মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর জীবনপ্রদীপ যেভাবে নিভে গিয়েছিল, তা অত্যন্ত করুণ এবং বিতর্কিত। সাধারণ ইতিহাস কিংবা উপকথার বাইরে গিয়ে যদি ইবনে আল-বালাজুরি, জি. আর. হটিং কিংবা পি. কে. হিটি-র মতো ইতিহাসবিদদের সূত্র বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় যে তাঁর মৃত্যু মূলত উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের ফলাফল ছিল। ১. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থান মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর অভিভাবক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের । ৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান হাজ্জাজকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৭০৫ সালে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর নতুন খলিফা আল-ওয়ালিদও হাজ্জাজকে তাঁর পদে বহাল রাখেন। এই হাজ্জাজের নেতৃত্বেই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে উমাইয়া শাসন সুদৃঢ় করেন। ২. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তরাধিকার সংকট হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কঠোর শাসন খিলাফতের ভেতরে বহু শত্রুর জন্ম দিয়েছিল: মুহাল্লাব পরিবারের সাথে দ্বন...
আজ সারাদেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় যুব দিবস। এই দিবসের প্রাক্কালে এদেশের যুবারা অবস্থান নিয়ে আছে রাজপথে। তাদের একটিই দাবি সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করতে হবে।জোরালোভাবে এ দাবী তারা কয়েক বছর ধরে জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বয়স বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। দাবিটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক হবার পরও বাস্তবায়ন না করাটা সত্যিই দুঃখজনক। এ নিয়ে আমার বেশ কয়েকটি লেখা ইতোমধ্যে পত্র পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। লেখাগুলোয় ৩৫ কেন প্রয়োজন? তা বিভিন্ন যুক্তির নিরিখে উপস্থাপন করা হয়েছে। আপাত: দৃষ্টিতে ৩৫ এর মতো যৌক্তিক আন্দোলনে দাবি পূরণ না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। প্রথমত : ৩৫ আন্দোলনকারীরা এ দাবীর যথার্থতা ও যৌক্তিক কারণ সরকারের উপর মহলে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
দ্বিতীয়ত : সবাই ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৩৫ চাই বলে সরব কিন্তু রাজপথে তাদের শারীরিক অনুপস্থিতি।
তৃতীয়ত :জোরালো কর্মসূচি জনসংযোগের অভাব এবং সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সাথে সম্পর্কেের যথেষ্ট ঘাটতি।
চতুর্থত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এ আন্দোলনে ৩৫ ঊর্ধ্ব বয়সীদের নেতৃত্বে থাকা। যেকারণে এ আন্দোলনে দ্বিধা দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং। ৩৫ ঊর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিরা এ আন্দোলনের গুরুত্ব কি বুঝবে? তার পাবারই বা কি আছে? তারা থাকবে মিডিয়ায় নিজেদের প্রদর্শনে ব্যস্ত। এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না।
পঞ্চমত : এ দাবি পূরণ হবার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো, জাতীয় সংসদে তারুণ্যের কোনো প্রতিনিধি নেই। যে কয়জন আছেন তারাও দলের বাইরে গিয়ে কিছু বলতে ও করতে পারেন না। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠীরর বয়স ৩৫ এর নিচে। বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যের গড় বয়স ৬০। জাতীয় সংসদে যুব প্রতিনিধি রয়েছে মাত্র শতকরা ০.৩ ভাগ। সেহিসাবে ৩০ বছরের কম বয়সী সংসদ সদস্যদের বিশ্ব র্যাকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬ তম। তাহলে বুঝেন সত্তর আশি বছর বয়সের রাজনীতিবীদেরা এদেশের যুবকদের পালস কতটুকু বুঝবেন? ৩৫ এর দাবিটি আজ কবিতার কয়েক ছত্রের মতো হয়েছে।
চিরসুখী-জন ভ্রমে কি কখন ?
ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে !
কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভু আসে বিষে দংশনে যারে করিছে ব্যাপন।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বর্তমান বয়সসীমা বিশ্বের ১৬২টি দেশের সর্বনিম্ন বয়সের চেয়েও পাঁচ বছর কম। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নত দেশে চাকরির সর্বোচ্চ বয়স ৪০ থেকে ৫৯ বছর। হাতেগোনা বিশ্বের কয়েকটি দেশে চাকরির সর্বনিম্ন বয়স ৩৫ বছর হলেও বাংলাদেশে তার চেয়েও কমিয়ে ৩০ বছরে রাখা হয়েছে। বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি, সর্বোপরি ’৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়। কিন্তু অমিত সম্ভাবনার যুব সমাজকে কাজে লাগানো ছাড়া আর এসব বাস্তবায়ন আষাঢ়ে গল্পের মতো মনে হয়। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যে কোনো নাগরিক যুব বলে গণ্য হবেন। এমন বিধান রেখে জাতীয় যুবনীতি ঘোষণা করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ যুবক। সেহিসাবে দেশ যুবকের সংখ্যা ৫ কোটি। সরকারি বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ। যদিও সংখ্যাটি এর চেয়েও বেশি। উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্বের হার ১০.৬ শতাংশ। গতকাল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলযুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ২৮ শতাংশ যুবক বেকার । বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এদের মধ্যে কর্মসংস্থান হয় মাত্র ৭ লাখ মানুষের।যেমন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, দেশে কর্মক্ষম ৫ কোটি ৬৭ লাখ লোকের মধ্যে কাজ করছে ৫ কোটি ৫১ লাখ। তার অর্থ, বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ। কিছু দেশে মাত্র ২৬ লক্ষ বেকার এটি বিশ্বাসযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নয়। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বেকার যুবকের হার ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার জন্য কাজ করছে সরকার। সরকার যদি সত্যিই বেকার যুবকদের বেকারত্ব ঘুচাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় তাহলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা অবশ্যই ৩৫ করতে হবে।বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ হওয়ায় অন্যান্য বেসরকারি সেক্টরেও চাকরির বয়সসীমা ৩০ নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। এতে করে অনেক যুবকের স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হচ্ছে। বিভিন্ন অযৌক্তি-কুযুক্তি দেখিয়ে ৩৫ এর দাবিকে নাকচ করছেন। যদি পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ৩০ এর উপর বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে আমাদের বয়স বৃদ্ধিতে এতো অজুহাত ও কালক্ষেপণ কেন? আপনারা কথায় কথায় দেশটাকে কানাডা, সিঙ্গাপুর, জাপান আবার কখনো কখনো সুইজারল্যান্ড বানিয়ে দেনএসমস্ত দেশ তারুণ্যের বয়স ৩০ এর ফ্রেমে বেঁধে রেখে এত উন্নত হয়নি। তারা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আজ উন্নত দেশ হয়েছে।এগুলো শুনতে বড়ই অদ্ভুত শোনায়।বাংলাদেশের বিশাল তরুণ সমাজকে ৩০ বছর হলেই উপেক্ষা করা হয়। ছাব্বিশ বছরে অর্জিত সনদপত্র ৩০ বছরে উত্তীর্ণ হলেই আস্তাকুঁড় নিক্ষেপ করেন। তারুণ্যের স্বপ্ন আঁতুড়ঘরেই হত্যা করেন। সেখানে উন্নত রাষ্ট্র গড়ার এ দাবী জনগণের সঙ্গে মশকরার শামিল ও হাস্যকর।৩৫ আন্দোলনকারীরা তারা চাকরি চায় না। তারা চায় চাকরিতে আবেদনের সুযোগ মাত্র। এ সুযোগ তাদের দিন। পারলে তারা উত্তীর্ণ হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করবে। না পারলে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে এলাকায় গিয়ে তারা মাছ চাষ, ক্ষেত খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবে। কিন্তু তারুণ্যের ৩৫ এর সুযোগ ও স্বপ্ন আপনারা গলাটিপে হত্যা করতে পারেন না।পাকিস্তান আমলে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৫ বছর, পরবর্তীতে তা ২৮ করা হয়,এর পর এখন ৩০ হয়েছে। এছাড়া ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর। ১৯৯১ সালে তা বাড়িয়ে বিএনপি সরকার ৩০ বছর করে। এরপর আর বয়সসীমা বাড়ানো হয়নি।যদিও এখন মানুষের গড় আয়ু অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সেই অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। যা খুবই দুঃখের ও হতাশাজনক।
২০১৪ সালে গড় আয়ু ছিল ৭০ দশমিক ৭ বছর,২০১৫ সালে ৭০.৯ বছর, ২০১৬ সালে ৭১.৬ বছর, ২০১৭ গড় আয়ু ৭২ বছর, বিগত বছরগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কিছুটা বেড়ে ৭২ দশমিক ৩ হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের আয়ু ৭০ দশমিক ৮ বছর আর নারী ৭৩ দশমিক ৮ বছর।আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে তিন মেয়াদে সরকার গঠন করলেও বয়স বাড়ায়নি। এমনকি নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামীলীগ বয়স বৃদ্ধির কথা বললেও এখন বেমালুম ভুলে আছে। যদিও সরকার ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সরকারি চাকরিতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৫৭ থেকে ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করে। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করে। কিন্তু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সরকারের একটি পক্ষ ও আমলারা বয়স বৃদ্ধির প্রস্তাবনা আটকিয়ে রেখেছেন।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ এর উপরে হলেও শুধু বাংলাদেশই ভিন গ্রহের দেশ হিসেবে বয়স রাখা হয়েছে ৩০। যা রীতিমতো অযৌক্তিক ও সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বরখেলাপ।বিভিন্ন সময়ে চাকরিতে বয়স বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অজানা কারণে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বয়স বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়া হলেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার পর তারা বেমালুম ভুলে আছেন। আজ যুব দিবসে তারুণ্যের ৩৫ দাবিটি মেনে নিয়ে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে যুব সমাজকেও শামিল করার সময় এসেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন