সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রি.): বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিজয়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল দুটি সাম্রাজ্যের ভাগ্যই পরিবর্তন করে দেয় না, বরং পুরো পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ এমনই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জমিনে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আধিপত্য চিরতরে ধসে পড়েছিল। ১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের সাসনানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের পর উদীয়মান ইসলামী শক্তির সামনে প্রধান পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেই সময় সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াস (Heraclius)। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা সাময়িকভাবে দামেস্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তারা ইয়ারমুকের মাঠে মূল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যদিও এই যুদ্ধকে সাধারণভাবে ইসলাম ও খ্রিস্টান শক্তির সংঘাত হিসেবে দেখা হয়, তবে সেসময়ের বাস্তবতায় অনেক যোদ্ধা ছিলেন যারা সরাসরি এই দুই ধর্মের কোনোটির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। ২. সংখ্যায় কম, ঈমানে বলীয়ান: কৌশলগত লড়াই ইয়ারমুকের প্রান্তরে বাইজেন্টাইন...

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটালো যে চুক্তি

 









লুজান চুক্তি হল ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত এমন একটি শান্তি চুক্তি যার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে বর্তমান তুরস্কের সীমানা। অর্থাৎ আধুনিক তুরস্কের জন্ম এই চুক্তির মাধ্যমে। লুজান চুক্তির আগে, ১৯২০ সালে ‘সেভের্সের সন্ধি’ সমাপ্ত করা হয়েছিল, যার আওতায় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অ-তুর্কি রাষ্ট্রকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে তুর্কিরা এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মিত্র শক্তির বিরুদ্ধে ১৯২২-১৯২৩ যুদ্ধের দুর্দান্ত জয় অর্জন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়।
তখন ১৯২২ সাল। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে।কিন্তু ইউরোপর কিছু কিছু জায়গায় তখনও সংঘাত চলছে। বিশাল ওসমানীয় সম্রাজ্য ভেঙে খান খান।
পশ্চিমাদের মদদে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকায় ওসমানীয়ওদের অধীন থেকে বেড়িয়ে গঠিত হয়েছে প্রায় ৪৫ টির মত নতুন রাষ্ট্র।
ইস্তান্বুলে উসমানীয়দের শেষ সুলতান কার্যত নিষ্ক্রিয়, ক্ষমতাহীন। মিত্রশক্তিদের হাত থেকে শেষ ভূমিটুকু রক্ষায় মরণপণ লড়াই করছেন কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে একদল তুর্কি সেনা। পরাশক্তির বিরুদ্ধে কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতাও পেয়েছেন তাঁরা। গ্রীকদেরকেও তাড়িয়ে দিয়েছেন নিজেদের ভূখণ্ড থেকে।
২৮ অক্টোবর ১৯২২ সাল। মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে তুর্কিদের কাছে দাওয়াত আসে বৈঠকে বসার। আহ্বান আসে যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য,একটি শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনায় বসার। একই বৈঠকে দাওয়াত দেওয়া হয় আঙ্কারায় কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বাধীন তুর্কি সরকারেকে এবং ইস্তানবুলে নিভু নিভু সালতানাতের সুলতানকেও। কিন্তু এই দাওয়াত আসার তিন দিনের মাথায় আতাতুর্ক সালতানাতকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলে শান্তি চুক্তির বৈঠকে শুধুমাত্র তার নেতৃত্বাধীন সরকারের যোগ দেওয়ার পথ উম্মুক্ত হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকারী চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে পরিচিত ১৯২৩ সালের লুজান চুক্তিতে একদিকে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্কের প্রতিনিধিরা এবং অন্য দিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, গ্রিস, রোমানিয়া এবং যুগোস্লাভিয়ার প্রতিনিধিরা ছিলেন। সাত মাসের সম্মেলনের পরে ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজানে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বিধায় এর নাম হয় লুজান চুক্তি।
চুক্তিতে তুরস্কের আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানার স্বীকৃতি দেয়া হয়। চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, তুরস্ক তার আগের আরব প্রদেশগুলোর ওপর কোনো দাবি জানাবে না এবং সাইপ্রাসে ব্রিটিশদের দখল এবং ডডেকানিজের ওপর ইতালীয় অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে। অন্য দিকে মিত্ররা তাদের তুরস্কের কুর্দিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিত্যাগ করবে। সাথে সাথে তুরস্ক আর্মেনিয়ার স্বত্ব ত্যাগ করবে। আর তুরস্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করার দাবি ত্যাগ করবে মিত্র শক্তি এবং তুরস্কের আর্থিক বা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ চাপাবে না। এজিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে বসফরাস প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে কোনো ফি নিতে পারবে না তুরস্ক।
লুজান চুক্তির মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ওসমানীয় খেলাফতের ৬০০ বছরের শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ওসমানী সালতানাতের সব উত্তরাধিকাদেরকে নির্বাসিত করা হয়, কাউকে গুপ্ত হত্যা করা হয়, অনেককে নিখোঁজ করা হয়। তাদের সম্পদ বাজয়াপ্ত করা হয়। এই ভাবে খিলাফতের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলা হয় তুরস্ক থেকে।
কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপ আমেরিকার তাবেদার সেক্যুলার রাষ্ট্র। নিষিদ্ধ করা হয় আরবী চর্চা, বন্ধ করা হয় হাজারো মাদ্রাসা, মসজিদে মসজিদে আজান নিষিদ্ধ করা হয়, হত্যা করা হয় বহু ইমাম, মুয়াজ্জিন, ইসলামী স্কলার এবং আলেমকে। ওসমানী সালতানাতে মূলত দুটি ভাষা প্রচলিত ছিল একটি আরবী অপরটির ফারসি। সাম্রাজ্যের বর্ণমালাকে আবজাদ বলা হতো, যা ওসমানী সাম্রাজ্যের ভাষা বলে পরিচিত ছিল। তাদের রাষ্ট্রীয় ভাষার পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রচলন করা হয় ল্যাটিন ভাষার। এই ভাবে রাতারাতি একটি জাতিকে ফেলে দেয়া হয় অক্ষরজ্ঞানহীন, পরিচয়হীন একটি অন্ধকার কুপে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...