সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

টুরসের যুদ্ধ ও ইউরোপে ইসলামিকরণ ব্যাহত



মহানবীর ওফাতের ১০০ বছরের মধ্যে টুরসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সময়টা ৭৩২ সালের ১০ই অক্টোবর। স্থানটা বর্তমান ফ্রান্সের পয়েটিয়ার্স ও টুরস শহরের মধ্যবর্তী মুসাইস লা বাটাইলি নামক গ্রাম। রচিত হয়ে গেলো ইতিহাসের গতিমুখ বদলে দেয়া এক আখ্যান। কর্ডোবার উমাইয়া গভর্নরের নেতৃত্বে আরব বাহিনীর সাথে ফ্রান্সের রাজা চার্লসের নেতৃত্বে ফ্রাঙ্কিশ ও বুরগুন্ডিয়ানদের মধ্যে সংঘর্ষ। যুদ্ধে উমাইয়া সেনাপতি আবদ আল-রহমান গাফিকী নিহত হন। ফরাসীদের কাছে ব্যাটল অব টুরস নামে পরিচিতি পেলেও আরবদের কাছে ‘মাআরাকাতে বালাতুশ শুহাদা’ বা শহীদী সৌধের যুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃত হয়। সৈন্য সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও মুসলিমদের সংখ্যা বেশি ছিল বলেই দাবি করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ পল ডেভিসের মতে, মুসলিম সৈন্য সংখ্যা ৮০ হাজার এবং ফরাসি সৈন্য ৩০ হাজার। যদিও ভিক্টর ডি হ্যানসন উভয়পক্ষে সৈন্য সংখ্যা প্রায় সমান এবং তা ৩০ হাজারের কাছাকাছি বলে যৌক্তিকতা দেখাতে চেয়েছেন।শত্রুর সামনে প্রবল প্রতাপ প্রদর্শনের কারণে চার্লস ‘মার্টেল’ বা হাতুরী উপাধি লাভ করেন।
Encyclopedia Britannica এর ভাষ্য মতে, টুরসের যুদ্ধে উমাইয়াদের নিহত সৈন্য সংখ্যা ১০ হাজারের মত, যেখানে ফ্রাঙ্কিশ বাহিনীতে মাত্র ১ হাজার। চার্লসকে মার্টেল বা হাতুরি উপাধি দেয়া হয় মুসলিম বাহিনীকে গুড়িয়ে দেবার জন্য।
টুরসের যুদ্ধকে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা একটি সিদ্ধান্তমূলক বলে মনে করেন। কারও কারও মতে, যুদ্ধ ইউরোপের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল।
মানুষের মধ্যে টুরসের যুদ্ধের তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, চার্লস পরাজিত হলে সমগ্র ইউরোপ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে যেত এবং সেখানে ইসলামি সংস্কৃতির প্রচলন হত। কেউ কেউ বলেন, টুরস যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় পশ্চিম ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মের অবসান ঘটাত।
ইংরেজ ঐতিহাসিক হেনরি হ্যালাম যুক্তি দিয়েছিলেন, কোন শার্লেমেন, কোন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য বা পাপল রাজ্য থাকত না। হ্যাঁ, তিনি সেই একই শার্লেমেন যাকে "ইউরোপের পিতা" (পেটার ইউরোপা) বলা হয়।
এডওয়ার্ড গিবন তার The History of the Decline and Fall of the Roman Empire গ্রন্থে বলেন,
"এই যুদ্ধে চার্লস্ বিজয়ী না হলে উমাইয়া সৈন্যবাহিনী স্বচ্ছন্দে জাপান থেকে রাইন পর্যন্ত জয় করতে পারত, এমনকি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ইংল্যান্ড পর্যন্ত। রক অব জিব্রাল্টার থেকে লোয়ার নদীর তীর পর্যন্ত অগ্রযাত্রার এক হাজার মাইল দীর্ঘ রেখা। অনুরূপ লাইনের পুনরাবৃত্তি ঘটলে আরবরা পৌঁছে যেত পোল্যান্ডের সীমান্ত ও স্কটল্যান্ডের উচুভূমিতে। নীল ও ফোরাতের চেয়ে রাইন বেশি অগম্য ছিল না।"
কেউ কেউ এটিকে একটি সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ হিসাবে দেখেন। টুরসের যুদ্ধে মুসলমানরা জিতলে কী হতো? ধারণা করা যায়? তাহলে শুনুন- বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধে মুসলমানরা জিতলে আজ ইউরোপের ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক গিবন ও লেনপুলদের মতে, সে যুদ্ধে মুসলমানরা জিতলে প্যারিস ও লন্ডনে, ক্যাথলিক গির্জার পরিবর্তে গড়ে উঠত মসজিদ। অক্সফোর্ড ও অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রে বাইবেলের পরিবর্তে শোনা যেত কোরআনের বাণী!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...