সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রি.): বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিজয়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল দুটি সাম্রাজ্যের ভাগ্যই পরিবর্তন করে দেয় না, বরং পুরো পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ এমনই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জমিনে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আধিপত্য চিরতরে ধসে পড়েছিল। ১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের সাসনানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের পর উদীয়মান ইসলামী শক্তির সামনে প্রধান পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেই সময় সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াস (Heraclius)। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা সাময়িকভাবে দামেস্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তারা ইয়ারমুকের মাঠে মূল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যদিও এই যুদ্ধকে সাধারণভাবে ইসলাম ও খ্রিস্টান শক্তির সংঘাত হিসেবে দেখা হয়, তবে সেসময়ের বাস্তবতায় অনেক যোদ্ধা ছিলেন যারা সরাসরি এই দুই ধর্মের কোনোটির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। ২. সংখ্যায় কম, ঈমানে বলীয়ান: কৌশলগত লড়াই ইয়ারমুকের প্রান্তরে বাইজেন্টাইন...

কুরআনের সুরের জাদুকর



 

আব্দুল বাসিত মুহাম্মাদ আব্দুস সামাদ,যিনি কারি আব্দুল বাসেত নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন মিশরীয় কারি। কুরআনের সুরের জাদুকর। কুরআনের সুমধুর তেলাওয়াতের কারণে বিশ্ববিখ্যাত কারি হিসেবেই স্বীকৃতি লাভ করেন।কারি আব্দুল বাসিত ১৯২৭ সালে মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার বংশের প্রথম কারি। তার দাদা ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষক। আব্দুল বাসিত ছোটবেলা থেকে কুরআন তেলাওয়াতকে ভালো বাসতেন। তিনি ভালোবাসতেন কারিদের মত কোরআন তেলাওয়াত করতে। এরি ধারাবাহিকতায় তিনি মাত্র দশ বছর বয়সেই কুরআন শরীফ মুুখস্ত করেন । কারি আব্দুল বাসিত কে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মহল্লার মসজিদে তারাবি নামাজ পড়ানোর সুযোগ পান।
তিনি ১৯৭০ এর দশকের প্রথম দিকে তিনটি বিশ্ব কেরা'আত প্রতিযোগিতা জিতেছিলেন। কারি বাসিত ছিলেন প্রথম হাফেজ, যিনি তার কুরআন পাঠ্যক্রমের বাণিজ্যিক রেকর্ডিং করেন, এবং তিনি ছিলেন মিশরের কারি পরিষদের প্রথম সভাপতি।
কারি আব্দুল বাসিতের সুললিত কন্ঠের কুরআন তেলাওয়াত যে কাউকে করত মোহমুগ্ধ ও মোহাচ্ছন্ন। তার সুললিত কন্ঠের কুরআন তেলাওয়াত ও সুরের মূর্ছনায় আনন্দ লাভ করেছেন মসলিম,অমুসলিম সকলেই। অনেক এ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তার সুললিত কন্ঠের কুরআন তেলাওয়াত শুনে। তিনি অন্যান্য কারিদের মত হতে চেয়েছিলেন। তার সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কারি ছিলেন কারি মোহাম্মদ রিফাত। তখন কারি মোহাম্মদ রিফাত এর তেলাওয়াত প্রচার করা হত রেডিওতে ঐ সময়ে কারি আব্দুল বাসিতের এলাকায় কোন রেডিও ছিল না। নিজের পছন্দের কারির তিলাওয়াত শুনতে তিন কিলোমিটার পথ হেটে এক মেয়রের বাড়িতে যেতেন কারি আব্দুল বাসিত। এর থেকে কাছে আর কোথায় রেডিওর ব্যবস্থা ছিল না। একটা জিনিসের প্রতি কতটা ভালোবাসা আর একাগ্রতা থাকলে একজন মানুষ শুধুমাত্র রেডিও শুনতে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে উঠেন পৃথিবীর বিখ্যাত কারিদের মধ্যে অন্যতম। মিশরের প্রেসিডেন্টের সাথে একবার রাশিয়া সফরকালে আব্দুল বাসিত কুরআন তেলাওয়াত করেন। তার তেলাওয়াত শুনে রাশিয়ার অমুসলিম ডেলিগেটররা অর্থ না বুঝলেও সুরের কাঁপনে, সুরের শক্তির কাছে নিজেদের অশ্রু বিসর্জন দেয়।
কারী বাসিত একদিন এক মাহফিলে কুরআন তেলাওয়াতের জন্য দাওয়াত পেয়েছিলেন। সেখানে তাঁর জন্য সময় বরাবদ্দ ছিল মাত্র ১০ মিনিট। তিনি যখন তেলাওয়াত শুধু করলেন তখন মাহফিলের কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেলো। তার সুললিত কন্ঠের তেলাওয়াত শুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকে অনুরোধ করলো আরো কিছুক্ষন তেলাওয়াত করতে। তার সুললিত কন্ঠে ১০ মিনিটের স্থলে ১:৩০ মিনিট তেলাওয়াত করলেন। এত মনোমুগ্ধকর কন্ঠে তেলাওয়াত শুনে সময়জ্ঞান ভূলে সবাই শুধু শুনতেই থাকলো।
কারি আব্দুল বাসিত সারাজীবন তাঁর তেলাওয়াতের মাধ্যমে বিমোহিত করেছেন বিশ্বের মানুষকে। তিনি মনকে প্রশান্ত করেছেন, আবেগের অশ্রু এনেছেন, মহান আল্লাহর বাণী তাঁর সুললিত কন্ঠে মানুষের অন্তর দুর্গে আঘাত করেছে। অবশেষে এই সুললিত কন্ঠের অধিকারী কারি আব্দুল বাসিত ৩০ নভেম্বর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
প্রসিদ্ধ এই কারির মনোরম ও সুললিত কণ্ঠস্বর, প্রতিভাধর, তেলাওয়াতের সময় দীর্ঘ শ্বাস ও মনোযোগ সহকারে তেলাওয়াত এবং প্রশান্তির কারণে শ্রোতাদের অন্তরে সর্বক্ষণ জীবিত রয়েছেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...