সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

স্পেন বিজয়ী তারেক বিন জিয়াদের ঐতিহাসিক ভাষণ


মো.আবু রায়হানঃতারিক বিন জিয়াদ ৭১১ থেকে ৭১৮ সাল পর্যন্ত ভিসিগথ শাসিত স্পেনের মুসলিম বিজয় অভিযানের একজন সেনানায়ক।বিশ্ব ইতিহাসে তাঁকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনা কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের আদেশে তিনি একটি বিরাট বাহিনীকে মরক্কোর উত্তর উপকূল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে স্পেন জয় করেন। তারিক বিন জিয়াদ উত্তর আফ্রিকার বার্বার বংশোদ্ভূত লোক।তবে বেশ কিছু ভিন্ন রকম তথ্য আছে। Tariq bin Ziyad was a new convert to Islam from the Berber tribe of Algeria. He was said to be a freed slave. তারিক ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের একজন দাস, পরবর্তীতে মুসা তাকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বাহিনীর সেনাপতি বানান। যদিও তাঁর দাস হবার সম্ভাবনা তার উত্তরসূরিরা অস্বীকার করেন।
মুসা বিন নুসায়েরে ৭১০-৭১১ সালে তানজিয়ার জয়ের পর তারিক বিন জিয়াদকে এর গভর্নর নিয়োগ দেন।বলা হয় তারিক বিন জিয়াদ স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে স্পেন জয় করেন।অভিযানের দায়িত্ব লাভের পর তিনি মহানবী (সা.)-কে স্বপ্ন দেখেন। ঐতিহাসিক ইবনে বাশকাওয়ালের বর্ণনায়, ‘তিনি দেখলেন, আনসার ও মুহাজির সাহাবিগণ রাসুল (সা.)-এর চারপাশে বসে আছেন। তাঁদের গলায় কোষবদ্ধ তলোয়ার আর কাঁধে ঝুলন্ত ধনুক। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, হে তারিক! তুমি তোমার কাজে এগিয়ে চলো। অতঃপর তিনি নিজেকে ও তাঁর সঙ্গীদের স্পেনে প্রবেশ করতে দেখলেন।’ (ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন ফারুক, স্পেনে মুসলিম ইতিহাস ও কীর্তি, পৃষ্ঠা. ২৫)।It is said that he saw the Holy Prophet (peace be upon him) in his dream who saying: “Take courage, O Tariq! And accomplish what you are destined to perform.” Then he saw the Messenger of Allah (peace be upon him) and his companions entering Andalus.” Tariq awoke with a smile, and from that moment, he never doubted his victory. রডারিক স্পেনের ক্ষমতায় এলে সিউটার গভর্নর জুলিয়ান তার কন্যাকে প্রথা অনুযায়ী শিক্ষা অর্জনের জন্য ভিসিগথিক রাজার দরবারে পাঠান। কথিত আছে যে রডারিক তাকে শ্লীলতাহানি করে। এর ফলে জুলিয়ান অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আরবদেরকে ভিসিগথ রাজ্যে আসতে আমন্ত্রণ জানান। সে সাথে মুসলিমদেরকে জিব্রাল্টার প্রণালী গোপনে পার করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি তারিকের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। জুলিয়ানের কাছে বেশ কিছু বাণিজ্য জাহাজ ও স্পেনিশ মূলভূমিতে নিজস্ব দুর্গ ছিল।
৭১১ সালে আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল বিজয় শেষে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মরক্কোর উপকূল থেকে জাহাজ বোঝাই সৈন্য নিয়ে পৌঁছে গেলেন স্পেনের তটরেখায়। ভূমধ্যসাগরের যে প্রনালির নাম আজ জিব্রালটার প্রনালি এটিই স্পেনের উপকূলীয় পর্বতমালার আরবি নাম জাবাল আত-তারিক এর বিবর্তিত রূপ। মুসলিমরাই প্রণালী ও পর্বতের নাম দিয়েছিলে জাবালুত-তারিক এর অর্থ তারিকের পাহাড়। তারিক বিন জিয়াদের নামে এটির নামকরণ হয়।প্রায় দেড় হাজার বছর আগের সে হাতে গড়া পালের জাহাজ নিয়ে সেনাপতি তারিক সেদিন স্পেনে পৌঁছিলেন।তারিক তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, তোমাদের সকল নৌযান তীরে তুলে এনে আগুনে জ্বালিয়ে দাও। কেননা, আমরা ইউরোপ থেকে ফিরে যাব বলে আসিনি। হয় তোমরা দুর্ধর্ষ রডারিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে এ ভূখণ্ড দখল করবে নয়ত বীরের মত জীবন দান করবে। বিকল্প কোন পথ আমরা খোলা রাখতে চাই না। এক পর্যায়ে তাঁর নির্দেশে মুসলিম বাহিনীর সকল জাহাজ জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।এরপর তিনি সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।বিশ্ব ইতিহাসেও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রদত্ত সেনাপতির ঐতিহাসিক ভাষণ সংগ্রহে সেনাপতি তারিকের সেদিনকার সে যুগান্তকারী ভাষণ চিরদিনের জন্য স্থান করে নিয়েছে। “হে আমার সৈন্যরা, কোথায় পালাবে তোমরা? তোমাদের পিছনে সাগর, সামনে শত্রু। তোমাদের সামনে রয়েছে অগণিত শত্রু, আর জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাদের কাছে রয়েছে শুধু তলোয়ার।... এবং মনে রেখো এই অসাধারণ যুদ্ধে আমিই সবার সামনে থাকবো যা তোমরা করতে যাচ্ছ...” (My Dear brothers, we are here to spread the message of Allah. Now, the enemy is in front of you and the sea behind. You fight for His cause. Either you will be victorious or martyred. There is no third choice. All means of escape have been destroyed.)এরপর অন্তত আধ ঘণ্টাব্যাপি ভাষণে তিনি অনেক মৌলিক বিষয়ের অবতারণা করেন।
জিব্রালটারের পাউন্ডে তারিক বিন জিয়াদ

তারিকের সেনাবাহিনীতে মোট ৭০০০ জন সৈন্য ছিল। বলা হয় যে মুসা বিন নুসায়েরে আরো ৫০০০ সৈন্য পাঠিয়েছিলেন।রডারিক হামলা মোকাবেলার জন্য ১,০০,০০০জন সৈন্য সমাবেশ করেন।১৯জুলাই গুয়াডালেটের যুদ্ধে রডারিক পরাজিত ও নিহত হন। ফলে ভিসিগথ রাজ্যের বিরুদ্ধে তারিক বিন জিয়াদ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন।ইবনে খালদুন বলেন, Marching on with an army comprising 300 Arabs and 10,000 Berber converts to Islam, Tariq landed at a large hill that would become known as the rock of Gibraltar, prepared to battle King Roderic of Spain who had amassed a force of 100,000 fighters against the Muslims. Being overwhelmed by the huge army of King Roderic, Tariq immediately called for military reinforcements, Ibn Khaldoum writes. He received an additional contingent of 7,000 cavalrymen under the command of Tarif bin Malik Naqi after which he consolidated his troops.জুলিয়ানের মতানুসারে তারিক বিন জিয়াদ তার সেনাদলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কর্ডোবা, গ্রানাডা ও অন্যান্য অঞ্চল জয় করতে পাঠান। এসময় তিনি মূল সেনাদলের সাথে অবস্থান করেন।তারা টলেডো ও গুয়াদালাজারা জয় করে।
যে যুদ্ধের শুরুই হয় এইরূপ ভাষণ দ্বারা, আল্লাহর উপর এত বিশ্বাস আর তাওয়াক্কুল দ্বারা, সেই যুদ্ধে কিভাবে কেও পরাজিত হতে পারে? আর তাই সেনাপতি তারিকের সেই দল এর বিজয় কাহিনী আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে তুলে। এর ফলে গোটা স্পেন বর্তমানের পর্তুগাল সহ বিশাল এলাকা নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয়। স্পেন ও পর্তুগালের জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়। গড়ে তুলেন আধুনিক স্পেন যার আরবি নাম আল-আন্দালুস মুসলিম আন্দালুসিয়া। স্পেন বিজয় ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা ইউরোপের বুকে ইসালমের মশাল প্রজ্জ্বলিত করে।৭৫০ খ্রিস্টাব্দে, উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্বে শুরু হয় আব্বাসীয় যুগ। গণহত্যার সময় উমাইয়া পরিবারের বেঁচে যাওয়া রাজপুত্র আবদুর রহমান পালিয়ে আন্দালুসে চলে আসেন। ৭৫৬ সালে নিজেকে আল-আন্দালুসের আমির হিসেবে ঘোষণা করেন আবদুর রহমান, ইউরোপের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র।৭০০ বছরের বেশি সময় মুসলমানরা স্পেন শাসন করে, অতঃপর ১৪৯২ সালে স্পেনের শেষ মুসলিম রাজ্য গ্রানাডা পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...