বলকান
উপদ্বীপের ছোট একটি স্বাধীন মুসলিম দেশ কসোভো। কসোভোর দক্ষিণ-পশ্চিমে আলবেনিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে মেসিডোনিয়া, পশ্চিমে ক্রোয়েশিয়া ও
উত্তরে সার্বিয়া অবস্থিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সার্বিয়ার দখল করা আলবেনিয়া অংশটি
কসোভো নামে বিশ্ব মানচিত্রে পরিচিতি লাভ করে। কসোভো সে সময় সার্বিয়ার অংশ
ছিল।১৯৯০-এর দশকে তৃতীয়বলকান যুদ্ধের মাধ্যমে সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর
কসোভো সার্বিয়ার একটি প্রদেশ ছিল।
রাজধানীঃ
দেশটির সবচেয়ে বড় শহর ও রাজধানীর নাম প্রিস্টিনা।
আয়তনঃ
১০ হাজার ৯০৮ বর্গকিলোমিটার।
জনসংখ্যা
১৯ লাখ সাত হাজার ৫৯২ জন।
ধর্মঃ
মুসলমান৯৬ শতাংশ, রোমান
ক্যাথলিক ২.২, অর্থডক্স
১.৫ ও অন্যান্য ধর্মের মানুষ ১ শতাংশেরও কম।
ইতিহাস
কসোভোর
ইতিহাস পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মতো। কসোভো প্রথম শতাব্দীতে রোমানদের দখলে আসে।
ষষ্ঠ শতাব্দীতে এ জনপদে স্লাভদের বসতি শুরু হয় এবং তারা রোমানদের দখলমুক্ত হওয়ার
জন্য সংগ্রাম শুরু করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে এ দেশটিতে সার্বিয়ার নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের প্রথম শতাব্দীতেই এ অঞ্চলে ইসলামের স্নিগ্ধ হাওয়া পৌঁছে
গিয়েছিল। তবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় লেগে গেছে। কসোভোয় ইসলাম
প্রতিষ্ঠিত হয় ৭৯৭ হিজরিতে। উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের সময় সার্বিয়ানদের
বিরুদ্ধে বিখ্যাত কসোভো যুদ্ধ হয়। কসোভো সমভুমির এই যুদ্ধ ইতিহাসে ঐতিহাসিক যুদ্ধ
হিসাবে পরিচিত।
১৩৮৯
সালে তুরস্কের ওসমানিয়া শাসকরা কসোভো দখল করে।এ সময় দেশটিতে আলবেনীয় তথা
মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।এখানকার আলবেনীয় জনগোষ্টীর ওপর ক্যাথলিক
খ্রিস্টানরা এতটাই করারোপ করেছিল যে মানুষের জীবন যাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল।
উসমানীয়দের বিজয়ের পর আলবেনীয় জনগোষ্টী এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করে। পূর্ব ইউরোপের
দেশগুলো ৫০০ বছর উসমানীয় শাসনের অধীনে ছিল। এ সময় এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটে।
ফলে উসমানীয় ঐতিহ্যর প্রতিফলন পাওয়া যায় কসোভোতে। ১৯১২ সালের বলকান যুদ্ধে
সার্বিয়া কসোভো দখল করে। ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান হওয়ার পর বলকান
অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে যুগোস্লাভিয়া নামের ফেডারেল
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে কসোভো তাতে যুক্ত হয়। ১৯৭৪ সালে যুগোস্লাভীয় সংবিধানে তারা
স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা পায়। ১৯৯০ সালে এ স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে কসোভোকে
সার্বিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে গেলে কসোভো স্বাধীনতার
জন্য সংগ্রাম শুরু করে। সার্বিয়া সে সংগ্রামকে শক্তি বলে দমন করে। ১৯৯৬ সালে
নতুনভাবে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দমনে সার্বিয়া
দমননীতির আশ্রয় নেয়। ১৯৯৯ সালে ন্যাটো কসোভোর পক্ষে এগিয়ে আসে এবং সার্বীয়
অবস্থানে বোমা হামলা শুরু করে। বাধ্য হয়ে সার্বিয়া আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তির
মাধ্যমে কসোভো থেকে সরে আসে। জাতিসংঘ এ ক্ষুদ্র দেশটির প্রশাসন ও শান্তিশৃঙ্খলা
রক্ষার দায়িত্ব নেয়। জাতিসংঘ শান্তি বাহিনীর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সৈন্যও
মোতায়েন হয় সে দেশে।
কসোভোর
স্বাধীনতা
কসোভো
সর্বশেষ স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। ইউরোপের বুকে ইসলামের স্মারক বুকে নিয়ে টিকে আছে।
বহুত্যাগ
ও সংগ্রামের বিনিময়ে কসোভোর মানুষ তাদের ঈমান ও ইসলাম টিকিয়ে রেখেছে। ইউরোপের
ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলোর আক্রমণের শিকার হয়েছে অত্র অঞ্চলের মুসলিম জনগণ।
গত
শতকের নববই দশকে সোসালিস্ট রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর জাতিগত পরিচয়ের
ভিত্তিতে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা এবং
সার্বিয়া নামে পাঁচটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হলেও মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত কসোভোর
স্বাধীনতাকে অস্ত্র ও নৃশংসতার মাধ্যমে দমিয়ে রাখার অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছিল
সার্বিয়রা। কিন্তু সে প্রচেষ্টা তাদের সফল হয়নি। কসোভোর মুসলমানরা প্রতিবেশী
আলবেনিয়ার সমর্থন নিয়ে শুরু করে তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ। কসোভো লিবারেশন আর্মি
[কেএলএ] নামে গেরিলা সংগঠনের মাধ্যমে তারা শুরু করে হানাদার সার্বিয়ার বিরুদ্ধে
সশস্ত্র যুদ্ধ। ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময়ই কসোভোর নির্বাচিত পার্লামেন্ট
স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে তারা তেমন সমর্থন লাভ করতে
পারেনি। যুগোস্লাভ যুদ্ধ বা তৃতীয় বলকান যুদ্ধেহানাদার সার্ব বাহিনীর হাতে লাখ লাখ
মুসলিম প্রাণ হারায় এবং গৃহহারা হয় অসংখ্য মানুষ।কসোভোও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার
পরিণতি ভোগ করে। মুসলিম হত্যার ক্ষত কসোভোতে এখনো শুকায়নি। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার
সরকারের হাতে সে দেশের দুই লাখ মুসলমান জঘন্য হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। আর কসোভোতে
নারকীয় হত্যার শিকার হয় প্রায় ১০ হাজার নিরীহ মুসলমান। সার্ব নেতা মিলোসোভিচের এ
বর্বর হত্যাকান্ড বন্ধ করতে ১৯৯৯ সালেন্যাটো বাহিনী সার্বিয়ার ওপর বিমান হামলা
চালায়। কসোভোর শান্তি স্থাপনের জন্য জাতিসংঘ ১২৪৪ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে সেখানে
একটি অন্তবর্তী শাসন প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৫ সালে মারটি আতিসারির নেতৃত্বে গঠিত
জাতিসংঘের বিশেষ কমিটি কসোভোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য কাজ শুরু করে। জাতিসংঘের
তত্ত্বাবধানে খুব দ্রুত এ বিষয়ে একটি সমাধানের লক্ষ্যে মারটি যথেষ্ট যোগ্যতার
পরিচয় দিলেও রাশিয়ার ভেটোর কারণে তা বার বার ব্যর্থ হয়ে যায়।কসোভোর দুই জনগোষ্ঠী
আলবেনিয়ান ও সার্বদের মধ্যে কখনোই বনিবনা ছিল না। তবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের
মুখে সার্বিয়া কসোভোর স্বাধীনতার ব্যাপারে নমনীয়তা প্রকাশ করে।এদের দীর্ঘ দিনের
রেষারেষির এক পর্যায়ে ২০০৮ সালে সার্বিয়ার অধিকৃত আলবেনীয় অংশেরকসোভোর
পার্লামেন্টে এক ঐতিহাসিক অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা
করে।নতুন রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয় কসোভো। সার্বিয়া এখনো কসোভোকে নিজেদের অংশ হিসেবে
দাবি করে এবং কসোভোর এ স্বাধীনতা দাবিকে অস্বীকার করে।রাশিয়ার মদদ পেয়ে সার্বিয়া
কাসোভোর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। কসোভোয় বসবাসকারী সার্বরাও কসোভোর
স্বাধীনতা চায় না ।গ্রিস, চীন ও
স্পেনের মতো দেশগুলো এখনো স্বাধীন দেশ হিসেবে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি।এ পর্যন্ত
পৃথিবীর ১১৫টি দেশ কসোভোকে
স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশই
সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে।হেগের আন্তর্জাতিক আদালত ২০১০
সালে কসোভোর স্বাধীনতাকে বৈধ হিসেবে রায় দিয়ে জানায়, সার্বিয়া সরকারের অনুমতি
ছাড়াই স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশে কসোভোর বাধা নেই। বিশ্বব্যাংক এবং
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও সদস্যপদ পেয়েছে
দেশটি।কসোভো এখনো জাতিসংঘের সদস্য দেশ নয়। রাশিয়া এবং চীনের হস্তক্ষেপের কারণে
তারা এই সদস্যপদ পাচ্ছে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর সদস্যপদ পেতে মুখিয়ে থাকলেও ইউরোপিয়ান
ইউনিয়নের ৫টি সদস্যদেশ এখনো
কসোভোকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তা হয়ে উঠছে না।২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রয়ারি কসোভোকে
স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। কসোভোকে স্বীকৃতি প্রদানকারী
দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১১৪তম। ওআইসির ৫৭টি দেশের মধ্যে তাদের স্বীকৃতি
প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ছিল ৩৭তম।কসোভোর স্বাধীনতার ১০ বছর পূর্তিতে সে
দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে বাংলাদেশ।
বর্তমান
পরিস্থিতি
কসোভোর রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক শক্তির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য দেশ হচ্ছে আমেরিকা। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটি এখন নিজেদের নতুন করে
গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সার্বদের হাতে ধ্বংস হওয়া ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
ফিরিয়ে আনা এবং ধর্মীয় অবকাঠামোর পুনর্র্নিমাণের কাজ শুরু করেছে।কসোভোর
ধর্মবিদ্বেষী কমিউনিস্ট শাসকরা বিগত ৭০ বছর ধরে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সব ধরনের
ধর্মীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। সার্ববাহিনীর সৈন্যরা ধ্বংস করে দিয়েছিল
প্রায় দুই শতাধিক মসজিদ। এখন সেখানে গড়ে উঠছে নতুন নতুন মসজিদ-মাদরাসা ও ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠান। আবার শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে দেওয়া হয়েছে মাদরাসায়ে আলাউদ্দিন নামে
একটি প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। নতুন করে খোলা হয়েছে একটি বিশেষায়িত
ইসলামিক কলেজ। কসোভোর প্রতিটি জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি করে ইসলামিক সেন্টার ও
পাঁচটি ধর্মীয় স্কুল। যেখানে শিক্ষার্থীদের ইসলাম ও আরবি ভাষা-সাহিত্য শেখানো হয়।
কসোভোর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়
ও শিক্ষাগত অবস্থা চমকপ্রদ। এখানকার প্রিস্টিনা বিশ্ববিদ্যালয় কসোভোর সংস্কৃতি ও
শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির ইসলামী ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার
ক্ষেত্রে তুরস্ক প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। কসোভোয়
ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের জন্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি এখন সময়ের প্রয়োজন। ১৯৯৯ সালের যুদ্ধের পর
খ্রিস্টানরা এখানে বহু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। তারা একটা ভিন্ন
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এর বিপরীতে ইসলামী ঐতিহ্য লালন করার
জন্য মুসলমানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন