সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্তাম্বুল থেকে মদিনা: উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ খলিফা আবদুল মজিদ দ্বিতীয়-এর করুণ প্রস্থান

ইতিহাসের পাতায় কিছু সমাপ্তি কেবল একটি অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং তা এক গভীর ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। ২৩ আগস্ট—উসমানীয় রাজবংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদ (Caliph Abdul Majid II) -এর জীবনের এক মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধূর অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। খেলাফতের পতন এবং উসমানীয় রাজবংশের তুরস্ক থেকে নির্বাসনের পর তাঁর জীবন কীভাবে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হয়েছিল, এটি তারই এক ঐতিহাসিক দলিল। ১. নির্বাসিত জীবন ও প্যারিসের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর যখন উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করা হয়, তখন রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আবদুল মজিদ দ্বিতীয়কেও দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানি ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন চরম দুর্দিনে প্যারিসের এক ফ্ল্যাটে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ এতটাই অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিল যে, বেশ কয়েক দিন ধরে তা ফ্ল্যাটেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হয় এবং তাঁর মরদেহ প্যারিস মসজিদে নিয়ে গিয়ে হিমঘরে (frozen storage) রাখা হয়। ২. অপূর্ণ ইচ্ছে ও শেষ ঠিকানার সন্ধান আবদুল মজিদ জীবনের ...

মুজাদ্দিদে আলফেসানির সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে ৭ দফা




#মো. আবু রায়হান

সম্রাট আকবর ইসলাম ত্যাগ করে ১৫৮২ সালে দ্বীনে-এলাহি নামে একটি নতুন ধর্ম প্রচার করেন। যদিও প্রচার করা হয়, এই নতুন ধর্মে সব ধর্মের ভালো দিকগুলো সংযোজন করা হয়েছে। দ্বীনে এলাহির মূল উপাদান ছিল অগ্নিপূজা, সূর্যপূজা, দরবারে প্রবেশ করতে তাঁকে সম্মানি সিজদা করা, নামাজ পড়তে নিষেধাজ্ঞা, পর্দা রহিতকরণ, সুদ-ঘুষ এবং জুয়ার বৈধতা, গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা, অনৈসলামিক দিবসের প্রচলন, শূকর হালাল বলে ঘোষণা, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে প্রবল আপত্তি, ব্যভিচারের সাধারণ অনুমতি, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর পরিবর্তে কালেমা হিসেবে আকবর খলিফাতুল্লাহর ব্যাপকহারে প্রচলন। এগুলোই ছিল দ্বীনে এলাহির মৌলিক উপাদান। এটাকে হিন্দুধর্মের নতুন সংস্করণ ছাড়া আর কীই বা বলা যায়? মুসলিম উম্মাহ তখন অত্যন্ত নাজুক মুহূর্তে অতিক্রম করছিল। উম্মাহর এমন ক্রান্তিকালে ধর্মদ্রোহিতার প্রতিরোধে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়লেন টগবগে যুবক আহমদ সিরহিন্দী। ইতিহাসের এ মহান কিংবদন্তি ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের সিরহিন্দে ১৫৬৪ সালে শুক্রবার রাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাখদুম শায়খ আবদুল আহাদ (রহ.) ছিলেন প্রখ্যাত সুফি শায়খ আবদুল কুদ্দুস গঙ্গোহী (রহ.)-এর শীর্ষ খলিফা। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর ২৮তম অধস্তন বংশধর। শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ)-কে তাঁর বিশাল কর্মযজ্ঞ ও খেদমতের কারণে মুসলিম উম্মাহ উপাধি দিয়েছে মুজাদ্দিদে আলফেসানি (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মহান ধর্ম-সংস্কারক)। একটি হাদিসে আছে, নবী (সা.) ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ এই উম্মাহর জন্য প্রতি শতাব্দীর সূচনালগ্নে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি এই শতাব্দীর জন্য দ্বীনের সংস্কারমূলক কাজ করবেন। (আবু দাউদ শরিফ, তিবরানি, বায়হাকি) আগে এক শ বছরের জন্য একজন মুজাদ্দিদ আসতেন। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের পর উম্মাহকে ধর্মদ্রোহিতার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতেচ ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন সম্রাট আকবরের দ্বীনে এলাহির প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত তুঙ্গে। ১৬০৫ সালে সম্রাট আকবরের মৃত্যু ঘটে। এরপর ক্ষমতায় সমাসীন হন আকবরপুত্র জাহাঙ্গীর। তখন মুজাদ্দিদে আলফেসানির বয়স ৪৩ বছর। নতুন সম্রাট আকবরের দ্বীনে এলাহি যে হালে পানি পায়নি, তা তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দেখলে বোঝা যায়। দ্বীনে এলাহি গ্রহণ করেছিল মাত্র ১৮ জন । জাহাঙ্গীরের শাসনামলের শুরুর দিকে তাঁর সংস্কার আন্দোলন পুরো দেশেই হইচই ফেলে দেয়।
মুজাদ্দিদে আলফেসানি সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১. সম্রাটকে সম্মানি সিজদা করার কুপ্রথা রহিত করতে হবে। ২. গরু জবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. সম্রাট ও তাঁর সভাসদদের প্রথম তাকবিরের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে হবে। ৪. শরিয়াহ বিভাগ আবার প্রতিষ্ঠা করে কাজির পদ পুনর্বহাল করতে হবে ৫. সমাজে প্রচলিত সব ধরনের কুসংস্কার ও ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। ৬. ভগ্ন ও বিধ্বস্ত মসজিদগুলো সংস্কার করে সেগুলো আবাদ করতে হবে। ৭. আকবরের যাবতীয় ইসলামবিরোধী আইন পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করতে হবে। সম্রাট তাঁর এসব দাবি মেনে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এ মর্মে শাহী ফরমান জারি করেন। উপমহাদেশে ইসলামের ওপর চেপে বসা দ্বীনে এলাহির জগদ্দল পাথর অপসারণ করে ফের ইসলাম প্রতিষ্ঠা, তাঁর জীবনের এক অনবদ্য মহান কীর্তি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে অর্থাৎ ইহুদিদের বন্ধু গাছ

মো.আবু রায়হান: কিয়ামত সংঘটিত হবার   পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) এর সঙ্গে দাজ্জালের জেরুজালেমে যুদ্ধ হবে। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা দাজ্জালের পক্ষাবলম্বন করবে। হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন।এদিকে   ইহুদিরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চেষ্টা করবে।   আশেপাশের গাছ ও পাথর/ দেয়ালে আশ্রয় নেবে। সেদিন গারকাদ নামক একটি গাছ ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। গারকাদ ইহুদীবান্ধব গাছ।গারকাদ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল কাটাওয়ালা ঝোঁপ।গারকাদ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ Boxthorn । Box এর অর্থ সবুজ ঝোঁপ এবং thorn এর অর্থ কাঁটা। এ ধরনের গাছ বক্সথর্ন হিসেবেই পরিচিত। এই গাছ চেরি গাছের মতো এবং চেরি ফলের মতো লাল ফলে গাছটি শোভিত থাকে।   ইসরায়েলের সর্বত্র বিশেষত অধিকৃত গাজা ভূখন্ডে গারকাদ গাছ ব্যাপকহারে   দেখতে পাওয়া যায়।ইহুদিরা কোথাও পালাবার স্থান পাবে না। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবে , হে মুসলিম! আসো , আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবে , হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে , আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদ...

সুফফা ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মো.আবু রায়হান:  সুফফা মসজিদে নববির একটি স্থান। যেখানে একদল নিঃস্ব মুহাজির যারা মদিনায় হিজরত করেন এবং বাসস্থানের অভাবে মসজিদে নববির সেই স্থানে থাকতেন।এটি প্রথমদিকে মসজিদ উত্তর-পূর্ব কোণায় ছিল এবং রাসুলের আদেশে এটাকে পাতার ছাউনি দিয়ে ছেয়ে দেয়া হয় তখন থেকে এটি পরিচিতি পায় আল-সুফফা বা আল-জুল্লাহ নামে। ( A Suffah is a room that is covered with palm branches from date trees, which was established next to Al-Masjid al-Nabawi by Islamic prophet Muhammad during the Medina period.)। মোটকথা রাসুল (সা) মসজিদে-নববির চত্ত্বরের এক পাশে আস সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুফফা হলো ছাদবিশিষ্ট প্রশস্ত স্থান। সুফফার আকৃতি ছিল অনেকটা মঞ্চের মতো, মূল ভূমির উচ্চতা ছিল প্রায় অর্ধমিটার। প্রাথমিক পর্যায়ে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৮ মিটার। মসজিদে নববির উত্তর-পূর্বাংশে নির্মিত সুফফার দক্ষিণ দিকে ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের অবস্থানের হুজরা এবং সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ছিল মেহরাব।আসহাবে সুফফা অৰ্থ চত্বরবাসী। ঐ সকল মহৎ প্ৰাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যা...

খন্দক যুদ্ধ কারণ ও ফলাফল

#মো. আবু রায়হান ইসলামের যুদ্ধগুলোর মধ্যে খন্দকের যুদ্ধ অন্যতম। ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবীজি (সা.) মদিনায় আসার আগে সেখানে বড় দুটি ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করত। বনু নাজির ও বনু কোরায়জা। ইহুদিদের প্ররোচনায় কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্র মদিনার মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খন্দকের এই যুদ্ধ ছিল মদিনার ওপরে গোটা আরব সম্প্রদায়ের এক সর্বব্যাপী হামলা এবং কষ্টকর অবরোধের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে হযরত মুহাম্মদ (স:) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণ কারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। জোটবাহিনী মুসলিমদের মিত্র মদিনার ইহুদি বনু কোরায়জা গোত্রকে নিজেদের পক্ষে আনে যাতে তারা দক্ষিণ দিক থেকে শহর আক্রমণ করে। কিন্তু মুসলিমদের তৎপরতার ফলে তাদের জোট ভেঙে যায়। মুসলিমদের সুসংগঠিত অবস্থা, জোটবাহিনীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়।এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসল...