সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

হযরত উযাইরকে মৃত্যু দিয়ে পুনরায় জীবন দান


ইরাকে অবস্থিত রওজা 
হযরত দাউদ ও ইয়াহইয়া (আ.) এর মধ্যবর্তী সময়ে আগমনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে উযাইর (আ.) ছিলেন অন্যতম। তিনি বাইবেলে ইজরা (Ezra) নামে খ্যাত। উযাইর (আঃ) কি নবী ছিলেন নাকি নবী ছিলেন না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেন, তিনি বনী ইসরাঈলের নবীগণের মধ্যে অন্যতম একজন নবী ছিলেন। অনেকে আবার বলেন, তিনি নবী ছিলেন না বরং একজন জ্ঞানী ও পুণ্যবান লোক ছিলেন। যদিও প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে- তিনি নবী। ইবনে কাছীর ‘বিদায়া নিহায়া’ গ্রন্থে (২/২৮৯) এটাই ব্যক্ত করেছেন। আবু দাউদ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“আমি জানি না- তুব্বা কি লানতপ্রাপ্ত; নাকি নয়। আমি জানি না- উযাইর কি নবী; না কি নবী নয়।” (আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন) শাইখ আব্বাদ বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেছেন তাদের (তুব্বা সম্প্রদায়) অবস্থা জানার আগে। যেহেতু এ মর্মে রেওয়ায়েত এসেছে যে, তুব্বা সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং তারা লানতপ্রাপ্ত নয়। পক্ষান্তরে, উযাইর নবী কিনা এ ব্যাপারে কোন রেওয়ায়েত আসেনি।(শরহে আবু দাউদ -২৬/৪৬৮) থেকে সমাপ্ত) তবে তাঁর ক্ষেত্রে ‘আলাইহিস সালাম’ বলতে কোন সমস্যা নেই। যেহেতু তিনি নেককার মানুষ ছিলেন। তাঁর ঘটনা কুরআনে এসেছে। আলেমদের অনেকে তাঁকে নবী হিসেবে গণ্য করেছেন।
ইহুদিরা তাকে আল্লাহর পুত্র (নাউযবিল্লাহ) কেন বলে ?
ব্যাবিলনের বাদশা বখতে নসর জেরুজালেম আক্রমণ করে ৭০ হাজার ইহুদিকে বন্দি করে নিজ দেশে নিয়ে যায়।অনেককে হত্যা করে এবং অনেক ইহুদি পলায়ন করে । বুখত নসর লিখিত তাওরাতের সমস্ত কপি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। একটি অংশও অবশিষ্ট ছিল না।রাজা সাইরাস ইহুদিদের মুক্তি দেন।উযায়ের যখন একশত বছর মৃত থাকার পর জীবিতাবস্থায় তার বনী ইসরাঈল জাতির কাছে ফিরে এলেন। তাঁর মৃত্যুর ৭০ বছর পর বাইতুল মুকাদ্দাস আবার জনবসতিপূর্ণ হয়। পলাতক বনি ইসরাইলরা আবার ফিরে আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যে শহর ভরপুর হয়ে যায়। আগের মতো ঝাঁকজমক ও শোভা বৃদ্ধি পায়।
তখন বনী ইসরাঈলের লোকজন উযাইরকে বলল, আমরা শুনেছি আপনি ব্যতীত অন্য কোন লোকের তাওরাত কিতাব মুখস্থ ছিল না। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে একখানা তাওরাত লিখে দিন। বুখত নসরের আক্রমণকালে উযাইরের পিতা সারূখা তাওরাতের একটি কপি মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্থানটি কোথায় উযাইর ব্যতীত আর কেউ তা জানত না। সুতরাং তিনি উপস্থিত লোকদেরকে সাথে নিয়ে সেই স্থানে গেলেন এবং মাটি খুঁড়ে তাওরাতের কপি বের করলেন। কিন্তু এতদিনে তাওরাতের পাতাগুলো নষ্ট হয়ে সমস্ত লেখা মুছে গিয়েছে। এরপর তিনি একটি বৃক্ষের নিচে গিয়ে বসলেন, বনী ইসরাঈলের লোকজনও তাঁর পাশে গিয়ে ঘিরে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ থেকে দুটি নক্ষত্র এসে তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করল। এতে গোটা তাওরাত কিতাব তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠলো। তখন বনী ইসরাঈলের জন্যে তিনি নতুনভাবে তাওরাত লিখে দিলেন।এ সকল কারণে অর্থাৎ নক্ষত্রদ্বয়ের অবতরণ, তাওরাত কিতাব নতুনভাবে লিখন ও বনী ইসরাঈলের নেতৃত্ব গ্রহণের কারণে ইহুদীদের একদল পথভ্রষ্ট লোক উযাইরকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে।
উযায়ের সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ইহুদীরা যখন তাওরাত হারিয়ে ফেলেছিল তখন উযায়ের সেটা তার মুখস্থ থেকে পুণরায় জানিয়ে দিয়েছিল। তাই তাদের মনে হলো যে, এটা আল্লাহর পুত্র হবে, না হয় কিভাবে এটা করতে পারল। (সা’দী; কুরতুবী; ইবন কাসীর)।এটা নিঃসন্দেহে একটি মিথ্যা কথা যে, উযায়ের তাদেরকে মূল তাওরাত তার মুখস্থ শক্তি দিয়ে এনে দিয়েছিল। কারণ উযায়ের কোন নবী হিসেবেও আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়নি। এর মাধ্যমে ইহুদীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা তাদের দাবী মাত্র। ঐতিহাসিকভাবে এমন কিছু প্রমাণিত হয়নি।(দেখুন, ড. সাউদ ইবন আবদুল আযীয, দিরাসাতুন ফিল আদইয়ান- আল-ইহুদিয়াহ ওয়ান নাসরানিয়্যাহ)।
 
আল্লাহ বলেন,আর ইহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র, এবং নাসারারা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র এটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরি করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!(সুরা আত তাওবা আয়াত-৩০)। আয়াতের ভাষ্য হতে বুঝা যায় যে, ইয়াহুদীদের সবাই এ কথা বলেছিল। কারও কারও মতে, এটি ইয়াহুদীদের এক গোষ্ঠী বলেছিল। সমস্ত ইয়াহুদীদের আকীদা বিশ্বাস নয়। (কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, সাল্লাম ইবন মিশকাম, নুমান ইবন আওফা, শাস ইবন কায়স ও মালেক ইবনুস সাইফ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমরা কিভাবে আপনার অনুসরণ করতে পারি, অথচ আপনি আমাদের কেবলা ত্যাগ করেছেন, আপনি উযায়েরকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নেন না? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। (তাবারী; সীরাতে ইবন হিশাম ১/৫৭০)এ আয়াতটি হলো পূর্বের আয়াতের ব্যাখ্যা। পূর্বে আয়াতে মোটামুটিভাবে বলা হয় যে, তারা আল্লাহর উপর ঈমান রাখে না। এখানে তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয় যে, ইহুদীরা উযাইরকে আর নাসারারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করে। [ইবন কাসীর] তাই তাদের ঈমান ও তাওহীদের দাবী নিরর্থক। এরপর বলা হয়,এটি তাদের মুখের কথা। এর অর্থ তারা মুখে যে কুফর উক্তি করে যাচ্ছে তার পেছনে না কোন দলীল আছে, না কোন যুক্তি। কত মারাত্মক সে উক্তি যা তারা করে যাচ্ছে। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা বলেছেন, “এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক। তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।”(সূরা আল-কাহাফ আয়াত- ৫) ।অতঃপর বলা হয়, এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে, আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। (ইবন কাসীর) এর অর্থ হল ইয়াহুদী ও নাসারারা নবীগণকে আল্লাহর পুত্র বলে পুর্ববর্তী কাফের ও মুশরিকদের মতই হয়ে গেল, তারা ফেরেশতা ও লাত মানাত মূর্তিদ্বয়কে আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করেছিল।(বাগভী)।

উযাইরকে ১০০ বছরের জন্যে মৃত্যু দিয়ে পুনরায় জীবন দান-
একদা উযায়ের তাঁর ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচা দেখার জন্যে ঘর থেকে বের হন। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে দ্বিপ্রহরের সময় একটা বিধ্বস্ত বাড়িতে বিশ্রাম নেন। তাঁর বাহন গাধার পিঠ থেকে নিচে অবতরণ করেন। তাঁর সাথে একটি ঝুড়িতে ছিল ডুমুর এবং অন্য একটি ঝুড়িতে ছিল আঙ্গুর। খাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পেয়ালায় আঙ্গুর নিংড়িয়ে রস বের করেন এবং শুকনো রুটি তাতে ভিজিয়ে রাখেন। রুটি উক্ত রসে ভালরূপে ভিজে গেলে খাবেন, এই সময়ের মধ্যে বিশ্রামের উদ্দেশ্যে চিত হয়ে শুয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি বিধ্বস্ত ঘরগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলেন, যার অধিবাসীরাও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। রাজা বখতে নাসর যখন ঐ জনবসতি ধ্বংস করে এবং জনগণকে তরবারির নীচে নিক্ষেপ করে তখন ঐ জনবসতি একেবারে শ্মশানে পরিণত হয়। তারপর উযায়ের সেখান দিয়ে গমন করেন। -প্রসিদ্ধ মতে সেটি বাইতুল মুকাদ্দাস- অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তখন সে গ্রামটি ছিল বিরান; তাতে কেউ ছিল না। এ গ্রামটি জনবহুল থাকার পর এখন এর যে অবস্থা তা নিয়ে তিনি ভাবতে ভাবতে বললেন, “মৃত্যুর পর কিভাবে আল্লাহ্‌ ইহাকে জীবিত করবেন ?” অতঃপর আল্লাহ্‌ তাকে একশত বৎসর মৃত রাখলেন, তারপর (পুনরায়) তাকে জীবিত করলেন।আল্লাহ্‌ বললেন, “(এরূপ অবস্থায়) তুমি কতকাল অবস্থান করলে ?”সে বলেছিলো, সম্ভবত একদিন বা দিনের কিছু অংশ।”আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, “না, বরং তুমি একশত বৎসর অবস্থান করেছ। তোমার খাদ্য ও পানীয়ের প্রতি লক্ষ্য কর, উহাতে দীর্ঘদিনের অবস্থানের কোন চিহ্ন নাই। এবং তোমার গাধাটির দিকে তাকাও। তোমাকে মানব জাতির জন্য নিদর্শন স্বরূপ করবো সে কারণে আরও তাকাও (গাধাটির) অস্থিগুলির প্রতি। কিভাবে সেগুলি আমি সংযোজিত করি এবং মাংস দ্বারা ঢেকে দেই।”যখন তাকে তা সুস্পষ্টরূপে দেখানো হলো, সে বলেছিলো, “আমি জানি যে সকল বিষয়ের উপরে আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিমান।” (সুরা বাক্বারাহ আয়াত- ২৫৯)। 
আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) ও ইবন আবী হাতিম (রহ) বলেন, এ আয়াতে বর্নিত ব্যক্তি হলেন উযায়ের (আ)।ইবনে জারীর (রহ)ও অনুরূপ বর্ননা করেছেন।একশ বছর পূর্ণ হলে আল্লাহ উযাইরের নিকট ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। ফেরেশতা এসে উযাইরের অন্তর ও চক্ষুদ্বয় জীবিত করলেন, যাতে কিভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করবেন তা স্বচক্ষে দেখেন ও অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন। এরপর ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে উযাইরের বিক্ষিপ্ত হাড়গুলো একত্রিত করে তাতে গোশত লাগালেন, চুল পশম যথাস্থানে সংযুক্ত করলেন এবং চামড়া দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত করলেন। সবশেষে তার মধ্যে রূহ প্ৰবেশ করালেন। তার দেহ এভাবে তৈরি হচ্ছে তা তিনি প্ৰত্যক্ষ করছিলেন এবং অন্তর দিয়ে আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করছিলেন। উযাইর উঠে বসলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ অবস্থায় কতদিন অবস্থান করলেন? তিনি বললেন, এক দিন অথবা এক দিনেরও কিছু কম। ফেরেশতা জানালেন, না বরং আপনি একশ বছর এভাবে অবস্থান করেছেন। আপনার খাদ্য সামগ্ৰী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করুন। এখানে খাদ্য বলতে তাঁর শুকনা রুটি এবং পানীয় বলতে পেয়ালার মধ্যে আঙ্গুর নিংড়ানো রস বুঝানো হয়েছে। দেখা গেল, এ দুটির একটিও নষ্ট হয়নি।
রুটি ও রসের মত তাঁর আঙ্গুর এবং ডুমুরও টাটকা রয়েছে। এর কিছুই নষ্ট হয়নি। উযাইর ফেরেশতার মুখে একশ বছর অবস্থানের কথা শুনে এবং খাদ্য সামগ্রী অবিকৃত দেখে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যান। তাই ফেরেশতা তাকে বললেন, আপনি আমার কথায় সন্দেহ করছেন? তাহলে আপনার গাধাটির প্রতি লক্ষ্য করুন। উযাইর লক্ষ্য করে দেখলেন যে, তার গাধাটি মরে পচে গলে প্ৰায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। হাড়গুলো পুরাতন হয়ে যত্রতত্র বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। অতঃপর ফেরেশতা হাড়গুলোকে আহ্বান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাড়গুলো চতুর্দিক থেকে এসে একত্রিত হয়ে গেল এবং ফেরেশতা সেগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করে দিলেন। উযাইর তা তাকিয়ে দেখছিলেন। তারপর ফেরেশতা উক্ত কংকালে রগ, শিরা-উপশিরা সংযোজন করলেন। গোশত দ্বারা আচ্ছাদিত করলেন এবং চামড়া ও পশম দ্বারা তা আবৃত করলেন। সবশেষে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করালেন। ফলে গাধাটি মাথা ও কান খাড়া করে দাঁড়াল এবং কিয়ামত আরম্ভ হয়ে গিয়েছে ভেবে চীৎকার করতে লাগল। উযায়ের (আঃ) দর্শন করতে থাকেন এবং মহান আল্লাহর এসব কারিগরী তা চোখের সামনেই সংঘটিত হয়।এসব কিছু দেখার পর তিনি বলেন, ”আমার তো এটা বিশ্বাস ছিলই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সব কিছুর উপর পুর্ণ ক্ষমতাবান। কিন্তু আজ আমি তা স্বচক্ষে দর্শন করলাম।সুতরাং আমি আমার যুগের সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশি জ্ঞান ও বিশ্বাসের অধিকারী।
অতঃপর উযাইর (আঃ) উক্ত গাধার পিঠে আরোহণ করে নিজ এলাকায় চলে যান। কিন্তু সেখানে কোন লোকই তিনি চিনতে পারছেন না। আর তাকেও দেখে কেউ চিনতে পারছে না। নিজের বাড়ি-ঘরও তিনি সঠিকভাবে চিনে উঠতে পারছিলেন না। অবশেষে ধারনার বশে নিজের মনে করে এক বাড়িতে উঠলেন। সেখানে অন্ধ ও পঙ্গু এক বৃদ্ধাকে পেলেন। তার বয়স ছিল একশ বিশ বছর। এই বৃদ্ধা ছিল উযাইর পরিবারের দাসী। একশ বছর পূর্বে তিনি যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে যান, তখন এই বৃদ্ধার বয়স ছিল বিশ বছর এবং উযাইরকে সে চিনত। বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে সে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যায়। উযাইর জিজ্ঞেস করলেনঃ হে বৃদ্ধা, এটা কি উযাইরের বাড়ি? বৃদ্ধা বলল, হ্যাঁ, এটা উযাইরের বাড়ি। বৃদ্ধা মহিলাটি কেঁদে ফেলল এবং বলল, এতগুলো বছর কেটে গেল কেউ তার নামটি উচ্চারণও করে না, সবাই তাকে ভুলে গিয়েছে। উযাইর নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমিই সেই উযাইর। আল্লাহ আমাকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রেখে পুনরায় জীবিত করেছেন। বৃদ্ধা বলল, কী আশ্চর্য। আমরাও তো তাকে একশ বছর পর্যন্ত পাচ্ছি না, সবাই তার নাম ভুলে গিয়েছে। কেউ তাকে স্মরণ করে না। তিনি বললেন, আমিই সেই উযাইর। বৃদ্ধা বলল, আপনি যদি সত্যিই উযাইর হন তাহলে উযাইরের দোয়া আল্লাহ কবুল করতেন। কোন রোগী বা বিপদগ্রস্তের জন্যে দোয়া করলে আল্লাহ তাকে নিরাময় করতেন এবং বিপদ থেকে মুক্তি দিতেন। সুতরাং আপনি আমার জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলে আপনাকে দেখব এবং আপনি উযাইর হলে আমি চিনব। তখন উযাইর দোয়া করলেন এবং বৃদ্ধার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। এতে তার অন্ধত্ব দূর হয়ে গেল।
.তারপর তিনি বৃদ্ধার হাত ধরে বললেন, আল্লাহর হুকুমে তুমি উঠে দাঁড়াও ৷ সাথে সাথে তার পঙ্গুত্ব বিদূরিত হল, সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর উযাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে বলে উঠল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনিই উযাইর। এরপর ঐ বৃদ্ধা বনী ইসরাঈলের মহল্লায় চলে গেল। সে দেখল তারা এক আসরে জমায়েত হয়েছে। সে আসরে উযাইরের এক বৃদ্ধ পুত্ৰও উপস্থিত ছিল, যার বয়স একশ আঠার বছর। পুত্রদের পুত্ররাও তথায় উপস্থিত ছিল। তারাও আজ প্রৌঢ়। বৃদ্ধা মহিলা এক পাশে দাড়িয়ে মজলিশের লোকদের ডেকে বলল, উযাইর তোমাদের মধ্যে আবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু বৃদ্ধার এ কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিল। তারা বলল, তুমি মিথ্যুক। বৃদ্ধা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আমি অমুক, তোমাদের বাড়ির দাসী। উযাইর এসে আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দোয়া করেছেন। তিনি আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং পঙ্গু পা সুস্থ করে দিয়েছেন। উযাইর বলেছেন, আল্লাহ তাঁকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রেখে আবার জীবিত করে দিয়েছেন।
.এ কথা শোনার পর লোকজন উঠে উযাইরের বাড়িতে গেল এবং তাকে ভাল করে দেখল। উযাইরের বৃদ্ধ পুত্র বলল, আমার পিতার দুই কাঁধের মাঝে একটি কাল তিল ছিল। সুতরাং সে কাঁধের কাপড় উঠিয়ে তিল দেখে তাকে চিনতে পারল এবং বলল, ইনিই আমার পিতা উযাইর।আল্লাহ তায়ালা হযরত উযাইর (আঃ)-কে মানব জাতির জন্যে নিদর্শন বানাবার উদ্দেশ্যে এরূপ করেছিলেন। উযাইর (আঃ) যখন বনী ইসরাঈলের নিকট ফিরে এসেছিলেন তখন তাঁর পুত্ৰগণ সবাই ছিল বৃদ্ধ, অথচ তিনি যুবক। কেননা যখন তাঁর মৃত্যু হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। একশ বছর পর আল্লাহ যখন তাঁকে জীবিত করলেন তখন (প্রথম) মৃত্যুকালের যৌবন অবস্থার উপরেই জীবিত করেছিলেন। তাই তাঁর মাথার চুল কালই ছিল, কিন্তু এর পূর্বেই তাঁর পুত্র ও পৌত্রের চুল পেকে সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন যুবক অথচ তাঁর পুত্র ছিলেন বৃদ্ধ, লাঠির উপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। পিতার বয়স চল্লিশ বছর আর পুত্রের বয়স নব্বই বছর অতিক্রম করেছে। আল্লাহু আকবার। আল্লাহ সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।

গ্রন্থনায়-মো. আবু রায়হান

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...