কাজাখস্তান
মধ্যএশিয়ার একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র।এর উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে গণচীন, দক্ষিণে কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, ও তুর্কমেনিস্তান এবং
পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর ও রাশিয়া। কাজাখস্তান প্রায় সম্পূর্ণভাবে এশিয়া
মহাদেশে অবস্থিত। তবে দেশটির কিয়দংশ উরাল নদীর পশ্চিমে ইউরোপ মহাদেশে পড়েছে।
ভৌগোলিকভাবে বলতে গেলে, কাজাখাস্তান
বিশ্বের সর্বউত্তরে অবস্থিত মুসলিম প্রধান দেশ কাজাখ একটি তুর্কি শব্দ। এর অর্থ
বিস্ময়। কাজাখিস্তানের অর্থ বিস্ময়ের ভূমি।
রাজধানী
– স্বাধীনকাজাখস্তানের প্রথম রাজধানী ছিল 'আলমাআতা। স্বাধীনতা লাভের
পর কাজাখস্তান সরকার শহরটির নাম পরিবর্তন করে রাখে আলমাতি। ১৯৯৭ সালের ১০
ডিসেম্বরে আস্তানা শহরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৯৮ সালের ১০ জুন
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহরটিকে কাজাখস্তানের রাজধানী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বর্তমানে শহরটির নাম নূর–সুলতান। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট নূর সুলতান
নাজারবায়েভের নামেই রাজধানীর নতুন নামকরণ করা হয়েছে।
আয়তনঃ
২৭ লাখ ২৪ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটার। এটি বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম রাষ্ট্র রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ভারতের পরেই
কাজাখস্তানের স্থান এবং বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র ।আয়তন পশ্চিম ইউরোপের
আয়তনের সমান। আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ কাজাখস্তান। আর জনসংখ্যায়
পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া।
জনসংখ্যাঃ১কোটি
৮০ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৮ জন।
নৃতাত্ত্বিক
জাতিগোষ্ঠীঃ দেশটির ১৩১টি জাতিগত গ্রুপের মধ্যে কাজাখ নামের তুর্কী জাতি এখানকার
প্রধান জনগোষ্ঠী।যারা মোট জন্যসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।কাজাখ ৬৬.৪৮%, রুশ ২০.৬১%, অন্যান্য ১২.৯১%।
অন্যান্য মুসলিম নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীগুলো হলো উজবেক, উইঘুর এবং তাতার।
ধর্মঃ
কাজাখস্তানের সর্বাধিক প্রচলিত ধর্ম ইসলাম।মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ মুসলিম। বাকী ৩০
ভাগ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।নৃতাত্ত্বিক কাজাখরা প্রধানত হানাফী মাজহাবভুক্ত সুন্নী
মুসলিম। এখানে কিছু সংখ্যক শিয়া ও আহ্মদীয়াও রয়েছে।
ভাষাঃ
১৯৪০ সাল পর্যন্ত সরকারি ভাষা রুশ ।ঐ বছর কাজাখ ভাষা কে কাজাখস্তানের সরকারি ভাষার
মর্যাদা দেয়া হয় ।
মুদ্রা
: টেংগে।
জাতিসংঘে
যোগদান- ২ মার্চ,১৯৯২।
ইসলামের
আগমন-
অষ্টম
শতাব্দীতে আরবদের আগমনের ফলে এই অঞ্চলে ইসলাম পরিচিতি লাভ করে। ইসলাম প্রথমে
দক্ষিণের তুর্কেস্তানে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তারপর উত্তর দিকে বিস্তার
লাভ করে।
ইতিহাস
কাজাখরা
একটি তুর্কি জাতি । তুর্কি ও মোঙ্গল উপজাতি থেকেই কাজাখাস্তানের উদ্ভব ।খিস্ট্র
পূর্বে প্রথমে এরা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।এ দেশের উপর দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপের
মধ্যে বাণিজ্য হতো বিখ্যাত 'সিল্ক রোড'-এর মধ্য দিয়ে। ১৩ শতকে
মোঙ্গলরা এখানে রাজত্ব শুরু করে। ১৬ শতক পর্যন্ত মোঙ্গলরা বিনা বাধায় এখানে রাজত্ব
করে। ১৮৭০-১৮৭৬ সালের মধ্যে রাশিয়া কাজাখ দখল নেয়। ১৯২০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত
কাজাখস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল।১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট প্রথম কিরঘিজ সোভিয়েত
সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯২৫ সালে এর নাম পরিবর্তন করে
কাজাখ সোভিয়েতসমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রাখা হয় এবং পরিশেষে ১৯৩৬ সালের ৫
ডিসেম্বর আলমাতাকে রাজধানী করে কাজাখস্তান সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র
হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।কাজাখস্তান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে নিজেকে স্বাধীন দেশ
হিসাবে ঘোষণা করেছিল। সর্বশেষ সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এটি ঘোষণা করে। এর
কমিউনিস্ট-যুগের নেতা, নুরসুলতান
নাজারবায়েভ, দেশের
নতুন রাষ্ট্রপতি হন।১৯৯৫ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতিকে
একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়। কাজাকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত
প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকার প্রধান
রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন
প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকক্ষ আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত।সোভিয়েত শাসনের সময়
ঐতিহ্যবাহী মুসলিম দেশটির ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ
করে এবং হাজার হাজার মসজিদ-মাদরাসা বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালে ৮০টি মসজিদ উদ্বোধন
করা হয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, কাজাখস্তানে বর্তমানে দুই হাজার ৬৯১টি মসজিদ রয়েছে। আরও
শতাধিক মসজিদ নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। এটি এখন মধ্য এশিয়ায় প্রভাবশালী রাষ্ট্র
হিসাবে বিবেচিত হয়। দেশটি জাতিসংঘ, ন্যাটো'র অংশীদারত্বের জন্য
শান্তির স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, কমনওয়েলথ
অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার
অন্তর্ভুক্ত। ২০১০ সালে কাজাখস্তান ইউরোপের সুরক্ষা ও সহযোগিতা সংস্থার সভাপতিত্ব
করে। ২০১১ সালে, এটি
রাশিয়া এবং বেলারুশের সাথে শুল্ক ইউনিয়ন গঠন করে।
পর্যটন
কাজাখস্তানের
পাঁচটি পর্যটন অঞ্চল: আস্তানা শহর, আলমাটি শহর, পূর্ব কাজাখস্তান, দক্ষিণ কাজাখস্তান, এবং পশ্চিম কাজাখস্তান
এলাকা।
নুরঝল
বুলেভার্দ - কাজাখস্তানের জাতীয় বুলেভার্দ। ইশিম নদীর তীরে গড়ে ওঠা রাজধানী শহর
আস্তানার একটি পায়ে চলা পথ। বুলভার্দটি শহর এবং দেশটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
বুলভার্দ সহ শহরটির নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থাপত্যবিদ কিশো কুরোকাওয়া। বুলভার্দটি
প্রেসিডেন্টের বাসভবন এক অরদা থেকে তাবু আকৃতির খান শাতির বিনোদন কেন্দ্র পর্যন্ত
বিস্তৃত।
খাবার
কাজাখ
রান্নার মূল ভিত্তি হচ্ছে টর্ট টালিক মাল - চার ধরনের গবাদি পশু (বা চার ধরনের
মাংস): ঘোড়া, উট, গরু এবং ভেড়া। ঘোড়া
মাংস হল প্রধান উৎসব মাংস,গ
মেষের মাংস সাধারণ মাংস হিসাবে ব্যবহৃত হয়, উটের মাংসটিও উৎসব
অনুষ্ঠানের মান্স, কিন্তু
প্রধান নয় কারণ কাজাখস্তানে ঘোড়ার মতো উট সহজে পাওয়া যায় না। গরুর মাংস হল
সাধারণ মাংস। ঘোড়া বা ভেড়ার মাংস সিদ্ধ করে তৈরী বেশবেরমেক সর্বাধিক জনপ্রিয়
কাজাখ খাবার। এটাকে খাবার ধরণের উপর ভিত্তি করে পঞ্চ অঙ্গুলী বলা হয়। সিদ্ধ
মাংসের টুকরো গুলো কেটে অতিথির গুরুত্ব অনুসারে পরিবেশন করা হয়। বেশবারমেওক সিদ্ধ
পাস্তা দিয়ে খাওয়া হয় এবন সাথে সরপা নামে এক প্রকার মাংসের ঝোল থাকে যা
ঐতিহ্যবাহী কাজাখ বাটি কেসেতে পরিবেশন করা হয়। কাজাখদের আরেকটি জাতীয় খাবার
হচ্ছে কুউরদাক। অন্যান্য জনপ্রিয় মাংসের খাবারের মধ্যে আছে কেজি যা ঘোড়া মাংস
দিয়ে তৈরী হয়ে এবং শুধুমাত্র বিত্তশালীরা খেয়ে থাকে, শুঝুক, কুইরদাক, ঝাল এবংঝায়া ইত্যাদি।
আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে পিলাফ (পোলাও) যা গাজর, পেঁয়াজ এর সাথে চাল ও
মাংস মিশিয়ে রান্না করা হয়।
আপেল
বিশ্বের যে কয়েকটি স্থানে
আপেলের উৎপত্তি হয় বলে গণ্য করা হয় সেগুলোর মধ্যে কাজাখস্তান অন্যতম। এখানকার
আপেলের প্রাচীন জাতটা হলো ম্যালাস সিভারসি। কাজাখস্তানের স্থানীয় ভাষায় এটাকে আলমা
বলা হয়। যে অঞ্চলে এর উৎপত্তি ঘটে তাকে বলে আলমাতি অর্থাৎ আপেল সমৃদ্ধ স্থান। মধ্য
এশিয়ার দক্ষিণ কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান
ও তাজিকিস্তান এবং চীনে ঝিনজিয়াংয়ের পার্বত্য বন-জঙ্গলে এখনো প্রাকৃতিকভাবে এই
আপেল গাছ জন্মে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন