সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পিতামাতা সৎ ও ধার্মিক হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আদর্শবান হয়


পিতামাতার ভালমন্দ, মন মেজাজ এবং আচার আচরণসহ সার্বিক বিষয়ের প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর। হযরত ওমরের নিম্নোক্ত ঘটনাটি কমবেশি সকলেই জানি। কোনো এক রাতে হযরত ওমর (রা.) জনগণের অবস্থা অবগত হওয়া এবং তাদের খোঁজখবর নেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ তিনি ক্লান্তি অনুভব করলেন। তখন নিকটবর্তী কোনো এক ঘরের প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। তার কানে নারী কণ্ঠ ভেসে এলো। এক বৃদ্ধা তার কন্যাকে আদেশ দিচ্ছে যে, হে মেয়ে! ওঠ, দোহনকৃত দুধে পানি মিশ্রিত কর। কন্যা বলল, হে জননী! আপনি কি অবগত নন যে, আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর (রা.) দুধে পানি মেশাতে নিষেধ করেছেন? তার জননী বলল, হে মেয়ে, যাও ওঠ, দুধের মধ্যে পানি মিশ্রিত কর, হযরত ওমর (রা.) আমাদের তো দেখছেন না। কন্যা জবাব দিলেন, হে জননী! হযরত ওমর (রা.) হয়তো আমাদের দেখছেন না, তবে তাঁর রব তো আমাদের দেখছেন।
হযরত ওমরের কাছে এ দীনদার নেক কন্যার কথোপকথন খুবই পছন্দনীয় হলো। ওই মেয়ের আল্লাহভীরুতা তার কাছে অত্যন্ত ভালো লাগল। স্বীয় ক্রীতদাস আসলামকে বললেন, হে আসলাম! এ দরজার চিহ্ন মনে রেখ এবং এ বাড়ির ঠিকানা স্মরণ রেখ।এরপর দুজনই অগ্রসর হলেন। চলতে চলতে হযরত ওমর (রা.) নিজের ঘরে পৌঁছে গেলেন। প্রভাত হলো, তখন হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আসলাম! যাও এবং খবর নাও, সে মেয়েটি কে?কে এ মেয়ে? যার হৃদয় খোদাভীতিতে ভরপুর। আসলাম সেই মেয়ের খোঁজ নিয়ে খলিফাকে জানালেন। মেয়েটি ছিল হেলাল গোত্রের এক বিধবার কন্যা । তাদের পরিবারে পুরুষ কেউ নেই। তারা দুধ বেচে জীবিকা নির্বাহ করে।
তখন খলীফা হযরত ওমর (রা) তাঁর পুত্রদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কারও স্ত্রীর প্রয়োজন আছে কি যে, আমি এ বালিকার সাথে তার বিবাহ দিব? আবদুল্লাহ বললেন, আমার স্ত্রী আছে, সুতরাং আমর দ্বিতীয় স্ত্রীর কোন প্রয়োজন নেই। আবদুর রহমানও অনুরূপ উত্তর করলেন। তখন আসেম নিবেদন করলেন, পিতা! আমার কোন স্ত্রী নেই, আমার নিকট তাকে বিবাহ দিন।
হযরত ওমর (রাঃ) মেয়েটি ও তার মাকে ডেকে পাঠিয়ে ওনার মনের কথা বললেন। মেয়ে ও তার মা দুইজনই আকাশ থেকে পড়লেন! এও কী সম্ভব! একজন খলিফা (তখনকার আমলের অর্ধেক দুনিয়ার বাদশাহ) তার ছেলের জন্য এই গরিব অসহায় বিধবার মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে সিলেক্ট করেছেন! এটা কি স্বপ্ন?
না, এটা স্বপ্ন না। এটা হল কাছে আসার গল্প। সাহাবীরা এভাবেই পাত্রী না দেখেই শুধু তার গুণের কথা শুনে ও খোদা ভীরুতাকে যোগ্যতা হিসেবে নিয়ে নিজের ও সন্তানের পাত্র পাত্রী নির্ধারন করতেন।
আসেম এ বালিকাকে বিয়ে করে স্ত্রীরূপে বরণ করে নিলেন।
আবদুল আজিজ বিন হাকাম ছিলেন বনি উমাইয়ার শ্রেষ্ঠ গভর্নরদের অন্যতম। ২০ বছরেরও বেশি সময় মিসরের শাসক ছিলেন তিনি। বিয়ের আগে আবদুল আজিজ (রহ.) নিজের সহকারীকে বলেন, ‘আমার বৈধ সম্পদ থেকে আমার জন্য চার শ দিনার সংগ্রহ করো। আমি অত্যন্ত সৎ পরিবারের মেয়ে বিয়ে করব।’ অতঃপর তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর নাতনি উম্মে আসেম লায়লা বিনতে আসেমকে বিয়ে করেন।
উম্মে আসেমের মা ছিলেন সেই নারী, যে মায়ের নির্দেশ অমান্য করে গভীর রাতে দুধে পানি মিশ্রণ থেকে বিরত ছিলেন এবং আড়াল থেকে তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)। উম্মে আসেম এর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করলো ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী শাসক হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)।
উমর ইবনে আবদুল আজিজ ( জন্ম ৬৮২, ২৬ সফর ৬৩ হিজরি- মৃত্যু ৩১ জানুয়ারি ৭২০, ১৬ রজব ১০১ হিজরি) উমাইয়া বংশীয় একজন শাসক। উমাইয়া বংশীয় অন্যান্য শাসকদের মতো তাকেও মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে গণ্য করা হয়। খুলাফায়ে রাশেদিন এর চার খলিফার সাথে তুলনা করতে গিয়ে অনেকে তাকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে থাকেন।
ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ শাসকদের অন্যতম হলেন উমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.)। খোদাভীতি, বিচক্ষণতা, সাহসিকতাসহ সাহাবাদের অনন্য গুণাবলির সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মাঝে। তাই অনেকে তাঁকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যে গণ্য করেন।
হজরত ওমরের সাথে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মিল থাকায় ওমর বিন আব্দুল আজীজ ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় ওমর হিসেবেও তিনি পরিচিত। উমাইয়া বংশের ইতিহাসে দ্বিতীয় ওমরের অভিষেক সত্যিই একটি যুগান্তকারী ঘটনা। অনাচার, অধর্ম, বর্বরতা, ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, বিলাসিতা যখন উমাইয়া খিলাফতে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল সে সময় তিনি শাসনভার গ্রহণ করেন। প্রশাসক হিসেবে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন। কেননা খলিফা ওয়ালিদের রাজত্বে তিনি হেজাজের শাসনকর্তা ছিলেন। এ সময় তিনি ন্যায়পরায়ণতা, সরলতা, চারিত্রিক মাধুর্য, ধর্মপরায়ণতা ও প্রজাবাৎসল্য দ্বারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তিনি পূর্ববর্তী উমাইয়া খলিফাদের স্বেচ্ছাচারী নীতি বর্জন করেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের মৌলিক ইসলামী আদর্শগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবার প্রয়াস পান। আর এ কারণেই তাঁকে ‘উমাইয়া সাধু' বলে অভিহিত করা হয়। তাকে ইসলামের প্রথম মুজাদ্দিদ বলে গণ্য করা হয়।মদিনায় বেড়ে ওঠায় বড় সাহাবিদের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল। আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.)-এর যেকোনো দরসে তিনি শৈশবকাল থেকেই যাতায়াত করতেন। কারণ তার মা আবদুল্লাহ বিন ওমরকে সব বিষয়ে খুবই গুরুত্বারোপ করতেন। ছোটবেলায় প্রায় তিনি আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.)-এর দরস থেকে এসে মাকে বলতেন, ‘আম্মু, আমি নানার মতো হব।’ তখন মা উত্তরে বলত, ‘সফর করো, ইলম অর্জন করো। ওনার মতো হতে পারবে।’ প্রায় তিনি মাকে এ কথা বলতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪৪/৫)
ওমর (রহ.) এমন সময় বেড়ে ওঠার সময়ে সমাজের সর্বত্র ছিল তাকওয়া ও ইলমচর্চায় ভরপুর। তা ছাড়া মদিনায় তখনো অনেক সাহাবি অবস্থান করছিলেন। তাদের কাছ থেকে তিনি ইলম অর্জন করতে থাকেন। এমনকি তিনি রাসুল (সা.)-এর খাদেম আনাস (রা.)-এর নামাজে ইমামতি করেন। তখন আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর নামাজের সঙ্গে এ যুবকের মতো এত সাদৃশ্যপূর্ণ কারও নামাজ আমার চোখে পড়েনি।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১৪/৫)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...