মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...
#মো আবু রায়হান
ইসলামের সোনালি ইতিহাস রচনায় যেসব নারীর আত্মত্যাগ সবচেয়ে বেশি, তাঁদের একজন উম্মে আম্মারা নুসাইবা বিনতে কাব (রা.)। তিনি একজন বিশিষ্ট আনসারি নারী সাহাবি। মদিনার প্রসিদ্ধ আনসার গোত্র বনু নাজ্জারে তাঁর জন্ম। নুসাইবা বিনতে কাব ছিলেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে কাব এর বোন। তিনিই প্রথম নারী যিনি ইসলামের জন্য যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। উম্মে আম্মারা (রা.)-এর পুরো নাম ছিল নুসাইবা বিনতে কাব বিন আমর বিন নাজ্জার। নুসাইবা বিনতে কাব যিনি উম্মে উমর বা উম্মে আম্মারা নামে অধিক পরিচিত। স্বামী জায়েদ ইবনে আসেম ইবনে কাব (রা.)। দুই ছেলে আব্দুল্লাহ্ ও হাবিব ইবনে জায়েদ আল-আনসারী। উম্মে আম্মারা (রা.), তাঁর স্বামী ও দুই ছেলে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।তিনি পরে বিন আমর কে বিবাহ করেন এবং আরো এক পুত্র তামীম ও এক কন্যা সন্তান খাওলাহ্কে জন্ম দেন।হিজরতপূর্ব মদিনায় যেসব নারী প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। উম্মে আম্মারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উহুদ, খাইবার, মক্কা অভিযান, হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি হিজরতের আগে বাইয়াতে আকাবার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। এ ছাড়া আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে ‘রিদ্দাহ’-এর যুদ্ধে এবং ইয়ামামার যুদ্ধেও অংশগ্রহণ কীর্তিময় সংগ্রামী এই মহীয়সী নারীর বীরত্বগাথা ইতিহাস নিয়ে আজকের এই লেখা।হিজরতের পূর্বে হজ্জ্বের মৌসুমে আইয়্যামে তাশরীকের মাঝামাঝি রাতের প্রথম প্রহরের শেষ মুহূর্তে মিনা প্রান্তরের আকাবা উপত্যকায় কুরাইশদের সম্পূর্ণ অগোচরে ৭২ জন পুরুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে এগিয়ে এলেন, তারা প্রত্যেকে একে একে তাঁর দু’হাতে নিজেদের হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। এই মর্মে শপথের বাক্য উচ্চারণ করলেন যে, দুশমন থেকে তাঁকে তাঁরা রক্ষা করবে যেমনটি তাঁরা করে থাকে নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের বেলায়। বাইয়াত শেষ হলে এগিয়ে এলেন ২ জন নারী। পুরুষদের মতো তারাও বাইয়াত গ্রহণ করলেন হাতে হাত রাখার পর্বটি ছাড়া। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) নারীদের সঙ্গে হাত মেলাতেন না। এই দুই নারীর একজন পরিচিত ছিলেন উম্মে মানী’ নামে আর দ্বিতীয় জন ছিলেন নুসাইবা বিনতে কাব । তিনি ফিরে আসলেন মদীনায়, আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত সম্মান (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ লাভের চরম সৌভাগ্য) বুকে নিয়ে বাইয়াতের শর্তসমূহ পূরণ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। মূলত ঐদিন যারা রাসূল (সা) এর কাছে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন তারা সবাই ছিলেন মদীনার আদিবাসী। যা পরবর্তীতে রাসূল (সাঃ) এর মদীনা হিজরতের অবস্থান তৈরী করে।
ইসলামের ইতিহাসে ওহুদ যুদ্ধ ছিল বিরাট শিক্ষণীয়। সামান্য অবহেলায় মুসলমানদের বিজয় হাতছাড়া হয়ে যায়। চরম সংকটময় মুহূর্তে সাহাবিরা আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোনো উদাহরণ নেই। প্রায় ৭০ জনেরও বেশি সাহাবি শহীদ হন এ যুদ্ধে। রক্তক্ষয়ী সে যুদ্ধে নারী সাহাবি নুসাইবা বিনতে কাব (রা.)-এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। উহুদের যুদ্ধে নুসাইবা বিনতে কাব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।তিনি প্রথমে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমবাহিনীর পানির মশক বহনে নিয়োজিত ছিলেন। যখন মুসলিম বাহিনীর এক অংশ বিজয় অর্জিত হয়েছে ভেবে নবীজী এর নির্দেশ ভুলে গিয়ে নির্দেশিত অংশ থেকে সরে গেল তখন কাফিরবাহিনী সেই স্থান দিয়ে এগিয়ে এসে পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করল। এ সময় নবীজী কে অরক্ষিত অবস্থায় দেখে তাকে রক্ষা করার জন্য নুসাইবা তীরধনুক হাতে নিয়ে অগ্রসরমান প্রতিপক্ষকে তীর ছুড়ে নবীজী কে নিরাপত্তা দেয়ার প্রচেষ্টায় রত ছিলেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উহুদের যুদ্ধে উম্মে আম্মারা (রা.)-এর ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, ‘আমি যখন ডানে-বাঁয়ে তাকিয়েছি কেবল তাঁকে যুদ্ধ করতে দেখেছি।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস : ৩৭৫৮৯)তার স্বামী ও পুত্র যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করছিল। যুদ্ধ শেষে তাকে আহত ও অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। জ্ঞান ফেরার পরও তার প্রথম বাক্য ছিল, রাসূলুল্লাহ জীবিত আছেন কিনা।তাঁর নিজ বর্ণনায় বিভীষিকাময় সেই যুদ্ধের ঘটনা এভাবে তুলে ধরেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছাকাছি ছিলাম। মুসলমানদের হাত থেকে যখন যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল এবং নবীজির নিরাপত্তায় কয়েকজন সাহাবি তাঁকে বেষ্টন করে রাখলেন। তখন আমিও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত হলাম এবং প্রাণপণ যুদ্ধ করতে আরম্ভ করলাম। ইতিমধ্যেই কাফেরদের এক যোদ্ধা ইবনে কিমিয়্যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে চিৎকার করে এগিয়ে আসছিল এবং বলছিল, ‘মুহাম্মদকে দেখিয়ে দাও! সে যদি আজ বেঁচে যায় তাহলে আমার মুক্তি নেই।’তার এই চিৎকার শুনে মুসআব ইবনে উমাইর এবং কয়েকজন সাহাবি তাকে প্রতিরোধ করতে অগ্রসর হলেন। এটা দেখে আমিও দ্রুত অগ্রসর হলাম। আমি তার কাছাকাছি না যেতেই সে আমাকে দেখে দূর থেকে আমার কাঁধে তরবারির আঘাত করল। তরবারির আঘাতে কাঁধে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হলো। প্রচণ্ড ব্যথাও করছিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি; বরং পাল্টা আক্রমণ করলাম। কিন্তু আল্লাহর দুশমন সেদিন বর্ম পরিহিত থাকায় আমার হাত থেকে বেঁচে যায়!” (তবাকাতে ইবনে সাদ : ৮/৪৪০-৪৪১)
তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যখন মানুষ তাঁর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, আমি ও আমার মা তাঁর নিকটবর্তী হই এবং তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করি।... তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চোখে পড়ল আমার মায়ের কাঁধের ক্ষত। তিনি বললেন, তোমার মা! তোমার!! তাঁর ক্ষত বেঁধে দাও। আল্লাহ তোমাদেরকে আহলে বাইতের মতো বরকতময় করুন। তোমার মায়ের মর্যাদা অমুক ও অমুকের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তোমাদের প্রতি আহলে বাইতের মতো দয়া করুন। তোমার মায়ের স্বামীর মর্যাদা অমুক অমুকের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তোমাদের প্রতি আহলে বাইতের মতো অনুগ্রহ করুন।’ (তাবাকাতুল কুবরা লি-ইবনে সাদ, হাদিস : ১২৪৬১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইবনে কিমিয়্যা মহানবী (সা.)-কে আঘাত করতে উদ্ধত হলে তিনি নিজের কাঁধ দিয়ে তা প্রতিহত করেন।
উম্মে আম্মারা (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে অনুযোগ করে বলেন, কোরআনে সর্বত্র পুরুষদের সম্বোধন করা হয়েছে। নারীদের উল্লেখ খুব কম। তাঁর এই অনুযোগের উত্তরে আল্লাহ সুরা আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ করেন। যেখানে আল্লাহ কোনো ভালো কাজের প্রতিদানে নারী-পুরুষে বৈষম্য করা হবে না বলে ঘোষণা দেন।
সংগ্রামী এই নারী শুধু নবী (সা.) জীবিত থাকা অবস্থায় ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন না; বরং নবীজির মৃত্যুর পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতকালে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে যে বাহিনী পাঠানো হয়েছিল তাতেও তিনি স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন, সাহাবিদের জীবনীর ওপর লিখিত কিতাব ‘উসদুল গাবাহতে’ সে যুদ্ধে তাঁর বীরত্বগাথার কথা এভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ‘মুসাইলামার বিরুদ্ধে যে সৈন্য বাহিনী প্রেরিত হয়েছিল তার অন্যতম যোদ্ধা ছিল নাসিবা (রা.)। তিনি তাঁর পুত্র হাবিব বিন জায়েদকে নিয়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে মুসাইলামাতুল কাজ্জাব তার প্রিয় পুত্রকে শহীদ করে। এরপর নাসিবা (রা.) শপথ করেন যে মুসাইলামা জীবিত থাকতে তিনি গোসলের পানি স্পর্শ করবেন না। সে যুদ্ধে তিনি অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। যুদ্ধ শেষে যখন ফিরে আসেন তখন তাঁর শরীরে তরবারি ও বর্শার বারোটি আঘাত ছিল। এমনকি এ যুদ্ধে তিনি একটি হাতও হারান!’ (উসদুল গাবাহ : ৫/৪৭৬)
খলীফা উমার (রাঃ) এর খেলাফত কালে একবার গনীমতের মালের মধ্যে কিছু চাদর আসে। তার মধ্যে একটি চাদর ছিল খুবই সুন্দর ও দামী। অনেকে বললেন, এটি খলীফা তনয় আবদুল্লাহর (রা) স্ত্রীকে দেওয়া হোক। অনেকে খলীফার স্ত্রী কুলছুম বিনত আলীকে (রা) দেওয়ার কথা বললেন। খলীফা কারো কথায় কান দিলেন না। তিনি বললেন, আমি এ চাদরের সবচেয়ে বেশী হকদার উম্মু আমারাকে মনে করি। এটি তাকেই দেব। কারণ, আমি উহুদের দিন তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) বলতে শুনেছি : “আমি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করছিলাম, শুধু উম্মু উমারাকেই লড়তে দেখছিলাম।“ অতপর তিনি চাদরটি তার কাছে পাঠিয়ে দেন। (তাবাকাত-৮/৪১৫; সিয়ারু আ‘লাম আন-নুবালা-২/২৮১)
সংগ্রামী এই মহীয়সী নারী মদিনায় ১৩ হিজরিতে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকালে মৃত্যুবরণ করেন। জান্নাতুল বাকিতে তাঁর দাফন হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন