সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হুদায়বিয়ার সন্ধি ও শর্তসমূহ





#মো আবু রায়হান
ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্বের ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের ইতিহাসে এ সন্ধি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সন্ধিতে সাক্ষর করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রতিভা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তাই হুদায়বিয়ার সন্ধি মহানবী (সা) এর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মহানবী (সা.)কে অত্যাচার-নির্যাতনের মাধ্যমে কুরাইশরা এক পর্যায়ে তাঁকে মদিনায় হিজরতে বাধ্য করেছিল। হিজরতের পরেও মহানবী (সা.) ও ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। বদর, ওহুদ, খন্দকের মতো যুদ্ধ মহানবী (সা.) ও ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়েই কুরাইশরা সংঘটিত করেছিল। আর এ উদ্দেশ্যে ইহুদি-খ্রিস্টানদের সহযোগিতা পেয়েও মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পরেনি। এক সময় তাদের সাথেই হুদায়বিয়ার সন্ধিতে বসতে হয়েছে। আর সন্ধির সুযোগে মহানবী (সা.) দেশে-বিদেশে ইসলামের আহ্বান পৌঁছিয়ে ইসলামের দ্রুত বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পটভূমি-

দীর্ঘদিন মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে এসে মহানবী (সা.)-এর প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। কাবা শরীফ জিয়ারত করবার মহান আল্লাহ তায়ালার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পেয়ে মহানবী (সা.) ৬ষ্ঠ হিজরীতে জিলকদ মাসে পবিত্র উমরাহ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) তাঁর চৌদ্দশত সাহাবীসহ শান্তিপূর্ণভাবে উমরাহ সম্পন্ন করার জন্য মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।দুর্গম উপত্যকা দিয়ে কাফেলাকে অতিক্রম করিয়ে ‘হুদায়বিয়া’য় পৌঁছলে মহানবী (সা.)-এর উট মাটিতে বসে পড়ল। মহানবী (সা.) বললেন : “এ উট আল্লাহর নির্দেশে এখানে বসে পড়েছে। এখানেই আমাদের করণীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” এরপর সবাইকে বাহন হতে নেমে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের শত্রুতা তখনো শেষ হয়নি। তারা মুসলমানদের প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইল। খুজায়া গোত্রের সর্দার বুদাইলের মাধ্যমে কুরাইশদের এই মনোভাবের কথা মহানবী(সা.) জানতে পারলেন। মহানবী(সা.) বুদাইলের মাধ্যমে কুরাইশদের এই মর্মে সংবাদ দিলেন যে, মুসলমানরা কোনো যুদ্ধের জন্য নয়, বরং শান্তিপূর্ণভাবে কাবা শরীফে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। কিন্তু মুসলমানদের বাধা দেবার জন্য কুরাইশরা ছিল সংকল্পবদ্ধ।রাসুল (সা.) তাঁর পাঠানো সংবাদের উত্তর জানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কুরাইশদের মধ্যে কিছু বিজ্ঞ ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করতে চাইল। তারা জানতো যে, মুহম্মদ (সা.)কে যদি উমরাহ পালন করতে দেয়া না হয় তাহলে এর ফলে যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। তাছাড়া মহানবী (সা.) এর সাথে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মক্কার কুরাইশরা সিরিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক পুনঃচালু করতে পারবে। কারণ মদিনার উপর দিয়ে যাওয়া এই বাণিজ্য পথটি মুসলমানদের দখলে রয়েছে। অতএব, কুরাইশরা তাদের মুখপাত্র হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে মহানবী (সা.) এর নিকট এই সন্ধিচুক্তির শর্ত নির্ধারণের জন্য প্রেরণ করলেন। উরওয়া মহানবী (সা.) এর নিকট আসলো। কিন্তু উভয় পক্ষের আলোচনাকালে মহানবী (সা.)-এর অনুসারীদের সম্পর্কে তার অপ্রীতিকর ও শত্রুভাবাপন্ন মনোভাবের কারণে চুক্তি সম্পন্ন সফল হননি। তবে উরওয়া মহানবী (সা.) এর উপর সাহাবীদের প্রগাঢ় ভক্তি, ভালোবাসা ও আস্থা লক্ষ্য করে এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে কুরাইশদের তা অবহিত করে। মহানবী (সা.) দ্বিতীয়বার কুরাইশদের নিকট খিরাস ইবনে উমাইয়া নামক একজন দূতকে প্রেরণ করলেন, কিন্তু কুরাইশরা তার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং তার উটের পায়ের রগ কেটে দেয়। কুরাইশরা মহানবী (সা.) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে খুবই শত্রুতামূলক আচরণ করে। তারা মুসলমানদের হত্যা করার জন্য একটি ক্ষুদ্র দলকেও পাঠায়। কুরাইশদের এ সমস্ত লোক আক্রমণ করতে এসে নিজেরাই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। কিন্তু মহানবী (সা.) তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেন এবং মক্কার পবিত্র কাবা ঘরের আওতার মধ্যে রক্তপাত করতে নিষেধ করেন। অতপর মহানবী (সা.) হযরত ওসমান(রা.)কে শান্তির জন্য কুরাইশদের নিকট প্রেরণ করেন। হযরত ওসমান (রা.) মক্কায় পৌঁছলে কুরাইশরা তাঁকে বন্দী করে। মুসলিম শিবিরে এরূপ গুজব রটে যে, কুরাইশরা হযরত ওসমান(রা.)কে হত্যা করেছে। মহানবী(সা.) এই খবরে খুবই মর্মাহত হলেন। পবিত্র কাবা শরীফের এলাকার মধ্যে পবিত্র মাসে কোনো আরব গোত্র প্রধানকে হত্যা করা ইসলামপূর্ব আমলেও আরবদের জন্য জঘন্য অপরাধ বলে বিবেচিত হতো।মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের ডেকে নতুন করে শপথ নেয়ার জন্য বললেন যে, তাদের ধর্ম ও ঈমানের জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁরা যুদ্ধ করবে। একটি গাছের নিচে এই শপথ নেয় হয়। ইতিহাসে এই শপথকে ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ বলা হয়। যা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে :“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ্ অবগত ছিলেন, যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।” (সূরা ফাত্হ ,আয়াত- ১৮) সকল সাহাবীর শপথ গ্রহণ শেষ হলে রাসূল(সা.) তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর দিয়ে হযরত ওসমানের প্রতিশোধ গ্রহণ কল্পে নিজে শপথ নিলেন। পরে অবশ্য হযরত ওসমান(রা.) নিরাপদে মুসলিম শিবিরে ফিরে আসেন।কুরাইশরা বুঝতে পারলো যে, এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও বিস্ময়করভাবে একান্ত অনুগত ভক্ত সমন্বয়ে গঠিত এই দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা সফলকাম হতে পারবে না। তাদের অবিস্মরণীয় অতীত ও শোচনীয় পরাজয়ের স্মৃতি তখনো তাদের মনে স্পষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা সুহাইল ইবনে আমরকে মুসলমানদের নিকট সন্ধি করার জন্য দূত করে পাঠালো।তার সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা হলো এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধির শর্তাবলি স্থিরিকৃত হলো। সন্ধিপত্র লেখার জন্য হযরত আলী (রা)-কে ডাকা হলো।অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনামতে মহানবী (সা.) হযরত আলীকে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন। প্রথমে তিনি আমীরুল মুমিনীন আলী (রা.)-কে বলেন : “লিখ : ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’” এবং আলী তা লিখলেন। কিন্তু সুহাইল বলল : “আমি এ বাক্যের সাথে পরিচিত নই। ‘রাহমান’ ও ‘রাহীম’-কে আমি চিনি না; লিখ : ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্! তোমার নামে’।”মহানবী (সা.) সুহাইলের কথা মেনে নিয়ে অনুরূপ লিখতে বললেন। এরপর মহানবী বললেন : “লিখ : এ সন্ধিচুক্তি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ এবং কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইলের মধ্যে সম্পাদিত হচ্ছে।” সুহাইল বলল : “আমরা তোমার রাসূল ও নবী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করি না। যদি তা স্বীকারই করতাম, তবে তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম না। অবশ্যই এ বিশেষণ চুক্তিপত্র থেকে মুছে দিয়ে নিজের নাম ও পিতার নাম লেখ।” রাসূল এ বিষয়টিও মেনে নেবেন ও তাকে ছাড় দেবেন, এ সময় কোন কোন মুসলমান তা চান নি। কিন্তু মহানবী একটি উচ্চতর লক্ষ্য সামনে রেখে-যা আমরা পরে উল্লেখ করব: সুহাইলের দাবী মেনে নিয়ে হযরত আলীকে ‘আল্লাহর রাসূল’ শব্দটি মুছে ফেলতে নির্দেশ দিলেন। হযরত আলী অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সাথে বললেন : “হে আল্লাহর নবী! আপনার পবিত্র নামের পাশে নবুওয়াতের স্বীকৃতিকে মুছে ফেলার মতো অসম্মানের কাজ করা থেকে আমাকে ক্ষমা করুন।” মহানবী হযরত আলীকে বললেন : “ঐ শব্দের ওপর আমার আঙ্গুল রাখ। আমি নিজেই তা মুছে দিই।” আলী তা-ই করলেন এবং রাসূল স্বহস্তে তা মুছে দিলেন। ‘আল্লাহর রসুল’ কথাটি মুছে দিয়ে বললেন : ‘তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রাসুল।’ এরপর নিম্নোক্ত শর্তাবলির ভিত্তিতে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো-

(১) মুসলমানগণ এ বছর উমরা হজ্জ না করেই মদীনায় ফিরে যাবে।
(২) আগামী বছর উমরার জন্য এসে তারা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে।
(৩) মুসলমানরা কোষবদ্ধ তলোয়ার নিয়ে আসবে, অন্য কোন অস্ত্র আনবে না এবং তাদের অবস্থানকালে কুরাইশরা মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবে।
(৪) কুরাইশ এবং মুসলমানরা চুক্তিতে বর্ণিত সময়ে পরস্পরের মধ্যে সকল প্রকার যুদ্ধ ও হানাহানি হতে বিরত থাকবে।
(৫) কুরাইশদের মধ্যে কেউ যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদীনায় আসে তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মক্কায় তার অভিভাবকের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। পক্ষান্তরে, মুসলিমদের কেউ মক্কায় আসলে তাকেকুরাইশরা মদীনায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
(৬) আরবের যেকোন গোত্রের লোক মুসলমানদের বা কুরাইশদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে।
(৭) চুক্তির মেয়াদকাল দশ বছর। তবে যেকোনো পক্ষ থেকে শর্ত ভঙ্গ ঘটলে এ চুক্তির সমাপ্তি ঘটবে। (সূত্র: সীরাতে ইবনে হিশাম)
যদিও সাধারণভাবে মুসলমানগণ শর্তাবলীতে খুশি হতে পারেনি। চুক্তির শর্তগুলো ছিল বড় বেশি একতরফা। সন্ধিচুক্তির শর্তাবলী নিয়ে আলাপ-আলোচনাকালে কুরাইশদের একগুঁয়ে আচরণ মুসলমানদেরকে ভেতরে ভেতরে ক্রোধান্বিত করে তোলে, কিন্তু মহানবী (সা.) এর মনঃতুষ্টির জন্য তারা শান্ত থাকে।

হুদায়বিয়ার সন্ধি ইসলামের জন্য একটি সুমহান বিজয়। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচালক মহানবী (সা.) এর এ হুদায়বিয়া সন্ধি স্বাক্ষরের মাধ্যমেই মূলত মক্কা বিজয়ের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।‘হুদায়বিয়ার চুক্তি’র ফলেই মুসলিম মিল্লাত আরব বিশ্বে একটি শক্তিধর জাতির সম্মান লাভ করে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল করীমে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে তাই ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।নাজিল হয় সূরা ফাতহ। এই সূরার শুরুতেই ইরশাদ হয়েছে : ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবিনা- (হে রাসূল), নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়।(সূরা ফাতহ: আয়াত ১)।মূলত হুদায়বিয়ার সন্ধিই ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়ের পথ উন্মোচিত করে দেয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরের বছর অর্থাৎ ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে সাহাবায়ে কেরামসহ মক্কা মুকাররমা গিয়ে উমরাহ পালন করেন।এই চুক্তির ফলেই মহানবী (সা.) ইসলামের আহ্বান দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ পান। এই সন্ধির পরেই খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও উসমান বিন তালহাসহ বড় বড় যোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই মহান চুক্তির ধারাগুলো আপাত দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অসম্মাজনক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। অল্প সময়ের মধ্যে মদিনার বাইরের বিভিন্ন গোত্রর বহুসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই সন্ধির একটি শর্ত অনুযায়ী মক্কা হতে প্রত্যাগত নবদীক্ষিত মুসলমানদের মহানবী (সা.) মক্কায় পাঠিয়ে দিতেন, আবু জান্দাল যার জ্বলন্ত প্রমাণ। পরবর্তীতে এই রকম নবদীক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে গেলে তাঁরা সন্ধিশর্ত বজায় রেখে মদিনা না গিয়ে সমুদ্র তীরবর্তী ‘ইস’ নামক এক জঙ্গলে বসবাস করতে শুরু করেন। সিরিয়া হতে প্রত্যাগত মক্কার ব্যবসায়ীদের সেই পথ দিয়ে আসতে হতো, ফলে তারা এই সমস্ত নবদীক্ষিত মুসলমানদের হুমকিস্বরূপ মনে করে নিজেরাই শর্তটি সংশোধনের অনুরোধ জানায়। ফলে এই সমস্ত মক্কার নবদীক্ষিত মুসলমানরা মদিনায় মহানবী (সা.) এর সাথে মিলিত হবার সুযোগ পান। এইভাবে দেখা গেল, শর্ত যেমনই হোক না কেন, এর সুফলগুলো ছিল মুসলমানদের পক্ষে।এই মহান সন্ধির ধারাবাহিকতায় ইসলামের উত্তরোত্তর প্রসার এবং সর্বোপরি ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়েছে। যা বিশ্বজয়েরও সূচনা করে।৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ২১ রমাদান সেই চূড়ান্ত বিজয় সাধিত হয় ১০ হাজার সাহাবায়ে কেরামসহ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা মুকাররমায় উপস্থিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। সেদিন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালাম মজিদের যে আয়াতে কারিমা বার বার বলছিলেন তা হচ্ছে: ওয়া কুল জাআল হাক্কু ওয়া জাহাকাল বাতিল, ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা- আর বলো, সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত, নিশ্চয়ই মিথ্যা দূর হয়।(সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৮১)।
হুদায়বিয়ার সন্ধি দুই বছর স্থায়ী হয়। এই দুই বছরে ইসলাম অনেকটাই শক্তিশালী হয়। সন্ধি কার্যকর হওয়ার পর খুযায়া গোত্র মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের শত্রু বনু বকর কুরাইশদের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়। মুসলমানদের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় কুরাইশদের অন্তর্জ্বালা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি তাদের মধ্যে জন্ম নিতে থাকে এক প্রচণ্ড ক্রোধের। খুযায়া গোত্র মহানবীর (সা.) সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরকে খুযায়া গোত্র আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দিতে থাকে। এই গুপ্ত চক্রান্তের ফলে বনু খুযায়াবাসী যখন ‘ওয়াতির’ নামক জলাশয়ের নিকট এক রাত্রে নিদ্রামগ্ন ছিল, তখন অতর্কিতভাবে বনু বকর তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে বনু খুযায়ার অনেক লোককে হত্যা ও তাদের ধন-সম্পদ লুট কর নিয়ে যায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে তাদের প্রকাশ্যে সাহায্য করে। বনু খুযায়া গোত্র এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে কুরাইশদের নিকট অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারা মহানবী (সা.) এর নিকট তাদেরকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। মহানবী (সা.) সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে কুরাইশদের তিনটি শর্ত দিয়ে এর যে কোনো একটি বেছে নেয়ার জন্য বার্তা প্রেরণ করেন-
১. খুযায়া গোত্রের যেসব লোককে হত্যা করা হয়েছে, কুরাইশদের তার রক্তপণ প্রদান করতে হবে, অথবা ২. বনু বকরের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, অথবা ৩. কুরাইশদেরকে হুদাইবিয়া সন্ধি বাতিল বলে ঘোষণা করতে হবে।কুরাইশ পক্ষ প্রথম দু’টি শর্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে কুরত ইবন উমারের মাধ্যমে মহানবীর (সা.) নিকট সংবাদ পাঠায় এবং এই সংবাদে তারা জানিয়ে দেয় যে, তারা তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করেছে। কুরাইশদের পক্ষে এটা ছিল একটি অবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপ। হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি বিলুপ্তির অনিবার্য ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করতে পেরে পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান চুক্তিটি নবায়নের উদ্দেশ্যে নিজেই মদিনায় মহানবী (সা.) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য গমন করেন। কিন্তু তার প্রস্তাবের পাশাপাশি মুসলমানদের দাবির প্রতি তিনি কর্ণপাত করেননি। এটি ছিল নিতান্তই অযৌক্তিক। ফলে মহানবী (সা.) তার চুক্তি নবায়নের প্রস্তাবে সম্মত হননি।রাসূল (সা.) এর রিসালাত ও বিশাল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটা ছিল মক্কার নেতৃস্থানীয় কাফিরগণ কর্তৃক মদিনায় প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং মহানবী (সা.) এর নেতৃত্বের স্বীকৃতির দৃষ্টান্ত। এতকাল যারা ছিল প্রাণের শত্রু, আজ তারই সন্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দশ বছর যুদ্ধ বিগ্রহ না করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...