কিরগিজিস্তান মধ্য এশিয়ার পূর্বভাগের
একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র।এর সরকারি নাম কিরগিজ প্রজাতন্ত্র। উত্তরে
কাজাখস্তান, পূর্বে চীন,
দক্ষিণে
চীন ও তাজিকিস্তান এবং পশ্চিমে উজবেকিস্তান।
আয়তন ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৫১ বর্গকিমি।
রাজধানীবিশকেক শহর দেশটির রাজধানী ও
বৃহত্তম শহর।
জনসংখ্যা: ২০১৯ সালের হিসেব অনুযায়ী
মাত্র ৬৪ লক্ষ।
জাতিগোষ্ঠীঃ জাতিগোষ্ঠী : কিরগিজ, উজবেক, রুশ,
উইঘুর, দাগান প্রভৃতি নৃতাত্ত্বিক জাতি কিরগিজস্তানে বসবাস করে।কিরগিজ ৭৩%, উজবেক ১৪.৬%, রুশ ৬%,
চীনা ১.১%, অন্যান্য ৫.৩%।
ধর্মঃ মোট জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশ মুসলিম এবং
তাদের বেশির ভাগ সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী। এ ছাড়া অর্থডক্স খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্মাবলম্বী রয়েছে দেশটিতে।
ভাষা কিরগিজ ভাষা কিরগিজিস্তানের সরকারি
ভাষা। এই ভাষাতে কিরগিজিস্তানের অর্ধেকের বেশি লোক কথা বলেন। প্রায় ১৬% লোক রুশ
ভাষাতে কথা বলেন। এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আছে উজবেক ভাষা, চীনা ভাষা, মঙ্গোলীয় ভাষা ও উইগুর ভাষা।
মুদ্রা : সোম (কেজিএস)।
জাতিসংঘে যোগদান :২ মার্চ১৯৯২ সাল।
ইসলামের আগমন
ইসলামের প্রাথমিক যুগেই কিরগিজস্তানে
ইসলামের আগমন হয়। আরব ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা ঐতিহাসিক সিল্ক রোড ধরে ওই অঞ্চলে
যাতায়াত করত, তাদের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের মানুষ ইসলামের
সঙ্গে পরিচিত হয়। ৮৩ হিজরিতে মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম ফারগানা জয় করলে
এই অঞ্চলে ইসলামী শাসনের সূচনা হয়। প্রাচীনকালে কিরগিজস্তান ফারগানারই অংশ ছিল।
তবে প্রাচীন কিরগিজস্তানে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে ইরানের সেলজুক শাসকদের
মাধ্যমে। সেলজুক প্রধানমন্ত্রী নেজামুল মুলক তুসি এই অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী
শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেলজুকদের পরবর্তী সময়ে মঙ্গলীয় শাসকরা
ইসলাম গ্রহণ করে। এই অঞ্চল তাদের শাসনাধীন হওয়ার পর তারাও ইসলামী অনুশাসন
প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে।
ইতিহাস
কিরগিজরা একটি মুসলিম প্রধান তুর্কি জাতি, যারা কিরগিজ নামের একটি তুর্কি ভাষায় কথা বলে। উনিশ শতকের শেষের দিকে
কিরগিজস্তান রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। ১৮৬৬ সালে রুশ সাম্রাজ্য কিরগিজস্তান
দখল করলে মুসলিম শাসনের অবসান হয়।স্বায়ত্তশাসিত তুরকেস্তান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক
প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে ১৯১৮ সালের ৩০ এপ্রিল কিরঘিস্তান প্রজাতন্ত্রের
প্রতিষ্ঠা হয়।১৯২৪ সালের ৪ অক্টোবর কিরঘিজ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠিত হলেও একটি
স্বশাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে তা ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বীকৃতি লাভ করে।১৯৩৬
সালের ৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন কিরগিজস্তানকে একটি স্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা
প্রদান করে।এটি তখন কিরগিজিয়া নামেও পরিচিত ছিল।রুশ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তী সোভিয়েত
ইউনিয়নের শাসনামলে দেশটিতে ইসলামচর্চা বিশেষভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। রুশ সাম্রাজ্য
কিরগিজস্তান দখলের সময় আরবি ছিল দেশটির প্রধান ভাষা। কিন্তু রুশ শাসকরা আরবিচর্চা
নিষিদ্ধ করে এবং রুশ ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে।৩১ আগস্ট
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯৩ সালে নতুন সংবিধান পাস
করে।একটি অর্ধ-রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয়
সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং
আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। এক-তৃতীয়াংশ মানুষ
দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মধ্য এশিয়ার দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ। আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট
ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে
অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরেনি। স্বাধীনতার তিন দশক পরও দেশটির রাষ্ট্র পরিচালনা ও
সমাজব্যবস্থায় রুশ শাসনের প্রভাব বিদ্যমান। বর্তমানে কিরগিজস্তানের দ্বিতীয় প্রধান
ভাষা রুশ এবং প্রধান ভাষা ‘কিরগিজ’ও লেখা হয় রুশ বর্ণে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের সময়
কিরগিজস্তানে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৯।তবে আশার কথা হলো, স্বাধীনতা লাভের পর কিরগিজস্তানে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে এবং
সেখানে ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটছে। কিরগিজস্তানে গত ২৮ বছরে আড়াই হাজারেরও বেশি
মসজিদ নির্মাণ হয়েছে। ৮১টি ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৬৮টি সরকার অনুমোদিত
সংস্থা ও সংগঠন রয়েছে। সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো একাধিক ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। কিরগিজ মুসলিমরা এখন আগ্রহের সঙ্গে মসজিদে আসে, তাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য
প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোতে পাঠায়। এভাবে ক্রমেই কিরগিজস্তানে ইসলাম বিকশিত হচ্ছে।
যোগাযোগব্যবস্থা
সড়কগুলো খাড়া পাহাড়ি ঢাল বেয়ে সর্পিলাকারে
উঠে নেমে গেছে। প্রায়ই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। সুউচ্চ পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় শীতকালে
দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ দুঃসাধ্য। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহনের মাধ্যম
হিসেবে এখনো ঘোড়া ব্যবহৃত হয়।
সুউচ্চ পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি কিরগিজিস্তানের
পরিবহন ব্যবস্থার উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। কিরগিজিস্তানের সড়কগুলি খাড়া
পাহাড়ী ঢাল বেয়ে সর্পিলাকারে উঠে নেমে চলে গেছে। অনেকসময় এগুলিকে সমুদ্র সমতল
থেকে ৩০০০ মিটার উঁচু গিরিপিথের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রাস্তাগুলি প্রায়ই ভূমি-ধ্বস
এবং হিমানী সম্প্রপাতের শিকার হয়। শীতকালে উচ্চ উচ্চতার দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে
ভ্রমণ অত্যন্ত দুঃসাধ্য। আরেকটি সমস্যা হল সোভিয়েত আমলে নির্মিত বেশির ভাগ
সড়কগুলির মধ্য দিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত চলে গেছে, ফলে এসমস্ত সড়কে সীমান্ত প্রোটোকলগুলি মেনে চলতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট
হয়। কিরগিজিস্তানে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে এখনও ঘোড়া
ব্যবহৃত হয়।
খাদ্য
বিভিন্ন ধরণের মাংস সবসময় কিরগিজ খাবারের
অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। সর্বাধিক জনপ্রিয় মাংসের খাবারের মধ্যে ঘোড়া-মাংসের
কেজি বা চুচুক, ভেড়ার ভাজা কলিজা, বেশবারমাক (চিকন নুডলস সাথে কুচানো মাংস),
এবং ঘোড়ার
মাংস থেকে তৈরি বিভিন্ন অন্যান্য খাবার। বেশবারমাক কিরগিজদের জাতীয় খাবার। যদিও
এটি কাজাখস্তান এবং জিনজিয়াংয়ের (যেখানে এটি নারিন নামে পরিচিত) সাধারণ খাবার।
এটা ঘোড়ার মাংস দিয়ে তৈরী হয়। কখনও কখনও মাটন ও গরুর মাংসও তৈরী হয়। ঘোড়ার
মাংস কয়েক ঘন্টা ধরে ঝোলের মধ্যে সিদ্ধ করা হয় এবং ঘরে তৈরী নুডল দিয়ে পরিবেশন
করা হয় উপরে ধনিয়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়। হাত দিয়ে খাওয়ার কারণে খাবারটিকে পঞ্চ
অঙ্গুলীও বলা হয়। শিশুর জন্মদিনে,
বিশেষ
জন্মদিবসে এবং পরিবারে মৃত্যুশোক পালনে এটা তৈরী করা হয়। মাটন দিয়ে বিশবারমাক
তৈরী হলে একটি রান্না করা ভেড়ার মাথা টেবিলে সবথেকে সম্মানিত অতিথির সামনে
পরিবেশন করা হয়। প্রধান অতিথি মাথা থেকে বিভিন্ন অংশ কেটে অন্যান্যদের পরিবেশন
করেন।
কুউরদাক মাংস দিয়ে তৈরী প্রধান খাবারের
মধ্যে একটি। শাশলিক, কাঁচা কাটা পেঁয়াজ দিয়ে কয়লার আগুনে
গ্রিল করা মাটন যা রেস্তোরা এবং ফুটপাতের দোকানগুলিতে প্রায়শই বিক্রি হয়।
রান্নার পূর্বে মাংস ঘন্টার বেশী মশলা মাখিয়ে রাখা হয়। গরুর মাংস, মুরগীর মাংস, এবং মাছ থেকেও শাশলিক তৈরি করা যেতে পারে।
প্রতিটি শাশলিকে মাংস ও চর্বির অনুপাত একঃএক থাকে। শর্পো বা সর্পো হচ্ছে মাংসের
স্যুপ।
পানীয়
একটি জনপ্রিয় কিরগিজ পানীয় হচ্ছে কিমিজ।
এটা সামান্য এলকোহলিক যা ঘোটকীর দুধ থেকে পাচনের মাধ্যমে তৈরী করা হয়। এই
পানীয়টি ইউরেশীয় যাযাবর সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি কাজাখস্তান
এবং মঙ্গোলিয়াতেও পান করা হয়। নতুন কিমিজ শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালে পাওয়া যায়, প্রায় মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত,
যখন এটি
সাধারণত পর্বত এলাকার পথপার্শ্বে পাওয়া যায়। বোতলজাত কিমিজ দেশের সব খাদ্যের
দোকানে সারা বছর পাওয়া যায়।
অর্থনীতি
মধ্য এশিয়ার সবুজ-শ্যামল ও পাহাড়বেষ্টিত
অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত মুসলিম দেশ কিরগিজস্তান। স্থলবেষ্টিত পাথুরে দেশটিতে কোনো
সমুদ্রের দেখা না পেলেও নীরবে বয়ে যায় অসংখ্য পাহাড়ি নদী ও ঝরনাধারা। দেশটির বুক
চিরে বয়ে গেছে দুই হাজার ৪৪টি ছোট-বড় নদী,
যা থেকে
উৎপাদিত হয় প্রচুর পরিমাণ জলবিদ্যুৎ। এ ছাড়া দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস, দস্তা,
ইউরেনিয়াম
ও সোনার মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও দেশটির অর্থনীতি
এখনো কৃষিনির্ভর। কিরগিজস্তানের ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষি কাজ ও পশুপালন করে
জীবিকা নির্বাহ করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন