সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

যে সীমান্ত হত্যাকান্ড নেপালকে নাড়া দিয়েছিল কিন্তু আমরা?


আজ থেকে বছর তিনেক আগে ২০১৭ সালের  কথা। ভারত নেপাল সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি) এর গুলিতে নিহত হন নেপালি যুবক গোবিন্দ গৌতম। ভারত নেপাল ১৭৫৮ কিলোমিটার সীমান্তে গোলাগুলি ও নিহতের ঘটনা বিরল। এ ঘটনার পর গোটা নেপাল উত্তপ্ত হয়ে উঠে। নেপালি নাগরিকরা রাজধানী  কাঠমান্ডুতে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ভারত সেই হত্যাকান্ডের কথা অস্বীকার করেছিল। নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। নেপালি যুবক নিহত হবার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে দোভাল। এ ঘটনা তদন্তের জন্য দোভাল নেপালের সহযোগিতাও কামনা করেছিল।

কিন্তু বাংলাদেশ - ভারতের ৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানায় এমন দৃশ্য কল্পনাতীত। প্রতিদিন লম্বা হচ্ছে সীমান্ত হত্যাকান্ডের নিহতদের তালিকা। বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম এই ভূমি সীমানায় চলতি বছরের প্রথম মাসে প্রথম ২৩ দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ বাংলাদেশি। সর্বশেষ ২৩ জানুয়ারি নওগাঁ ও যশোর সীমান্তে চার বাংলাদেশি খুন হন। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন বিএসএফের গুলিতে এবং একজন নির্যাতনে।
২০১৮ সালে সীমান্তে হত্যার পরিসংখ্যান কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছিল বাংলাদেশিদের। ২০১৮ সালে সীমান্তে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হন। কিন্তু পরের বছর ২০১৯ সালে তা ১২ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ জনে। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অধিকার-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী  এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৬ এবং ৪১ জন।মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর নথিপত্রে আরও দেখা যায় ২০১৯ সালে বিএসএফের হাতে অন্তত ৪১ জন বাংলাদেশি আহত হয়েছে এবং আরও ৩৪ জন অপহৃত হয়েছেন।বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত এলাকা  দক্ষিণ এশিয়ার হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরস্ত্র এবং অসহায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।  পরিষ্কার প্রমাণ সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত কাউকেই হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি।হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচের এশিয়া বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ব্যাড এডামস সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "Routinely shooting poor, unarmed villagers is not how the world's largest democracy should behave."
একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ৩শ ১২ বার হামলা চালানো হয়। এতে ১২৪ জন বাংলাদেশী নিহত হয়। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০টি হামলায় ১৩ জন নিহত, ১৯৯৭ সালে ৩৯টি ঘটনায় ১১ জন, ১৯৯৮ সালে ৫৬টি ঘটনায় ২৩ জন, ১৯৯৯ সালে ৪৩টি ঘটনায় ৩৩ জন, ২০০০ সালে ৪২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়।২০০১ সালে ৯৪ জন,২০০২ সালে ১০৫ জন, ২০০৩ সালে ৪৩ জন, ২০০৫ সালে ১০৪ জন,
২০০৬ সালে ১৪৬ জন, ২০০৭ সালে ১২০ জন, 
২০০৮ সালে ৬২ জন নিহত হন।
বিগত ১০ বছরে প্রায় ১,০০০ মানুষ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত হন, যার বেশিরভাগই বাংলাদেশি।যদিও ২০১৯ সালে জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সংসদে জানিয়েছিলেন, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে মোট ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। বছর ওয়ারি হিসাবে,২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে ৩ জন মারা যান সীমান্তে।
বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের ঠান্ডা মাথায় খুনের একটিরও বিচার হয়নি। এমনকি বহুল আলোচিত ফেলানি হত্যার বিচার এখনো ঝুলে আছে।ভারতে একটি কার্যকরী আদালত থাকলেও, সীমান্তের এসব অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যত বিএসএফ একইসাথে বিচারক, জুরি এবং ঘাতক হিসাবে কাজ করতে পারে। যে কারণে সীমান্ত হত্যার বিচার পাওয়াটা দুষ্কর বটে।  ভারতের পাশে সীমান্তবর্তী দেশ পাকিস্তান, চিন, ভুটান, মায়ানমার এবং নেপাল রয়েছে যেখানে ভারতের সীমান্ত রক্ষী এতোটা মারমুখি ও বেপরোয়া অবস্থানে নেই। কিন্তু বন্ধু দাবিদার ভারতের বাংলাদেশের নাগরিকদের সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মারার প্রবণতা জনগণকে ভারত বিদ্বেষী করে তুলছে। এজন্য অনেকে সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও ভারত তোষণকে দায়ী করছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ভারতের সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের কারণে সীমান্ত জুড়ে কড়াকড়ি আরোপের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।সীমান্তে চোরাচালান ও বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিতর্কিত শ্যূট-অন-সাইট বা দেখামাত্র গুলি নীতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বহাল আছে, যার প্রেক্ষিতে বিএসএফ কারণে কিংবা অকারণে বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করতে পারে।নেপালের মতো দুর্বল একটি দেশের জনগণ যদি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে তাহলে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনতার সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আপত্তি কোথায়? সরকার ও জনগণের শক্ত অবস্থান ভারতের এই আগ্রাসী নীতি রুদ্ধ করতে পারে। দেশের জনগণ সীমান্ত হত্যাকান্ডের পর বিজিবির শুধু ফ্লাগ মিটিং দেখতে চায় না। চায় কড়া হুশিয়ার ও সীমান্তে জান মালের পূর্ণ নিরাপত্তা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি