সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রি.): বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিজয়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল দুটি সাম্রাজ্যের ভাগ্যই পরিবর্তন করে দেয় না, বরং পুরো পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ এমনই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জমিনে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আধিপত্য চিরতরে ধসে পড়েছিল। ১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের সাসনানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের পর উদীয়মান ইসলামী শক্তির সামনে প্রধান পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেই সময় সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াস (Heraclius)। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা সাময়িকভাবে দামেস্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তারা ইয়ারমুকের মাঠে মূল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যদিও এই যুদ্ধকে সাধারণভাবে ইসলাম ও খ্রিস্টান শক্তির সংঘাত হিসেবে দেখা হয়, তবে সেসময়ের বাস্তবতায় অনেক যোদ্ধা ছিলেন যারা সরাসরি এই দুই ধর্মের কোনোটির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। ২. সংখ্যায় কম, ঈমানে বলীয়ান: কৌশলগত লড়াই ইয়ারমুকের প্রান্তরে বাইজেন্টাইন...

কমিউনিস্ট রাশিয়ায় ইসলাম ও মুসলমান




রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ যার রয়েছে পৃথিবীর মোট আবাসযোগ্য জমির এক অষ্টমাংশ। দেশটির মোট আয়তন ১৭,০৭৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার। রাশিয়া বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ যেখানে ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৪৩ মিলিয়ন লোক বসবাস করে।দেশটির ইতিহাস শুরু হয় ৩য় ও ৮ম খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব স্লাভদের মাধ্যমে যারা ইউরোপের একটি স্বীকৃত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ভারাঞ্জিয়ান যোদ্ধা ও তাদের বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও শাসিত হয় এবং নবম শতকে দেশটির উত্থান শুরু হয়। ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য থেকে গোঁড়া খ্রিস্টান রীতি গৃহীত হয়।
ইসলাম প্রথম রাশিয়ে প্রবেশ করে ৮ম শতাব্দীতে দাগেস্তান হয়ে। এরপর ৯২২ সালে রাশিয়ার ভলগা-বুলগেরিয়ায় প্রথম ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত।পরবর্তীতে চেঙ্গিস খানের নাতি বাতু খান ১২৩০-এর দশকে রাশিয়া জয় করে। পরে মোঙ্গলরা (তাতার) ইসলাম গ্রহণ করলে রাশিয়ায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২৩৬ থেকে ১২৩৭ সালের মধ্যে মোঙ্গলরা ভোলগা বুলগার রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেয় এবং এরপর সমগ্র রুশ ভূমিকে পদানত করে। ১৩২৭ সালে গোল্ডেন হোর্ডের শাসক উজবেক খান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এর ফলে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের জন্য রুশ ভূমিসমূহের কর্তৃত্ব মুসলিমদের হাতে ন্যস্ত হয়। এরপর মাস্কো ও গোল্ডেন হোর্ডের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটতে থাকলে মস্কোর রাজপুরুষেরা ক্রমাগত গোল্ডেন হোর্ডের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সংঘর্ষে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।১৫৫২ সালে রাশিয়ার জার চতুর্থ আইভান গোল্ডেন হোর্ডের উত্তরসূরি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্র কাজান দখল করেন এবং ভৌগোলিক সম্প্রসারণের এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া আরম্ভ করেন।ক্রমে ক্রিমিয়া, ককেশাস এবং মধ্য এশিয়া রাশিয়ার পদানত হয় এবং এর ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বহু মুসলিম জাতি রুশ শাসনাধীনে আসে।রুশ বিপ্লব হচ্ছে বলশেভিক বিপ্লব এবং অক্টোবর বিপ্লবের সমন্বিত রূপ। ১৯১৭ সালে কমিউনিস্ট বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান হয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংগঠিত প্রথম বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ার সম্রাজ্য ভেঙে পরে এবং শেষ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসকে উৎখাত করে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। দ্বিতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে অন্তর্বতীকালীন সরকারকে উৎখাত করে বলশেভিক (কমিউনিস্ট) সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
বলশেভিকগণ এমন একটি নাস্তিক্যবাদী রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করেন যা আধুনিক ইতিহাসে এই প্রথম।ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার বন্ধ করে দেয়। কমিউনিস্ট রাশিয়ায় সব ধর্মের লোকজনের অবস্থাই খারাপ ছিল। সবচেয়ে খারাপ ছিল তৎকালীন মুসলমানদের অবস্থা। রাজনৈতিক পরাধীনতা এবং অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও ইসলামকে কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নাস্তিকতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। কুরআন প্রকাশ ও প্রচার করা নিষিদ্ধ ছিল। মসজিদ, ধর্মীয় উপসনালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো হয়তো ভেঙ্গে ফেলা হয় নয়তো অফিস বা গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নাস্তিক কমিউনিষ্টদের নিবর্তনমূলক শাসনের ফলে রাশিয়ায় ইসলাম ধর্ম ৭০ বছর যাবত প্রকাশ্যে বিকশিত হতে পারেনি। ইসলামের প্রচার-প্রসার, দাওয়াত ও তাবলীগ সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকে। রুশ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসন ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি পালন স্থগিত হয়ে যায়।রাশিয়ায় ইসলামী শিক্ষার ইতিহাস বড়ই করুণ ও মর্মবিদারী। সমাজতান্ত্রিক সরকার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দখল করে ফেললে বিদগ্ধ মুসলিম পন্ডিতদের হয়তো হত্যা করা হয় নয়তো কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। প্রায় অধিকাংশ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।উনবিংশ শতব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে কিছু কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় নাস্তিক্যবাদী রাজত্বের অবসান ঘটলে ধর্মীয় স্বাধীনতা পূণরুজ্জীবিত হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...