্রতি ১০ জন লোকের জন্যে ১ জন করে ডাক্তার নিযুক্ত রয়েছে, যেখানে ইউরোপ ও আমেরিকার
উন্নত দেশ গুলিতেও প্রতি ১০০ জন লোকের জন্যে ১ জন করে ডাক্তার নিযুক্ত রয়েছে।
লেবাননে
মোট ১৫টি নদী রয়েছে। এই নদীগুলোর পানি লেবাননের নিজস্ব পাহাড় থেকেই প্রবাহিত
হয়।আমাদের সবার প্রিয় কার্টুন টম এন্ড জেরির নির্মাতারা মূলত লেবানিজ নাগরিক।
লেবাননের প্রতিটা শহরে বাংলাদেশিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ১৯৮০/৮২ সাল থেকে লেবাননে
বাংলাদেশীদের প্রবেশ আরম্ভ হয়। বর্তমানে লেবাননে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন
পেশায় কাজ করছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নারী অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় লক্ষাধিক। তবে
এদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন।লেবাননের প্রধান
খেলাগুলোর মধ্যে বাস্কেটবল, ফুটবল
ও রাগবি বেশ জনপ্রিয়।সাহিত্যের আকাশে লেবাননের বড় তারকা ছিলেন খলিল জিবরান। তার
লিখিত দ্য প্রপেট বিশ্বের বিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।রমজানে লেবাননের জনপ্রিয় খাবার
কাটায়েফ প্যানকেক। সে দেশের মানুষ কাটায়েফ প্যানকেক দিয়ে ইফতার করতে খুবই পছন্দ
করে।লেবানন অর্থনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল কিন্তু বর্তমানে তাদের দেশের
অর্থনীতিতে অনেকটা সাফল্য নিয়ে এসেছে তাদের পর্যটন খাত। লেবাননে প্রতি বছর
গ্রীষ্মকালে ইউরোপ থেকে বহু পর্যটক পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন। দেশটির মোট আয়ের ৬৭ শতাংশ
আসে এই পর্যটন খাত থেকেই।
লেবাননের
বিচারিক ব্যবস্থায়ও বৈচিত্র্যের ছাপ দেখা যায়। এ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ওসমানি আইন, নেপোলিয়ান কোড, গির্জার আইন ও বেসামরিক
আইনের সমন্বয়ে। লেবাননের আদালত তিন স্তরের। প্রথমত, প্রারম্ভিক পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো
আপিলের, তৃতীয়
পর্যায়টি হলো চূড়ান্ত ফয়সালা বা মীমাংসার। সাংবিধানিক আদালত আইন ও নির্বাচনী
প্রতারণার বিষয়গুলো দেখে। এ ছাড়া সেখানে ধর্মীয় আদালত আছে। সেখানে সব ধর্মের
লোকেরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিয়ে, উত্তরাধিকার ইত্যাদি
বিষয়ে বিচার পেতে পারে।লেবাননের বিচার ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময়। ওসমানি আইন, নেপোলিয়ান কোড, গির্জার আইন ও বেসামরিক
আইনের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, সে দেশের বিচার ব্যবস্থা। এছাড়া সেখানে ধর্মীয় আদালতও
রয়েছে। সব ধর্মের নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিয়ে, উত্তরাধিকার ইত্যাদির
ক্ষেত্রে বিচার পাওয়া যায়।
লেবাননের আবহাওয়া বেশ
মনোরম। সেখানে রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান। ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো
প্রতিবছরই পর্যটকদের টানে লেবানন ভ্রমণে। লেবাননের পর্যটন খাতে দেশটির জনশক্তির
মোট ৬৫ শতাংশ জড়িয়ে আছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন