সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একজন আজহারীর চলে যাওয়া এবং ওয়াজের স্টাইল কেমন হওয়া উচিত?


মো. আবু রায়হানঃ এই মুহুর্তে খুব বেশি আলোচনায় রয়েছেন তরুণ উদীয়মান ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী। কুরআন হাদীস ও যুগের সঙ্গে মিল রেখে দেওয়া তার ইসলামি বক্তৃতা দেশের লাখ লাখ  ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিশেষ করে তরুণ সমাজের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।ইতোমধ্যে আজহারী রীতিমতো তরুণদের আইডলে পরিণত হয়েছেন।বাংলা ভাষাভাষী সারা বিশ্বের অগণিত মানুষ ইউটিউবে শোনছেন ও দেখছেন তার হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য। সেই সঙ্গে তিনি চষে বেড়িয়েছেন  ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের বাংলাদেশ। যেখানেই গিয়েছেন আবাল বৃদ্ধা থেকে শুরু করে তরুণ যুবারা হয়েছেন তার ইসলামি বক্তব্যের মনোমুগ্ধকর শ্রোতা। জনগণ ব্যাকুল হয়ে উপচে পড়া ঢেউয়ের মতো হাজির হয়েছেন তার মাহফিলে, তার কথা শুনতে ও এক নজর দেখতে।আজহারীর বয়ান শুনতে ঘন্টা পর ঘন্টা অপেক্ষা, বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। প্রচন্ড হাড় কাঁপুনি শীত আর কুয়াশা উপেক্ষা করে হিন্দু মুসলিম সকলেই হয়েছেন তার মাহফিলের শ্রোতা।ভারতীয় উপমহাদেশে যে ওয়াজ মাহফিলের জনাসমাগমের রেকর্ড তা এখন আজহারীর দখলে।এতোদিন গ্রাম গঞ্জের মানুষ  রাত জেগে ওয়াজ মাহফিল শোনে নিজেদের ইসলামের রঙে রঙিন করতেন। এখন শুধু রাত নয়, দিনেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মৌমাছির  মতো কুরআনের মাহফিলে ছুটে চলেন কুরআনের মধু পানে। এটি বিশ্বাস করার কারণ নেই যে শুধু আজহারীর জন্য মাহফিলে এতো লোক সমাগম। এটি সম্ভব হয়েছে আজহারীর কণ্ঠে কুরআনের সুমধুর তেলাওয়াত ও বয়ানের জোরে। কুরআনের স্পর্শে আজহারী এখন হিরোর আসনে।তিনি আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিশেষ আশির্বাদ স্বরুপ। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে আজহারীর চেয়ে শিক্ষা দীক্ষায় ডিগ্রিতে অনেক বড় বড় আলেম ওলামা এদেশে রয়েছেন। তারা হয়তো সেভাবে ইসলামের সৌন্দর্য ও উদারতার দিক সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি। সেক্ষেত্রে আজহারী সাহেব বিশাল সৌভাগ্যবান। দ্বীনের জ্ঞান ও দাঈ হবার যোগ্যতা সবার হয় না। সেদিক দিয়ে আজহারীকে হয়তো মহান রব কবুল করেছেন। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, " তিনি যাকে চান, তাকে প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, সে বিরাট কল্যাণ পেয়ে গেছে। আর চিন্তাশীল মানুষরা ছাড়া কেউ শিক্ষা নেবে না।" (আল-বাক্বারাহ ২৬৯)। হিকমাহ অর্থাৎ প্রজ্ঞা,  যার অর্থ কথা বা কাজে পরিপূর্ণতা, পারফেকশন। প্রজ্ঞা হচ্ছে জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহার। আজহারী আজ মুসলমানদের কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ। কবি ফররুখের পাঞ্জেরী কবিতার সেই পাঞ্জেরি ।দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করছেন,
"রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলার এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।"
আজহারী জাগিয়ে তুলেছেন ঘুমন্ত জাতিকে। যে তরুণ যুবারা মদ নেশায় বুদ, সামাজিক নানা অপরাধ অপকর্মে জড়িত, তারা  আজ খুঁজে পেয়েছে মুক্তির নিশান । আজহারীর মাহফিলে পঙ্গপালের মতো মানুষের ঢল কিসের ইঙ্গিত বহন করে?  ইসলামের সঠিক মেসেজ এতো সুন্দর ও প্রাণবন্ত ভাবে উপস্থাপন  আজহারীর আগে বঙ্গ জনপদের কয়জন আলেম করতে পেরেছেন? জীবন চলার পথে যা প্রয়োজন, সুন্দর ও শান্তিময় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তার যুগোপযোগী বয়ান ধর্মপ্রাণ জনগণকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছে। দিয়েছে আত্মার খোরাক। আগের দিনে ওয়ায়েজিনরা ইউসুফ জুলেখার গল্প,নদীর ধারের গাছের একটি পাতা পানিতে পড়ে কুমির হলো আরেকটা পাতা ...।একটি হরিণ বাধা ছিল গাছেরই তলা ... এ জাতীয় বক্তব্য দিয়ে মাহফিল সরগরম রাখতো। সেসব বক্তব্যের অধিকাংশে ছিল না দিক নির্দেশনা ও ইসলামের সঠিক বয়ান । আগেই বলেছি দিনের বেলা এদেশে ওয়াজ মাহফিল খুব একটা চোখে পড়ে না অর্থাৎ জমে না। দুই একটা মাহফিল হলেও জনগণের  উপস্থিতি তেমন থাকে না। আজহারী সাহেব শুধু রাতের অাঁধারের ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্য ভেঙ্গে দিনের বেলাও কুরআন পাগল  জনগণকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে রেখেছেন। এসবই সম্ভব হয়েছে খোদা প্রদত্ত বাক শক্তি ও তার নান্দনিক উপস্থাপনার গুণে।
 ধর্মীয় কুসংস্কার আর গোঁড়ামীতে আচ্ছন্ন অধিকাংশ বক্তাদের অনুদার মনোভাব ও আলোচনায়  জনগণ যখন মাহফিল বিমুখ।  ফতোয়া, মাজারী বাজারী বিভিন্ন দল উপদলে বক্তারা বিভক্ত। সেই সময়ে আজহারী ইসলামের মধ্যমপন্থার সৌন্দর্যকে প্রমোট করার কথা বললেন।যেটিকে আরবিতে বলে আল-ওয়াসাতিয়্যাহ। জীবনযাপনে ভারসাম্য, চিন্তায় ভারসাম্য, কাজে ভারসাম্য এবং আচরণে ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম তৈরি করা।শুধু তাই নয় আজহারী কুরআনের শাশ্বত বাণী, তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর এবং কখনও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (সূরা আল ইমরান - আয়াত ১০৩)।এই নির্দেশনা অনুযায়ী সবার ঐক্যও কামনা করেন। বর্তমান যুগের অধিকাংশ ইসলামি বক্তা যেভাবে হৈচৈ চিৎকার চেঁচামেচি করে ইসলামের বয়ান দেন তা  শ্রোতাদের হৃদয়গ্রাহী করতে ব্যর্থ হয়েছে আবার ওয়াজের নামে উচ্চ স্বরে বক্তৃতা শব্দ দূষণের জন্যও তো কম দায়ী নয়। ইসলামের একজন দাঈ বা ধর্ম প্রচারকের যেভাবে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখার কথা তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের স্টাইলে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। কারো ওয়াজ মাহফিলে চিৎকার চেঁচামেচির চোটে মাইক্রোফোন স্টেজ থেকে পড়ে যায়। একজন বক্তা তো বলেই ফেলছেন চিল্লায়া কি মার্কেট পাওন যাবে? মানুষের কান ঝালাপালা করে আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করার পদ্ধতি তারা কোথায় পেলেন?ইসলামের দিকে আহ্বান করা একটি মর্যাদাপূর্ণ মিশন। এটি নবী-রাসূলদের কাজ এখন তা তাঁদের উত্তরসূরীরা করছেন। আল্লাহ পাক বলেন, "আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমত ও উত্তম ওয়াযের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে তর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে।”(সূরা নাহল, আয়াত- ১২৫)।
এ আয়াতে দাওআত  ইসলাম প্রচারের তিনটি পদ্ধতি উল্লিখিত হয়েছে। যথা-এক. হিকমত তথা পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিস ভিত্তিক দাওআত দেওয়া। দুই. উত্তম উপদেশ দেওয়া। তিন. উত্তম পন্থায় বিতর্ক করা।বর্তমান আলেম সমাজ এই তিনটি পদ্ধতি অবলম্বন করে কী দ্বীনের প্রচার করছেন? একজন দাঈ বা দ্বীনের ধর্ম প্রচারক হবেন নিম্নোক্ত গুণের অধিকারী,সত্যবাদী, ইলম, ফিকহ, ধৈর্য, সহনশীলতা, কোমলতা, দয়া, জান-মালের ত্যাগ, নানা পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মানুষের আচার-অভ্যাস সম্পর্কে অবগতির গুণের অধিকারী।  আল্লাহ পাক নিম্নোক্ত বাণীতে তাঁর রাসুলের উপর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেন, “আল্লাহ্‌র দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।”(সূরা আলে-ইমরান, আয়াত- ১৫৯)।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কোমলতা অর্জনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফেরাউনের সাথে কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা মুসা ও হারুন (আ.)-এর উদ্দেশ্যে বলেন, "তোমরা উভয়ে ফেরাউনের নিকটে যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালংঘন করেছে। অতঃপর তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বল। সম্ভবত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীতি অবলম্বন করবে।'’(সুরা ত্ব-হা আয়াত - ৪৩-৪৪)। আজকাল অনেক বক্তা ওয়াজের নামে একজন আরেকজনের সমালোচনা করেন শুধু কি তাই?   খুবই জঘন্য ভাষায় কথা বলেন।এটা আলেম সমাজের জন্য অবমাননাকর একজন মুসলমান হিসেবে খুবই লজ্জিত করে। মমতাজের মতো একজন এমপি আলেম সমাজের এই দৈন্যদশা ও ভেদাভেদ নিয়ে কথা বলার সাহস পান।মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের ভাষায়, ফেসবুক, ইউটিউব খুললে ওয়াজের নামে মিথ্যা আর অকথ্য গালাগালি ভরা, এগুলো সরকারের নজরে আসা দরকার বলে সংসদে তিনি দাবি করেন। এমন দাবি তোলার সাহস তিনি কোথায় পেলেন। আপনাদের মতো কিছু কাঠ মোল্লার  কাঁদা ছোড়াছুড়ির কারণে সুযোগ পেয়েছেন। আপনাদের একপক্ষ  অন্য পক্ষকে কাফের ফতোয়া দেন। এটা বড় ধরনের অন্যায় জানার  পরও অবলীলায় আরেকজনকে কাফের ঘোষণা করেন। অথচ আপনাদের আমরা আলেম এবং  যথেষ্ট শিক্ষত জ্ঞান করি। এই হাদিসটি কি আপনারা জানেন না?হযরত আবুজার গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেন, "কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে কাফের বা আল্লাহর ‘দুশমন’ বলে অভিযুক্ত করল, অথচ এটি সত্য নয়, তাহলে ওই অভিযোগ তার ওপরই বর্তাবে।" আমিরুল মুমেনিন খলিফা ‘উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)'র শাসনামলে ইবনে মাজউন নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ইসলামে মদপানের অনুমতি রয়েছে বলে একটি বিবৃতি দেয়। খলিফা অবশ্য এ জন্য তাকে কাফের ঘোষণা না করে বললেন, এ ব্যাপারে কোনো রায় ঘোষণার আগে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাক্ষ্যপ্রমাণসহ যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন।ওলামায়ে কেরাম ও চার মাযহাবের ইমামগণ একমত যে, নিছক মতপার্থক্যের কারণে কাউকে অবিশ্বাসী বা কাফের বলা জায়েজ বা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে নাম উল্লেখ করে কাফের ঘোষণা করা যাবে না।ইমাম আবু হানিফার মতে, কোনো কথার যদি নিরানববই শতাংশই অবিশ্বাসের বোঝায় এবং মাত্র এক শতাংশ বিশ্বাস (ঈমান) অবশিষ্ট থাকে তাহলেও তাকে কাফের বলা যাবে না।
মানুষ মাত্র ভুল করে। ভুলের ঊর্ধ্বে কেউই নয়।মাহফিলে একটানা দীর্ঘক্ষণ  কথা বলতে গেলে কথার মধ্যে ভুল ভ্রান্তি আসাটা অমূলক নয়। আজহারী সাহেবের বেশ কিছু কথা বিতর্ক তৈরি করেছে যেমন মহানবী( সা.) সিক্স প্যাক ছিলেন, পর্দা, মহানবী নিরক্ষর ছিলেন,নবীজির প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদিজা( রা.) সমন্ধে আজহারী বলেছেন, ‘‘২৫ বছরের বিশ্ব নবী বিয়ে করলেন ৪০ বছরের বুড়ি খাদিজাকে। বিয়ে করছেন সাইয়্যেদাতুনা খাদিজাকে। আগে দুই বার তালাক খাইছে। অনেক গুলো বাচ্চা জন্ম দিয়ে প্রৌঢ়া। তাগড়া যুবক বিয়ে করলো ৪০ বছরের এক মহিলা,তাও এমন যদি হতো এই মহিলার আগে বিয়ে হয় নাই, ইন্ট্যাক্ট মহিলা; তাও না, ভার্জিন না, উইডো বিধবা, আরমালাহ।’’তার বর্ণনা ঠিক আছে। কিন্তু শব্দের চয়ন ও প্রয়োগে  আরো সতর্ক  হওয়া উচিত।তারপরও বলি ২৮ বছরের তরুণ টগবগে বক্তা আজহারী আমাদের ইসলামের মূল বিষয়গুলোই পরিশীলিতভাবেই উপস্থাপন করছেন। বয়সের সঙ্গে তার কথা বলা ও শব্দ চয়নেরও আশা করি পরিবর্তন আসবে। 
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, আজহারী মাজহারী রাজহারী এগুলো যে সমস্ত কথাবার্তা বলে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে, এরা কিন্তু জামায়াতের প্রোডাক্ট। এ বক্তব্যের জবাব আজহারী সাহেব তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেন,"নিজের চিন্তা আর মতের বিরুদ্ধে গেলেই এ দেশে একটা সস্তা ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। আর সেটি হলো– ‘জামায়াত-শিবির’। এবার আপনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হোন অথবা মনেপ্রাণে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক হোন। দ্যাট ডাজেন্ট মেটার। ভিন্নমতকে দমনের এই অপকৌশল পুরো জাতির ভাগ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।একজন দা’ঈ ইলাল্লাহর কোনো দল নাই। তিনি সব দলের, সব মানুষের। তাদের দলীয়করণ না করে ব্যাপকভাবে দ্বীনের খেদমতের সুযোগ করে দেয়া উচিত।"
আজহারীকে কোনো বিশেষ দলের দিকে ঠেলিয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। তিনি যেমন সাঈদীর কথা বলেছেন কথা প্রসঙ্গে তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,জিয়াউর রহমানের কথা বলেছেন। এজন্য তাকে কেউ আওয়ামীলীগ বা বিএনপির প্রোডাক্ট বলেন নি। এমনকি তিনি সরকারের অনেকে ভালো কাজের প্রশংসা করেছেন।  ১২ জন ভারতীয় নাগরিককে ধর্মান্তরের এক ঘটনাও ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া গ্রামে আজহারির মাহফিলে একই পরিবারের মোট ১২ জন সদস্য এক সঙ্গে ইসলামে দীক্ষা নেয়। এই হিন্দু পরিবারটি এসেছিল ভারত থেকে। বাংলাদেশের পুলিশ ১২ জনকেই আটক করে এবং তাদের ভারতে ফেরত পাঠায়। ধর্মান্তরিত পরিবার নিয়ে বিতর্ক হলেও আজহারী তাদের জোর করে তো ধর্মান্তরিত করেননি। হুজুগে বাঙালি কোনো মতে একটি ইস্যু পেলেই হলো। চিলে কান নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
বাংলাদেশ সরকার জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক  নির্মূলে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে কিন্তু  তার সুফল জাতি খুব একটা পাচ্ছেন না। তারুণ্যের আইকন আজহারী তার বিভিন্ন মাহফিলে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি ও  সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলেন।  তরুণদের এসবের বিরুদ্ধে সচেতন ও সোচ্চার করে তোলেন। আজ যৌতুকের মহামারিতে জাতি আক্রান্ত, আজহারী তার মাহফিলে আগত অভিভাবক, তরুণদের যৌতুকবিহীন বিয়ের কথা বলেছেন,যৌতুক মুক্ত বিয়ের ওয়াদা নিয়েছেন। আজহারী বাল্যবিবাহ, সামাজিক নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন।তার এসব বক্তব্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে মিলে যায়। তার বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণ সচেতন ও উপকৃত হচ্ছে। সরকারের উচিত ছিল মোটিভেশনাল বক্তা হিসেবে আজহারীকে পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং তাকে  আরো সুযোগ করে দেওয়া। আজহারী কথা বলেছেন ধর্মের নামে বিরাজমান ভন্ডামীর বিরুদ্ধে। ভন্ড পীর, মাজার পূজারী, দয়াল বাবা, ল্যাংটা বাবার বিরুদ্ধে। জনগণকে সচেতন করে তুলছেন। যেকারণে মাজারী বাজারী পন্থীরা তার প্রতি খড়গহস্ত।মাজার, পীর পূজারীদের ব্যবসায় টান পড়েছে। যে কারণে তাদের আজহারীর বিরুদ্ধে অবস্থান। আজহারী কথা বলেছেন পরিবার, পিতামাতা  স্বামী স্ত্রীর অধিকার নিয়ে। একটি আদর্শ পরিবার কিভাবে গঠিত হতে পারে তার রুপরেখা নিয়ে। আজহারীর সর্বশেষ ফেসবুক পোস্টে সেকথায় ব্যক্ত করেছেন, "এ বছর বেশির ভাগ প্রোগ্রামগুলোতেই পারিবারিক ও সামাজিক ক্রাইসিস নিয়ে কথা বলেছি, পাশাপাশি কয়েকটি সূরার তাফসিরও করেছি। আশা করি, আলোচনাগুলো থেকে আপনারা উপকৃত হবেন। পরিবারের সবাই মিলে আলোচনাগুলো শুনুন এবং কথাগুলো বাস্তব জীবনে মেনে চলার চেষ্টা করুন। তাহলে দেখবেন ধীরে ধীরে, আমাদের পরিবার ও সমাজ সুখময় এবং শান্তিময় হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।"
একটি বক্তৃতায় আজহারী সাহেব বলেছিলেন আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডু, এই খেলায় এক জন অপর পক্ষের খেলোয়াড়কে টেনে ধরে রাখে। একথাটি তিনি বলতে ভুলে যাননি।"আমার এ জীবনের ছোট্ট অভিজ্ঞতায় যা দেখলাম, সেটা হলো,  আমরা আমাদের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়ে দেই অন্যকে হিংসা করতে করতে। নিজেরা কাজ না করে অন্যের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে আমরা মহা ব্যস্ত। আসলে, অপপ্রচার করে তেমন কোন লাভ নেই। অপপ্রচারে আমি কখনো মনক্ষুণ্ন হই না। আমার বিশ্বাস আপনারাও হবেন না। কারণ অপপ্রচারগুলোই আমাদের প্রচারণার দায়িত্ব পালন করেছে আলহামদুলিল্লাহ। হক্বের পথে বাধা, বিপত্তি আসবেই। এটাই স্বাভাবিক। যে পথে কাঁটা নেই সেটা পথ নয়, সেটা কার্পেট। আর কার্পেটে হেটে মজলিশে পৌঁছানো যায়, মনজিলে নয়।"শেষ করি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে , 
"উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ; 
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ। 
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ, 
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ।"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...

কাবা ঘর নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মো. আবু রায়হানঃ কাবা মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যে দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে বা সালাত আদায় করে, পৃথিবীর যে স্থান থেকে কাবা যে দিকে মুসলমানগণ ঠিক সে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। হজ্জ এবং উমরা পালনের সময় মুসলমানগণ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।কাবা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মুকাআব অর্থ ঘন থেকে।কাবা একটি বড় ঘন আকৃতির ইমারত। (The Kaaba, meaning cube in Arabic, is a square building elegantly draped in a silk and cotton veil.)।যা সৌদি আরবের মক্কা শহরের মসজিদুল হারাম মসজিদের মধ্যখানে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি কাবাকে ঘিরেই তৈরি করা হয়েছে।কাবার ভৌগোলিক অবস্থান ২১.৪২২৪৯৩৫° উত্তর ৩৯.৮২৬২০১৩° পূর্ব।পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর বায়তুল্লাহ বা পবিত্র কাবা ঘর ।আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে তা মক্কা নগরীতে। (সুরা আল ইমরান - ৯৬)। “প্রথম মাসজিদ বায়তুল্লাহিল হারাম তারপর বাইতুল মাকদিস, আর এ দুয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো চল্লিশ বছরের”।(মুসলিম- ৫২০)। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি ...