সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রি.): বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিজয়

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল দুটি সাম্রাজ্যের ভাগ্যই পরিবর্তন করে দেয় না, বরং পুরো পৃথিবীর সভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ এমনই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জমিনে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের আধিপত্য চিরতরে ধসে পড়েছিল। ১. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের সাসনানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের পর উদীয়মান ইসলামী শক্তির সামনে প্রধান পরাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেই সময় সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াস (Heraclius)। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা সাময়িকভাবে দামেস্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তারা ইয়ারমুকের মাঠে মূল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যদিও এই যুদ্ধকে সাধারণভাবে ইসলাম ও খ্রিস্টান শক্তির সংঘাত হিসেবে দেখা হয়, তবে সেসময়ের বাস্তবতায় অনেক যোদ্ধা ছিলেন যারা সরাসরি এই দুই ধর্মের কোনোটির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। ২. সংখ্যায় কম, ঈমানে বলীয়ান: কৌশলগত লড়াই ইয়ারমুকের প্রান্তরে বাইজেন্টাইন...

হিজরি সন থেকে যেভাবে বাংলা সনের উৎপত্তি হলো এবং কিভাবে ইংরেজি থেকে বাংলা সন বের করবেন?

 

সন আরবি শব্দ। অর্থ হলো অব্দ বা বর্ষ বা বর্ষপুঞ্জ। আবার সনকে সাল বলা হয়। সাল ফার্সি শব্দ।
ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট ছিলেন আকবর। তিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দী ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেন।উল্লেখ্য, আকবরের রাজত্বকাল ছিল ১৫৫৬-১৬০৫ সাল পর্যন্ত। সম্রাট আকবর বাংলাসহ বেশ কয়েকটি প্রদেশ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে কতিপয় ‘ফসলি সাল’ প্রবর্তন করেন। বাংলা বর্ষ সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সেই সব ফসলি সালের একটি। সেই সময় থেকে এ দেশের মানুষ চাষাবাদ, খাজনা পরিশোধ, সংবছরের হিসাব-নিকাশ সব কিছুতেই বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে থাকে, যেটা মুঘল শাসন আমল সম্রাট বাবর থেকে শুরু করে বাহাদুর শাহ জাফর তারপর ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান শাসনামল পার হয়ে বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে বাংলা সন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা:)-এর সময়কালে হজরত আলী (রা:)-এর প্রস্তাবে মহানবী (সা:)-এর হিজরতের দিন থেকে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। সেটি ছিল ৬২২ সালের ১৬ জুলাই। হজরত ওমর (রা) ৬৩৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সনের প্রবর্তন করেন। বছরটি ছিল ১৭ হিজরি।হিজরি সন থেকেই সূচনা হয় বাংলা সনের। এর আগে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস।
সম্রাট আকবরের অর্থ বিভাগের উপদেষ্টা টোডরমলের সহকারী আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী বাংলা মাসের নামগুলো নক্ষত্রের নাম থেকে নিয়ে সৌর মাসের দিন মিলিয়ে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবরের দরবারে বিখ্যাত নবরত্ন সভার’ বাইরেও অনেক মেধাবী পণ্ডিত ছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী। তাকেই দায়িত্ব দেয়া হয় নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের।
৯৬৩ হিজরি সনের মহরম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এ জন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং পয়লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।হিজরি সনের গণনা করা হয় চাঁদের হিসাবে আর বাংলা সন গণনা করা হয় সৌর হিসেবে। চন্দ্র বা চাঁদের হিসাবে ৩৫৪ দিন আর আর সৌর হিসাবে ৩৬৫ দিন। আজ থেকে ৪৩৭ বছর আগে মুঘল সম্রাট আকবর পয়লা বৈশাখ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলা সনের সূচনা করেন। ইংরেজি ১৫৮৪ সালে পয়লা বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করা হলেও তার কার্যকারিতা দেখানো হয় ২৯ বছর আগে ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১১ মার্চ থেকে অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে। সেই হিসাবে ৪৬৫ বছর আগে ৯৬৩ হিজরিতে ৩৫৪ দিনের গণনায় এনে সম্রাট আকবর নতুন বাংলা সন প্রবর্তন করেন। খুব সহজে ইংরেজি তারিখ এবং সালের সাথে মিলিয়ে বাংলা সাল বের করা যায়।আকবর যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন ইংরেজি ছিল ১৫৫৬ এবং হিজরি ছিল ৯৬৩ হিজরি। দুই সনের পার্থক্য (১৫৫৬-৯৬৩)= ৫৯৩। এখন ইংরেজী সন থেকে সহজে ৫৯৩ বিয়োগ করে বাংলা সন বের করে নিতে পারবেন।যেমন বর্তমান (২০২১-৫৯৩) = ১৪২৮। যদি সালটি ১লা জানুয়ারি থেকে ১৩এপ্রিলের মধ্যে হয় তাহলে ইংরেজি সাল থেকে ৫৯৪ বিয়োগ করলেই বাংলা সন বের হবে। যেমন-
১৯৫২ সালের ২১ এ ফেব্রুয়ারি বাংলা কোন সন ছিল? নির্ণয়: ১৯৫২ — ৫৯৪ = ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ।
আর যদি সালটি ১৪ এপ্রিল থেকে বাকি মাস হলে ৫৯৩ বাদ দিলে বাংলা সন বের হবে। যেমন—১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলা কোন সন ছিল? নির্ণয়: ১৯৭১ — ৫৯৩ = ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...