১২৬০ খ্রিষ্টাব্দ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তখন আতঙ্কের কালো মেঘ। মঙ্গোল বাহিনীর নাম শুনলেই নগরীর দরজা বন্ধ হয়ে যেত, মানুষ পালানোর পথ খুঁজত। একের পর এক নগরী ধ্বংস করে এগিয়ে আসছিল চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরিদের বাহিনী। এরই মধ্যে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী সেনাপতি হুলাগু খান মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ংকর অভিযান শুরু করেন। বাগদাদ থেকে সিরিয়া—ধ্বংসের পথে মঙ্গোল বাহিনী ১২৫৮ সালে হুলাগুর বাহিনী আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ দখল করে। শেষ আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহ নিহত হন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাগদাদ ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। এরপর হুলাগুর বাহিনী সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। ১২৬০ সালের জানুয়ারিতে আলেপ্পো অবরোধ করা হয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শহরটি মঙ্গোলদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর মঙ্গোল বাহিনী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হয় এবং মার্চ মাসে দামেস্কও তাদের দখলে আসে। মনে হচ্ছিল—মঙ্গোলদের থামানোর মতো কোনো শক্তিই আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইতিহাস তখন অন্য একটি অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মিশরে উঠে এল মামলুক শক্তি মঙ্গোলদের এই অপ্রতিরোধ...
আব্বাসীয় খলীফা আল মুতাসিম বিল্লাহ ৮৩৩ সাল থেকে ৮৪২ সাল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব শাসন করেন। তিনি ছিলেন অষ্টম আব্বাসীয় খলিফা। খলীফা মামুনের মত তিনিও ছিলেন মুতাযিলা মতবাদের অনুসারী। নিজের মতবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল সহ আহলুস সুন্নাহর অন্যান্য আলেমদের উপর তিনি প্রচন্ড নির্যাতন চালান।
খলীফা মুতাসিম চলছেন রাজপথ দিয়ে। রাজকীয় সমারোহে সুসজ্জিত অশ্বে আরোহণ করে চলেছেন তিনি। জনসাধারণ নিরাপদ পথ করে দিচ্ছে। চারদিকে থেকে অগণিত মানুষ সহাস্য বদনে সালাম জানাচ্ছে খলীফা মুতাসিমকে। খলীফা সকলের দিকে চেয়ে তাদের সালাম বিনিময় করে ধীরে ধীরে সামনে এগুচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল রাস্তার উপরে এক বৃদ্ধের উপর। বৃদ্ধটি খলীফাকে পথ করে দেবার জন্য রাস্তা থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছিল। সরতে গিয়ে সে হঠাৎ রাস্তার পাশে নর্দমায় পড়ে গেল। কাদায়,ময়লায় মলিন হয়ে গেল তার দেহ। নর্দমা থেকে উঠার চেষ্টা করেছে বৃদ্ধ। সাহায্য পাবার আশায় দুটি হাত যেন তার অজ্ঞাতেই উপরে উঠেছে। খলীফা সংগে সংগে তার ঘোড়া দাঁড় করালেন। নামলেন ঘোড়া থেকে। ছুটে গেলেন সেই নর্দমার ধারে। সেই বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরে অতি সাবধানে তাকে উপরে টেনে তুললেন খলীফা। বৃদ্ধের দেহের কাদা-ময়লা খলীফার দেহের রাজকীয় সজ্জাকেও কর্দমাক্ত করে দিল। কিন্তু খলীফার সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাকেই পথ করে দিতে গিয়ে এক বৃদ্ধ কষ্ট পেয়েছে,এই বেদনাদায়ক অনুভূতিই তাঁর কাছে বড়। তিনি খলীফা কিন্তু মুলতঃ জনগণের সেবক। জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধান করাই তাঁর দায়িত্ব,কষ্ট দেয়া নয়। বৃদ্ধটি খলীফার কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নেয়ার পর খলীফা স্বস্তি লাভ করলেন। তারপর ঘোড়ার পিঠে ফিরে এসে আবার যাত্রা কররেন তাঁর গন্তব্যের দিকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন