সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

কামাল পাশা



"আমি কামাল পাশাকে পূর্ব আনাতোলিয়ায় পাঠিয়েছিলাম (ঔপনিবেশিক বিরোধী প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিতে) কিন্তু সে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।"" I sent Kemal Pasha to Eastern Anatolia (to lead anti-colonial resistance). But he betrayed us."

-সুলতান মেহমেত বাহদেত্তিন ( ৩৬তম অটোমান সুলতান এবং ১১৫তম খলিফা)
( Murat Bardakcı, Shahbaba, Inkallap Library, Istanbul, 2013, 5th edition)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা নামক একজন জাতীয়তাবাদী নেতা ও সেনানায়কের আবির্ভাব ঘটে যিনি পতনোন্মুখ তুরস্ককে বৈদেশিক আগ্রাসন থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। তার সামরিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ তুরস্ককে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে। তুরস্কের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় পরবর্তীতে তাকে আতাতুর্ক (তুর্কী জাতির পিতা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯২০ সালের ঘৃণিত সেভ্রেস চুক্তির পর থেকে ১৯২৩ সালের ল্যুজান চুক্তির মধ্যবর্তী সময়ে তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ পার করেছে। বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্ক যখন মিত্রপক্ষের ঘৃণিত চক্রান্তের মুখোমুখি হয় আতাতুর্ক তখন আনাতোলিয়ায় তুরস্ককে রক্ষার নকশা করছিলেন। তুরস্কের পশ্চিম প্রান্তে ইস্তাম্বুলে অটোমান সাম্রাজ্য যখন ঘৃণিত চুক্তির ফলে ধিকৃত হচ্ছিল তখন পূর্বাঞ্চলে আনাতোলিয়ায় মোস্তফা কামাল বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার অবস্থান দৃঢ় করতে থাকেন।
এ সময় আনাতোলিয়ায় মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে নতুন একটি রাজনৈতিক সংগঠন সৃষ্টি হয়। এই সময় কামালের রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তাভাবনা আনাতোলিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯১৯ সালে সংগঠনের একটি অধিবেশনে কামালকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী কামালিষ্ট দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিছুদিন পর গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলির সভায় কামালকে স্পিকার নির্বাচিত করা হয়।
এই সময় তুরস্ককে রক্ষায় সালতানাতের নীরবতা ও মোস্তফা কামালের বলিষ্ঠ ভূমিকা তুরস্কের জনগণের কাছে সালতানাত ও খিলাফতের পরিবর্তে মোস্তফা কামাল ও গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি আস্থাশীল ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্রমেই বিশ্বব্যাপী ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক সালতানাতের পরিবর্তে আনাতোলিয়ার আঙ্কারাকেন্দ্রিক গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি তুরস্ককে প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে। এভাবে ক্রমশ সমগ্র তুরস্কে মোস্তফা কামাল ও গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
অটোমান সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষায় সালতানাতের ব্যর্থতা ও পরবর্তীতে গ্রিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতায় সালতানাতের উপর জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। অপরদিকে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি সমস্ত তুরস্কে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এদিকে আনাতোলিয়ায় কামালিস্টরা সালতানাতবিরোধী মতবাদ জনপ্রিয় করতে থাকে। মোস্তফা কামাল ও তার অনুসারীরা প্রচার করতে থাকে যে দেশের অখণ্ডতা রুখতে জরাজীর্ণ খিলাফত ও সালতানাতের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা উচিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...