সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

ইসরায়েল সর্বোচ্চ যুদ্ধ বিমান ধবংসের রেকর্ড বাঙালি বৈমানিক সাইফুল আজমের



মো.আবু রায়হান
সাইফুল আজম একজন বৈমানিক ও বীরযোদ্ধা ।তিনি ১৯৪১ সালে পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতার নাম ছিল নুরুল আমিন। ১৫ বছর বয়সে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে, ১৯৫৬ সালে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান যান। ১৯৫৮ সালে তিনি ভর্তি হন পাকিস্তান এয়ার ফোর্স ক্যাডেট কলেজে। দুই বছর পর ১৯৬০ সালে তিনি পাইলট অফিসার হয়ে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। একই বছর তিনি জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে যোগ দেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। সাইফুল আজম বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্ডান ও ইরাকের বিমানবাহিনীর বৈমানিকের দায়িত্ব পালন করেছেন।পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র যোদ্ধা, যিনি আকাশপথে লড়াই করেছেন তিনটি ভিন্ন দেশের বিমানবাহিনীর হয়ে। একক ব্যক্তি হিসেবে আকাশপথের যুদ্ধের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করার রেকর্ডটিও এই যোদ্ধার।
এক সময় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লড়াইয়ে প্রায় আট হাজার বাংলাদেশি অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশি গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন । ১৯৬৭ সালের ৫ জুন তৃতীয় আরব-ইসরায়েলি ছয়দিনের যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী বোমাবর্ষণ করে মিশরীয় বিমান বাহিনীর সব বিমান অচল করে দেয়। ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হামলা থেকে জর্দানের মূল বেস মাফরাকের প্রতিরক্ষার জন্য তাকে ডাকা হয়। সেসময় জর্দান বিমানবাহিনীর হয়ে সাইফুল আজম হকার হান্টার বিমান নিয়ে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর আক্রমণের আগমূহুর্তে জর্দানের বিমান বাহিনীর পক্ষে উড্ডয়ন করেন। তিনি অসামান্য দক্ষতা এবং সাহসিকতার দৃষ্টান্ত রেখে তার বিমানের চেয়ে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির দুইটি ইসরায়েলি মিরাজ ফাইটার বিমান ভূপাতিত করেন।
দুইদিন পর তাকে ইরাকে জরুরি ভিত্তিতে বদলি করে পাঠানো হয়। তিনি ইরাকি বিমান বাহিনীর হয়ে ইসরায়েলি ফাইটারের মোকাবেলা করেন এবং ডগ ফাইটে একটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করেন। বিমানঘাঁটি আক্রমণের সময় তিনি পশ্চিম ইরাকে ছিলেন। ইসরায়েলি পাইলট ক্যাপ্টেন গিডিওন ড্রোর সাইফুল আজমের উইংমেনসহ দুজন ইরাকি যোদ্ধাকে গুলি করতে সক্ষম হন, এর বিপরীতে সাইফুল আজম তাকে গুলি করতে সক্ষম হন। তিনি ক্যাপ্টেন গোলানের বোমারু বিমানকেও ভূপাতিত করতে সক্ষম হন। পরে দুই ইসরায়েলি বৈমানিককে যুদ্ধবন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়। আকাশযুদ্ধে তিনি চারটি ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হন, যা এখন পর্যন্ত একটি রেকর্ড। আজ পর্যন্ত এককভাবে সর্বাধিক ইসরায়েলি বিমান ধ্বংসের রেকর্ড তাঁরই। দুই দিনের ব্যপ্তিতে তিনি দুইটি ভিন্ন স্থানে আক্রমণ পরিচালনা করে ৪টি ইসরায়েলি ভূপাতিত করেন। এজন্য তাকে জর্দানের অর্ডার অব ইস্তিকলাল ও ইরাকি সাহসিকতা পদক নুত আল সুজাত প্রদান করা হয়।। জর্দান, ইরাক তাঁকে সম্মাননা দিলেও সর্বোচ্চ উপাধি দিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী।যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতা আর কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশন বিশ্বের যে ২২ বৈমানিককে ‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননা দিয়েছিল, সাইফুল আজম তাদেরই একজন।
সাইফুল আজম ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানে ফিরে আসেন। পাকিস্তানে ফেরার পর ১৯৬৯ সালে শেনিয়াং এফ-৬ জঙ্গি বিমানের ফ্লাইট কমান্ডার হন । এরপর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ফাইটার লিডারস স্কুল-এর ফ্লাইট কমান্ডারের দায়িত্ব নেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট সেফটি পরিচালক এবং পরে ডিরেক্টর অব অপারেশনসের দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আজম। ১৯৭৭ সালে পদোন্নতি পেয়ে হন উইং কমান্ডার, পান ঢাকায় বিমান ঘাঁটির দায়িত্ব।
সাইফুল আজম ১৯৭৯ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেন।
লড়াকু এই আকাশ যোদ্ধা গত বছর ১৪ জুন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
সাইফুল আজমের মৃত্যু শোকগ্রস্ত করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদেরও। ফিলিস্তিনের ইতিহাসবিদ ওসামা আল-আশকার তাকে বর্ণনা করেন একজন ‘মহান বৈমানিক’হিসেবে।ফেইসবুকে এক পোস্টে শোক জানাতে গিয়ে তিনি লিখেন, জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদকে রক্ষার লড়াইয়ে এই ‘বাংলাদেশি ভাইও’ শামিল হয়েছিলেন।
ফিলিস্তিনের অধ্যাপক নাজি শুকরি এক টুইটে সাইফুল আজমের প্রতি স্যালুট জানিয়ে লিখেন, “তিনি ফিলিস্তিনকে ভালোবাসতেন এবং জেরুজালেমের স্বার্থে লড়াই করেছিলেন।”মৃত্যুতে সাইফুল আজমকে স্মরণ করে জর্ডানও। দেশটির যুবরাজ হাসান বিন তালাল এক শোকবার্তায় এই বাংলাদেশি বৈমানিকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছিলেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...